প্রভাতী

ধরা আর সরা

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

দেশজ শব্দে ‘ট’ যথাযথভাবেই বজায় থাকে৷ আর ‘ড’ বা ‘ড়’ মৌলিক শব্দ হিসেবেই থেকে যায়৷ যেমন, আজ ভুলোর সঙ্গে ভোঁদার আড়ি হয়ে গেল৷ ওরা বলছে, ওরা আর একসঙ্গে মার্বেল খেলবে না, একটা পেয়ারাও আর কামড়াকামড়ি করে খাবে না৷ গোপনে কান পেতে শোনাকেও আড়িপাতা বলে৷ এটিও বাংলা দেশজ শব্দ৷

সেই যে একজন মহিলা আহ্লাদে আটখানা হয়ে তার এক বন্ধুকে বলেছিল–তোমার সঙ্গে দেখা হওয়ায় আমার যে কী আনন্দ হচ্ছে তা ভাষায় বলতে পারছি না৷ বন্ধু বলেছিল, তোমার যে কী আনন্দ হচ্ছে তার একটু আভাস আমায় দাও৷ মহিলাটি বলেছিল, আহ্লাদের আতিশয্যে আমার এখন ধরাকে সরা মনে হচ্ছে৷ সেই সময় হয়েছে কী, একজন চাষীর গোরু হারিয়ে গেছে৷ সে গোরু খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত হয়ে যে বাড়ির বারান্দায় বসেছে সেই বাড়িরই ঘরের ভেতর ওই মহিলাটি বলছে– আমি আনন্দের আতিশয্যে ধরাকে সরা মনে করছি৷ চাষী আড়ি পেতে কথাটা শুনে নিলে৷ এবার সেও আনন্দের আতিশয্যে ধেই ধেই করে নাচতে নাচতে ঘরের বাইরে থেকে ওই মহিলাটিকে গড় করে বললে–মা লক্ষ্মী, এই বিরাট ধরাটা যখন তোমার কাছে সরা হয়ে গেছে তখন দয়া করে বলে দাও, ওই সরার কোন্খানটিতে আমার গোরুটা রয়েছে৷

নুকাইঁ নুকাইঁ

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

তৃতীয় ধরনের কপটাচরণও আমরা কম দেখি না৷ শুনেছিলুম, আমেরিকায় এক ভদ্রলোক একটি প্রচণ্ড রকমের মদ্যপান–বিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন৷ এক জনসভায় মদের অপকারিতা সম্বন্ধে তিনি ওজস্বিনী ভাষায় ঠায় এক ঘণ্ঢা বত্তৃণতা করেছিলেন৷ তারপর বললেন–উঃ, উঃ গলা শুকিয়ে গেছে, এক গ্লাস ব্র্যাণ্ডি দাও৷

* * * * * * * *

সেবার আমি সাহেক্ষগঞ্জ থেকে দুমকা যাচ্ছি৷ সুদীর্ঘ পথ৷ সাহেক্ষগঞ্জ শহর পার হবার পরই শুরু হল পাহাড় আর জঙ্গল৷ পশ্চিম রাঢ়ের এই প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রাকৃতিক দৃশ্য অতি রমণীয়৷ ইচ্ছে হ’ল, এই পাহাড়–জঙ্গলের মধ্য দিয়ে মাইল খানেক পায়ে হাঁটি৷ গাড়ি থেকে নেবে পড়লুম..........হাঁটতে শুরু করলুম৷ কিছু দূর যাবার পর দেখছি, পায়ে নতুন জুতো–পরা সাত–আট বছরের একটি ন্যাংটো ছেলে কঞ্চি দিয়ে মাঠের একটি গর্ত্তের মধ্যে খোঁচা দিচ্ছে৷ আমি তাকে জিজ্ঞেস করলুম–তুর নাম কী বটেক?

সে বললে– রামকৃষ্ণ তুরী বটেক গো৷

আমি বললুম– কী করছিস বটেক?

ছেলেটি বললে–ইন্দুর ধরছি৷

আমি জিজ্ঞেস করলুম–ইন্দুর লিয়ে কী করবি?

সে বললে–পুড়াই খাব৷

আমি জিজ্ঞেস করলুম–ব্রাহ্মণ–কায়স্থরাও খায়?

সে বললে–হঁ, উয়ারা নুকাইঁ নুকাইঁ খায়৷

এই ‘নুকাইঁ নুকাইঁ খাওয়া’ লোকের সামনে নিজের ত্রুটি ঢাকার অপচেষ্টা৷ এটাও এক  ধরনের কপটতা৷

নেতাজী প্রণাম

লেখক
জ্যোতিবিকাশ সিন্হা

নেতাজী, নেতাজী, আজাদ হিন্দ্ বাহিনীর নেতাজী

নেতাজী, নেতাজী, সকলের আদরের নেতাজী

বাঙলার মহান সন্তান তুমি, ভারতের গৌরব

বিশ্বনিখিলে সততঃ স্পন্দিত তোমার স্বদেশপ্রেমের সৌরভ

শতাব্দীর ধ্রুবতারা তুমি, যুগপুরুষ মহাবিপ্লবী

ত্যাগ-মন্ত্র বলে ভারতবাসীর বুকে এঁকেছিলে দেশাত্মবোধের ছবি

আসমুদ্র হিমাচল হয়েছে উত্তাল তোমারই অমোঘ আহ্বানে

লক্ষ লক্ষ বীর সৈনিক জেগেছে ‘জয় হিন্দ্’ গানে

বিদেশী শাসকের অমানুষিক নিপীড়ন আর পৈশাচিক অট্টহাস

কলঙ্কিত করেছে পৃথিবী ও সভ্য মানুষের ইতিহাস৷

অন্ধঘোর নিশীথের বক্ষ চিরে রক্তিম পূবের আকাশ

উদ্ভাসিত করলে যুগ সন্ধিক্ষণে, তুমি, সুভাষ৷

পুষ্পশোভিত নিঃশঙ্ক  জীবনের হাতছানি দিয়েছ বিসর্জন

কণ্টকাকীর্ণ রক্তাক্ত দুর্গম পথ হাসিমুখে করেছ বরণ৷

গগনভেদী হুঙ্কারে ভেঙেছে অত্যাচারীর পাষাণ কারাগার

কেঁপেছে শার্দূল-শয়তান, দুর্বার শক্তিতে তোমার

লালচক্ষু-ভ্রূকূটি অবহেলে, ধূর্ত শ্যেন দৃষ্টি দিয়েছ ফাঁকি

অভ্রংলেহী মদমত্ত বোঝেনি, তুমি বিধাতার এক অপূর্ব সৃষ্টি৷

তরুণ সমাজের আদর্শ তুমি, চির উন্নত শাশ্বত মৃত্যুঞ্জয়

যুব-মানসে যুগে যুগে সঞ্চার’ পৌরুষ অমর অক্ষয়৷

শুভ জন্মদিনে স্মরণে-বরণে জানাই শতকোটি প্রণাম আজি

নেতাজী, নেতাজী, অফুরন্ত যৌবনের অগ্রদূত নেতাজী

নেতাজী, নেতাজী, আপামর দেশবাসীর গর্বের নেতাজী৷৷

নেতাজী সুভাষ

লেখক
প্রণবকান্তি দাশগুপ্ত

নেতাজী সুভাষ---বীরের নাম

লহ প্রণাম লহ প্রণাম!

বিপ্লবের মন্ত্র সাধন---

তীব্র শক্তি সম্পাদন,

কদম কদম গতি বর্ধন---

ইংরেজের হৃদয় কম্পন!

আপোষ নয়, সন্ধি নয়

যুদ্ধে তুমি যে অকুতোভয়৷

কম্বুকণ্ঠে বজ্রনাদ---

বশ্যতা নয়, আমরা আজাদ

যুদ্ধে রণবাদ্য বাজিয়ে

ব্রিটিশের সাম্রাজ্য কাঁপিয়ে

লালকেল্লা জয়ের যুদ্ধে

জাতীয় পতাকা তুলতে ঊধের্ব

আজাদ হিন্দ সৈন্যবাহিনী---

অগ্ণ্যাক্ষরে লেখা সে কাহিনী৷

প্রণাম তোমায়, হে মহাবীর

নতশির তাই ভারতবাসীর৷

নেতাজীর প্রতি

লেখক
শ্রীপথিক

    নেতাজী,

    তুমি আমাদের বলেছিলে

         রক্ত দাও, স্বাধীনতা দেব৷

    আমরা বলেছিলুম রক্ত নয়

         বিনা রক্তেই স্বাধীনতা পাব৷

    অত্যাচারীর হূদয়ের পরিবর্তন হবে,

    ওরা নিজেরাই যেচে স্বাধীনতা দেবে৷

 

    স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি

    তবুও রক্ত তো আমাদের দিতেই হচ্ছে

    গ্রামে গঞ্জে শহরে নগরে

    কিন্তু সে রক্ত তোমার চাওয়া

    গাা লাল রক্ত নয়,

    এ রক্ত বিশ্বাসঘাতকের নীল রক্ত

    ভ্রাতৃঘাতী আত্মঘাতী রক্ত৷

    হায়, সেদিন যদি তোমার ডাকে

    সাড়া দিয়ে

    রক্ত গোলাপের মত

         তাজা লাল রক্ত

    পূর্ণ স্বাধীনতার চরণে অর্ঘ্য দিতুম

     তাহলে হয়তো এমনি করে

    চক্রবৃদ্ধি হারে সুদে–মূলে

         ঋণ শোধ করতে হোত না৷

শিশু কারা

লেখক
অশোক রায়চৌধুরী

‘শিশু কারা? শিশু কারা?

শিশু কাদের বলে ?---

প্রশ্ণ করল একটি শিশু

এ্যাকাডেমীর হল্-এ৷

একটু যেন ভরকে গেলাম

প্রশ্ণ শুণে তার

বলবোটা কী, মুখে আমার

রা ফোটে না আর৷

বললো শিশু মিষ্টি হেসে,

একটু যেন তীব্র শ্লেষে---

‘পারলে নাতো?

তবুও তোমার বুকে শিশু-

সাহিত্যিকের ব্যাজ্

শিশু হ’ল তারাই জেনো,

যাদের মনে

নেই জিলিপির প্যাচ,

মা বলেছেন, মনটা যাদের

আনকোরা ওই

নতুন স্লেটের মতো

জটিলতার আঁকিবুকি,

ঘোর-প্য্যাঁচট্যাচ  নেইকো

অত-শত৷

জেনে রাখো দাদুরা সব

তাকেই শিশু বলে৷’

শিশুর সংজ্ঞা শিশুই দিল

এ্যাডেমীর হল-এ৷

শোরগোল তোলে রোল

লেখক
শিবরাম চক্রবর্তী

শোরগোল দেয় রোল

               হাসি আর ঠাট্টার

এসো ধেয়ে দ্যাখো চেয়ে

               খুশী ভরা মাঠটার৷

শোরগোল খায় দোল

               আনন্দের সাথে

থাকে সুখে কোন দুখে

               তারে নাহি গাঁথে৷

শোরগোল তোলে রোল

               হাটে বাটে ঘাটে

ছোট বড়ো করে জড়ো

               থাকে ঠাটে-বাটে৷

শোরগোল রাঁধে ঝোল

               রসিকের জন্যে,

ঠেসেঠুসে খেলে তারে

               পায় স্বাদ অন্য৷

শোরগোল খেয়ে ঘোল

               এ কী বলে শেষটায়

নেতা ধর ঝোলা ভর

               কুবুদ্ধির চেষ্টায়

শোরগোল দেয় কোল

               কারেও সে না ছাড়ে

যে যা পারে বাক্য ঝাড়ে

               শোরগোলের আয়ু বাড়ে৷৷

মহিমা

লেখক
বিশ্বপথিক

একের মাঝেই মিলল সন্কল দেহ

সেই তো বুঝি মোদের পরম গেহ,

একই দোলায় দুলছে সকল প্রাণ

মধুর মধুর সবই তাঁর আহ্বান

একের মাঝেই প্রবেশে সকল মন

পেয়ে রণিত ঝণিত তাঁর আকর্ষণ.....

একতানেতেই হচ্ছি আত্মহারা

ভাঙল সবই ক্ষুদ্র গণ্ডির কারা,

একাত্ম হয়ে আছি এ বিশ্বমাঝ

একের বলেই করছি যত কাজ,

অনুরাগ ডোরেই হচ্ছে সব উদাসী

এক কে তুষি সকল জীবন খুশী৷

বিশ্বদোলায় হলুম একাত্ম আজ

অভিন্ন হৃদয় গড়ে তুলে এ সমাজ,

এক কে নিয়েই মাতে যত না চিত

একের মহিমায় গড়ছে সমাজ ভিত৷

সবাই কাছে নহে আর কেহ দূর

দিব্য জীবনে জাগিল নোতুন ভোর৷

ঘনঘোর যত সরিয়া গিয়াছে বুঝি

ভাবেতে সবাই আছে একেতে মজি

একের ইচ্ছায় আছি ভবে তার হয়ে

হৃদয় জুড়িয়া ধরি সে মধুময়ে৷৷

পাঁচু ডায়াস

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

সে অনেকদিন আগেকার কথা৷ স্র্যামপুরের পাঁচু দাস অভাবে পড়ে কিরিস্তান হয়েছিল৷ সেবার বাঙলায় ধান ভাল হয়নি৷ বেশ অভাব–নটন চলছিল৷ পাঁচু দাস গীর্র্জেয়১ (১এটি একটি আইবেরিয়ান শব্দ) গিয়ে পাদরী২ (২এটিও একটি আইবেরিয়ান শব্দ) সাহেবের কাছে কিছু ভিক্ষে চেয়েছিল৷ পাদরী সাহেব তাকে আদর–যত্ন করে পেট ভরে খাইয়ে দিয়েছিলেন আর স্র্যামপুর শহরবাসীকে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে পাঁচুর জাত গেছে৷

গোড়ার দিকে পাঁচু বোঝাবার চেষ্টা করেছিল যে সে গীর্জেয় গিয়ে ভাত–ডাল খেয়েছিল ঠিকই কিন্তু জল খায়নি৷ তাই তার জাত যায়নি৷ কিন্তু পণ্ডিতেরা তা মানতে রাজী হলেন না৷ তাঁরা বললেন–ভাত–ডালের সঙ্গে তো জল থাকেই৷ সুতরাং পাঁচু জলও খেয়েছে, তার জাতও গেছে৷ আর তাই তাকে সমাজে রাখা যায় না৷

যথাকালে গীর্জেয় ঘটা করে পাঁচুকে নাম দেওয়া হল এরিক্ এডওয়ার্ড পাঁচু ডায়াস৷ সমাজ থেকে যখন তাকে তাড়িয়েই দেওয়া হয়েছে তখন পাঁচু আর কী করে৷ সে খিরিস্তান হল৷ ‘এরিক এডওয়ার্ড’ শব্দ দু’টো রয়ে গেল পোষাকী নাম হিসেবে৷ আটপৌরে নাম হিসেবে ‘পাঁচু ডায়াস’–ই চলতে থাকল৷ পাঁচুর সাধ্বী স্ত্রী আহ্লাদী দাসীও ক্রিস্তান হল৷ পাদরী সাহেব তাকে নূতন নাম দিলেন মার্গারেট আহ্লাদী ডায়াস৷ আহ্লাদীর নামটা পসন্দ হল বটে, কিন্তু উচ্চারণ করতে তার প্রাণান্তকর অবস্থা৷ তাই কেউ নাম শুধোলে সে আহ্লাদী দাসীই বলত৷

শ্রীরামপুরের নাম তখন ফ্রেডারিক টাউন৷ শহরটিতে কিছুদিনের জন্যে দিনেমারদের কুঠি ছিল৷ ডেনমার্কের রাজা ফ্রেডারিকের নামে স্থানটির নামকরণ হয়েছিল৷ এই শহরের মাধ্যমে কিছু কিছু ডেনিস শব্দ বাংলা ভাষায় ঢোকবার সুযোগ পেয়েছিল৷ ‘পাঁড়’, ‘ফোঁটা’ প্রভৃতি শব্দগুলো এইভাবেই বাংলায় এসেছে৷ শব্দ দু’টোর কোনোটাই বিশুদ্ধ ডেনিস নয়৷ তবে পশ্চিম ইয়ূরোপের কয়েকটি দেশেই এদের প্রচলন রয়েছে৷ আর দিনেমারদের মুখে মুখেই এগুলো বাঙলায় ছড়িয়েছিল৷

কিছুদিন আগে ডেনমার্কে গিয়ে একটা জিনিস লক্ষ্য করেছিলুম যে তাঁরা তাঁদের অনেক পুরোনো শব্দ ত্যাগ করে গত ২০০ বছরে প্রচুর পরিমাণে ইংরেজী শব্দ গ্রহণ করেছেন৷ আমি আর তাঁদের মুখে ‘পাঁড়’ ও ‘ফোঁটা’ শব্দ শুণতে পাইনি৷ হয়তো বা গ্রামাঞ্চলে এখনও কিছু কিছু চলে৷ ‘ভ্রাতৃদ্বিতীয়া’–কে বাঙলায় যে ‘ভাই–ফোঁটা’ বলে সেই ‘ভাই–ফোঁটা’ শব্দটিও খুব বেশী দিনের নয়৷ কারণ ইয়ূরোপীয়েরা এদেশে আসবার আগে ‘ফোটা’৩ (৩‘ফোঁটা’–র খাঁটি দেশজ বাংলা হচ্ছে ‘টোপা’ (‘টোপা কুল’ স্মর্তব্য)৷ ওড়িষ্যায় আজও এই ‘টোপা’ শব্দটি চলছে৷ গ্রাম–বাঙলায় কিছু কিছু চলে৷ শিশিরবিন্দুকে এখনও ওড়িশায় বলা হয় ‘কাকর–টোপা’৷) শব্দটি নিশ্চয় ছিল না৷ পাঁড় মাতাল (পাকা মাতাল), পাঁড় পেয়ারা৪ (পেয়ারা’ শব্দটি এসেছে আইবেরিয়ান ‘পিয়ারো’ শব্দ থেকে৷ এর কোনো সাবেকী সংস্কৃত প্রতিশব্দ নেই৷ ‘পেয়ারা’ থেকে গৃহীত সংস্কৃত হয়েছে ‘পেরুকম্ বীজ–পুরকম বা’৷) (পাকা পেয়ারা) প্রভৃতি শব্দগুলিও নিশ্চয় ছিল না৷ এখনও বাঙলার নিকটবর্ত্তী রাজ্যগুলিতে এই শব্দগুলি ঢোকেনি৷ ভ্রাতৃ–দ্বিতীয়াকে উত্তর ভারতে ‘ভাই–ফোঁটা’ না বলে বলা হয় ‘ভাই–দুজ’৷

ফ্রেডারিক টাউনের নাম বদলে তার সাবেকী নাম স্র্যামপুর (শ্রীরামপুর) ফিরে এল ইংরেজদের দখলে আসার পর৷ তবে লোকের মুখে মুখে ফ্রেডারিক টাউন নামটা চলেছিল তার পরেও আরো কিছুকাল ধরে৷

এই স্র্যামপুরের পাঁড় মাতাল ছিল দুলাল মুখুজ্জে* (*‘মুখার্জী,’ ‘ব্যানার্জী’, ‘চ্যাটার্জী’ শব্দগুলি ছিল পাদরী সাহেবদের তৈরী৷ হয় তাঁরা ‘মুখুজ্জে’, ‘বাঁড়ুজ্জে’, ‘চাটুজ্জে’ উচ্চারণগুলি করতে পারতেন না অথবা খ্রিস্তান হওয়ার প্রমাণ স্বরূপ ওই পদবীগুলিকে তাঁরা কিঞ্চিৎ বিকৃত করে দিয়েছিলেন৷ গাঙ্গুলী ও ঘোষালেরা এই বিকৃতির হাত থেকে বেঁচে গেছলেন কারণ সংখ্যায় তাঁরা খুব কম ছিলেন৷)৷ তার তখন তিন কাল গিয়ে এক কালে ঠেকেছে৷ তবু বয়সের তুলনায় তার জ্ঞানগম্যি–হঁুশ–আক্ক্ কিছুই হয়নি৷ একদিন সে মদ খেয়ে নালীতে পড়ে রয়েছে৷ এমন সময় সেখানকার পাদরী সাহেব তাকে সেই অবস্থায় দেখতে পেয়ে তুলে গীর্জেয় নিয়ে গেলেন৷ তারপর তাকে পেট ভরে পাঁউরুটি–চপ–কাটলে খাইয়ে দিলেন৷ দুলাল মুখুজ্জে তো এটাই চাইছিল৷ কিন্তু ফ্যাসাদ বাধালেন পাদরী সাহেব নিজেই৷ তিনি ঢোল সহরৎ জানিয়ে দিলেন দুলাল মুখুজ্জে নিষিদ্ধ খাদ্য খেয়েছে ও আরো খাবার জন্যে বায়না ধরেছে৷ পণ্ডিতদের সভা বসল৷ সভায় সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাব গৃহীত হল যে এহেন যবন ভাবাপন্ন দুলাল মুখুজ্জেকে আর সমাজে রাখা যায় না৷

দুলাল সমাজচ্যুত হল৷

যথাকালে যথাবিহিত পদ্ধতিতে দুলালের নূতন নাম হল এডমন্ড দুলাল মুখার্জ্জী৷ দুলালের শ্বশুর কিন্তু বেঁকে বসলেন৷ তিনি তাঁর মেয়েকে কৃশ্চান জামাইয়ের সঙ্গে ঘর করতে দিতে নারাজ৷ এডমন্ড দুলাল বউকে আনতে গেলে শ্বশুরমশায় তাকে নাদনা–পেটা করে তাড়িয়ে দিলেন৷ একঘর ছেলেমেয়ে নিয়ে দুলালের বউ বাপের বাড়ীতেই থেকে গেল৷

পাদরী সাহেবের হল এখন গোদের ওপর বিষফোঁড়া৷ দুলালের জন্যে একটি বউ খঁুজতে তিনি হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন৷ দুলাল প্রকাশ্যে বলে বেড়াচ্ছে, সে যখন মাদার মেইরীর (এই থেকে বাঙলায় ‘মাইরী’ শব্দটি এসেছে৷) শরণে এসেছে, তখন তার দৌলতেই তার একটা বউও জুটে যাবে৷

এদিকে এরিক এডয়ার্ড পাঁচু ডায়াসের ধর্মপত্নী আহ্লাদী দাসী দু’বেলা পাঁচুর সঙ্গে ঝগড়া করে চলেছে৷ বলছে–মেয়ে সোমত্ত হয়েছে, বিয়ে দেবে না গা? তুমি কেমন মানুষ এইভাবে যদি হাত গুটিয়ে বসে থাকো তাহলে আমি মেয়েকে নিয়ে ঘরকে চলে যাব৷ সেখানে গয়না বেচে পুরোনো নিয়মে মেয়ের বিয়ে দোব৷

পাঁচুও মহা ফ্যাসাদে পড়ল৷ আহ্লাদী বললে, মেয়ে এখন ডাগর হয়েছে৷ আর কি ওকে ঘরে রাখা যায় পাঁচ পেরিয়ে এবার ছ’য়ে পড়েছে৷ লোকে যে গালে চূণকালি দেবে আমার গলায় যে ইলীশ মাছের কাঁটা বিঁধে রয়েছে৷

পাঁচু পাদরী সাহেবের দ্বারস্থ হল৷ পাদরী সাহেব হাতে স্বর্গ পেলেন৷ তিনি তো এটাই চাইছিলেন৷ তিনি বললেন–পাট্রো টো হাটেই রহিয়াছে৷ এডমন্ড ডুলাল খুব ভালো পাট্রো আছে৷

পাঁজিপুঁথি দেখে শুভদিনে শুভক্ষণে শাঁখ বাজিয়ে উলুধ্বনি  দিয়ে সিঁথেয়৬ (৬শব্দটি ‘সীমন্ত’ থেকে এসেছে৷ যথাবিধি বিচারে শব্দটি হওয়া উচিত ‘সীমান্ত’৷ কিন্তু ভুল শব্দ ‘সীমন্ত’ আজও অক্ষত রয়েছে৷ মহিলাদের আজও ‘সীমন্তিনী বলা হয়৷) সিঁদুর ঢেলে পাঁচুর মেয়ের সঙ্গে এডমন্ড দুলাল মুখার্জীর বিয়ে হয়ে গেল৷ সাত পাক ঘোরা, এয়োদের নিয়ম–কানুন, স্ত্রী–আচার, দেশাচার সব কিছুই যথাবিধি হল৷ কেবল পুরুত মশায়ের বদলে বসলেন পাদরী সাহেব৷

বিয়ের ঝক্কি–ঝামেলা শেষ হয়ে যাবার পরে পাঁচু আহ্লাদীকে ডেকে বললে–দেখলি আহ্লাদী, তুই তো উল্টোপাল্টা কথা বলছিলি৷ আজ তুইই ভেবে দেখ, ভাগ্যিস খ্রিশ্চান হয়েছিলি, তাই তো অমন টুকটুকে বামুন জামাই পেলি৷ আগেকার সমাজে থাকলে এমনটি কি ভাবতে  পারতিস মানছি, জামাই একটু–আধটু পান করে৷ তা অমন পান তো আমাদের পাদরী সাহেবও করে৷ আর পাড়ার ভট্চাজ্ মশায় তো কালী পুজোর রাত্রে কারণবারির নামে বোতলের পর বোতল রঙ টেনে যায়৷ আর যদি কেউ বলে জামাইয়ের গাল তোক্ষড়া তাহলেও দেখ ও তো আর এমন কিছু বুড়ো হাক্ষড়া ঘাটের মড়া নয়৷ তাছাড়া গাল একটু তোবড়া হলেও একেবারে টোল খাওয়া নয়৷ আর পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সের সঙ্গে পাঁচ বছর বয়সের কনের বিয়ে এমন কিছু বেমানান নয়৷ কুলীন বামুনের ঘরে তো পাঁচ বছরের মেয়ের সঙ্গে নব্বই বছর বয়সের ঘাটের মড়ারও অন্তর্জলির সময় মালাবদল হয়ে যায়৷ বিয়ের পাঁচ মিনিট পরেই কনে হয়তো বিধবা হয়৷ তাতে আর হয়েছে কি....আইবুড়ো নাম তো খণ্ডানো গেল......কৌলীন্য তো বাঁচল.....গাঞি হারিয়ে চক্কোত্তি তো আর হতে হল না৷ তা যাই হোক্, জামাইয়ের জন্যে এখন ভাল করে ক্রিস্মাস কেক তৈরী কর৷

আহ্লাদী জিজ্ঞেস করলে–সে আবার কী জিনিস গা?

এরিক এডওয়ার্ড পাঁচু ডায়াস বললে–আরে গুড়পিঠে....গুড়পিঠে....গুড়পিঠে....জানিস না? এই পিঠেকেই সাহেবরা কেক বলে৷

মার্গারেট আহ্লাদী দাসী তখন আহ্লাদে আটখানা৷ গুড়পিঠে তৈরী করতে সে ভালই জানে৷

সাত্ত্বিক আহার, নেই তুলনা তার

লেখক
শিবরাম চক্রবর্তী


সাত্ত্বিক আহার দেহ মন আত্মার

    শ্রীবৃদ্ধি ঘটায়

তাই সে সদাই গুণীজনে

    উচ্চ আসন পায়৷

সাত্ত্বিক আহার দেখি তাহার

    দেহে পুষ্টি ভরা

অন্যের সাথে লড়ে জিতে

    হয় সে আত্মহারা৷

সাত্ত্বিক আহার নির্বিকার

    ভাবে খাওয়া যায়

স্বাদে-গন্ধে মহানন্দে

    আপন ছন্দে ধায়৷

সাত্ত্বিক আহার করবে সবার

    রোগমুক্ত শরীর

এই আহারই উপযুক্ত তাই

    সমস্ত রোগীর৷

সাত্ত্বিক আহার বয়সের ভার

    কমাতে জুড়ি নাই

দীর্ঘ জীবন সজীব মন

    পাবেরে সবাই৷