বর্ত্তমান শাসন ব্যবস্থায় রাজনৈতিকভাবে শিক্ষাক্ষেত্রে প্রধানদের উপর ভয়ংকর মানসিক ও শারীরিক চাপ তাই প্রধান হওয়ার অনীহা

লেখক
প্রভাত খাঁ

মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ হতে শিক্ষাবিদ বিশেষ করে অধ্যাপকদের এতো অনীহা কেন এর উত্তর তো একটাই তা হলো অধ্যক্ষপদে গেলে ছাত্রছাত্রাদের বহুমকী তো অধ্যক্ষকেই সহ্য করতে হবে৷ কখনো কখনো সেই ছাত্র-ছাত্রাগণ দাবী আদায়ে অফিস ঘরে আটক করে রেখে তাঁকে জল পান করতে, এমনকি প্রাকৃতির ডাকে বাহিরে যেতেও দেয় না৷ শুধু তাই নয় বর্তমানে সরকারের নিয়ন্ত্রণটা এতটা শিক্ষাক্ষেত্রের ওপর পড়েছে যার দরুণ সরকারী নির্দেশের তিলমাত্র এদিক ওদিক হলে অধ্যক্ষের চেয়ারও টলমল করতে পারে৷ শিক্ষাবিদ্গণ শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষাদান করেই তাঁদের পবিত্র কর্তব্যের সমাপ্তি ঘটাতে চান৷ কিন্তু যত দিন যাচ্ছে শিক্ষাক্ষেত্রগুলিতো রাজনৈতিক দলগুলোর ছেলে ধরার আঁতুড় ঘর হয়ে দাঁড়িয়েছে৷

এটা তো আজকের সমস্যা নয়৷ এটার বেশী করে প্রাদুর্ভাব ঘটেছে অতীতের বাম শাসনের আমল থেকে৷ বর্তমানের শিক্ষা ব্যবস্থাটাই হয়ে গেছে সরাসরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে যেন বিশেষ কোন ফার্ম৷ এখানে শিক্ষকগণের কোন ব্যাপারে বিশেষ করে শিক্ষা পদ্ধতি বা শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে কোন নিজস্ব সত্তার মূল্য নেই৷ শিক্ষা ব্যবস্থাটা একেবারে শাসক দলের নিজস্ব নীতির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত৷ যার ফলে যখন যে সরকার আসে তাঁরাই শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটিয়ে জানান দিয়ে থাকেন যে শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁদের নির্ধারিত শিক্ষা পদ্ধতিই চলবে৷ এতে শিক্ষার ক্ষেত্রে নেমে এসেছে এক চরম অনিশ্চততা ও রাজনৈতিক জুলুম, বিশেষ করে সরকারী দলের ছাত্র ইউনিয়নের উদ্ধত ব্যবহার কোথাও কোথাও অসভ্য ব্যবহার, শিক্ষকদের ওপর শারীরিক নির্যাতনও৷ আর তার প্রধান লক্ষ্য হন অধ্যক্ষ৷

প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য, মাত্র ৬৬টি মহাবিদ্যালয়ে অধ্যক্ষ নিয়োগ সম্ভব হয়েছে৷ ৮৪টি মহাবিদ্যালয়ে অধ্যক্ষের দায়িত্ব নিতে কেউই এগিয়ে আসেন নি৷ তার কারণটা হলো এখানে যাঁরা এ্যাকটিং হিসাবে আছেন তাঁরা নিশ্চয়ই যেভাবে কাজ চালাচ্ছেন সেটা ছাত্রছাত্রা ও প্রভাবশালী ব্যষ্টিদের সমর্থন আছে৷

তাঁরা অনেকেই হয়তো অত্যাচার অপমান সহ্য করে সরস্বতীর মন্দিরে প্রধান সেবাইত হয়ে কাজ চালিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর৷ অধ্যক্ষের বেতন ও মর্য্যাদা তাঁদের কাম্য নয়৷ তবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে এ্যাকটিং অধ্যক্ষরা ভালোভাবেই কাজ করে চলেছেন শত বাধা বিপত্তিকে দূরে ঠেলে দিয়ে৷ তবে বর্ত্তমানে মহাবিদ্যালয়গুলিতে যেটির অভাব সেটি হলো ছাত্রছাত্রাদের পঠনপাঠানের জন্য উপযুক্ত লেকচারারদের দারুণ অভাব৷

মোদ্দাকথা শিক্ষার জগতে নেমে এসেছে দারুণ অরাজকতা ও অব্যবস্থা৷

প্রাথমিক শিক্ষাক্ষেত্রে সমীক্ষায় দেখা গেছে শিক্ষার মান অনেকটাই নেমে গেছে৷ মধাহ্ণ ভোজনের ব্যবস্থা আছে ঠিকই কিন্তু ওই ভোজনটুকুর পর আর তেমন পড়াশুণা হয় না ফলে শিক্ষাগত মান নেমেই চলেছে৷ ফলে সরকারী প্রাথমিক সুকলে ছাত্রসংখ্যা কমছে৷

শিক্ষাক্ষেত্রে যেটির সবচেয়ে প্রয়োজন সেটি হলো উপযুক্ত শিক্ষক ও শিক্ষিকার নিয়োগ৷ সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা আগের মতো পরিদর্শকগণ বিদ্যালয়ে আসেন না৷ মোদ্দাকথা হলো বাম আমলে অধিকাংশ শিক্ষক দলের ক্যাডার হয়ে কাজ করতেন৷ সেটা হয়তো কিছুটা কমেছে তবে বর্তমানে শিক্ষাক্ষেত্রে অন্য অনেক কিছুর প্রাদুর্র্ভব হয়েছে৷ শিক্ষাক্ষেত্রে ববহু বছর হলো প্রাথমিক স্তর থেকে সেই মহাবিদ্যালয় পর্যন্ত দেখা যায় শিক্ষক নিয়োগে দারুণ কার্পণ্য৷ এটা হয়েছে বোধহয় আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে৷ তাছাড়া আমাদের দেশের দুর্ভাগ্য, কথায় কথায় মামলা রুজু হওয়া৷ এই শিক্ষক নিয়োগে প্রতিবারই যেন কর্তৃপক্ষ এমন সব কাজ করে থাকেন যা অবৈধ৷ যারা বঞ্চিত হয় তারা কোর্টে যায় ও মামলা রুজু করে৷ আর সবদিকেই দেখা যায়, রাজনৈতিক দলগুলি কি সরকারী আর কি বিরোধী দল সবক্ষেত্রেই এমন রাজনৈতিক টানাটানি শুরু করে যাতে হতভাগ্য জনগণের বিশেষ করে শিক্ষিত বেকারদের প্রাণান্ত৷ অত্যন্ত দুঃখের কথা হ’ল শিক্ষিত বেকারদের কর্মপ্রাপ্তির ব্যর্থতার কারণে শিক্ষালাভের যে উদ্দেশ্যে সেটা বিফল হওয়াতে শিক্ষালাভ করার যে আগ্রহ সেটাই কমে গেছে৷ তাই পড়াশুণা না করে নিছক পাশ করার জন্য ছাত্রছাত্রাগণ বিশেষ করে মহাবিদ্যালয়গুলিতে ইউনিয়নবাজি করে রাজনৈতিক দলগুলির ইন্ধনে৷ তাই শিক্ষাকে রক্ষা করতে হলে দরকার শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রকৃত শিক্ষাবিদদের হাতে তুলে দেওয়া৷ সরকারকে শিক্ষার ব্যাপারে সংযত হতে হবে৷ বেশী করে শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারী নিয়মকানুন ফলাতে গেলে শিক্ষায় ভাঁটা পড়বে আরো বেশী৷ আর ওই প্রধানের দায়িত্ব নিয়ে দেখা যাবে লোকই পাওয়া যাচ্ছে না৷ শিক্ষা ব্যবস্থায় তো পদোন্নতি বলতে কিছুই নেই৷ সহকারী শিক্ষক তো সেই সহকারী শিক্ষকই৷ মনে হয় শিক্ষকদের মধ্যে যিনি প্রবীণ তিনি শিক্ষকতার শেষ লগ্ণে ওই প্রধানের পদ অলঙ্কৃত করার সুযোগ পেলে ভাল হয় (অবশ্য যোগ্যতাও বিবেচ্য)৷ যদি এমনটি হয় তাহলে কেউই এই পদে যেতে বিশেষ অনীহা প্রকাশ করবেন না৷