কর্ষকদের সমস্যার স্থায়ী সমাধান কোন পথে?

লেখক
আচার্য সত্যশিবানন্দ অবধূ্ত

গত ৩০শে নবেম্বর দিল্লির রামলীলা ময়দান থেকে পার্র্লমেন্ট ষ্ট্রীট পর্যন্ত প্রায় ১ লক্ষ কর্ষক বিক্ষোভ মিছিলে সামিল হয়ে ঋণমুকুব, ফসলের ন্যায্য মূল্য প্রভৃতির দাবী জানায়৷ অল ইণ্ডিয়া কিষাণ সংঘর্ষ সমন্বয় কমিটির পক্ষ থেকে এই মিছিলের আয়োজন করা হয়৷ উত্তর প্রদেশ , মধ্যপ্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ, গুজরাট, মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু , কর্ণাটক, তেলেঙ্গানা, পশ্চিমবঙ্গ প্রভৃতি রাজ্য থেকে কর্ষকরা এই মিছিলে অংশগ্রহণ করেছিলেন৷ বস্তুতঃ সারা বিশ্বেই কর্ষকরা বিপন্ন৷ ভারতীয় কর্ষকদের অবস্থা আরও খারাপ৷ ক্ষুদ্র-চাষীদের অবস্থা সর্র্বধিক মর্মান্তিক৷ খরা, বন্যা, ঋণের প্রভৃতি বোঝা, ফসলের ওপর রোগাক্রমণ বিভিন্ন কারণে ফসল নষ্ট হয়৷ এই সমস্ত প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করেই চাষীরা ফসল উৎপাদন করেন৷ বলাবাহুল্য, দেশের প্রধান খাদ্য, বস্ত্রের উপাদান কার্র্পস প্রভৃতি অধিকাংশ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য উৎপাদন করে’ চাষীরাই দেশের সমস্ত মানুষদের বাঁচিয়ে রেখেছে৷ অথচ সেই চাষী পরিবারেরই বেশিরভাাগ মানুষকে অনাহারে কাটাতে হয়৷ তাদের পরণে উপযুক্ত বস্ত্র নেই৷ রোগে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা নেই৷ পায় না উপযুক্ত শিক্ষা৷ এরা যেন পিলসুজের মতো --- সমাজ-সভ্যতার প্রদীপকে মাথায় করে ধরে রেখেছে, অথচ এরাই প্রদীপের আলো থেকে বঞ্চিত, তার ওপর প্রদীপের পোড়া তেল গড়িয়ে পড়ে এই পিলাসুজের গা বেয়ে৷

ন্যাশন্যাল ক্রাইম ব্যুরোর তথ্য অনুসারে আমরা জানতে পারি, ১৯৯৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৩ লক্ষ্যের বেশি কর্ষক আত্মহত্যা করেছে৷ ২০১৭ সালে কেন্দ্রীয় সরকার সুপ্রিম কোর্টে দেওয়া তথ্যে জানায় প্রতিবছর গড়ে ১২ হাজার কর্ষক আত্মহত্যা করে৷

পঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায়ও ধরা পড়েছে, ২০০০ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত শুধু পঞ্জাবে, যে পঞ্জাবে কৃষি-ব্যবস্থা খুবই উন্নত বলা হয়--- সে পঞ্জাবেও এই ১৬ বছরে ১৬ হাজার ৬০০ কর্ষক আত্মহত্যা করেছে৷

স্বাধীনতার পর ৭১ বছর অতিক্রান্ত হল, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলি চাষীদের উন্নতির জন্যে বত্তৃণতার তুবড়ি ফাটিয়ে চলে৷ কিন্তু তা সত্ত্বেও আজও সারা দেশে গড়ে ১২ হাজার কর্ষককে ঋণের বোঝা বয়ে অভাবে অনটনে আত্মহত্যা করতে হয়--- এর চেয়ে দুঃখের কথা আর কী হতে পারে!

নরেন্দ্র মোদির সরকারও চাষীদের কতই না ‘আচ্ছে দিনে’র স্বপ্ণ দেখিয়েছিলেন, কিন্তু চাষীদের অবস্থার পরিবর্ত্তন হল না৷ মন্ত্রীরা তো জটিল পরিসংখ্যান তুলে ধরে বত্তৃণতামঞ্চে বুঝিয়ে দেন, দেশ প্রগতির পথে এগিয়ে চলেছে, দেশের অর্থনীতির অভাবনীয় বিকাশ হয়েছে৷ তাহলে চাষীদের এই দুর্দশা কেন? এ তো সুপ্রিমকোর্টে কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া তথ্যেই প্রমাণিত ৷

চাষীরা কি সাধ করে আত্মহত্যা করছে? আসলে ওঁদের সমস্যা ও তার সমাধানের প্রকৃত পথটাই সরকারের জানা নেই৷ কর্ষকদের আন্দোলনের চাপে পড়ে হয়তো কিছু ক্ষেত্রে এরা কৃষিঋণ মুকুব করে দেবেন, কিন্তু সমস্যার স্থায়ী সমাধান এভাবে সম্ভব নয়৷

তবু বলব, বর্তমান পরিস্থিতিতে চাষীদের বাঁচাতে কৃষিঋণ তো অবশ্যই মুকুব করা উচিত৷ সরকার বড় বড় শিল্পপতিদের বিশাল বিশাল অংকের ঋণ মুকুব করে দিচ্ছেন, আর দরিদ্র চাষীদের কৃষিঋণ মুকুব করতে এত দ্বিধা কেন?

স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনা হিসেবে, চাষীরা যেহেতু দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড, তাই দেশের অর্থনীতি বাঁচাতে, কল্যাণ রাষ্ট্রের সরকারের প্রাথমিক কর্তব্য হিসেবে অবশ্যই তাঁদের অভাব অভিযোগ দূর করতে সমস্ত ব্যবস্থা নিতে হবে৷ তবে আগেও যেমন বলেছি, সেই কথা আবার বলব, কেবল সাময়িক ঋণমুকুব বা অনুদান নয়, বা শুধু সাময়িক ব্যবস্থা গ্রহণ নয়, কৃষি ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন ৷ না হলে কৃষি ও কর্ষককুলের স্থায়ী কল্যাণ হবে না৷

কী করতে হবে? এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের পথ একমাত্র প্রাউট-প্রবক্তা শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার তাঁর প্রাউটের কৃষিনীতিতে দিয়েছেন৷ তিনি সুষ্পষ্টভাবে বলেছেন, কৃষি ও কর্ষককুলের যথার্থ উন্নতি সাধন করতে গেলে কৃষিতে ধাপে ধাপে সমবায় ব্যবস্থা চালু করতে হবে৷ বর্তমান কৃষি ব্যবস্থায় এক একজন চাষীর জমি অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খণ্ডে বিভক্ত --- যাতে উন্নত বৈজ্ঞানিক প্রথায় কৃষি সম্ভব নয়৷ এইভাবে ছোট ছোট ভূমিখণ্ডে চাষ করে চাষীরা কৃষিকে লাভজনক করতে পারবেন না৷ এছাড়া চাষ ও চাষীদের বিভিন্ন সমস্যার সুষ্ঠু সমাধানের দিকে তাকিয়ে ধাপে ধাপে কৃষি-উৎপাদনকে ও কৃষিতে উৎপাদিত ফসলের বিপণনকেও যথাক্রমে উৎপাদক সমবায় ও উপভোক্তা সমবায়ের মাধ্যমেই সংসাধিত করতে হবে৷ আর, একমাত্র এতেই রয়েছে কৃষি ও তৎসংশ্লিষ্ট সমস্ত সমস্যার একমাত্র সমাধান৷