প্রভাতী

শোল–ঘাপটি

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

গাত্রূসম্কুচূঘঞূণিনি‘গাত্রসংকোচিন্’৷ ভাবারূঢ়ার্থে গাত্রসংকোচিন্ মানে যে শরীরকে সংকুচিত করে, যোগারূঢ়ার্থে যে পরিবেশগত ও মানসিক কারণে শরীরকে ছোট করে দেয়, ঘাপ্পি বা ঘাপটি মেরে বসে পড়ে৷ এই ঘাপ্পি বা ঘাপটি মারা আবার তিন ধরনের হয়৷

১) শোয়া–ঘাপটি ঃ যেমন হাত–পা কুঁকড়ে হাঁটু দু’টো বুকের কাছাকাছি এনে চিৎ হয়ে বা পাশ ফিরে শুয়ে থাকা৷ এতে শীত একটু কম লাগে৷ শীতের দিনে বিড়াল, কুকুর ও অন্যান্য অনেক জীবকে এই ভাবে শোয়া অবস্থায় দেখতে পাবে৷ 

 তোমরা কখনো কখনো ঠান্ডায় অনেকক্ষণ থাকার পর শীতের রাতে যখন নেপের তলায় চলে যাও যদিও সে সময়টায় আমি তোমাদের নেপ সরিয়ে দেখিনি তবু অনুমান করি খানিকটা সময় শরীরকে কিছুটা তাতিয়ে না নেওয়া পর্যন্ত তোমরা বোধ হয় ঘাপটি মেরে শুয়ে থাক অর্থাৎ কুঁকড়ি হয়ে শুয়ে থাকো৷

২) বসা–ঘাপটি ঃ দ্বিতীয় ঘাপটি হল বসা–ঘাপটি বা তিন–মুণ্ডে বসা৷ দু’টো হাঁটু হল দু’মুণ্ড ও তোমার নাকের ডগা হল তিন মুণ্ড৷ দু’হাতে করে অনেক সময় পা দু’টোও জড়িয়ে ধরো৷ তোমরা অনেক ক্ষেত্রে দুঃখের সময়ে, শোকের সময়ে এইভাবে বসে থাকো৷ আবার অনেক সময় হাঁটাহাঁটি ভাল লাগছে না বলেও ওই ভাবে বসে থাকো৷ হুগলী জেলার কলাচাষীদের আমি সাধারণতঃ ওইভাবে উক্ষু হয়ে বসে কলার কাঁদির ছড়া গুণতে দেখেছি৷ তোমরা দেখোনি?

৩) দাঁড়িয়েও ঘাপটি মেরে থাকা যায়৷ এক হাতের কনুইয়ের ওপর বা কনুইয়ের ফাঁকে আরেক হাতের কনুই ঢুকিয়ে দিয়ে শীতের রাতের কষ্ট দূর করার চেষ্টা তোমরা করো না কি নিশ্চয় করো৷ এতে শীতের কষ্ট কিছুটা কমানো যায়৷

একটা মজার কথা ভেবে দেখ৷ পরচর্চা করবার সময় (কারো কারো মতে যা ডালমুট–চানাচুরের চেয়েও মুখরোচক) কেউ কিন্তু ঘাপটি মেরে বসে না, ভাল করে আসন পেতেই বসে৷ মেয়েরা যাঁতীতে সুপুরি কোচাবার সময় পা ছড়িয়ে দিয়ে বসেন....ঘাপটি মেরে বসেন না, কতকটা যেমন বসেন পা দিয়ে সলতে তৈরী করার সময়৷ যাই হোক্, এই ঘাপটি মারা হল এক ধরনের গাত্র সংকোচন৷

অনেকদিন আগে তোমাদের একবার শোল–ঘাপটির গপ্প বলেছিলুম না একজন ছিলেন জাঁদরেল হাকিম সাহেব তাঁদের ছিল পারিবারিক একটি হেয়ার–কাটিং সেলুন৷ আরেকজন ছিলেন জাঁদরেল মৎস্যজীবী তাঁর ছিল সাতখানা মাছ ধরার ডিঙ্গি৷ কেউ কারো চেয়ে কম নয়–ইজ্জতে, আভিজাত্যে, অর্থকৌলীন্যে৷

গোপেন্দ্রনাথ হাকিমের এজলাসে একটা খুনের মামলায় সাক্ষ্য দিতে এসেছেন সেই মৎস্যজীবী বৃন্দাবনচন্দ্র৷ গোপেন্দ্রনাথ হাকিম বৃন্দাবনচন্দ্রকে শুধোলেন–আচ্ছা, যখন লোকটাকে খুন করা হচ্ছিল লোকটা কোনো আবাজ করেনি?

বৃন্দাবনচন্দ্র বললে–হ্যাঁ, লোকটা তখন কই–কাতরান কাতরাচ্ছিল৷

হাকিম শুধোলেন––ওই বীভৎস কাণ্ড দেখবার সময় তুই কী করছিলি?

বৃন্দাবনচন্দ্র বললে–আমি তখন ভয়ে শোল–ঘাপটি মেরে বসেছিলুম৷

গোপেন্দ্রনাথ হাকিম বৃন্দাক্ষনচন্দ্রকে শুধোলেন–সময়টা তখন দিন না রাত্তির, আলো না অন্ধকার?

বৃন্দাবনচন্দ্র বললে–দিনও নয়, রাতও নয়, আলোও নয়, অন্ধকারো নয়, কেমন একটা আলো–আঁধারি৷ এই পুকুর পাড় ঘেঁসে মাছেরা যে সময় গাঁদি মারে তেমন সময়৷

গোপেন্দ্রনাথ হাকিম শুধোলেন–তুই তারপর কী করলি?

বৃন্দাবনচন্দ্র বললে–আমি জাল–কাটা বোয়ালের মত ঝপাঙ করে জলে লাফ দিয়ে পড়লুম, তারপর চ্যাঙ মাছের মত চোঁ চোঁ করে পুকুরের ওপারে পৌঁছে গেলুম...কাতলা মাছের মত কেৎরে গিয়ে একটা আঁব গাছের আড়ালে গিয়ে নুকোলুম৷

গোপেন্দ্রনাথ বললেন–তোর ভীমরতি হয়েছে, সবেতেই মাছের কথা, সবেতেই মাছ নিয়ে আদিখ্যেতা৷ যেন মাছ ছাড়া দুনিয়ায় আর কোনো কুলীন বামুণ নেই৷

কথাটা বৃন্দাবনচন্দ্রের গায়ে লাগল....লাগল না বলে বলতে হয় বিধল৷

গোপেন্দ্রনাথ বৃন্দাবনচন্দ্রকে শুধোলেন–আচ্ছা, বল তো এই যে খুনের ঘটনাটা ঘটল .... রক্তপাত হল এতে আন্দাজ কতখানি রক্ত বেরিয়েছিল বলতে পারিস?

বৃন্দাবনচন্দ্রের মুখেচোখে, ঠোঁটের কোণে অল্প হাসির ঝিলিক নেক্ষে এল৷ সে বললে– তা ঠিক কী করে বলিবলুন হুজুর, তবে আপনি যাতে আন্দাজ পেতে পারেন সেই ভাবে বলছি...অ এই নাপতে বাটির এক বাটি হবে৷

যাই হোক্, এই ঘাপ্পি মারা বা ঘাপটি মারা কাকে বলে জেনে গেলে৷

হ্যাঁ, তবে মটকা মারা কিন্তু আলাদা জিনিস আর এই মটকা মারার সঙ্গে গরদ–মটকা–তসরে কোনো সম্পর্ক নেই৷ বাঙলা ভাষায় ‘মটকা’ শব্দটি তিনটি অর্থে ব্যবহৃত হয়৷ প্রথমতঃ যে পলু পোকার গুটি খেয়ে প্রজাপতি গুটি কেটে বেরিয়ে যায় সেই গুটির গরদ মোটা ও নিকৃষ্ট মানের হয়৷ সেই মোটা ও নিকৃষ্ট মানের গরদকে মটকা বলা হয়৷

পাকা ঘর বাদে খড়, টিন, টালি প্রভৃতি দিয়ে ঘর তৈরী করলে ঘরের যেটা সর্বোচ্চ অংশ তাকেও মটকা বলে–‘‘চেয়ে দেখ মটকার ওপর একটা মুরগী বসে রয়েছে’’৷

‘মটকা’র তৃতীয় অর্থ হল ভাণ বা অছিলা৷ ‘‘চেয়ে দেখ, মনে হচ্ছে ও ঘুমুচ্ছে, আসলে কিন্তু ঘুমুয়নি, মটকা মেরে পড়ে আছে৷ যে ঘুমায় তাকে ডেকে বা ধাক্কা দিয়ে তোলা যায় কিন্তু যে মটকা মেরে পড়ে  থাকে তার ঘুম ভাঙ্গানো যায় না’’৷

হ্যাঁ, যদি কেউ কোনো জায়গায় ঢুকে নিজের পরিচয় গোপন রেখে বা নিজ উদ্দেশ্য চেপে রেখে চুপ করে একটা জায়গায় গিয়ে বসে থাকে তাকেও বলে ঘাপটি  মারা–ভাল বাংলায় ‘গাত্রসংকোচী’, কথ্য বাঙলায় ‘ভিজে বেড়ালটি’৷

বিপ্লবের অপমৃত্যু

লেখক
কবি রামদাস বিশ্বাস

আজ আমার মনে কিছু লেখার মত মন নেই৷

বুকের ভেতর একটা ব্যথাতুর মন,

একটা যন্ত্রণাকাতর আমি আর

এক পৃথিবী বুভুক্ষু মানুষ৷

অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান কোনটাই

এদের নেই৷

অথচ

পৃথিবীর এক ভাগ ধনী লোক এই মানুষগুলোকে

খেদিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে৷

আর তাদের ড্যাস টিপে ড্যাস বের করে

চেটে চেটে খেয়ে চলেছে৷

আমি ভেবে অবাক হই নিরানববইটি মানুষ মিলে

একটি লোককে মারতে পারে না৷৷

ওই পাঁচটি জিনিসের একটা  জিনিসও যদি

আজ ওদের হাতে থাকত

তবে এক হুঙ্কারেই ওই একটি লোক

মরা তো দূরের কথা ভস্ম হয়ে যেত৷

পৃথিবীতে বিপ্লব এনেছে

মধ্যবিত্ত ঘরের শিক্ষিত ছেলেরা৷

আজ তাদের শিক্ষা কেড়ে নিয়ে

ওই একভাগ লোক৷

শিক্ষা নেই বলে তাদের ঘরে

বাকী চারটি জিনিসও নেই---তার আজ নিঃস্ব৷

সেই নিঃস্ব মানুষগুলোর চোখের সামনে তুলে ধরেছে

তুলে ধরেছে নগ্ণ বিজ্ঞাপ, অশ্লীল সিনেমা সিরিয়াল

সমাজের বুকে ছড়িয়ে দিয়েছে ব্রাউন সুগার৷

নেশায় বঁুদ হয় যুবসমাজ দিশাহারা

অসহায় পিতামাতার বুকে ব্যথার পাষাণ

আর আমি অথর্ব কবি সুড়সুড়ি দেওয়া কবিগান গেয়ে চলেছি৷

তোমরা কেউ আমার মাথায় একটা

হাতুড়ি মারতে পারো?

দেখতে পাবে হেরোইনের ধোঁয়ায় আমার

মাথার ঘিলু কালো হয়ে গেছে৷

নেতাজী সুভাষ

লেখক
প্রণবকান্তি দাশগুপ্ত

নেতাজী সুভাষ---বীরের নাম লহ প্রণাম লহ প্রণাম

বিপ্লবের মন্ত্রসাধন---তীব্র শক্তি সম্পাদন৷

কদম কদম গতি বর্ধন ইংরেজের হৃদ কম্পন

আপোষ নয়, সন্ধি নয় যুদ্ধে তুমি যে অকুতোভয়৷

রনংদেহী ঘোড়সওয়ার ব্রিটিশরাজ হুঁশিয়ার৷

কম্বুকণ্ঠে বজ্রনাদ বশ্যতা নয় আমরা আজাদ৷

মুক্তির রণবাদ্য বাজিয়ে ব্রিটিশের সাম্রাজ্য কাঁপিয়ে

লালকেল্লা জয়ের যুদ্ধে জাতীয় পতাকা তুলতে ঊধের্ব

ক্ষাত্র বীর্যে অগ্ণিগর্ভ রক্তবেদীতে জীবন অর্ঘ৷

পরাধীনতার ছিঁড়ছো লাগাম তুলকালাম তুলকালাম

আজাদ হিন্দু সৈন্য বাহিনী অগ্ণাক্ষরে লেখা সে কাহিনী

প্রণাম তোমায় হে মহাবীর

নতশির আজ ভারত বাসীর৷

গোবিন্দবাবুর ঝকমারি

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

গণ  অন্ন ঞ্চ গণান্ন৷ ভাবারূঢ়ার্থে ‘গণান্ন’ বলতে বোঝায় যে অন্ন বা খাদ্য অনেকের জন্যে পাক করা হয়েছে৷ যোগারূঢ়ার্থে গণান্ন বলতে বোঝায়–বিশেষ ধরনের গণ–নবান্ন উৎসব৷

সুপ্রাচীনকালে শস্য কর্ত্তনের পর কর্ষকেরা সবাই শিশু–বৃদ্ধ নির্বিশেষে সমস্ত গ্রামবাসী একসঙ্গে অন্ন ভাগ করে ভোজন করতেন চাষের জমিতে বসে৷ এই যে একটি বিশেষ ধরনের নবান্ন উৎসব সেকালের মানুষেরা পালন করতেন তার সঙ্গে তাঁরা খেতেন ছাঁচি কুমড়োর বড়ি, মাষ–কলাইয়ের (বিরি কলাইয়ের) ডাল৷ বৌদ্ধ যুগ পর্যন্ত পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে বাঙলায় এই গণনবান্ন উৎসব চলত৷ পরে এই গণনবান্ন উৎসব ধীরে ধীরে উঠে যায়৷ নবান্ন হয়ে দাঁড়ায় পারিবারিক উৎসব৷ তার সঙ্গে ‘গণ’–সংযুক্তি থাকে না৷ তবে প্রাচীনকালের গণনবান্নের জের হিসাবে এখনও নবান্নের দিন শত্রুমিত্র নির্বিশেষে একে অপরকে ডেকে খাওয়ায়–পশুপক্ষীকেও খাওয়ায়–অনেকে নূতন বস্ত্র পরিধান করে৷ অনেকে ছাঁচি–কুমড়ো কুরে নিয়ে বড়ি তৈরী করে৷ অনেকে নূতন মাষকলাইয়ের (বিরিকলাই) ডাল খায় (বিরিকলাই বোনা হয় আষাা মাসে আর তোলা হয় আশ্বিন মাসে)৷ নবান্নের সময় তাজা বিরিকলাইয়ের ডাল পাওয়া যায়৷

এই গণনবান্ন উৎসব মগধ দেশে অন্য ভাবে পালিত হত৷ তাঁরা এইদিন সূর্যের প্রতি কৃতজ্ঞতাবশতঃ সূর্যের পূজা করত৷ সূর্যের কৃপাতেই মেঘ তৈরী হয়, মেঘ থেকে বর্ষণ হয়–এই ভেবেই তারা সূর্যের পূজা করত৷ পূজা করত ভাদই ফসল বা আউশ ফসল উঠবার পরে কার্ত্তিক মাসে৷ বৈদিক বিধি অনুযায়ী সূর্য পুরুষ–দেবতা, চন্দ্র স্ত্রী–দেবতা৷ কিন্তু অষ্ট্রিক বিধি অনুযায়ী চন্দ্র পুরুষ–দেবতা ও সূর্য স্ত্রী–দেবতা৷ তাই প্রাচীন মগধের মানুষেরা সূর্যকে ছট্ঠি মাঈ অর্থাৎ ষষ্ঠীমাতা নামে সম্বোধন করত৷ পূজা দিত ওই ষষ্ঠী মাতাকে৷ যেহেতু এটি অষ্ট্রিক বিধান তাই এতে ব্রাহ্মণ–পুরোহিতের কোন স্থান নেই৷ অষ্ট্রিক সমাজের স্বাভাবিক বিধি অনুযায়ী ষষ্ঠী মাতার পূজা অর্থাৎ ছট্ পূজা নারীরাই করত৷ অষ্ট্রিক পূজার উপাদান হিসেবে চালের গুঁড়ো, কলা প্রভৃতি উপকরণ থাকত৷ রবি ফসল কাটার পরে–চৈত্র মাসেও মগধের মানুষ কৃতজ্ঞতাস্বরূপ আরও একবার সূর্যের পূজা করত৷ আজও মগধে এই দুই ছট পূজাই (কার্ত্তিকা ছট ও চৈতী ছট) চলে৷ জিনিসটা কতকটা অসাম্প্রদায়িক৷ ছোটবেলায় দেখেছি, জাতি–ধর্ম নির্বিশেষে সবাই এই পূজা করছেন–মুসলমানেরাও৷ প্রাচীন মগধে ষষ্ঠীমায়ের প্রসাদ (ঠেকুয়া) গ্রামবাসীরা গ্রামের উত্তর–পূর্ব কোণে (ঈশান কোণ) বসে একত্রে ভোজন করত৷ এটাকেও বলতে পার এক ধরণের গণনবান্ন৷ অবশ্য পৃথক ভাবে নবান্ন উৎসবও মগধে ছিল বা আছে৷ বৌদ্ধ যুগের পর জাতিভেদ বাঙলার সমাজে জীবনে শিকড় গেড়ে বসার সঙ্গে সঙ্গে এই একত্র–ভোজন বা গণনবান্ন বা নবান্ন–বিধি প্রায় উঠেই যায়৷ তবে একটু আগেই বললুম, নবান্নের অসাম্প্রদায়িকত্ব বা ব্যাপকত্ব আজও রয়েছে৷ কোন উৎসব উপলক্ষ্যে গ্রামের মানুষেরা যদি একসঙ্গে বসে পঙ্ক্তি ভোজন করেন ও রান্নাগুলো যদি এক সঙ্গে হয় তবে এই বিরাট পঙ্ক্তিভোজন বা সাধারণ ভুরিভোজনকেও গণান্ন বলা হয়৷ এ ধরনের গণান্ন পৃথিবীর অনেক দেশেই রয়েছে... ভারতেও রয়েছে৷

যদি কিছু–সংখ্যক মানুষ কোন অপরিচিত স্থানে যায় বা  থাকে সেক্ষেত্রে তাকে বা তাদের যদি কোন গজ্জায় (হোটেলে) থাকতে হয় সেক্ষেত্রে দীর্ঘকাল গজ্জায় থাকতে থাকতে তাকে বা তাদের নানান ধরনের অসুবিধা ভোগ করতে হয়৷ কখনো কখনো সে তার পছন্দমত রান্নাবান্না পায় না, কখনো কখনো গজ্জার মালিক কম তেল–ঘি দিয়ে বেশী ঝাল প্রয়োগ করে আহারকারীর তেল–ঘিয়ের অভাব বোধকে ভিন্ন পথে চালিয়ে দেয়৷ ঝালের ঠ্যালাতেই সে আ–হা–হা....উ–হু–হু করতে থাকে৷ কখনো কখনো আবার কোন কোন স্থানে অল্প পরিমাণ বাসি জিনিস বেশী পরিমাণ তাজা জিনিসের সঙ্গে মিশিয়ে বাজারে পার করে দেয়৷ আমি বলছি না সমস্ত গজ্জা–মালিকই এমন করেন৷ তবে কেউ কেউ এমনটা করেন–এই খরবটা আমি পেয়েছিলুম আমার কম বয়সের বন্ধু বাবু গোবিন্দপ্রসাদ সিংয়ের কাছ থেকে৷ বাবু গোবিন্দপ্রসাদ ছিলেন বিহারের মুঙ্গের জেলার মানুষ৷ আমার এই জেলার মানুষেরা বুদ্ধিমান হলেও খুব সোজা বুদ্ধিতে চলে৷ বাবু গোবিন্দপ্রসাদকে একবার জিজ্ঞেস করা হ’ল–আপনি কি সরকারী কার্যব্যপদেশে দু চারদিনের জন্যেও কলকাতায় যাবেন? তিনি সঙ্গে সঙ্গে হাত–মুখ নেড়ে প্রবল ভাবে আপত্তি জানিয়ে বললেন–না, না, কিছুতেই নয়, কিছুতেই নয়৷

আমি শুধোলুম–কেন?

আজন্ম নিরামিষাশী বাবু গোবিন্দপ্রসাদ বললেন–ওখানকার হোটেলে কী বলে কী খাইয়ে দেবে তার কোন ঠিক–ঠিকানা নেই, আমি যাব না৷

বাবু গোবিন্দপ্রসাদের অন্যান্য বন্ধুরা বললেন–যখন কলকাতায় যাবে, তখন প্রথমেই বলবে আমি নিরামিষ খাই–ভাত, ডাল, ঝালের ঝোল আর পটোলের তরকারী৷ বাবু গোবিন্দপ্রসাদ কলকাতা গেলেন–যথাসময়ে ফিরেও এলেন৷ একদিন আমার কাছে এসে দাঁড়ালেন–দেখি তাঁর মুখমণ্ডলে কালো মেঘ নেবে এসেছে৷ জিজ্ঞেস করলুম–কী হয়েছে? কী হয়েছে? কলকাতা কেমন লাগল?

উনি বললেন–এই কাণ মলছি, নাক মলছি, প্রাণ থাকতে দ্বিতীয়বার কলকাতায় যাচ্ছি না৷

আমি বললুম–কী হয়েছে?

তিনি বললেন–বন্ধুদের পরামর্শমত গিয়েই বললুম আমি খাই ভাত–ডাল–ঝালের ঝোল–পটোলের তরকারী৷

হোটেল মালিক সাগ্রহে বললে–প্রত্যেকটি জিনিস এখানে পাবেন–খেয়ে মেজাজ তররর হয়ে যাবে৷

আমি একটু খুশি মনে ভোজনের টেবিলে বসলুম৷ প্রথমেই দেখলুম রয়েছে জলের মত পাতলা মুসুরির ডাল৷ আমি সাঁতরে অনেকবার মুঙ্গেরের গঙ্গা পার হয়েছি৷ ভাবলুম ওই ডালের বাটিতে নেবে সাঁতার কাটতে শুরু করে দিই৷ তাতে রয়েছে শীরফ জল৷ বাটির তলায় আড় চোখে তাকিয়ে রয়েছে কেবল দু–চারটে মুসুরির ডাল৷ পটোলের তরকারীতে তেল বা ঘি কিছুই নেই৷ তবে মীর্চ (লংকা) ঢালা হয়েছে প্রচুর৷ লংকার জ্বালায় যখন চোখ–নাক দিয়ে জল গড়াচ্ছে তখন আমি তরকারীতে যে তেল–ঘি নেই তা অনুভব করার শক্তি হারিয়ে ফেললুম৷ সবচেয়ে ফ্যাসাদ হ’ল ঝোলের বাটি টানতে টানতে৷ বাটি টানার সঙ্গে সঙ্গে মনে হ’ল কেমন যেন একটা মাছের বাজারের গন্ধ৷ রামজীর নাম নিয়ে কিছুটা ঝোল–ভাত মাখালুম৷ এক গ্রাস মুখে

ফেলতেই দেখি নির্ঘাত মাছের গন্ধ৷ (হিন্দী ভাষায় যেমন ‘বু’, মারাঠীতে তেমনি ‘মহক’ ও গুজরাতীতে ‘গন্ধ’)৷ এই মাছের মহক (ঝোলের) তার চেয়ে উগ্রতর৷ হোটেল–মালিককে শুধোলুম, ঝালের ঝোলে মাছের গন্ধ কেন? উত্তরের জন্যে তিনি তৈরীই ছিলেন৷ কাল বিলম্ব না করেই বললেন–জানেন তো, বঙ্গাল মে ধানের জমির পাশে মাছকা পুকুর হ্যায়৷ তাই ধানের জমিতে মাছের গন্ধ ভেসে আসতা হ্যায়৷ সেই জন্যে আপনি ঝোলেতে মাছের গন্ধ পাতা হ্যায়৷ ও কিছু নয়, ওনিয়ে আপনার ভাববার দরকার নেহী হেঁ৷ দু–চার গ্রাস ওটাই গলাধঃকরণ করলুম৷ চরম ফ্যাসাদ বাধল আর একটু পরে৷ এক গ্রাস ঝোল–ভাত মুখে ফেলতে যাচ্ছি এমন সময়ে আঙ্গুলে আটকা পড়ল মাছের একটা লম্বা হড্ডী (মাছের লম্বা কাঁটা)৷ আমি তখন হোটেল মালিককে বললুম–এ কেমন হ’ল? ভাতে না হয় মাছের গন্ধ এল কারণ ধানক্ষেতের পাশেই পুকুরে মাছ কিন্তু মাছের কাঁটা কী করে এল?

হোটেল–মালিক বললে–জেলেরা পুকুর থেকে মাছ ধরে এই ধানক্ষেতের মাছগুলো ফেলে কি না? ধান কাটার সময় দু–চারটে মাছের কাঁটাও উঠে আসে৷ এতে রাঁধবার সময় কয়েকটা কাঁটাও সেই ভাতে থেকে যায়৷

তাহলে বুঝুন, কী ফ্যাসাদ হয়েছিল৷ আমরা খাই ড়হেরী কা ডাল৷

যাই হোক্, পরের দিকে কেবল মুসুরের ডাল আর পটোলের তরকারী খেয়ে দিন কাটিয়েছি৷ আর ভুলেও কলকাতার পথ মাড়াচ্ছি না৷ এখন থেকে কাণ মলছি, নাকে খৎ দিচ্ছি আর ভুলেও কলকাতার পথ মাড়াচ্ছি না৷     (শব্দ চয়নিকা, ১৬/১৯৮)

আসা

লেখক
কবি রামদাস বিশ্বাস

আসা যাওয়া ভবের খেলা সবাই বলে গানের সুরে

আসতে হবে এই ভূবনে বারে বারে ঘুরে ঘুরে৷

কোথা থেকে আসব আমি কোথায় আবার যাব চলে

কেউ জানি না সেই ঠিকানা কেউ ঠিকানা দেয় না বলে৷

কী কারণে আসা হেথা কেন সেথা চলে যাওয়া

কেউ কি বলে দেবে আমায় কেন হেথায় তরী বাওয়া৷

শুনেছি মানুষের জীবন শ্রেষ্ঠ জীবন ভূমণ্ডলে

দেখেছি মানুষ পশু হয়ে চরছে বনে জঙ্গলে৷

কেউ জানে না সুখ-দুঃখ দুটোই আছে সমান সমান

সবাই ভাবে দুঃখ বেশী সুখ নাই কণা প্রমাণ৷

দুঃখে পুড়ে সুখের আশায় বারে বারেই যাওয়া আসা

আশায় আশায় ভূমণ্ডলে শূন্য মাঝে শুধুই ভাসা

শূন্য মাঝে ভেসে ভেসে মানুষ করে মানুষ খুন

আত্মসুখে পরকে দোষে পান থেকে খসিলে চুন৷

কেন আসা কেন ভাসা কোন আশাতে ভবে আসা

আশায় আশায় মানব জীবন হ’ত না সর্বনাশা৷

দুঃখ সুখের প্রপঞ্চময় এই ধরণী স্বর্গ হ’ত

আত্মস্বার্থ বলি দিয়ে সবাই যদি ভাল বাসত৷

পৃথিবীতে আসার আগে ছিলাম পরমপিতার ঘরে

আসতে আমি চাইনি তবু পাঠাল পিতা ভবের পরে৷

বলল এবার যা জগতে কাজ করে খা বুদ্ধিবলে

কর্মগুণে হবি বড় ধবংস হবি ছলে-বলে৷

সুখের আশায় ভুলে গেলাম দুঃখ আছে সুখের পিছে

পরমপিতার চরম সত্যি সত্য মিথ্যা মেশা প্রপঞ্চে৷

আসতে আমি চাইনি তবু শেষ পর্যন্ত হ’ল আসা

যে ঘরেতে ছিলাম আমি সেথায় আছে সকল আশা৷

মৃত্যুর মিছিল

লেখক
প্রভাত খাঁ

এ কোন সভ্যতা এ কোন ব্বরতা?

মৃত্যুর মিছিল চলে নেশার ঠেকে

আর হাসপাতালে অবিরাম গতিতে

গৃহে গৃহে ক্রন্দনের রোল,

এদিকে জ্বলন্ত বাতি হাতে নগরের রাস্তায় রাস্তায়

বিদেহী অতৃপ্ত আত্মার শান্তি কামনায়

নীরব পদচারণার এক মর্মন্তুদ ছবি

         চোখে আনে জল

এ কার পাপ? কোন অপরাধীর অপরাধের

এতো বড়ো ভয়ংকর নারকীয় পরিণতি?

গণতন্ত্রের বুকে এ কোন কদাচারী

শাসকের শাসনের কদর্য কুকর্মের ফল?

ন্যায় সত্য ধর্মের ঠুলি পরে আছে যারা

হতভাগ্য মানুষের তরে কতটুকু

সেবা দিতে পেরেছে তারা

তারই কৈফিয়ৎ দাবী করে মহাকাল৷

 

বর্ণচোরা যতো সব শয়তানের দল

লালসার পূর্ত্তি তরে করি নানা ছল

হতভাগ্য মানুষেরে করিয়া শোষণ

দানবের নৃত্য করে শ্মশানের পরে৷

হায় গণতন্ত্র খণ্ড ক্ষুদ্র সংকীর্ণ

দলতন্ত্রের বিষাক্ত নখরাঘাতে

মৃতপ্রায় রক্তাক্ত হয়ে পথমাঝে

        ধূলিতে লুটায়

আর মানবতা, বিশ্বৈকতা

লজ্জাপেয়ে অন্ধকারে মুখ যে লুকায়৷

ডান হাতটা কার?

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

অংশুমালী বাগচী সবে মাত্র ডাক্তারি পাস করেছে৷ ডিস্পেনসারি খুলেছে বগুড়ায়, তখনো তেমন জমেনি৷ চিকিৎসার চেয়েও পুরাতত্ত্বে archaeology তার ঝোঁক বেশী৷ প্রায়ই সে চলে যেত বাঙলার প্রাচীন রাজধানী মহাস্থানে যার অবস্থিতি বগুড়া থেকে বেশী দূরে নয়৷ মহাস্থানে কিছু পাথর, কিছু নুড়ি, কিছু ইট–পাটকেল পরীক্ষা  করে করতোয়া নদীর তীর ধরে খানিক বেড়িয়ে আসত৷ নদীতীর ধরে যেতে যেতে এমনই একটা প্রত্যন্ত সীমায় সে পৌঁছত যেখানে আছে প্রকাণ্ড একটা তেঁতুলগাছ৷ তার নীচে সিঁদুর–মাখানো কতকগুলো নুড়ি ওই জায়গাটায় এসে মনের মধ্যে কেমন যেন একটা অস্বস্তি বোধ করত৷ তারপর আর এগোত না৷

গ্রামের লোকেদের জিজ্ঞেস করত–ওই তেঁতুলগাছের তলায় গিয়ে তার কেমন যেন লাগে৷ ব্যাপারটা কী

এককালে বাঙলায়–বিশেষ করে উত্তর বাঙলায় কালচক্রযান নামে এক বৌদ্ধতন্ত্রের প্রাদুর্ভাব হয়েছিল৷ সেকালে মানুষ ধরে (১৬ থেকে ৩০ বছরের ছেলে ছিল তাদের লক্ষ্য) বলি দেওয়া হত কালভৈরবীর বেদীর সামনে৷ কাউকে যদি এক কোপে কাটা না যেত তবে তার ডান দিকের হাতটা বা ডান দিকের পা–টা কেটে দেওয়া হত৷ এখন আর কালচক্রযান নেই৷ শুনে অংশুমালীর খুবই খারাপ লাগল৷ সে ওই দিকটায় যাওয়াই ছেড়ে দিল৷ কিন্তু অংশুমালীর পুরাতত্ত্বে দারুণ আগ্রহ৷ একদিন আলো থাকতে থাকতে সে তেঁতুল গাছের চারিদিক একবার ঘুরে দেখলে কালভৈরবী মন্দিরের ভগ্ণাবশেষ আছে কি না তারই খোঁজে৷ নাঃ, কোনো চিহ্ণ পাওয়া গেল না৷ তবে ফেরবার সময় সে পেল একটা মানুষের হাত৷ হাতটা কাটা হয়েছে অনুমানিক একশ’ বছর আগে৷ কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় তা পচে গলে যায়নি–শুকিয়ে চিমড়ে চিমসে হয়ে গেছে৷ কোন্টা ডান হাত আর কোন্টা বাঁ হাত চেনবার সোজা উপায় হচ্ছে হাতের তালুর দিক দিয়ে যদি দেখা যায় ডানহাতের পাঁচটা আঙ্গুল (বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ, তর্জনী, মধ্যমা, অনামিকা ও কনিষ্ঠা সাজানো থাকে ঘড়ির কাঁটার গতির উল্টো পথে counter clock wise)৷ ঠিক তেমনি বাঁ হাতের তালুর দিক দিয়ে দেখতে গেলে আঙ্গুলগুলো সাজানো থাকে ঘড়ির কাঁটার চলার হিসেবে (Clock wise)৷

পুরাতত্ত্ববিদ্ হলেও সে তো ডাক্তার৷ হাতটা সে নিয়ে এল, সযত্নে রেখে দিল তার ডিস্পেন্সারীতে৷ গ্রামের লোকে বলেছিল যারা কালভৈরবীকে সম্মান জানায় না তারা ওই তেঁতুল গাছের কাছে গেলে বিপদে পড়ে, মরেও যেতে পারে৷ এমনকি যেসব ভূত–প্রেত–দানাদত্যি কালভৈরবীকে মানে না তারাও যায় না৷ যারা মানে কেবল তারাই যায়৷ অংশুমালীর পক্ষে কালভৈরবীকে মানা না মানার কোন প্রশ্ণই  নাই৷ কালভৈরবী তার কাছে প্রাচীন বাঙলার একজন ঐতিহাসিক বৌদ্ধতান্ত্রিক দেবী৷

হ্যাঁ বলছিলুম অংশুমালীর পসার তখনও তেমন জমেনি৷ সকালের দিকে দু–তিনজন রোগী, সন্ধেও দু–একজন রোগী ব্যস৷ এদিকে ডিস্পেন্সারীর ঠাটবাট বজায় রাখতে প্রাণান্ত....ঢাকের দায়ে মনসা বিকোয়৷ সন্ধের একটু পরেই খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়ত৷ মাঝরাত্রিরে একবার ঘুম একটু পাতলা হত বা ঘুম ভেঙ্গেও যেত৷ তার পরে আসত আর একটা ঘুম৷

সেদিনও মাঝরাত্রিতে অংশুমালীর ঘুম ভেঙ্গে গেল৷ ঘড়িতে দেখে আড়াইটে৷ তার মনে হ’ল যে ঘরে আর কেউ একজন রয়েছে৷ অংশুমালীর আলো নিবিয়ে শোয়ারই অভ্যাস৷ তাই অন্ধকার ঘরে সে আর কাউকে দেখতে পেল না৷ খানিকক্ষণ ঠাহর করার পরে তার মনে হ’ল তার পা থেকে ৭/৮ হাত দূরে ২২/২৩ বছরের একটি ছেলে৷ সেটি একটি ছায়ামূর্ত্তি৷ অন্ধকার ঘরের কৃষ্ণত্বের চেয়েও ওই ছায়ামূর্ত্তির কৃষ্ণত্ব ছিল বেশী গাঢ়৷ তাই তাকে অস্পষ্টভাবে দেখতে পেল৷ অংশুমালী ছায়ামূর্ত্তির দিকে খানিকক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে তাকাল৷ এবার ভালো করে একবার চোখদুটো রগড়ে নিল৷ নাঃ, একটি অতিকৃষ্ণ ছায়ামূর্ত্তি–এতে কোন সন্দেহই নেই৷ ছায়ামূর্ত্তি নির্বাক৷ তবে সে হাত বাড়িয়ে ডিস্পেন্সারীর একটি আলমারীর দিকে কী যেন দেখাচ্ছে৷ খানিকক্ষণ এই রকম দেখার পরে অংশুমালীর চোখে ঘুমের আস্তরণ নেবে এল৷ তারপরে রাতে অংশুমালী ঠিক করেছিল আজ আড়াইটের সময় সে নিশ্চয়ই জেগে থাকবে৷

ঘড়িতে  আড়াইটে আবার সেই ছায়ামূর্ত্তি৷ মূর্ত্তিটা আবার আলমারীর দিকে হাত বাড়িয়েছে৷ অংশুমালী অপলক দৃষ্টিতে তাকে দেখে চলেছে৷ একবার ভাবলে তাকে সে জিজ্ঞেস করে কেন সে এসেছে, কিসের জন্যে৷ আবার ভাবলে, ছায়ামূর্ত্তি কী কথা বলে? জিজ্ঞেস করাই বৃথা৷ আর একবার ভাবলে তাকে ধরে একটু নাড়া দিয়ে বলে–কী তোমার মতলব বলো৷ আবার ভাবলে তাকেই  বা কেন বিরক্ত করব৷ সে তো আমাকে বিরক্ত করছে না৷ এই ধরনের ঘটনা চলতে থাকল রাতের পর রাত৷ অংশুমালীর জীবনের সঙ্গে রাত আড়াইটে যেন এক সূত্রে গাঁথা হয়ে গেল৷

এবার অংশুমালী ঠিক করলে জিনিসটা যেন ভাল হচ্ছে না৷ আজ এর একটা হেস্তনেস্ত করতে হবে...একটা এসপার ওসপার করতে হবে৷ সে ঠিক করলে ছায়ামূর্ত্তি যতক্ষণ থাকবে সে কিছুতেই ঘুমোবে না৷ শুয়েই সে রইল, কারণ উঠে বসলে যদি ছায়ামূর্ত্তি ভয় পেয়ে না আসে

রাত আড়াইটেয় নীরব চরণে ছায়ামূর্ত্তি এল, নিজের জায়গাটিতে এসে দাঁড়াল, আলমারীর দিকে হাত দেখাল৷

অংশুমালী জেগেই আছে...জেগেই আছে৷

খানিকক্ষণ ওইভাবেই থেকে ছায়ামূর্ত্তি বেরিয়ে গেল খোলা জানালার দিকে৷ অংশুমালীও দরজা খুলে কিছুটা দূরত্বে ব্যবধান রেখে ছায়ার অনুসরণ করতে লাগল৷ ছায়ামূর্ত্তি সোজাই চলছে....পিছনে তাকাচ্ছে না৷ অংশুমালীও ছায়ামূর্ত্তিকে দেখছে৷ ডান পাশে বাঁ পাশে, পিছনে তাকাচ্ছে না৷ ছায়ামূর্ত্তি এসে শেষ পর্যন্ত বগুড়ার সবচেয়ে পুরোনো গোরস্থানটিতে পৌঁছাল ও একটা ভাঙ্গা কবরের কাছে এসে কোথায় যেন হারিয়ে গেল৷

অংশুমালী ঘরে ফিরল৷ তারপরের রাতে অংশুমালী আর আড়াইটে পর্যন্ত অপেক্ষা করল না৷ সে রাত ১০টার পরেই আলমারী থেকে সেই শুকনো ডান হাতটাকে নিয়ে চলল সেই সাবেকি গোরস্থানের দিকে, সেই ভাঙ্গা কবরটার দিকে৷ ওই কাটা হাতটা কবরের ওপর রেখে সে ফিরছে৷ এমন সময় কবরের নীচে থেকে বেরিয়ে এল একটা অট্টহাসি... হাঃ হাঃ হাঃ

অংশুমালী ঘরে ফিরল৷ রাত আড়াইটেয় অংশুমালীর ঘুম ভাঙ্গল৷ নাঃ, আজ আর সেই ছায়ামূর্ত্তি নেই৷ হ্যাঁ, যখন সে ছায়ার পেছনে ধাওয়া করেছিল গোরস্থানের দিকে তখন সে দেখেছিল ছায়ামূর্ত্তির বাঁ হাত নড়ছে, ডান হাত নড়ছে না৷ কেন সে জানে না৷

পরের দিন বেলা বড়তে না বাড়তেই এই ছায়ামূর্ত্তির গল্প বগুড়া শহবে ছড়িয়ে পড়ল৷ এর কোনো ভাল দিক থাক বা না থাক, একটা খারাপ দিক হ’ল এই যে ওই ছায়ামূর্ত্তির গল্প শুনে রোগীরা অংশুমালীর ডিস্পেন্সারীর ত্রিসীমানায় আর আসত না৷ বাধ্য হয়ে অংশুমালী বগুড়া থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে নীলফামারীতে গেল...নূতন করে চিকিৎসা ব্যবসা শুরু করতে হ’ল৷

–শব্দ–চয়নিকা ২৪/১১৭

লুচি-পুরি

লেখক
কবি রামদাস বিশ্বাস

লুচি পুরি দেখে আমার বড্ড লোভ হয়

লালসাতে জিভ দিয়ে ধারা জল বয়,

একশ’ দিনের কাজের পরে দু’টাকা কেজি চাল

রেশন দোকান দিচ্ছে তাই পালটে গেছে হাল৷

কাজ করি না বসে বসে বেশ তো চলে দিন

কাজ না করে করে আমার শক্তি হ’ল ক্ষীণ৷

বিনা কাজে ভাটিখানায় দল বাঁধিয়া ঘুরি

কেমন করে খাবো বল দামী লুচি-পুরি!

শীতের দিনে কড়াইশুঁটির পুরি বড্ড স্বাদু

কি করে আর খাবো বল জানি না তো জাদু৷

কাজ করি না কষ্টে আছি কেউ বোঝে না তা

দেশের অধিকাংশ মানুষ গরীব নেই কো পিতামাতা৷

শিমূল তুলো

লেখক
প্রণবকান্তি দাশগুপ্ত

শিমূল তুলো পরীর বাহন

               কোথায় উড়ে যও?

চাঁদেতে আর নেইকো বুড়ী

               হয়েছে উধাও৷

হঠাৎ সেদিন রকেট থেকে

               নামল মানুষ চাঁদে,

চরকা বুড়ী চরকা নিয়ে

               পড়ল বিষম ফাঁদে৷

ভয়ে শেষে পালিয়ে গেছে

               চাঁদের রাজ্যি ছেড়ে

তারার আলোয় ছায়াপথে

               চরকা নিয়ে ফেরে৷

শিমূল তুলো শিমূল তুলো

               কোথায় তুমি যাও?

শিমূল তুলো সত্যি তুমি

               পরীর পবন-নাও?

সপ্তর্ষির প্রশ্ণ

লেখক
জ্যোতিবিকাশ সিন্হা

কৃষ্ণা রজনীর শেষ প্রহর

সপ্তমীর ক্ষয়িষ্ণু চাঁদ তখনও

ঢালছে অন্তিম জ্যোৎস্নার পুষ্পবর্ষণ,

আকাশের উজ্জ্বল তারার নিশানায়

ছোট্ট তরী ভাসিয়েছে মানুষ

ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ জীবনের অপার সমুদ্রে

অসহ্য ব্যথার তীব্র কালকূট বুকে

ফেনিল জীবন যন্ত্রণার উত্তাল তরঙ্গমালা চারিদিকে

মুক্তির আশ্বাস খুঁজেছে  শুক্রে-মঙ্গলে

কিংবা ওই আলো-বিলানো চাঁদের কোলে

পেয়েছে কি?---

ঊষার প্রথম পদক্ষেপে পাখীর কলগুঞ্জন

পূর্ব দিগন্তে সদ্য জেগে ওঠা চকোলেট রং

সভ্যতার অগ্রগতি হাই তোলে প্রকৃতির সাথে৷

শ্রান্ত নাবিক ক্লান্তির স্বেদ মোছে

প্রশান্তির প্রগাঢ় পরশ খুঁজে পেতে

আপ্তি-প্রাপ্তির মধ্যবিন্দু নিঃসীম ব্যোমের ঠিকানায়---

তখনও বিদায়ী সপ্তর্ষির জিজ্ঞাসা চিহ্ণ

প্রশ্ণ করে নীরব ভাষায়

পেয়েছ কি?