প্রভাতী

দাদাঠাকুরের চিঠি - নৈতিকতা

লেখক
দাদাঠাকুর

ছোট্ট ভাইবোনেরা, তোমরা জেনেছ যে মানব জীবনের লক্ষ্য হ’ল ঈশ্বরকে উপলব্ধির দ্বারা আনন্দ লাভ করা৷ কিন্তু আমাদের মনের কামনা–বাসনা, লোভ–লালসা আমাদের ঈশ্বরের দিকে না নিয়ে গিয়ে আপাত সুখের জন্যে জড় ভোগের দিকে নিয়ে যায়৷ মনের এই কামনা বাসনাকে বাধা দিয়ে ভোগমুখী মনকে ঈশ্বরমুখী করা দরকার৷ তার জন্যে চাই কিছু বিধি–নিষেধ৷ যেমন, একটা চারা গাছকে গোরু–ছাগল থেকে রক্ষা করে বড় করে তুলতে গেলে তার চারপাশে বেড়া দেবার প্রয়োজন হয়, ঠিক তেমনি সাধকের সাধনার পথে এগিয়ে চলার জন্যে যে প্রাথমিক বেড়া বা অনুশাসনের প্রয়োজন তার নাম নীতিবাদ বা নৈতিকতা৷

যম–নিয়ম হ’ল এই নীতিবাদ৷ যম মানে অপরের সঙ্গে সংযত ব্যবহার৷ আর নিয়ম হ’ল আত্মশুদ্ধির জন্যে যে আচার–আচরণ৷ যমের পাঁচটি অঙ্গ রয়েছে৷ যেমন–অহিংসা, সত্য, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য ও অপরিগ্রহ, আবার নিয়মেরও পাঁচটি অঙ্গ রয়েছে৷ যথা–শৌচ, সন্তোষ, তপঃ, স্বাধ্যায় ও ঈশ্বর প্রণিধান৷

অহিংসা ঃ মন, বাক্য ও শরীরের দ্বারা কারো ওপর পীড়ন না করার নামই অহিংসা৷ আর যখন কোন চিন্তা, কথা বা কাজ অন্য কাউকে বিনা কারণে দুঃখ বা কষ্ট দেবার জন্যে বলা বা করা হয় তা অবশ্যই হিংসা৷

সত্য ঃ অপরের হিতের জন্যে বাক্য ও মনের যে যথার্থ ভাব তারই নাম সত্য৷ মানুষ বিচারশীল জীব৷ কিসে অপরের ভাল হবে তা বোঝার ক্ষমতা সব মানুষেরই কম বা বেশী রয়েছে৷ সেই ক্ষমতা অনুযায়ী কিছু মনে ভাবা, বলা বা করাকে সত্য বলে৷

অস্তেয় ঃ অন্যের দ্রব্য অপহরণ না করার নামই অস্তেয়৷ অস্তেয় মানে চুরি না করা৷

ব্রহ্মচর্য ঃ মনকে সব সময় ব্রহ্ম ভাবনায় রত রেখে কাজ করে যাওয়াকেই ব্রহ্মচর্য বলে৷

অপরিগ্রহ ঃ দেহরক্ষার জন্যে যা প্রয়োজন তার অতিরিক্ত সবকিছু ত্যাগ করার নাম অপরিগ্রহ৷ তাই শরীর ঠিক রাখার জন্যে যতটা ভোগ্যবস্তুর দরকার ততটাই গ্রহণ করতে হবে তার বেশী নয়৷

শৌচ ঃ শৌচ মানে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা৷ শৌচ দুই প্রকার৷ যথা,–

ক) বাহ্যিক শৌচ ৷ যেমন, শরীর, জামা–কাপড়, ঘর ইত্যাদি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা৷

খ) মানসিক শৌচ–সব সময় অপরের ভাল চিন্তা করা, মনে মনে কারও ক্ষতির চিন্তা না করা৷

সন্তোষ ঃ অযাচিত ভাবে যা পাওয়া যায় তাতেই সন্তুষ্ট থাকার নাম সন্তোষ৷ স্বাভাবিক পরিশ্রমে অর্থাৎ শরীর ও মনের ওপর তার সামর্থ্যের বেশী চাপ না দিয়ে যে অর্থ বা সম্পদ উপার্জন করা যায় তাতে তৃপ্ত থাকার নামই সন্তোষ সাধনা৷

তপঃ ঃ তপঃ শব্দের অর্থ হচ্ছে লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্যে কৃচ্ছ্রসাধন করা৷ তাই উদ্দেশ্য সাধনের জন্যে শারীরিক–মানসিক কষ্ট স্বীকারের নাম তপঃ৷

স্বাধ্যায় ঃ অর্থ বুঝে ধর্মগ্রন্থ পাঠ করাকে স্বাধ্যায় বলে৷ তাই স্বাধ্যায়ে ধর্মগ্রন্থ পাঠ করে বা শুনে তার অন্তর্নিহিত অর্থ ভালভাবে বুঝে নিতে হবে৷ শুধু বুঝলেই হবে না, সেইমত জীবনকে পরিচালিতও করতে হবে৷

ঈশ্বর প্রণিধান ঃ ঈশ্বরকে উপলব্ধি করার জন্যে আন্তরিক ভাবে মানসিক প্রয়াস করাকে ঈশ্বর প্রণিধান বলে৷ সুখে দুঃখে সব সময় ঈশ্বরে বিশ্বাস রেখে তাঁর ভাবনা নিয়ে কাজ করাও ঈশ্বর প্রণিধানের অঙ্গ৷

খন্ খন্ ঝন্ ঝন্

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

গম্ভীর শব্দের অর্থ হল জলের তলমাপক ভাব অর্থাৎ জলকে গম্ভীর বললে বুঝতে হবে সেটা অর্থই জল.... অনেকতলা পর্যন্ত সেই জল গেছে৷ যদিও শব্দটি আদিতে  জলপরিমাপক  হিসেবেই ব্যবহৃত হত কিন্তু পরবর্তীকালে বিভিন্ন ধরণের  অলঙ্কারে বিভিন্ন বস্তুর  তলমাপকতায় এর ব্যবহার হয়ে এসেছে৷ ভারী আবাজ, ভারী মনমেজাজ, ভারী চলন-বলন,  যার মধ্যে অনেক নীচ অবধি বা অনেক ভিতর পর্যন্ত মাপবার  প্রশ্ণ ওঠে তার জন্যে ‘গম্ভীর আবাজ হাসিবিহীন মুখকে লব গম্ভীর চলন৷ তবে মনে  রাখতে হবে মুখ্যতঃ এটি জলেরই  তলত্ব বা অতলত্বের  পরিমাপ৷

‘গম্ভীর’ শব্দের কথা বলতে গিয়ে মনে পড়ে গেল একটি কম বয়সের ঘটনার কথা৷ আমার জানা  এক ভদ্রলোকের স্ত্রী ছিলেন দারুণ দজ্জাল, উঠতে বসতে স্বামীকে খোঁটা দিয়ে কথা বলতেন৷ বচনের  ঝালে  তিনি অন্নপ্রাশনের  ভাতকেও  বমি করে বার করে দিতে লোককে বাধ্য করতেন৷ কিন্তু গোবেচারা*

(এখানে বেচারা মানে সাদাসিধে মানুষ..... সাত চড়েও যিনি রা-টি কাড়েন না৷ গোরু একটি শান্তশিষ্ট প্রাণী, মোষের মত)

একদিন ভোরে পশ্চিম দিকের পাহাড়টার দিকে বেড়াতে যাচ্ছি৷ দেখি, রাস্তার ধারে বটতলায় বসে রয়েছেন  সৌরেন সরকার ৷ ভদ্রলোক আমার বাবার চেয়ে বয়সে এক বছরের বড় ছিলেন৷ তাই তাঁকে জ্যাঠামশায় বলতুম৷ তাঁকে ওইভাবে বসে থাকতে দেখে শুধোলুম--- কী জ্যাঠামশাই! এখন  এখানে  এভাবে বসে আছেন!

হ্যাঁ,প্রসঙ্গতঃ বলে রাখি, দেওয়ালে ঠেস দিয়ে থালা বাসন-পত্র যদি সেই বাড়ীর কাছ দিয়ে তীব্রগতিতে ছুটে আসা রেলগাড়ীর শব্দে থালা-বাসনপত্রের দেওয়ালের গা ছেড়ে যখন  মাটিতে পড়ে যায় তখন একটা খন্ খন্ ঝনাৎ শব্দ নিশ্চয়ই শুণেছ৷ আবাজ কেমন বোঝাতে গিয়ে লোকে বলে খন্খন্ ঝন্-ঝন্ আবাজ ৷ এ আবাজ  কেবল বাসনেরই হয়, মানুষ বা অন্য জীবের হয় না৷ তবুও এ আবাজটি অনেক সময় মুখর বা মুখরা মানুষের অভিব্যাক্তি বোঝানোর সময় ব্যবহৃত হয়৷

(মেজাজী নয়, হরিণের মত ছটপটেও নয়, বেস শান্তশিষ্ট স্বভাবের৷ যে বেচারী মানুষটি একেবারে গোরুর মত শান্তশিষ্ট তিনি হলেন গোবেচারী৷ গোরুকে বেশী মারলেও সে শিঙ নেড়ে তেড়ে আসে না৷   মার সয়েই যায়--- বেশী মারে শিঙ নেড়ে তেড়ে আসে না৷ মার সয়েই যায়--- বেশী মারে  ক্কচিৎ কখনও কাঁদে৷  তাই কাউকে যদি গোরুকে মারার মত মারা হয় ও সে মার খেয়ে মরে যায়, সে ধরণের মারকে বলা হয় ‘গোবেড়ান’--- কলকাতার কথ্য বাংলায় ‘গোবেড়েন’৷ )

আমি সরকার জ্যাঠামশাইকে জিজ্ঞেস করলুম--- তা অত ভোরে এই বটতলায় বসে থাকার কারণটা কী?  তিনি বললেন--- বাবা, সবই তো জানো, বাড়িতে চব্বিশ ঘন্টা খন্ খন্ ঝন্-ঝন্৷ তা তোমার  জেঠীমার ভয়ে একটু গাছতলায় বসে শান্তি পাচ্ছি৷ খানিক বাদে  আবার বাড়ী ফিরতে হবে, তারপর অফিস যেতে হবে, তবু আর দশটা মিনিট বসে থাকি.....যতটুকু  সময় খন্ খন্, ঝন্-ঝনের  হাত থেকে  দূরে থাকা যায়৷

 তাহলে বুঝলে এই গম্ভীর শব্দ যদিও জলের পরিমাপের জন্যে প্রাচীনকালে ব্যবহৃত  হত কিন্তু আজ গম্ভীর  স্বভাবের  মানুষ, গম্ভীর চালচলন, গম্ভীর  চরণ-চারণা, গম্ভীর ধবনিবিন্যাস প্রভৃতি নানানভাবে নানান ব্যঞ্জনার বহ্বাম্ফোটে তরঙ্গের উত্তরণে সত্যিই মুড়ি-মুড়কির মতই ছড়িয়ে পড়েছে৷ শব্দটি তার সাবেকি গাম্ভীর্য আজ হারিয়ে ফেলেছে৷ (শঃচঃ ২০৷১৮)

বৃষ্টির দিন

লেখক
জয়তী দেবনাথ (অষ্টম শ্রেণী)

আজ সারা দিন ধরে

               বৃষ্টি শুধুই ঝরে,

তার নাই কোনও অবসর

               সে শুধুই ঝরে ঝরঝর৷

 

দিন-রাত্রি শুধুই ঝরে বৃষ্টি

               প্রকৃতির এ-কী অপরূপ সৃষ্টি,

গ্রীষ্মের প্রখরতা গেল চলে

               বরষার স্নিগ্দতায় মুগ্দ সকলে৷

 

খাল-বিল-নদী-নালা-স্থলে

               যেথা দেখি পরিপূর্ণ জলে,

কর্মহীন অবসরে বদ্ধ ঘরে

               নিঝুম রাত্রি নামে দিনে-দুপুরে৷

 

গ্রীষ্মের খরতাপে যখন পোড়ায়

               বিধাতার কৃপাবারি তখন ঝরায়,

আকাশে কালো মেঘ ঢেকে সারা দিন

               অবিরাম বৃষ্টি ঝরে রিমঝিম৷

 

সাবধান

লেখক
রবীন্দ্রনাথ সেন

ব্যাঙ্গমা শুধালো ব্যাঙ্গমিকে

আচ্ছে দিন আসছে দ্যাখো ওই দিকে

ব্যাঙ্গমি তো হেসেই মরে

বলি বুড়ো হলে কি এমনি করে?

আচ্ছে রাত আসছে দ্যাখো চৌদিকে

মানুষগুলো দেখবে  এবার বিভীষিকে৷

ওরা কেবল দাঙ্গা বাধায় ফায়দা তোলে

বজ্জাতি আর অজ্ঞানতার বোল বলে৷

গরীব মেরে ব্যবসা করে কেবল চাই টাকা

বাঙলা মুলুক শুষে খাবে বাঙলা হবে ফাঁকা৷

ভাইয়ে ভাইয়ে দ্বন্দ্ব হবে ওদের হবে মজা

বাঙলাটাকে কব্জা করা তবেই হবে সোজা৷

ব্যাঙ্গমা বলে ব্যাঙ্গমি আয় দুজনে বলি---

সকল দ্বন্দ্ব বিভেদ ভুলে এসো নোতুন যুগে চলি৷

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

লেখক
মৃণাল কান্তি রায়

দয়ার সাগর বিদ্যাসাগর তোমায় নমস্কার,

বীরসিংহের  বীর সন্তান ভাষার অলংকার৷

বিধবার জীবনদীপ জ্বেলে দিলে তুমি,

ছিলে তুমি সমাজ সংস্কারক, সকলেই জানি৷

তোমার আদর্শে সকলে শেখে মাতৃভক্তি,

দামোদর পার হওয়ার মনে পায় শক্তি৷

পিতা ছিলেন ঠাকুরদাস, মাতা ভগবতী,

জন্ম তোমার অজগ্রাম, জ্বালাও জ্ঞানের বাতি৷

তুমি কর তোমার কর্ম, বিধবার  জীবনের গর্ব,

সাধুজন  বোঝে শুধু তোমার ক্রিয়াকর্ম৷

ছাবিবশে জুলাই (১৮৫৬) করলে আইন পাশ,

বিধবার বিয়ে হলো, গোঁড়া সমাজ গেল পরবাস৷

সংস্কারাচ্ছন্ন পণ্ডিতগণ করলেন তিরস্কার---

অবহেলায়  লিখলেন  কবিতা, বিধবা মাতার৷

‘‘সাজ গো বিধবাগণ , ফুটিয়াছে ফুল,

তোমাদের সৌভাগ্য ঈশ্বর অনুকূল৷’’

সাত ডিসেম্বর গড়লে তুমি বিধবা বিবাহ  আসর৷

কালীমতি আর শ্রীশচন্দ্র গড়লো নতুন বাসর৷

আজও তুমি আমাদের মাঝে রয়েছো মহান,

বিদায় বেলায়  জানাই তোমায় দ্বিশত  প্রণাম৷

‘‘মোসাহেব’’

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

কথায় বলা হয়, খোসামদে পাহাড়ও গলে মাখন হয়ে যায়৷ খোসামদে দুর্বাসা মুনিও গলে যান৷ সেই খোসামদের জন্যে ‘কাণ্ড’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়৷ ‘খোসামদ’ শব্দটি এসেছে ফার্সী ‘খুসামদ’ থেকে৷ অনেকে ‘খুসামদ’–কে মার্জিত রূপ দেবার জন্যে ‘তোষামোদ’ বলে থাকেন৷ না, ‘তোষামোদ’ বলে কোনো শব্দ নেই৷ শাস্ত্রে বলেছে, খোসামদকারী প্রতি মুহূর্তেই প্রতি পদবিক্ষেপেই অধোগতি হয়, কারণ সে প্রতি মুহূর্তে, প্রতি পদবিক্ষেপে কেবল স্বার্থচেতনায় অস্বাভাবিক কাজ করে থাকে৷ আগেকার দিনে রাজাদের বা অবস্থাপন্ন লোকেদের বেতনভুক খোসামদকারী থাকত৷ তাদের বলা হত মোসাহেব–যারা সব সময় নিজেদের কর্ত্তাকে  ‘সাহেব’, ‘সাহেব’ বলে তুষ্ট রাখবার চেষ্টা করে৷ আরবী ব্যাকরণ অনুযায়ী ওই  ‘সাহিব’ শব্দটির আদিতে  ‘মু’ সংযুক্ত করে তাদের বলা হয় মুসাহিব বা মোসাহেব৷ এইভাবে বিভিন্ন গুণের সঙ্গে ব্যষ্টির সংযোগ সাধন করে ক্রিয়া বা বিশেষ্যের আদিতে ‘মু’ যোগ করে আরবীতে বিভিন্ন শব্দ সৃষ্ট হয়ে থাকে৷ যেমন মুয়াল্লিন, মুয়াজ্জিন (যিনি আজান দেন), মুজাহিদ (যিনি জেহাদ বা ক্রুসেডে অংশগ্রহণ করেন), মুহাজির (যিনি অন্য দেশ থেকে এসে হাজির হয়েছেন অর্থাৎ রেফিউজী), মুসাফির (যিনি সফর বা ভ্রমণ করে চলেছেন) প্রভৃতি৷ সেই যে মোসাহেবের একটা গল্প আছে না

রাজামশায়ের একজন মোসাহেব চাই৷ তিনি খবরের কাগজে যথাবিধি কর্মখালির বিজ্ঞাপন দিলেন৷ জানিয়েও দিলেন, ‘‘আবেদনকারীকে দরখাস্তের সঙ্গে ৫০০ টাকার ক্রশ চেক দিতে হবে যা প্রত্যর্পণযোগ্য নহে৷ হাজারে হাজারে দরখাস্ত এল৷ লিখিত পরীক্ষার পর মৌখিক পরীক্ষা চলছে৷ রাজামশায় বসে রয়েছেন৷ তাঁর সিংহাসনের বাঁ হাতলটা ধরে ঘাড় বেঁকিয়ে মন্ত্রীমশায় একটু কেতরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন৷ এক একজন কর্মপ্রার্থী আসছেন ইন্টারভিউ (সংজ্ঞ–প্রতীতি) দিতে৷

রাজামশায় প্রথম জনকে জিজ্ঞেস করলেন–‘‘তুমি কি মোসাহেবের কাজ পারবে?’’

সে বললে–‘‘নিশ্চয় পারব, জাঁহাপনা৷’’

রাজামশায় তার নাম খারিজ করে দিলেন৷ দ্বিতীয় কর্মপ্রার্থী এলেন–একজন চালাক–চতুর যুবক.......চোখে মুখে খই ফুটছে৷

রাজামশায় তাকে বললেন–‘‘মোসাহেবের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরু দায়িত্ব তুমি কি এ কাজ পারবে?’’

কর্মপ্রার্থী বললে–‘‘একবার চান্স দিয়ে দেখুন শাহানশাহ্, আমি নিশ্চয় পারব৷’’ রাজা তাকেও না–পসীন্দ*(*শব্দটা ফার্সী৷ তাই ‘না–পছন্দ’ না বলে ‘না–পসীন্দ’ বলাই বেশী ভাল৷ তবে এর বাংলা রূপ হিসেবে ‘না–পছন্দ’ও চলতে পারে’৷) করলেন৷ বলা বাহুল্য, এরও চাকরী হল না৷

পরের কর্মপ্রার্থীটি খুবই শিক্ষিত কিন্তু ইন্টারভিউ কেমন হবে তাই ভেক্ষে সে পৌষের শীতেও ঘেমে গেছল........রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে সে রাজার সামনে এসে দাঁড়াল৷

রাজামশায় তাকে শুধোলেন–‘‘মোসাহেবের এই মহান কর্ত্তব্যে তুমি কি সমর্থ?’’

উৎসাহের অগ্ণিতে প্রদীপ্ত হয়ে কর্মপ্রার্থীটি বললে–‘‘নিশ্চয়ই পারব৷ একশ’ বার পারব, স্যার......কথা দিচ্ছি স্যার....কেবল একবার একটা চান্স দিন স্যার....just a chance please৷’’

রাজামশায় তাকেও বাতিল করে দিলেন৷ এবার যে ছেলেটি এল তার চোখে–মুখে বুদ্ধির ঝলক ছিল কিন্তু প্রজ্ঞার গভীরতা ছিল না৷

রাজামশায় তাকে শুধোলেন–‘‘খোসামদের কাজটা তুমি কি পারবে?’’

সে বললে–‘‘সত্যিই রাজাসাহেব, খোসামদের কাজটা আমি কি পারব’’

রাজামশায় বললেন–‘‘হ্যাঁ, তবে চেষ্টা করে দেখতে পারো৷’’

সে বললে–‘‘হ্যাঁ, তবে চেষ্টা করে দেখতে পারি৷’’

রাজামশায় আড়চোখে মন্ত্রীর দিকে চাইলেন৷ মন্ত্রী বললেন–‘‘মহারাজ, ইনিই সর্বগুণান্বিত, এঁকেই ক্ষহাল করুন৷ আজকের দিনে ইনিই বিশ্বমানবতার প্রতিভূ......জয়মাল্য পাবার ইনিই অধিকারী৷’’

রাজামশায় প্রার্থীকে বললেন–‘‘বুঝলে হে, আজ থেকে তোমার চাকরী হল৷’’

তাহলে বুঝলে ‘কাণ্ড’ বলতে এই খোসামদকে বোঝায়৷ সংস্কৃতে কিন্তু মোসাহেবকে বলা হয় ‘বিদুষক’৷ ‘মোসাহেব’ অর্থে সীমিত ক্ষেত্রে সংস্কৃতে ‘ভাণ্ড’ শব্দটিও চলত যার থেকে বাংলার ‘ভাঁড়’ শব্দটি এসেছে (যেমন–গোপাল ভাঁড়)৷ তবে ‘ভাঁড়’ বলতে ক্লাউনকেও বোঝায়৷ ‘‘আর ‘ভাঁড়ামি’ করতে হবে না’’–এমন কথা যখন আমরা বলে থাকি তখন কিন্তু সেটা ‘ভাণ্ড’ বা ‘ভাঁড়’ থেকে আসছে না, আসছে ‘ভণ্ড’ থেকে অর্থাৎ ভণ্ডামি অর্থে ‘ভাঁড়ামি’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷

শিক্ষা

লেখক
জয়তী দেবনাথ (অষ্টম শ্রেণী)

শিক্ষা আনে চেতনা

অন্ধকারে আলো

শিক্ষা দেয় উপলব্ধি

সবার সাথে চলো৷

শিক্ষা মনের পবিত্রতা

 জ্ঞানে সমুজ্জ্বল

শিক্ষা শেখায় উদারতা

মানবতার বল৷

শিক্ষার নেই কোনো শুরু

শিক্ষার নেই অন্ত,

শিক্ষা কেবল সুকলে নয়

নয়তো শুধু গ্রন্থ৷

শিক্ষা হ’ল নিজের ছন্দে

জীবনটাকে চেনা,

শিক্ষা হ’ল নতুনভাবে

জগৎটাকে জানা৷

শিক্ষা হ’ল অনুপ্রেরণা

 শুভকাজে শক্তি,

শিক্ষা জাগায় মনের মাঝে

অমলিন ভক্তি৷

বন্দী পাখী

লেখক
সাগরিকা বিশ্বাস

বদ্ধ ঘরে বন্দী এক

 সবুজ তাজা পাখী৷

আটকা পড়ে ওই সে ঘরে

 করছে ডাকাডাকি৷৷

উড়তো পাখী আকাশ পানে

 সবুজ পাখা মেলে৷

হারিয়ে যেতো কোন সুদুরে

  বাসনা মনে হলে৷৷

প্রাণ খুলে সে গাইত গান

 বলতো নানান কথা৷

প্রকৃতি মাঝে থেকে পাখী

 ভুলতো সকল ব্যথা৷৷

যেদিন সে বন্দী হল

 সোনার খাঁচা ঘরে৷

হারিয়ে গেল স্বাধীনতা

হঠাৎ এক পলে৷৷

আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ণ তার

   হল যে ধোঁয়াশা৷

শেষ হল এক নিমেষে

 রঙীন যত আশা৷৷

বদ্ধ ঘরে বন্দী পাখী

হারাল সব কিছু ৷

বাঁধল জীবন সোনার তারে

 রইল না আর কিছু৷৷

উপকারী

লেখক
প্রবীর মুখার্জী

গোরু যদি দুধ দেয়                দশ সের প্রত্যহ,

তাহলে গুঁতো তার                  লাগলেও গা সয়৷

ল্যাজের ঝাপটায়                   জলে সারা অঙ্গ

দুধের জন্যে শুধু                  খাতির ও সঙ্গ৷

কুকুরের ঘেউ ঘেউ                 রাত্রে অসহ্য–

তাড়া দিই, জল খাই                 পায়চারি অবশ্য৷

চোখ পড়ে পাঁচিলে,                 ওখানে ও কে রে

একলাফে সটকায়                  নির্ঘাত চোর এ৷

জিন্দা র’ বলে                     তার পিঠ চাপড়াই

আহ্লাদে ভো–ও–ও ডাকে              গায়ে লেজ ঘষটায়৷

হর্রে মানে হরীতকী

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

‘কৃপণ’ শব্দের অর্থ হচ্ছে যে মানুষের অর্থগত প্রাচুর্য্য আছে কিন্তু অনাহারে থেকে ও অন্যান্য ক্লেশবরণ করে যে কষ্টেসৃষ্টে জীবনযাত্রা নির্বাহ করে, এক কথায় না খেয়ে–পরে অর্থ সঞ্চয় করে৷ সাধারণতঃ মানুষ অর্থ সঞ্চয় করতে চায় বা দানধ্যানও করতে চায়৷ এটাই মানব জীবনের সাধারণ রীতি৷

যে মানুষ হাত  পেতেই আছে, উপুড়–হস্ত  করে না,  কথ্য ভাষায়  আমরা যাকে  বলি আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে জল গলে না তাকেও ‘কৃপণ’ বলা হয়৷

কৃপণের কথা বলতে গিয়ে আমার হ্যাংলাগ্রামের চাওয়া–চাটা চাটুজ্জ্যের কথা মনে পড়ে গেল৷ চাওয়া–চাটা চাটুজ্জ্যে শিষ্যবাড়ী থেকে পাওয়া জিনিসপত্র নিয়ে একটি ভ্যারাইটি ষ্টোর্স অর্থাৎ চাল–ডাল–নুন–তেল– দোকান খুলেছিলেন......রকমারি পণ্যের দোকান৷ প্রতিটি পণ্যই শিষ্যবাড়ী থেকে সোজাসুজি পেয়ে অথবা পরোক্ষভাবে চেয়ে যোগাড় হত৷ চাওয়া–চাটা চাটুজ্জ্যে ছিলেন হাড়কঞ্জুষ......কেপ্পনের জাসূস......আঙ্গুল দিয়ে জল গলে না৷ কিন্তু তার বামনী শ্রীমতী ট্যাংরাকালী দেবী ছিলেন কৃপণতায় আর এক কাঠি ওপরে৷ তোমরা ভাবছ, ট্যাংরাকালী–এ আবার কেমন নাম আসল ব্যাপারটা তোমরা বুঝি জানো না৷ তাহলে শোনো ঃ–

কারো যদি পর পর কয়েকটাই মেয়ে জন্মায়, তবে মেয়ের উপর তাদের বিতৃষ্ণা আসে৷ তারা শেষের দিকের মেয়েদের নাম রাখতে শুরু  করে আন্নাকালী (হে মা কালী, আর মেয়ে নয়), চাইনাকালী (হে মা কালী, ঢের হয়েছে আর মেয়ে চাই না), ঘেণ্ণাকালী (হে মা কালী, এবার মেয়েতে ঘেণ্ণা ধরে গেছে), কান্নাকালী (হে মা কালী, মেয়ে দেখে এবার কান্না পাচ্ছে), ট্যাংরাকালী (এ মেয়ে যেন ট্যাংরা মাছের কাঁটার মত গলায় বিঁধে রইল গো), খ্যাংরাকালী (এ মেয়ে যে খ্যাংরা কাঠির মত গলায় এসে বিঁধলে)৷ সুতরাং অনুমান করতে পার ট্যাংরাকালীর বাপের বাড়ীর অবস্থা তেমন জুৎসই নয়৷

চাওয়া–চাটা চাটুজ্জ্যে জন্মগত সূত্রেই হাড়কঞ্জুষ, যাকে বলি দৃষ্টিকেপ্পণ৷ তার পারিবারিক জ্যোতিষী চেয়ে–খাওয়া খাসনবীশ তার ঠিকুজী–কোষ্ঠীতে এই কথাটাই লিখে গেছেন৷ তারপর চাওয়া–চাটা চাটুজ্জ্যের বামনী এসে জুটল ট্যাংরাকালী...... একেবারে সোনায় সোহাগা...হিন্দীতে যাকে বলে ‘‘সোনে মে সুগন্ধ্’’৷

চাওয়া–চাটা রোজ সকালে বিকেলে কুঁড়োজালির ঝুলির মধ্যে হাত ঢুকিয়ে তর্জনীটি বাইরে রেখে ‘হরে রাম’ ‘হরে রাম’ মন্ত্র জপ করত৷ তোমরা কুঁড়োজালি জানো তো সেই যে ধানের ক্ষেতে, সেই যে বর্ষাকালে একটা জাল দিয়ে তৈরী পাত্রের নীচের দিকে কিছুটা কুঁড়ো–খইল রেখে ধানের ক্ষেতে বা ডোবার একপাশে রেখে দিতে হয়৷ ছোট ছোট কুচো মাছেরা কুঁড়ো খাবার আশায় সেই জালের ফোকর দিয়ে ভেতরে ঢুকে যেই কুঁড়ো খেতে শুরু করে অমনি কুঁড়োজালিকে ওপরে টেনে তুলতে হয়৷ জালির ফোকর দিয়ে জল বেরিয়ে যায়......মাছগুলো আটকে পড়ে সেই যে ছড়ায় আছে না–

‘‘জানলা দিয়ে ঘর পালাল, গৃহস্থ রইল বন্দী’’–

এটা ঠিক তেমনি ব্যাপার৷ মাছের ঘর হ’ল জল, আর কুঁড়োজালির ফোকর হ’ল জানালা৷ তাই জানালা দিয়ে ঘর অর্থাৎ জল চলে গেল আর গৃহস্থ–মাছ আটকা পড়ল৷

তা যাই হোক্, যারা জালির ভেতর হাত রেখে সুদের হিসেব কষতে থাকে তাদের ঠাট্টা করে বলা হয়ে থাকে কুঁড়োজালিতে হাত ঢুকিয়ে সুদের হিসেব কষছে৷

তা সে যাই হোক্, চাওয়া–চাটা রোজ সকালে বিকেলে কুঁড়োজালিতে হাত ঢুকিয়ে দোকানে ক্ষসে হিসেব–নিকেশ করত আর মুখে মধ্যে মধ্যে বলত–হরে রাম, হরে রাম৷ কেউ ভিক্ষে বা চাঁদা চাইতে এলে চাটুজ্জ্যের পো মৌনী সেজে (যেন মন তখন রয়েছে জপের দিকে) এক ঘণ্ঢা ধরে মুখে হুঁ হুঁ আবাজ করতেন৷ চাঁদা–চাওয়া ছেলেরা অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে করে ওর দোকান ছেড়ে চলে যেত৷ চাওয়া–চাটা চাঁদা দেওয়ার হাত থেকে রেহাই পেত৷ যদি কখনও কোনো বড় রকমের বিপদে জনসেবার জন্যে পাড়ার ছেলেরা চাঁদা চাইত ও চাওয়া–চাটাকে বলত যে এরকম সৎ কার্যে চাঁদা দিতে হয়–চাওয়া–চাটা চাটুজ্জ্যে তখন তাদের দিকে একটা শুকনো হরীতকী ফেলে দিত৷ তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে হরীতকী বা হর্তুকীকে উত্তর ভারতে বলে ‘হর্রে’৷ তাই চাওয়া–চাটা চাটুজ্জ্যে যখন ‘হরে–রাম হরে–রাম’ বলত পাড়ার ছেলেরা তারই জের টেনে বলত ‘হর্রে রাম’ ‘হর্রে রাম’৷

সত্যিই কৃপণের বড় দুর্গতি