প্রভাতী

মন জমিনের আবাদ কর

লেখক
রামদাস বিশ্বাস

পৃথিবীতে আমরা মানুষ যারা,

মানুষের রূপ নয় মন রচি’ তারা৷

মনের মাঝে আছে চৌদ্দটা তল

ভূর্ভূবাদী সাত ঊধর্বতল৷

তলাতলাদি সাত অধস্তল৷

অধস্তল হ’ল সাতটি নরক

উধর্বতল সাত পুষ্প কোরক৷

অন্য ভাষায় যাকে বলে স্বর্গ

কৃষ্ণের বাস উবাচ গর্গ৷

সেই মনকে সবে কর কর্ষণ

দেখতে হবে অমৃত বর্ষণ৷

অহঙ্কার রূপী ছাতা আছে মাথাতে

তাকে ত্যাগ কর প্রেমের আঁতাতে৷

দেখবে স্বর্গ হয়েছে ধরা

স’রে গেছে হৃদয়ের সকল খরা৷

ফল পায় সে তেমন

লেখক
শিবরাম চক্রবর্ত্তী

অসতেরা মিথ্যাচারে

               সত্যবাদী যাঁরা

ছলনায় কাবু করে

               শেষে পড়ে ধরা৷

খল লোক সোজা নয়

               বাঁকা পথ ধরে৷

চলতেই শেষটায়

               যায় জলে পড়ে৷

পাপাচারী পাপ কাজে

               হাবুডুবু খেয়ে

সমাজের হয়ে বাজে

               জেল খাটে যেয়ে৷

অফিসের বড় বাবু     যদি ঘুষ খায়

শেষ কালে হয় কাবু    চাকরীটা যায়৷

প্রশাসক ধায় যদি      নিজ সুখ তরে,

শেষ কালে তাঁর গদি    জোরে ভেঙে পড়ে৷

যে দেশেতে এই সব যত বেশী হবে

চারিদিকে উঠে রব নোতুনেতে ধাবে৷

ঈশ্বরের ইচ্ছায় সব কিছু হয়

লেখক
বিভাংশু মাইতি

ঈশ্বরের ইচ্ছায় সব কিছু হয়

               ফুল ফোটে পাখী গায়,

                              রাত ভোর হয়৷

               শিশু কাঁদে রবি হাসে

                              মধু বায়ু বয়

ঈশ্বরের ইচ্ছায় সব কিছু হয়৷

               *    *    *

প্রভু তোমায় রাখবো ধরে মনে

খেলা–ধূলা পড়াশুনায়

সব কাজে সব–খানে

ঈশ্বর তোমায় রাখবো ধরে মনে৷

সকাল বেলায় ঘুম ভাঙলে

ধরবো তোমায় মনে

রাতের বেলায় ঘুমিয়ে যাব

ওই রাঙা চরণে

ভুলবো না কখনো তোমায়

রাতে কিংবা দিনে

প্রভু তোমায় রাখবো ধরে মনে৷

যার কর্ম যেমন

পল গুণে যায় আশায় আশায়

লেখক
আচার্য দীপাঞ্জনানন্দ অবধূত

মধ্যরাত্রি, ঘন অরণ্য, অন্ধকারের বুক চিরে যন্ত্রচালিত চার চাকা বিশিষ্ট ছোট ঘর দূরন্ত গতিতে এগিয়ে চলেছে সমুখের পানে৷ যে দুটি বৈদ্যুতিক বাতি লাগানো সমুখে, তারআলো জোরালো নয়৷ তাই সমুখের বা পাশের দর্শকদের আবছা আবছা দেখাচ্ছে৷ শুধু কালো পীচের রাস্তাটা সামনের খানিকটা দেখা যাচ্ছে৷ পাকা ড্রাইভার না হলে এই আঁকাবাঁকা রাস্তায় ওই ক্ষীণ আলোতে এত দ্রুত বাসকে চালিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব৷ মোট আমরা ৩০ জন যাত্রী৷ একবার ড্রাইভার ভাই জোরে চেঁচিয়ে বলল ওই চেকপোষ্টে পাহারা রত সৈনিকদেরকে৷ সবাই ঘুমিয়ে এপাশ-ওপাশ হচ্ছে, আমার যে কেন ঘুম নেই চোখে তা অজানা৷ সত্যি কি সুন্দর এই আলো আধারের আবছা আবছা জগৎ! ঘন বন চারপাশে৷ ছোট বড় বিভিন্ন ধরণের গাছ, তা কিছুটা বুঝতে পারছি ওই ক্ষীণ আলোতে৷ এই আবছা আলোতে কালোতে বেশ ভাল লাগছিল৷ শহরে দেখি পাটিগণিত ঠাসা আধুকি জঙ্গলের পশু৷ যারা বিবর্তনের পথ কিছুটা অতিক্রম করেছে বলে নিজেদের নাম দিল মানুষ৷ তবে মানুষ নয় এরা হচ্ছে বেহুঁশ৷

যা বলছিলুম৷ এই আলো আঁধারের খেলা দেখতে দেখতে অনেক সময় পেরিয়ে গেল হঠাৎ আবছা আলোতে যে কালো ভাবটা তা সরে যেতেই দেখলাম ঘন কালো নীল ছায়া৷ এমন ঘন কালো নীল ছায়া দেখতে পেয়ে বুকের ভেতরটা ধরফর করে উঠল৷ সেই ঘন কালো নীল ছায়া বলল---ভয় পেয়েছেন? আমি কিছু বলার আগেই আবার বলল---অনেক দিন ধরে আপনাকে খঁুজছি কিন্তু পাইনি৷ ভাগ্য ভাল আজ পেয়েছি৷ ইতস্ততঃ হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম---আমায় খোঁজ করছেন? আ-মা-য় মানে? আপনি কে? সেই ঘন কালো নীল ছায়া বলল---গলার স্বরে আমায় চিনতে পারছেন না? আমি একটু ঘাবড়ে গিয়ে বললাম---না, মানে, ঠিক বুঝতে পারছি না যে৷ এবার সেই ঘন কালো নীল ছায়া কাতর স্বরে বলল---আমায় চিনতে পারছো না! হায় বিধাতা, সত্যি তোমার কী আশ্চর্য আবিষ্কার এই ধরা৷ দেখুন তবে আমায় আর একবার৷

তার সেই আগের পচা-গলা, হাড়-মাংসের শরীরখানা আবছা আবছা চোখের সামনে ভেসে উঠল৷ মুহূর্ত্তে চিনতে পেরে আমি চেঁচিয়ে বললাম---তুমি সেই গোপাল যার মৃত্যু হয়েছিল আজ থেকে পনেরো বছর আগে৷

সে বলল---হ্যাঁ স্যার, আমি সেই আপনার প্রিয় ছাত্র গোপাল৷

সব ঘটনা মনে পড়ে গেল৷ আজ থেকে পনেরো বছর আগে গোপাল সুকলে ভর্তি হয়েছিল সপ্তম শ্রেণীতে৷ গোপাল পড়াশুনায়, খেলাধূলায় সব সময় প্রথম স্থানে থাকত৷ কিন্তু নবম শ্রেণীতে ওঠার আগে ও জলে পড়ে মারা যায়৷

গোপাল বলল---স্যার, আপনার শেখানো সব কথা আমার মনে আছে৷ সবাইকে ভুলতে পেরেছি, কিন্তু আপনাকে! তা অসম্ভব৷ এই দেখুন৷ আপনি আমাকে দীক্ষা দিয়েছিলেন--- সেই মন্ত্র আমার আজও মনে আছে৷ জীবন সংগ্রামে কীভাবে সফলতা আসবে তার সম্পূর্ণ গাইডলাইন যা আমি পেয়েছিলাম জীবনবেদ ও চর্যাচর্য বইগুলি পড়ে৷ এই বইগুলি পড়ে ৷ আপনি আমায় এই বইগুলি পড়তে দিয়েছিলেন৷

আমি বললাম---এই মন্ত্র তুমি অভ্যাস করছ? হঠাৎ সে কেঁদে উঠল৷

তাকে আমি সান্তনা দিয়ে বললাম---কেঁদনা গোপাল, ঈশ্বর দেখছেন তিনি দয়ালু, তিনি কৃপা করবেন৷

গোপাল বলল---স্যার আজ পনেরো বছর পাগলের মত ছুটে বেড়াচ্ছি---পথে-ঘাটে, পাহাড়ে-জঙ্গলে, শশ্মানে, ঘরে, নদী, ঝর্ণাতে আকাশে-বাতাসে, গ্রহে-নক্ষত্রে মুক্তির আশায়৷ কেউ না, কেউই পারল না শোনাতে আমায় আমার মোক্ষের উপায়৷ আমি এ যন্ত্রণা আর সইতে পারছি না৷ ওগো স্যার, তুমি বল আমায় আমার মোক্ষ মুক্তির উপায়৷ এই ত্রিতাপ জ্বালা থেকে মুক্তি চাই৷

নিজেকে সামলে তাকে বললাম---এখন ডি.ষম.এস.-এর সময় যাও পুরুলিয়াতে৷ সেখানে গিয়ে হরিপরিমণ্ডল গোষ্ঠীর দলে যোগ দিয়ে কীর্ত্তন কর খুব করে৷

হঠাৎ কাণে বার বার ভেসে আসছে---স্যার উঠুন, স্যার নামতে হবে৷ চোখ খুলে চেয়ে দেখি বাসে বসে আছি৷ ওদিকে ভোরের মিষ্টি চিক্চিকে রোদ, চারপাশের বন জঙ্গলকে আলোকিত করেছে৷ শোনাযাচ্ছে পাখীদের মিষ্টি কলরব৷ আবার আমার পাশের সেই ভদ্রলোক বলল---স্যার চলুন, সবাই বাস থেকে নেমে গেছে৷ ভোর রাতে বেশ ঘুমিয়েছেন৷ আমি বললুম---হ্যাঁ, হ্যাঁ, এই যে যাচ্ছি যাচ্ছি৷

প্রিয় নরহরি স্মরণে

লেখক
প্রভাত খাঁ

মানব সেবার ব্রতে রত প্রিয় নরহরি

হঠাৎ পাড়ি দিলে ইহলোক ছাড়ি

বাবার আদর্শ তুমি নিষ্ঠা সহকারে

পালন করে গেলে এ মর সংসারে৷

তুমি জানায়ে গেলে---আদর্শের তরে বাঁচো

আর আদর্শের তরে মর৷

ধন্য, ধন্য, ধন্য তুমি মার্গের সমাজে

অভিনব দৃষ্টান্ত রেখে গেলে আমাদের মাঝে৷

সবাই স্মরিবে তোমায় এই স্মরণীয় দিনে

ভক্তি আপ্লুতচিতে, অমর হয়ে যে

রবে ভক্ত ভগবানে৷

ভাইফোঁটা

লেখক
জয়তী দেবনাথ (অষ্টম শ্রেণী)

দাদার কপালে দিলাম ফোঁটা

যম-দুয়ারে পড়ল কাঁটা৷ 

সারা জীবন থাকব সাথে

স্নেহ-প্রীতির বন্ধনেতে৷

দিনে রাতে থাকব মেতে

হাসি-খুশী আনন্দেতে৷

খুলতে পারে স্নেহের ডোর

নেইতো কিছুর এমন জোর৷

দুষ্টু দাদা গুড্ডু আমার

মিষ্টি বোনটি আমি যে তার৷

দুষ্টু-মিষ্টি খুনসুটি

যত পারি নেব লুটি৷

দীপাবলীর ইতিবৃত্ত

লেখক
রামদাস বিশ্বাস

কার্ত্তিকী অমাবস্যা ঘোরতর

তমিস্রাময় রাত্রি

দ্বীপ জ্বেলে যাই আমরা সবাই

যারা আলোকের পথযাত্রী৷

শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন না সেইদিন

রাজধানী দ্বারকা নগরীতে

শ্রীকৃষ্ণপত্নী সত্যভামা দেবী

বধিলেন তাঁকে সেই তিথিতে৷

পাপিষ্ঠ নরকাসুরকে বধি রাণী

আলোকে সাজালেন পুরী

সেই থেকে এল ধরাধামে দীপাবলী

সত্যভামার হাত ধরি৷

সহজ কাজ

লেখক
বিভাংশু মাইতি

সমাজে মানুষ মারা

আজ যে হ’ল জল ভাত

বিবেক আর দেয় না বাধা

কাঁপে নাকো কারো হাত৷

নেতা মরে গুলি খেয়ে

কেউ বা মরে বাঁচতে গিয়ে

প্রেমিক-প্রেমিকা প্রাণ হারায়

একে অন্যের গলা দাবিয়ে৷

পার্কিংয়ের জায়গা নিয়ে

যোগানদারের বখরা নিয়ে

সম্পত্তির প্রলোভনে

নিমেশে আমরা লাশ ফেলি

মুখেতে মিথ্যা বাণী

সংহতির প্রেমের বুলি৷

হৃদয় কি আজ হারিয়েগেল

সভ্যতারই উগ্র সাজে

হিংসা আজ ছড়িয়ে গেল

দাবানলে সবার মাঝে৷

আসবে সুদিন আসবে

বিশ্বপ্রেমের রঙিন গোলাপ

ফুটবে আবার ফুটবে৷

ভালোবাসার সুরের নদী

বইবে আবার বইবে৷

পেত্নীর লড়াই

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

‘দংশ্’‘অনট’–এর দু’টি রূপ,–‘দংশন’, ‘দশন’৷ ‘দংশন’ মানে কামড়ানো৷ ‘দশন’ মানে দাঁত কারণ দাঁতের সাহায্যে মানুষ কামড়ায়৷ তোমরা দাঁত বলতে দন্ত, দত, দশন প্রত্যেকটি শব্দই ব্যবহার করতে পারো৷ যে মানুষটির দাঁত কুন্দফুলের মত শুভ্র সে কুন্দদন্ত/কুন্দদশন/কুন্দদত এই তিন শব্দেই পরিচিত হতে পারে৷ স্ত্রীলিঙ্গে কুন্দদন্তী/কুন্দদশনা চলতে পারে৷ তবে ‘কুন্দদতী’ ব্যবহারটাই বেশী প্রচলিত৷

আমরা ছোটক্ষেলায় পেত্নীর গল্পে শুনেছিলুম দুই পেত্নীতে সব সময় দারুণ ঝগড়া করত৷ একে অন্যের ২৪ ঘণ্ঢা খোয়ার করত৷ সম্পর্কে তারা ছিল ননদ–ভাজ৷ একজনের নাম ছিল মিসেস কুলোকর্ণী–তার ছিল কুলোর মত কাণ, অন্য জনের নাম ছিল মিসেস মূলদন্তী (বৈয়াকরণিক বিচারে ‘মূলদতী’ হলে সেটাই বেশী শোভন হত)–তার মূলোর মত দাঁত৷ একজনের হাতে থাকত কাঁকড়া বিছের (বিচ্ছু–Scorpion) চামড়ার ব্যানিটি ব্যাগ৷ অন্যের হাতে থাকত ডেঞো পিঁপড়ের হাড়ের ব্যানিটি ব্যাগ৷ দু’জনেই হাতে ব্যানিটি ব্যাগ নিয়ে যখন আকাশ পানে চেয়ে ঝগড়া করত তখন কী খোলতাইটাই যে হত তা ভাষায় ব্যক্ত করা যায় না৷

ফুরফুরার জনৈক ফটোগ্রাফার আমাকে বলেছিল–সে ওই দৃশ্য টেকনিকালার মুবি ক্যামেরায় তুলবার জন্যে কড় গুণে গুণে ১১১১ বার চেষ্টা করেছিল৷ কিন্তু প্রতিবারই সে বড়তাজপুরে গিয়ে বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে এসেছিল৷ কারণ প্রতিবারই দু’জন পেত্নীই মুড়ো ঝাঁটা নিয়ে তার দিকে তেড়ে এসেছিল৷ কুলোকর্ণীর*  স্বামী শ্রীযুক্ত বাবু পিণ্ডিগেলা ভূত (সংক্ষেপে পি. জি. বি.) ঝগড়ার চ্যাঁ ভ্যাঁ এড়াবার জন্যে অধিকাংশ সময় মাঠে–ভাগাড়ে, বনে–ক্ষাদাড়ে, ঝোপে–বাঁশঝাড়ে–শ্যাওড়্ গাছে ঘুরে ক্ষেড়াত৷ অন্য ভূতেরা যখন তাকে শুধোত–হ্যাঁ গাঁ, তুঁমি সঁব সঁময় ক্ষাঁড়ীর বাঁইরে বাঁইরে কেঁন থাঁক গাঁ? সে বলত–আঁমাঁর হাঁর্টের ব্যাঁমোঁ আঁছে কিঁ নাঁ৷ তাঁই ডাঁত্তঁণার বঁলেঁছেঁ খোঁলাঁ হাঁওয়াঁয় থাঁকতেঁ৷

ভাগাড়ীস্তান রাষ্ট্রের মহিলা কল্যাণ বিভাগের মন্ত্রিণী হবার জন্যে তারা ৫০০ বছর ধরে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এসেছে কিন্তু একবারও কেউ জিততে পারেনি–জিতেছে সাধারণ মানবীরা৷

তোমায় যায় না দেখা

লেখক
রামদাস বিশ্বাস

তোমায় যায় না দেখা সত্য এও যায় দেখা সেও মিথ্যা নয়৷

ভ্রমের বসে এই জগতে সত্যমিথ্যা দুই-ই হয়৷৷

তুমি নিরাকারে অনন্ত ধন, সাকারে এই ব্রহ্মান্ড

কেউ জানে না কেমন করে রচিলে জগত কান্ড৷

কেবল ভক্ত মনের শুদ্ধ চিত্তে তোমার সাথে হয় পরিচয়৷৷

দিনেরবেলায় যায় না দেখা আকাশভরা তারাদলে

রাতের বেলায় ফুটে ওঠে অসীমছোঁয়া আঁধার জলে

মনকে যেমন যায় না দেখা কল্পনাতে হয় সে উদয়৷৷

আরশিতে জমিলে ধুলো আপনাকে আর যায় না দেখা

আত্মাচিত্তে জমলে কালি মানুষ তখন হয় যে একা

ময়লা ধুয়ে অমল হলে অরূপ রাজে বিশ্বময়৷৷