প্রভাতী

বিনা টিকিটে গঙ্গাস্নান

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

প্রাচীনকালের মানুষ যাঁদের গঙ্গা–যমুনার উপর খুব শ্রদ্ধা–ভক্তি ছিল তাঁরা ভাবতেন ঈশ্বরের করুণাই  অবস্থান্তর প্রাপ্ত হয়ে      গঙ্গাধারার রূপ পরিগ্রহ করে থাকে কারো গঙ্গাস্নানের আকর্ষণ কর্ত্তব্যের প্রেরণায়, কারো বা ধর্মোন্মাদনার প্রেষণায় কেউ বা গঙ্গাস্নান করেন ডগমা বা ভাবজড়তার বশবর্ত্তী হয়ে, আর কেউ বা পুরাণের কাহিনীকে গুরুত্ব দেন বলে৷ সত্যিই গঙ্গা ‘‘পতিত পাবনী’’ এ কথা ঠিকই যে গঙ্গা সুবিশাল আর্যাবর্ত্তের স্তন্যদাত্রী জননী৷ এও ঠিক যে নদীর বহমান ধারায় স্নান করলে তা শরীর মনকে স্নিগ্ধ করে৷ তবে গঙ্গাস্নানে কোন বিশেষ গুণ আছে কি না তা  পণ্ডিতেরা বিচার করে দেখতে পারেন৷ তবে আপাতঃদৃষ্টিতে তেমন গুণ আছে বলে মনে হয় না কারণ মীন ও অজস্র জীবজন্তু গঙ্গায় স্নান করে থাকে, তাদের মল–মূত্র নিত্য গঙ্গায় পতিত হয়৷ তারা গঙ্গা স্নান করে কতটা বৈকুণ্ঠের কাছে পৌঁছোয় তা কেউই  হলফ করে বলতে পারবে না৷ তবে একথা বলব যে গঙ্গাস্নান হিসাবে মন্দ নয় যদি সেখানে জলবিদূষণ না হয়ে থেকে থাকে৷ পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী বৈকুণ্ঠে নারায়ণের চরণোদক থেকে গঙ্গার উৎপত্তি৷ বাঙলার রাজা ভগীরথ তাঁর তপস্যার বলে গঙ্গাকে মর্ত্ত্যে আনয়ন করেন৷ আকাশ থেকে নীচে নাববার সময় গঙ্গার তোড়ে বসুন্ধরা যাতে বিদীর্ণা না হন তাই শিব তাঁকে জটায় আশ্রয় দিয়ে তাঁর গতিবেগ বা তোড় কমিয়ে দেন৷ কাহিনী অনুযায়ী গঙ্গা চতুর্ধারায় বিভক্ত হয়েছিল৷ তার একটি ধারা মর্ত্ত্যে  চলে আসে ঃ

‘‘স্বর্গেতে অলকানন্দা মর্ত্ত্যে ভাগীরথী 

দেবলোকে মন্দাকিনী পাতালে ভোগবতী৷’’

সুতরাং গঙ্গাস্নান মানে বিষ্ণুর চরণোদকে স্নান৷ এই ভেবে ভক্ত পুণ্যার্থী গঙ্গাস্নানে আকৃষ্ট হক্ষেন ক্ষৈ কি তাঁরা গঙ্গাকে বিষ্ণুর করুণার বিগলিত রূপ হিসেবে ভাবক্ষেন ক্ষৈ কি

অন্য কাহিনী অনুযায়ী গঙ্গা শিবের পত্নী৷ শিবজায়া গঙ্গার জলবিধৌত হতে কোন্ শৈব, কোন্ শাক্ত না চাইক্ষেন তাই গঙ্গা যে কেবল বৈকুণ্ঠনিবাসী নারায়ণের পাদোদক তাই নয় শাক্ত শৈবের কাছে গঙ্গা পুণ্যতোয়া৷

‘‘হরিপাদপদ্মবিহারিণ্

গঙ্গে হিমবিধুমুক্তাধবলত্৷

*      *      *

তব তটনিকটে যস্য নিবাসঃ

খলু বৈকুণ্ঠে তস্য নিবাসমঃ৷

*      *      *

ভাগীরথি সুখদায়িনি মাতস্তব

জলমহিমা নিগমে খ্যাতঃ৷

*      *      *

‘‘দেবি সুরেশ্বরি ভগবতি

গঙ্গে ত্রিভুবনতারিণি তরলতরঙ্গে৷

শঙ্করমৌলিনিবাসিনি বিমলে,

মম মতিরাস্তাং তব পদকমলে৷৷’’

*      *      *

নাহং জানে তব মহিমানং,

ত্রাহি কৃপাময়ি মামজ্ঞানম্৷’’

*      *      *

সুতরাং সাধারণ মানুষই নয়, জ্ঞানী–গুণীরাও গঙ্গাকে ক্ষিগলিত করুণা হিসেক্ষে দেখেছিলেন৷ তাই গঙ্গা–মহিমাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া যায় না৷ অন্য নদীর সঙ্গে গঙ্গার গুণগত পার্থক্য খুব কম৷ বরং গঙ্গার তীরবর্ত্তী শিল্পকেন্দ্রগুলি যে পরিমাণ আবর্জনা গঙ্গাজলে নিক্ষেপ করে তাতে গঙ্গাস্নানে রোগ বৃদ্ধিও অবশ্যই ঘটতে পারে৷

‘‘এক ডুব কাক ডুব দুই ডুব ব্যাঙ

তিন ডুবে শরীর টান চার ডুবে গঙ্গা স্নান৷’’

‘‘জাহ্ণবী–যমুনা বিগলিত করুণা’’

বর্দ্ধমান জেলার বেশীর ভাগ অংশই       অ–গঙ্গার দেশ, তাই দেখেছি গ্রামাঞ্চলের সাদামাঠা অনেক মানুষই বলে থাকেন মরণান্তে তাকে যেন তিরপুণী (বর্দ্ধমানের গ্রাম্য মানুষ ত্রিবেণীকে ‘তিরপুণী’ বলে৷ বর্দ্ধমানের গ্রাম্য ছড়ায় আছেঃ

‘‘চালভাজা খেতে খেতে গলা হয় কাঠ

হেথা কোথা জল পাব সেই তিরপুণির ঘাট

তিরপুণির ঘাটাতে বালি ঝুরঝুর করে

সোনার গায় রোদ লেগেছে ডালিম ফেটে পড়ে৷’’)  ঘাটে দাহ করা হয়, ছাইগুলো যেন গঙ্গাজলেই শেষ আশ্রয় পায়৷

মনে পড়ে গেল আমার ছোট বয়সের পাড়াতুত এক ঠাকুমার কথা৷ ঠাকুমা রোজ ট্রেনে করে ছয় মাইল দূরবর্ত্তী গঙ্গায় ডুব দিয়ে আসতেন৷ অতি ভোরে বেরুতেন, ফেরবার সময় হাতে ছাপ, কপালে ছাপ, বুকে তিলক, নাকে রসকলি লাগিয়ে ফিরতেন৷ সবই করতেন.... কেবল করতেন না টিকিট৷ ইষ্টিশানে চেকারবাবু যখন হাত পেতে শুধোতেন –মা, আপনার টিকিটটা? কোলকুঁজো ঠাকুমা বাঁ হাতটা উপরের দিকে কেৎরে দিয়ে বলতেন–আ মরণ মিনসের ছেলে পেছনে রয়েছে দেখছ না টিকিটটা তার হাতেই রয়েছে৷

চেকারবাবু কোন কোন দিন শুধু হাসতেন, কেবল বলতেন–মা, রোজই তো বলেন ছেলে পেছনে আসছে৷ কই, এক দিনও তো আপনার ছেলের টিকি দেখতে পাই না৷

ঠাকুমা একটু ঝাঁঝালো ভাষায় বলতেন–আমার ছেলে কি ভিনদেশী নাকি যে মাথায় টিকি রাখবে বাঙালী পোলা মাথায় টিকি রাখে না মরণ....মিনসের মরণ

একদিন আমি বুকে বল  নিয়ে সাহসে  ভর দিয়ে  শুধোলুম–হ্যাঁ গো ঠাকুমা, তুমি যে   গঙ্গাস্নান করো, কষ্ট করো, তিলক–ছাপ, চন্দন–ছাপ, তিলক–মাটি লাগাও, সেই যে নাকে রসগোল্লা না কী একটা লাগাও এ তো পুণ্যি করা ঠিক, কিন্তু বিনা টিকিটে ট্রেন ভ্রমণ করায় সব পুণ্যি তো বরবাদ হয়ে যাবে....এ যেন সেই এক ভাঁড় গোদুগ্ধে এক ফোঁটা গোরোচনা৷

ঠাকুমা বললেন–খোকন, ওইখানেই তো ভুল করলি৷ বিনা টিকিটে ভ্রমণের পাপটার দিকে তাকিয়ে দেখলি কিন্তু গঙ্গাস্নানের পুণ্যিটার দিকে ভাল করে তাকালি না ৷ গঙ্গাস্নানে যে পরিমাণ পুণ্যি হয় বিনা টিকিটে ভ্রমণে সে তুলনায় পাপ একেবারেই অকিঞ্চিৎকর৷ তাই দু’য়ে যে গায়ে গায়ে শোধ হবে তার জো নেই৷

‘‘একবার গঙ্গাস্নানে যত পাপ হবে,

পাপীদের সাধ্য নাই তত পাপ করে৷’’

(শব্দ চয়নিকা)

জাগো বাঙালী

লেখক
বঙ্গ কন্যা অনন্যা

বাঙালী, এবার তো জাগুন,

অনেক আগেই লেগেছে আগুন!

এবারও না জাগলে পরে

নীরব দর্শক থাকলে ঘরে

বাঙলা ও বাঙালীর সমৃদ্ধি হবে ছাই

দেখবেন তখন বাঁচার আর উপায় নাই!!

কৃপা ভরে

লেখক
শিবরাম চক্রবর্ত্তী

তুমি আমার আমি তোমার

এই ভাবনার ভাবে,

ভাব বিনিময় হওয়ার সময়

আর সবই দূরে যাবে৷

চলার পথে বাধার সাথে

যখন লড়তে হয়,

ভাল-মন্দ, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব

মনে জাগে সংশয়৷

কৃপা ভরে’ সেই সময়ে

হৃদয় জুড়ে থাকবে তুমি,

মনের গ্লানি সরিয়ে দূরে

ওগো অন্তর্যামী৷

লীলাময়

লেখক
জ্যোতিবিকাশ সিন্হা

কোন্ সে অনাদিকালে লীলাচ্ছলে---

অসীম তুমি, ধরা দিলে বৈচিত্র্যের সীমায়

প্রকৃতির গণ্ডী এঁকে নিলে বিরাট ভূমাসত্ত্বায়৷

রস-সমুদ্রে সত্ত্ব-রজঃ-তমের গুণবন্ধনে

সঞ্চরের পথ ধরে’ সৃষ্ট হ’ল জগৎ

ক্ষিতি-অপ-তেজ-মরুৎ-ব্যোম৷

প্রকৃতির প্রচণ্ড উগ্রতায় আরও

বাঁধতে চাইলে তোমায় আষ্টেপৃষ্ঠে,

শুভারম্ভ প্রতিসঞ্চরের পালা, জডস্ফোটে৷

সর্জনকেন্দ্রে নিহিত শক্তির প্রাবল্যে

জাগলো প্রাণের স্পন্দন---

বিকশিত এককোষী থেকে বহু-বহুকোষী অবয়ব৷

প্রবহমান বিবর্তনের ধারা বেয়ে

উজ্জীবিত উন্নত মননের উন্মেষ---

জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ উত্তরণ---এলো মানুষ৷

পরমাত্মার প্রতিবিম্ব সর্বদা বিচ্ছুরিত

জীবাত্মার গহন নভোপটে৷

তোমার বিচিত্র রূপকল্পে

বিধৃত পৃথিবীর বিরাট রঙ্গশালা৷

লীলানন্দে বিভোর লীলাময়---

কোথাও লোভ-লালসা, কামনার তীব্র দহন

অন্যদিকে ত্যাগ-বৈরাগ্য, অধ্যাত্ম-রতন

হৃদয়ে বিবেকবুদ্ধি, প্রেম-প্রীতির অনুরণন৷

বিদ্যা-অবিদ্যা, ধর্মাধর্মের নিয়ত সংগ্রামে

পাশ-রিপু-বৃত্তির দংশন অবহেলে

মুক্তি পিপাসু মানুষ যখন অন্তরের অন্তঃস্থলে

সাধনা, ত্যাগ, সেবার মশাল জ্বালে

তুমি তখন তার দু’হাত ধরে, করুণাভ’রে

টেনে নাও তোমার মধুময় ক্রোড়ে---

কোটি জন্ম মৃত্যুর অবিরাম চলার অবসানে

অনন্ত ওঁঙ্কারের শাশ্বত প্রশান্ত গুঞ্জরণে

সমাহিত হয় পরম আনন্দ পারাবারে৷

গল্পের গল্পকথা

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

অনেকে ভাবে ‘গল্পর্ষ’ বুঝি একটি সংস্কৃত শব্দ৷ না, এটি একটি গৃহীত সংস্কৃত শব্দ অর্থাৎ যে শব্দ মূলতঃ সংস্কৃত নয়, অন্য ভাষা থেকে নেওয়া হয়েছে যেমন ‘গুবাক’, ‘রজ্জু’, পান অর্থে ‘পর্ণ’, মাছ অর্থে ‘মীন’, গ্রাম অর্থে ‘পল্লী’---এরা সবাই গৃহীত সংস্কৃত৷ ‘গল্প’ শব্দটি তাই-ই৷ গল্প / গল্পিকা দুটোই গৃহীত শব্দ৷ সংস্কৃতে এরকম গৃহীত শব্দগুলির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হ’ল এদের ব্যুৎপত্তি পাওয়া যায় না৷

গল্পের সংস্কৃত হচ্ছে ‘কথা’ আর ছোট গল্পের সংস্কৃত হয় ‘কথানিকা’ (কথানিকা< কহানিয়া< কহানি< কাহিনী)৷ হ্যাঁ, ‘গল্প’, ‘গল্পিকা’ শব্দগুলি সংস্কৃতে আদিমকালে ছিল না, গৃহীত হয়েছিল সম্ভবতঃ বাংলা বা মৈথিলী থেকে কারণ ওই দুটি ভাষাতেই ‘গল্প’ বা ‘গপ্প’ শব্দ চলে যার উর্দু হচ্ছে ‘কিস্সা’৷ বাঙলায় কেউ কেউ ওই ‘কিস্সা’ থেকে ‘কেচ্ছা’ শব্দ তৈরী করে নিয়েছেন৷ ‘কেচ্ছা’ শব্দের আর একটি অর্থ হ’ল নিন্দা বা ‘কুৎসা’৷ এখানে ‘কেচ্ছা’ শব্দটি সংস্কৃত কুৎসা শব্দ থেকে আসছে না....আসছে উর্দূ ‘কিস্সা’ শব্দ থেকে৷ উর্দুতে যদি বলি ‘মতিবিবি কি কিস্সা’৷ তার বাংলা হবে ‘মতিবিবির কেচ্ছা’৷ এই কিস্সা শব্দের হিন্দী ভাষার তদ্ভব রূপ হচ্ছে ‘কহানী’, বাংলায় তদ্ভব রূপ ‘কাহিনী’ অর্থাৎ হিন্দীতে হবে ‘মতিবিবি কী কহানী’, বাংলায় হবে ‘মতিবিবির কাহিনী’৷ শোনা যায় একবার নাকি মিথিলার কমতৌলে বা সৌরাষ্ট্রের সভাগাছিতে অর্থাৎ নবদ্বীপের পোড়ামাতলায় অথবা ভাটপাড়ায় গঙ্গার ধারে কিংবা কোটালীপাড়ার বটতলায় অথবা কাঁথির কাছে জুনপুটের সমুদ্রতীরে কিংবা কোচবিহারের রাসময়দানে অথবা হাসিশহরের (পণ্ডিতী নাম ‘কুমারহট্ট’) ইট-বেরিয়ে যাওয়া গঙ্গার ঘাটে পণ্ডিতেরা সবাই জড় হয়েছিলেন৷ ‘গল্প’ শব্দটির ইতিহাস আবিষ্কার করতে৷ তাঁদেরজন্যে রাজারাজড়াদের এমন কিছু খরচ করতে হয়নি---আনতে হয়েছিল এক শ’ মণ চা আর পাঁচ শ’ মণ নস্যি৷ পণ্ডিতেরা তিন দিন তিন রাত এই নিয়ে তর্ক করেছিলেন, চর্চা করেছিলেন, শুরু হয়েছিল সেই তৈলাধার পাত্র বা পাত্রাধার তৈল নিয়ে গবেষণা৷ তারপর এল ‘তাল্ পড়িয়া চ ঢপ্ শব্দ হইল, না ঢপ্ শব্দ হইয়া  তরু হইতে তাল্ পড়িল’! অবশেষে এল তামাকের গুণাগুণ৷ পণ্ডিতেরা এ সম্বন্ধে সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেলেন ধোঁয়ারূপেই হোক অথবা চূর্ণ রূপেই হোক (দোক্তা বা জর্দা বা নস্যি) তামাক সেবন মহা ফলদায়ী৷ সংস্কৃতে তামাকের নাম ছিল না৷ পণ্ডিতেরা গবেষণা করে নাম দিলেন ‘তাম্রকূট’৷ কিন্তু কিছু পণ্ডিত বলেছিলেন নাম রাখা হোক ‘স্বর্ণকূট’৷ কিন্তু অন্যরা বললেন, হৈমবতী উমা অর্থাৎ পার্বতীর সঙ্গে নামটি যুক্ত৷ তাই এটি চলবে না৷ কেউ কেউ নাম রাখতে চাইলেন ‘রজতকূট’ অন্যে আপত্তি করে বললেন---না, তাও চলবে না কারণ শিবের ধ্যান মন্ত্রে আছে---‘ধ্যায়েন্নিত্যং রজতগিরিনিভম্ সুতরাং সে নামও চলবে না৷ তা নিয়ে দেবতাদের মধ্যে মতভেদ নেই৷ তাই নাম রাখা হ’ল ‘তাম্রকূট’৷ কথ্য ভাষায় লোকে নাম রাখতে পারে টোবাকু, তাম্বাকু, তামাকু, তাংকু, তাতে ব্যকরণ সমর্থন করুক বা না করুক৷ ‘যার সঙ্গে যার মজে মন / কিবা হাঁড়ি কিবা ডোম৷ তাঁরা সিদ্ধান্তে পৌঁছুলেন---

‘‘তাম্রকূটং মহদদ্রব্যং শ্রদ্ধয়া দীয়তে যদি৷

অশ্বমেধসমপুণ্যং  টানে টানে ভবিষ্যতি৷’’

অর্থাৎ তামাকু একটি মহৎদ্রব্য৷ কেউ যদি শ্রদ্ধার সঙ্গে কাউকে তামাক অফার করে  তাহলে প্রাপক যেমন এক-একটা টান দেবেন দাতা তেমনি এক-একটি করে অশ্বমেধ যজ্ঞের সমান ফল পেতে থাকবেন৷

সবই তো হয়ে গেল৷ এবার পণ্ডিতেরা এলেন আসল বিষয়ে৷ অনেক গবেষণার পর ওঁরা বললেন ঃ তিন বন্ধু ছিল---গণেশ, ললিত, পরেশ৷ ওরা একবার বক্সীর হাট থেকে বেড়িয়ে তোর্সা নদী পার হয়ে যাচ্ছিল মাথাভাঙ্গা গণেশ লম্বা চেলে সে গরমকালে তোর্সা নদীর কোমড় জল পার হয়ে গেল৷ পরেশ আরো লম্বা৷ গরমকালে তোর্সা নদী তারকাছে হাঁটু জলের সামিল৷ কিন্তু ললিত বেঁটেখাটো৷ তাকে বলা হ’ল তুই নদী পার হতে পারবি?

ও বললে---মুই পরিম না৷

তখন পরেশ ওকে নিজের কাঁধের ওপর বসিয়ে নিল৷ এখন পণ্ডিতেরা মানস দৃষ্টিতে ওই ছবিটা দেখে নিলেন ঃ তোর্সা নদীর মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে আছে গণেশ আর নামের প্রথম অক্ষর ‘গ’৷ আর একটু পেছনে দাঁড়িয়ে আছে পরেশ যার নামের অক্ষর ‘প’৷ আর পরেশের কাঁধে রয়েছে ললিত যার নামের প্রথম অক্ষর ‘ল’৷ সবার আগে ‘গ’, পেছনে ‘প’ অক্ষর তার মাথার ওপরে ‘ল’৷ এই হ’ল ‘গল্প’ এর ইতিহাস....নবতর পুরাণ৷     (শব্দচয়নিকা ২১/১০৭)

টুনটুনি

লেখক
বিদ্যুৎ বেরা

ছোট পাখী টুনটুনি,

খাবে পাতা থানকুনি?

উড়ে এস এক্ষুণি

নইলে দেব বকুনি৷

বিড়াল মাসি এলে পড়ে

উড়ে যেও তক্ষুণি৷

পাখীর তরে

লেখক
ভবেশ কুমার বসাক

ছোট্টবেলায় অনেক ছোট তখন

ভালবাসতাম যে পাখীদের গান

গানের কথা স্পষ্ট হ’ল এখন

‘তোমরা মোদের দিচ্ছ না সম্মান’৷

মনে-পড়ে সেই ভোরের বেলার ডাক

‘ছোট্ট সোনা ঘুমিয়ে কেন থাকো,

ওঠো নয়তো করবোই হাঁকডাক

হাত-মুখ ধুয়ে অ-আ-ক-খ শেখো৷’

দুয়ারে এসে বসতো শালিক কটা

সঙ্গে চড়ুই আর দোয়েলের দল,

নেচে গেয়ে কইত কি সব কথা

ভাবলে পরেই চোখ করে ছলছল৷

উঠল যেথায় উঁচু অট্টালিকা,

সেথায়ই-তো মিলত পাখীর দেখা,

হারিয়ে গেছে তাদের সুর ও কথা

এখন শুধুই শূন্যতে মুখ দেখা৷

হঠাৎ সেদিন ভোরের বেলায় দেখি

পুরোনো সেই দিনের একটি পাখী

চেহারায় নেই একটুও ঝিকিমিকি

বলল আমায়---দিলেম তোমায় ফাঁকি৷

এই না বলে উড়তে যাবে যেই

হাত বাড়িয়ে ধরেই তাকে ফেলি

বলি তারে---রাগ করতে নেই

বন্ধু তোমায়  কেমন করে ভুলি?

স্বপ্ণেতে সে কষ্ট করে হাসে

কণ্ঠস্বরে চাপা অভিমান

‘প্রতিদানটা পেলাম ভালবেসে

তাড়িয়ে দিলে করলে অসম্মান৷’

দাঁড়িয়ে দেখি অট্টালিকার ছাদে

লোহার জালের উঁচু টাওয়ারখানি,

এর জন্যেই পাখীরা সব কাঁদে

এর বিষেই পাখীর জীবনহানি৷

আমার আমি উঠছে যে আজ জেগে

আবার হবে প্রভাত পাখীর গান,

আকাশ-বাতাস মাতিয়ে আসবে তেজে

শত-সহস্র পাখীর কলতান৷

গণতন্ত্রের নাভিঃশ্বাস

লেখক
প্রভাত খাঁ

বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে!

কে দেবে উত্তর এই ছন্নছাড়া গণতন্ত্রের!

কলহে উন্মত্ত সব শাসকের দল

স্বার্থসিদ্ধি তরে করে সদা নানা ছল৷

সার্বিক কল্যাণ থেকে রহে বহুদূরে

নিজেদের স্বার্থ লাভে এক হয়ে রহে৷

নির্বাচন কালে শুধু পালে হাওয়া লাগে

বোটারদের দুয়ারে এসে সবে কড়া নাড়ে৷

গদীতে বসার পর আর দেখা নেই

হাওয়া মিলিয়ে যায় দেওয়া প্রতিশ্রুতিই৷

দলতন্ত্রে গণতন্ত্রের নাভিঃশ্বাস ওঠে

আশাহত মনে তাই বিরক্তিটাই ফোটে!

গণতন্ত্রের জন্ম হয় জনগণের তরে

কিন্তু পোড়া দেশে দেখ শুধু

মুষ্টিমেয় ব্যষ্টিরাই সুখভোগ করে৷

যা চাই

লেখক
ভবেশ কুমার বসাক

মাঠে মাঠে ফসল নাই

সেখানেতে বৃষ্টি চাই

ফসল যখন প্রাণ পেয়েছে

বৃষ্টি বলুক---এবার যাই৷

স্যাঁতসেতে আর ভিজে-কাদায়

কত মানুষ জীবন কাটায়

সুখ পাখিটা যায় না সেথায়

রোদ্দুর যেন সেথায় পাই৷

দুপুর রোদে চাষী ঘামে

স্বপ্ণ কত চোখের কোণে

অসীম শক্তি যেন আনে

শীতল বাতাস তারই প্রাণে৷

বেশী কিছু চাইছি নাতো

অলীক স্বপন দেখছি নাতো

সয়ে গেলাম দুঃখ ক-ত

আমার মত দুঃখী যত৷

সবার ভালো দেখতে চাই

মন্দ মুখে পড়ুক ছাই

এসো এসো এক সুরে গাই

বাঁচার মত বাঁচতে চাই৷৷

রাবণ রাজা

লেখক
প্রণবকান্তি দাশগুপ্ত

রাবণ রাজার দশটি মাথা

বৃষ্টি হলে কিংবা রোদে

কোন্ মাথাতে ধরতো ছাতা?

কোন্ মাথাতে কাটতো টেরি,

কোন্ মাথাতে বাবরি চুল?

কোন্ মাথাতে বুদ্ধি বেশি

কোন্ মাথাতে কেবলি ভুল?

কোন্ মাথাতে মুকুট পরে’

বসতো রাবণ সিংহাসনে?

বাল্মীকি তো এসব কথা

যান নি লিপ্সে রামায়ণে৷

কোন্ মাথাটার প্ররোচনায়

করলো রাবণ সীতা হরণ,

রামের সঙ্গে যুদ্ধ করে

সবংশে তার হলো মরণ?