আজ দেশ নিছক দলবাজিতেই ডুবতে বসেছে

লেখক
প্রভাত খাঁ

এই বাঙলার তরুণ বিদ্রোহী কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য বলেছেন–‘‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি৷’’ যার ক্ষুণ্ণিবৃত্তি হয় সে ওই চাঁদকে দেখে সুন্দর ও অনেক কিছুই ভাবতে পারে কিন্তু যার পেটে খাদ্য নেই, ক্ষুধার জ্বালায় যে ছট্ফট করে তার চোখে খাদ্য বস্তু ছাড়া অন্য কোন কিছুই আসে না৷ এটা বাস্তব সত্য৷ তাই তো মানবতাবাদীরা এমনকি আধ্যাত্মিক পথের যাঁরা পথ প্রদর্শক তাঁরা বলেন–খালি পেটে ধর্ম হয় না৷ তাঁরা উপদেশ দেন যে অন্নহীনকে প্রথমে অন্ন দান কর তারপর ধর্মের কথা, আদর্শের কথা বল৷

এই ভারতে এক সময়ে খাদ্যের সন্ধানে ও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বাইরের লোকেরা এসেছে৷ এখানে এসে তারা খেয়ে পরে নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছে৷ তারা আর লুটেরা হিসাবে ফিরে যায় নি৷ তারা চিরকালের মতোই এই দেশের মাটিতে মাটির সন্তান হয়েই থাকছে৷তাই তো কবি রবীন্দ্রনাথ বলেছেন–‘শক্ হূন দল, পাঠান মোগল এক দেহে হ’ল লীন’৷

কিন্তু বর্তমানে বিদেশী শাসনের হাত থেকে দেশ মুক্ত হয়েছে৷ স্বাধীন দেশের বয়স হয়ে গেল প্রায় ৭২ বছর৷ যে গত ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট জন্মেছে  তার বয়স হয়ে গেল অনেক বছর কিন্তু হতভাগ্য দেশের নাগরিকগণ সকলে বেঁচে থাকার মতো আজও খাদ্যটুকু পয় না৷ রাষ্ট্র সংঘের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন বলছে বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ৮২ কোটি মানুষ ক্ষুধার শিকার৷ তার মধ্যে প্রায় ২৭ কোটি মানুষ ভারতেরই৷ ২০ কোটি ভারতীয়কে আজও প্রত্যহ ক্ষুধা নিয়ে রাতে ঘুমুতে যেতে হয়, আর ক্ষুধা নিয়ে জাগতে হয়৷ প্রতিদিন ৭ হাজারের বেশী মানুষ মরে ক্ষুধায়৷ অপুষ্টিই বর্তমানে দেশে ভয়াবহ নীরব ঘাতক৷

অনেক বছর আগে সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দেশের শ্রীবৃদ্ধি সম্বন্ধে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন যে দেশের শ্রীবৃদ্ধি ঘটিয়াছে কিন্তু রেমো, শ্যেমোর কি উন্নতি ঘটিয়াছে৷ সারাদিন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের পর ভাঙ্গা পাত্রে পান্তাভাতও জোটে না৷ অত্যন্ত বেদনার ও দুঃখের সঙ্গে বলতে হয় যে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর ইংরেজের প্রবর্ত্তিত রেশনিং ব্যবস্থা আজ প্রায় উঠে গেছে৷ রেশনিং কার্ড প্রায় সকলের আছে কিন্তু সপ্তাহে আগে যে খাদ্য যোগান দেওয়া হতো তা বর্তমানে কেবলমাত্র বিপিএল নামে কিছু লোককে দেওয়া হয় নিকৃষ্ট মানের খাদ্য যার খাদ্যগুণ নিম্নমানের৷ বিশেষ করে এই রাজ্যে আবার যে মাসে ৫টি রবিবার পড়ে এক সপ্তাহ সেটাও পায় না কার্ডধারিগণ৷ শুকিয়ে থাকতে হয়৷ বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য এমনই ঊর্দ্ধসীমায় গিয়ে পৌঁছেছে যা অনেকের নাগালের বাইরে৷ জীবনদায়ী ওষুধ কেনার ক্ষমতা অনেকেরই নেই৷ চরম বেকার সমস্যায় দেশ ধুঁকছে৷ চরম অর্থাভাবে লক্ষ লক্ষ পরিবার মৃত্যুর সঙ্গে প্রতিনিয়ত পাঞ্জা লড়ছে৷ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নে দেশ ডুবেছে৷ দুর্নীতিতে দেশের গণতন্ত্র আজ কলঙ্কিত৷

নিছক দলতন্ত্রে আজ গণতন্ত্র এদেশে ডুবতে বসেছে৷ ১৩০ কোটি মানুষের মধ্যে কেবলমাত্র বিশেষ কয়েকটি ধনী পরিবার ফুলে ফেঁপে জয়ঢাক হচ্ছে৷ চরম ধনতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পুঁজিপতিদের তথা বৈশ্য–সমাজ–ব্যবস্থ্ স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে ভারত৷ হতভাগ্য গরীব দেশবাসীর কথা এ সরকার ভাবার সময় পায় না৷ তাই সমগ্র দেশবাসীকে রক্ষার জন্যে প্রয়োজন সৎ, নীতিবাদী আদর্শবান তরুণ–তরুণীদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা যাতে করে প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র এদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়৷ অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ ব্যতীত প্রকৃত গণতন্ত্র বাঁচতে পারে না ও দেশবাসীর মুখে হাসি ফুটতে পারে না৷ বলা বাহুল্য পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক কেন্দ্রীকরণ ঘটে মুষ্টিমেয় পুঁজিপতিদের হাতে৷ দেশে অধিকাংশ জনসাধারণ ক্রমশঃ পুঁজিপতিদের দয়ার পাত্রে পরিণত হয়৷ এমনকি মার্কসবাদী সমাজব্যবস্থাতেও অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ হয় না৷ জনগণের হাতে অর্থনৈতিক ক্ষমতা থাকে না৷ একমাত্র প্রাউটের পথেই অর্থনীতির বিকেন্দ্রীকরণ সম্ভব হবে৷