প্রভাতী

‘‘চক্রং ভ্রমতি মস্তকে’’

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

পূর্ব প্রকাশিতের পর–

আরও কিছুদূর এগিয়ে চলতে চলতে সে সামনে দেখলে আর একটা পাহাড়......তাঁবার*১

কিপ্ঢেকঞ্জুস দেখলে–ছ’পকেট ভরতি রূপোর টাকা নিলে তাতেও তিনটে অসুবিধে৷ প্রথমতঃ অত রূপোর টাকারই বা দাম কত দ্বিতীয়তঃ রূপোর টাকার ভারে সে দ্রুত চলতে পারবে না৷ তৃতীয়তঃ তাতে ঝমঝম শব্দ হবে তাতে চোর–ডাকাতের বুঝতে সুবিধে হবে যে সে অনেক টাকার মালিক৷

সেকালে এক টাকার নোট ছিল না৷ ইংরেজ যুগে কড়ির ব্যবহারও রহিত হয়ে যায়৷ ব্যবহার বেশী ছিল তাম্র মুদ্রা, ব্রোঞ্জ মুদ্রা, নিকেল মুদ্রা ও রৌপ্য মুদ্রার (খাদ–মেশানো সোনার মুদ্রার –যাকে ইংরেজীতে সব্রেন, বাঙলায় গিনি বলা হত যার থেকে গিনি সোণা–ব্যবহারও অল্পস্বল্প ছিল)৷ বিক্রেতারা তাই দিনে যখনই দোকান থেকে বাড়ীতে যেতেন বিক্রয়লব্ধ অর্থ পুঁটলিতে মজবুত ভাবে বেঁধে পুঁটলিকে ছোট্ট করে এমনভাবে নিয়ে যেতেন যাতে মুদ্রার কোনো আওয়াজ না হয়৷ একটি ছোটখাট ক্ষেনের পুঁটলিতে থেকে যেত অনেকগুলি টাকা৷

ক্ষেনের পুঁটলির কথা বলতে গিয়ে সেকালের একটা গল্পের কথা মনে পড়ল৷ একবার একজন গুরু অর্থসংগ্রহের জন্যে শিষ্যবাড়ী পরিক্রমায় বেরিয়েছিলেন৷ তখন শীতকাল.......সদ্য ধান উঠেছে৷ অর্থসংগ্রহের পক্ষে সেটা ছিল খুব উপযুক্ত সময়৷ শিষ্যবাড়ীতে আসায় শিষ্য তাঁকে খুবই আদরযত্ন করলে৷ তখন তার হাতে দু’পয়সা রয়েছে৷ রাত্রে সে গুরুকে বললে–ঠাকুরমশায়, এখন শীতকাল৷ রাত্রে আপনি কম্বল না লেপ গায়ে দেবেন? আপনার জন্যে দুইই তৈরী আছে৷ গুরু ভাবলেন–এই সময়ে একটু মহাপুরুষ সাজা যাক

সেই যে একবার জঙ্গলের ধারে এক ফকিরের আস্তানার পাশে ঝড়ে অনেকগুলো কাক মরে পড়েছিল, লোকে বললে–‘‘ফকির সাহেব, জঙ্গলের এত কাক ঝড়ে মরল কেন?’’ ফকির বললে–‘‘কাকগুলো আমাকে বড্ড জ্বালাতন করত৷ কাল সন্ধেক্ষেলা ওদের খুব শাসিয়েছিলুম৷ বলেছিলুম–তোরা যদি খুব ভদ্রভাবে থাকতে না পারিস তাহলে তোদের সবাইকে শ্যাষ করে দোব৷ একরাত কাটল না গো, এমন ঝড় এল যে সবাই মরে গেল৷ আমার আদেশ পালন করে ওরা যদি কা কা রব ছেড়ে কুহু কুহু রব শিখে নিত তাহলে ওদের এ দশা হত না৷’’

গুরুমশায় দেখলেন–কাক মরল ঝড়ে, ক্যারামতী পেল ফকির৷ তাই না বাংলায় প্রবাদ আছে–ঝড়ে কাক মরে, ফকিরের ক্যারামতী বাড়ে৷ গুরুমশায় ভাবলেন–আমিও এই শিষ্যবাড়ীতে এসে একবার ক্যারামতী দেখিয়ে দিই৷

সে শিষ্যকে বললে–‘‘দেখ, আমরা সব মহাপুরুষ৷ আমাদের শীত–গ্রীষ্ম লাগে না৷ ওই লেপ–কম্বল কোনো কিছুরই দরকার নেই৷’’

গুরু খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়লেন৷ শিষ্য মানুষটি খুবই ভাল৷ সে গুরুর দোরগোড়ায় কম্বল–মুড়ি দিয়ে বসে রইল৷ যদি গুরুর শীত করে তাহলে সঙ্গে সঙ্গে লেপ বা কম্বল দিয়ে দেবে৷ সে দরজার ফাঁক দিয়ে দেখলে–প্রথম প্রহরে গুরু হাত–পা লম্বা করে সটান হয়ে শুয়ে রয়েছে৷ সে আপন মনে বললে–‘‘প্রথম প্রহরে প্রভু ঢেঁকি অবতার’’৷ দ্বিতীয় প্রহরে গুরুর একটু শীত করছে ৷ শীতে তিনি হাঁটুকে একটু মুড়ে ফেললেন৷ শিষ্য বাইরে থেকে গেয়ে উঠল–‘‘দ্বিতীয় প্রহরে প্রভু ধনুকে টংকার’’৷ তৃতীয় প্রহরে শীত আরও বেড়েছে৷ গুরুর শরীর শীতে আরও কুঁকড়ে গেল৷ শিষ্য গেয়ে উঠল–‘‘তৃতীয় প্রহরে প্রভু কুকুরকুণ্ডলী’’৷ চতুর্থ প্রহরে শীত আরও বেড়ে যাওয়ায় গুরুর শরীরটা একেবারে গোল পাকিয়ে গেল৷ তাই দেখে শিষ্য গেয়ে উঠল– ‘‘চতুর্থ প্রহরে প্রভু বেনের পুঁটুলি’’৷ তা সে যাই হোক্, কিপ্ঢেকঞ্জুস বেনের পুঁটলি নিয়ে ঘোরাফেরা করতে চায় না৷

সে আরও এগিয়ে চলল৷ কিপ্ঢেকঞ্জুস এগিয়ে চলল৷ দিনের পর দিন..........মাসের পর মাস৷ চলে গেছে কত বিনিদ্র রজনী.....কত অজস্র বৃষ্টিপাত৷ কিপ্ঢেকঞ্জুসের কোনো দিকেই ভ্রূক্ষেপ নেই৷ লক্ষ্য তার সম্পদ আহরণ.........মন তার বলে চলেছে–‘‘ম্যাঁয় ভুখা হুঁ......ম্যাঁয় ভুখা হুঁ ’’৷

হঠাৎ সে দেখলে ঝকঝকে সোণার*২ পাকা সোণার মুদ্রা–প্রাচীনকালে বলা হত ‘সীনক’৷

সোণার পাহাড় দেখে কিপ্ঢেকঞ্জুসের চোখ ঝলসে গেল–ওঃ আমার জন্ম–জন্মান্তরের সাধ পূর্ণ হল৷ আমি আজ সবচেয়ে ধনী কিন্তু এই ধনরত্ন কী করে নিয়ে যাব কোথায় রাখব ........এই ধনরত্ন আমি সুদে আসলে আরও বাড়াব..........এতদিন জলখাবারে খেতুম তেল–নুন মাখা মুড়ির সঙ্গে কাঁচা লঙ্কা৷ এবার থেকে কাঁচা লঙ্কা বাদ দিয়ে শুধু শুকনো মুড়ি খাব–খরচ কমাব......আয় বাড়াব৷ কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফ্যাসাদ ক্ষাধল কীভাবে এই ধনকে নিয়ে যাওয়া যায় তাই নিয়ে ৷ ছ’টা পকেটে তো এই সোণার পাহাড় আঁটবে না৷    (ক্রমশঃ)

বিপন্ন বাঙালী

লেখক
রবীন্দ্রনাথ সেন

একদিন জ্ব’লে উঠেছিল এই বাংলা

জ্ঞানে গরিমায় ত্যাগে তিতিক্ষায়

বিদ্যায় বুদ্ধিতে ধ্যানে ধারণায়

সাহসে শৌর্যে আত্মদানে৷

ভারতের একপ্রান্ত থেকে

আরেক প্রাম্তে ছুটেছিল তারা

ঐক্যের বন্ধন নিয়ে, বিপ্লবের বাণী নিয়ে

মুক্তির স্বপ্ণ নিয়ে, ঊষার আমন্ত্রণ নিয়ে৷

 

যেদিন দাবানলের মতো জ্বলে উঠল তারা

বিপ্লবের অগ্ণিশিখা ছড়িয়ে পড়ল

দেশ থেকে দেশান্তরে জার্র্মন জাপান হয়ে

উল্কার অনল শিখা এল দিল্লীর পথে,

আতঙ্কিত হলো সাম্রাজ্যবাদী শোষক

কেঁপে উঠল ভীরু কাপুরুষের দল

তলে তলে হ’ল গোপন শলা

বিড়াল হলো তপস্বী

স্বাধীনতা সঁপে দিল

ভেকদারী পিশাচের হাতে....

বাঙলা মায়ের গান

লেখক
রামদাস বিশ্বাস

বাংলাকে ভালবাসা হয় যদি অপরাধ

সেই অপরাধ আমি বার বার করবো৷

বাংলাকে ভালবাসব, আমি বাংলাকে ভালবাসব৷৷

জাগরণের দীপ জ্বেলে বাংলার ঘরে ঘরে আছে যত ভাইবোন বলব হাতে ধ’রে৷

বাংলা আমাদের মা তার কোলে বসে মোরা হাসব ৷৷

আমাদের ঘরে কোন দস্যু এলে

বাংলা মায়ের চোখ ভরে যে জলে৷

সে মায়ের চোখের জল মোছাতে

আবার করব সংগ্রাম অতি দুর্বার৷

তস্করে ক’রে পরাজিত

মায়ের মুখের হাসি অম্লান রাখব৷৷

নোতুন পৃথিবী

লেখক
প্রভাত খাঁ

জরাজীর্ণ এই ধরণী, বুকে

নোতুনের বার্তাবহ রূপে

যে তরু, সৃজিয়া গেলে

আশীর্বাদ পূর্ণ বারিদানে,

সে আজ সেবিছে বিশ্বে

ক্লান্তিহীন বটবৃক্ষ রূপে৷

আজিকার শুভদিনে

তাপসের দল আপ্লুত হৃদয়ে

তোমারে স্মরণ করে সেই বৃক্ষতলে৷

হে মহান, তোমার অভীষ্ট

যেন সিদ্ধ হয় ‘নোতুন পৃথিবী’ রূপায়ণে৷

আমার প্রার্থনা পিতঃ

সুভাশিস দানে জাগ্রত করিয়া

তোল সকলের প্রাণ৷

‘‘চক্রং ভ্রমতি মস্তকে’’

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

মনে পড়ে গেল একটা ইতিহাসপ্রসিদ্ধ আখ্যায়িকা৷ গ্রামের নাম কুড়িয়ে–খাওয়া৷ সেখানকার সুপ্রসিদ্ধ মানুষ ছিলেন শ্রীযুক্ত বাবু কিপ্ঢেকঞ্জুস কর৷ কিপ্ঢেকঞ্জুস বৈধ অবৈধ নানান ভাবে টাকা রোজগার করত৷ সে ভেবে দেখলে, হঠাৎ–বড়লোক হতে গেলে শিব ঠাকুরের কাছ থেকে ক্ষরদান নিতে হবে৷ অন্য দেবতাদের সন্তুষ্টির জন্যে কঠোর তপস্যার প্রয়োজন৷ কিন্তু শিব তো ভোলানাথ .....আশুতোষ৷ একটা আকন্দ ফুল আর কয়েকটা বেলপাতা দিলেই সন্তুষ্ট হয়ে যান৷ তাই তাঁকেই ডাকি৷

কিপ্ঢেকঞ্জুসের জানা ছিল শিবের দয়ার শরীর৷ দানব–রাক্ষসেরা শিবের কাছ থেকে ক্ষর দান পেত৷ কিপ্ঢেকঞ্জুস শিবের তপস্যায় বসে গেল৷ অল্প দিনের তপস্যায় শিব সন্তুষ্ট হয়ে তার সামনে এসে দাঁড়ালেন৷ বললেন–‘‘চোখ খুলে চা বেটা, আমি এসেছি৷’’

কিপ্ঢেকঞ্জুস বললে–‘‘এসেছো যখন ঠাকুর, আমার মনস্কামনা পূর্ণ করো৷’’

শিব বললেন–‘‘কী তোর মনস্কামনা? তুই আমাকে চাস, না আমার কাছ থেকে আর কিছু চাস?’’

তখন কিপ্ঢেকঞ্জুস বললে–‘‘তুমি তো ছাইমাখা ভিখিরি৷ তোমাকে নিয়ে আমার লাভ কী তুমি আমার বোঝা হয়ে দাঁড়াবে৷ তুমি বরং আমাকে বর দান করো যাতে দু’পয়সার মুখ দেখতে পাই৷’’

শিব বললেন–‘‘এই মাত্র বললি, আমি ছাইমাখা ভিখিরি৷ আবার আমার কাছ থেকে টাকা পয়সা চাইছিস কোন যুক্তিতে?’’

কিপ্ঢেকঞ্জুস বললে–‘‘তুমি যে ছাইমাখা ভিখিরি একথা তো  ঠিকই ৷ কিন্তু দুপুরবেলায় হবিষ্যি করার পর ধনৈশ্বর্যের দেবতা কুবের এসে তোমাকে ম্যাসাজ (হাত–পা টিপে দেওয়া) করে দিয়ে যায়৷ ম্যাসাজ করতে করতে কুবের যখন তোমাকে বলবে–‘ঠাকুর, এবার ডানপাশ ফিরে শোও, সেই ফাঁকতালে তুমি বলে দিও, কুবের কিপ্ঢেকঞ্জুসের দিকে মুখ তুলে চা৷ ওকে কিছু পাইয়ে দে৷’’

শিবঠাকুর বললেন–কুবের যদি আমার কথা না রাখে......

কিপ্ঢেকঞ্জুস বললে–‘‘ত্রিভুবনে কার ঘাড়ে ক’টা মাথা আছে যে তোমার কথা ঠেলতে পারে৷ কুবের তোমার কথা শুনবেই শুনবে৷’’

শিব বললেন–‘‘আমি কুবেরকে বলে দোব৷ আর কুবের যা বলবে তোকে জানাব৷’’

কিপ্ঢেকঞ্জুস বললে–‘‘ঠাকুর বেশ কিছুদিন ধরে তপস্যা করে আজ তোমার ইন্টারভিউ পেয়েছি৷ আবার দ্বিতীয়বার ইন্টারভিউ পেতে গেলে অনেকদিন তপস্যা করতে হবে৷ এদিকে আমাদের দোকানের কেনাবেচা লাটে উঠতে বসেছে৷ কুবেরের কী উত্তর হবে তা অনুমান করে নিয়ে তুমি আগাম বলে দাও আমাকে কী করতে হবে৷’’

শিব বললেন–‘‘আহাহা বেচারা বারবার কেনই বা আমার জন্যে তপস্যা করবে আহাহা বেচারা ......... মোহগ্রস্ত বেচারা’’

শিব কিপ্ঢেকঞ্জুসকে বললেন–‘‘ওই যে দিগন্তবিস্তৃত অরণ্যানী*১ তুই নাকের সোজা ওর ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলতে থাক৷ কথাটা আমি কুবেরকে জানাব৷ সে দরকারমত ব্যবস্থা করবে৷’’

কিপ্ঢেকঞ্জুস এগিয়ে চলল..........এগিয়ে চলল তার অশেষ গতিতে৷ গাছপালা সে দেখছে না...........গাছপালা নিয়ে গবেষণা করতে সে আসেনি৷ পশুপক্ষীর জীবন–চর্যার দিকেও সে তাকাচ্ছে না কারণ তাদের নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় তার নেই৷ সে কি শিবঠাকুরের কথা ভাবছে? না না না শিবঠাকুর তখন তার কাছে পর্দার আড়ালে সরে যাওয়া জিনিস৷ সেকি কুবেরের কথা ভাবছে?–না, তাও নয়৷ সে ভাবছে কুবেরের ধন–সম্পদের কথা৷

কিপ্ঢেকঞ্জুস এগিয়ে চলেছে৷ তার বাঘের ভয় নেই......সাপের ভয় নেই........জল থেকে উঠে–আসা কুমীরের ভয় নেই৷ ধনসম্পদের মোহে সে আচ্ছন্ন৷ মোহের চশমায় তার দৃষ্টি অস্পষ্ট হয়ে গেছে৷ কে কী বলবে, কে কী ভাববে, তা ভাবার অবসর তার নেই৷ সে চলেছে......সে চলেছে.........অর্থগৃধ্ণুতার চরমত্বের দিকে৷ হঠাৎ কী যেন একটা দেখে কিপ্ঢেকঞ্জুস থমকে দাঁড়াল৷ সে তার চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না.....সামনে কড়ির*২  পাহাড়..........ডাইনে কড়ির পর্বত........ বাঁয়ে কড়ির টিলা........পেছনে কড়ির ঢিবি৷ সে জয় ঘোষণা করলে কিন্তু কার জয়? শিবের জয় নয়......কুবেরের জয়  নয়......কড়ির জয় পরক্ষণেই সে ভাবলে–কড়ির আর দাম কতটুকু সঙ্গে তো তার রয়েছে ছটা পকেট–কোটের চারটে পকেট আর প্যান্টের দুটো পকেট, ছটা পকেট–ভরতি কড়ি নিলেও তার দাম এমন কিছু হবে না৷কিপ্ঢেকঞ্জুস কড়িকে খারিজ করে এগিয়ে চলল৷     (ক্রমশঃ)

 

*১    বৃহৎ অরণ্য এই অর্থে অরণ্যানী৷ বৃহৎ হিম অর্থাৎ অনেকদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হিম এই অর্থে হিমানী৷ কিন্তু বৃহৎ যবন এই অর্থে ‘যবনানী’ নয়, ‘যবনানী’ মানে যবনের লিপি বা লেখা৷ ‘অরণ্যানী’ শব্দ শুদ্ধ হলেও ‘বনানী’ শব্দ শুদ্ধ নয়৷

*২    কড়ির জন্যে সংস্কৃতে অনেকগুলি শব্দ থাকলেও কটিকা ও ক্কথিকা–এই দুটো শব্দই বেশী প্রচলিত৷ প্রাচীনকালে হাটেবাজারে লেনদেনে কড়িই বেশী চলত৷ তাম্রমূদ্রা অচল ছিল না৷ তবে বাজার–চালু তাম্রমুদ্রার সংখ্যা বা পরিমাণ ছিল কম৷ কড়ি তৈরীর জন্য টংকশালার (টাঁকশালার) দরকার পড়ে না৷ তাই লেনদেনে ছিল তারই অক্ষাধ ব্যবহার৷ খুব বেশী দামী জিনিসের লেনদেনে টংকক (টাকা) বা রৌপ্যকম্ (রূপেয়া) ব্যবহার করা হত৷ এই টংকক বা রৌপ্যকমের সঙ্গে সাধারণ মানুষের বিশেষ যোগাযোগ ছিল না৷ এমনকি সাধারণ মানুষ অনেক সময় কড়ির ব্যবহার না করে অদলবদল প্রথায় কাজ চালাত৷ এই ‘অদলবদল’ শব্দটি আমাদের ছোটবেলায় রাঢ়ে ব্যাপকভাবে ব্যবহূত হত৷ ছোটবেলাতে তাই দেখেছি এক কুনকে চালের বিনিময়ে শাক–মাছ–তরীতরকা নানান জিনিস কেনা চলত৷ বীরভূমের খয়রাসোল থানায় দেখেছি ছুতোর কাঠের পিলশুজ তৈরী করে হাটে বসে চালের বিনিময়ে তা বেচছে৷ আধুনিক যুগের বার্টার ব্যবসায় প্রথাও কতকটা এই ধরনের৷

তা যাই হোক রূপোর টাকার ব্যবহার খুবই অল্পই ছিল৷ মুদ্রা মানে সোনাই চলত৷ কিন্তু বাজারে সাধারণ লেনদেনে সোণা বা স্বর্ণমুদ্রার (সীনক) ব্যবহার ছিল না৷ সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে তাই কড়ি অচ্ছেদ্যভাবে জড়িত থাকত৷ আগেকার দিনে মেয়েরা যে লক্ষ্মীপুজো করতেন তাতে লক্ষ্মীর ঝাঁপিতে অবশ্যই কড়ি থাকত৷ আমাদের ছোটবেলায় কোলকাতায় দেখতুম বিয়েতে বরণের সময় বরকে বলা হত ঃ

‘‘কড়ি দিয়ে কিনলুম, দড়ি দিয়ে বাঁধলুম,

হাতে দিলুম মাকু একবার ভ্যা কর তো বাপু৷’’

জানি না কোনো কোনো বোকা বর সত্যিসত্যিই ভ্যা করত কিনা৷ এখনও আমরা ব্যবহারের ভাষায় টাকাকড়ি, পয়সাকড়ি, মাইনেকড়ি বলে থাকি, যদিও কড়ি বড় একটা চোখে দেখি না৷

যেসব মায়েদের মৃতবৎসা রোগ ছিল তারা সন্তান যাতে না মরে সেইজন্যে ভূমিষ্ঠ হক্ষার সঙ্গে সঙ্গে সন্তানকে ধাইকে (দাই–midwife, সংস্কৃতে ‘ধাত্রী’) দান করত৷ তারপর যেন অন্যের ছেলেকে কিনছে এই রকম ভান করে সেই ধাইয়ের কাছ থেকে একটা কড়ি, তিনটে কড়ি, পাঁচটা কড়ি, সাতটা কড়ি বা ন’টা কড়ি দিয়ে কিনে নিত৷ আর সন্তানেরও নাম ঠিক তেমনি রাখা হত৷ সেকালে কড়ি নিয়ে বেচাকেনা চলত বলেই ছাত্রদের অঙ্ক শিখবার সময় কড়াক্রান্তি শিখতে হত৷

আনন্দেরি টান

লেখক
সাধনা সরকার

সবুজপাতা আকাশ নীল

               কে যাবি আয় সাথে

জোনাকজ্বলা ফিনকি ফোটা

               আনন্দগানের সাথে৷

ডাকছে আকাশ ডাকছে বাতাস

               ডাকছে খোকা খুকু

কি আনন্দ আকাশ জোড়া

               নেইকো আর দুখু

মেঘের পরে মেঘ জমেছে

               আনন্দ আর গানে

কে কোথায় সব আয়রে তোরা

                ভালোবাসার টানে

দেখ চেয়ে দেখ মাটির কাছে

                চাঁদা মামার গান

বুকের মাঝে ছলকে ওঠে

               আনন্দেরি টান৷  

রয়েছো মোরে ঘিরে

লেখক
শ্রীপথিক

ধর্ম ভুলে কর্ম নিয়ে মত্ত ছিলুম বলে,

আজকে প্রভু, কর্ম হয়েই এলে৷

গানের সুরে বিভোর হতুম তাই

গানের তোড়া আজ উপহার পাই৷

নাচের তালে দুলতো কোমল মন

তোমার নামে সকাল সাঁঝে তাই বুঝি নাচাও

ফুলের শোভা প্রাণটি ভরে ভালবাসতুম বলে

নিজের হাতে ফুলের বাগান আজকে রচে যাও৷

কানন ছেড়ে ঘরের কোণে

               লুকিয়ে ছিলুম বলে

চার দেওয়ালে যেদিকে তাকাই

               তোমার দেখা মেলে

লেখার মাঝে ডুবেছিলুম

               তাই লেখনীর পাশে

আজকে দেখি

               তোমারই ছায়া ভাসে৷

আমার তুমি ভালোবাসো

               প্রাণের অধিক করে

তাই তো দেখি সব দিকেতেই

               রয়েছো মোরে ঘিরে৷

অবাক কাণ্ড

লেখক
শিবরাম চক্রবর্তী

দেখছে মদন স্পষ্ট চোখে গাছে উঠছে গোরু,

জোড়া বাঁদর নিয়ে হারু চাষ করছে শুরু৷

আলু–পটল, উচ্ছে–বেগুন রান্না হয়ে গাছে,

খাওয়ার ইচ্ছা না হলেও আসছে মুখের কাছে৷

আরব সাগর দিচ্ছে পাড়ি যত উটের দলে,

মরুর বুকে দেখছে আবার জাহাজ ছুটে চলে৷

হিমালয় পাখা মেলে আকাশেতে উড়ছে,

চিতল–বোয়াল উঠোনটায় ডিস্কো নাচন নাচছে৷

একি কাণ্ড পাঠশালাতে পশুরা সব পড়ছে

মানুষ যত পশুর মত কামড়া–কামড়ি করছে

গাছের মাথা নীচে পোঁতা গোড়া আকাশ মুখে,

পায়ে হেঁটে চলত যারা হাতে হাঁটছে সুখে

ঘরটা এবার উল্টে গিয়ে শূন্যপানে ওড়ে

বসন্তকাল

লেখক
প্রণবকান্তি দাশগুপ্ত

বন্ধ্যা মাটি স্বপ্ণ দেখে  ফুলের বাগান,     দখিন হাওয়ায় মন্দ্রিত তার    বন্দনা-গান৷

ডানার শিশির রৌদ্রে মোছে    শঙ্খচিল,

নেই কুয়াশা বিষণ্ণ্তার---    আকাশ নীল৷

রাতের আকাশ সরায় আঁধার   সূর্যোদয়,

পাষাণ-বুকে সুপ্ত প্রাণের       অভ্যুদয়৷

বন-মাতানো কুহু কুহু  মন মাতাল,

পলাশ বনে লাগলো আগুন     বসন্তকাল৷

পঞ্চ দধীচি স্মরণে

লেখক
জ্যোতিবিকাশ সিন্হা

সেদিনও জেগেছিল শাল-পিয়ালের কোলে এমনই ফাগুন

বনবিতানে মধুর কুহুতানে মুখর কোকিল

পলাশের ডালে হাওয়ায় দোলা পুষ্পিত আগুন

প্রকৃতির বুকে বসন্তের আনন্দ অনাবিল৷

কুলু কুলু রবে রঙের উৎসবে উচ্ছল উত্তরা-দক্ষিণা

ফুলের গন্ধে নৃত্য ছন্দে চঞ্চলা হরিণী

আঁকাবাঁকা পথে ছুটিয়া চলিতে নাই যে তার মানা

দূরে ওই শান্ত বেলামু, ধ্যানমগ্ণ গম্ভীর, মৌনী৷

পরমপিতার নির্দেশ মানি সত্যনিষ্ঠ ভক্ত দলে দলে

ঊষর টিলার পাথর ভাঙে, ফণীর সাথে বাঁধে ঘর

ঝড়-জল-রোদে অবিরাম মহানন্দে কর্মযজ্ঞ পাহাড়ে-জঙ্গলে

গড়িতে মহাসম্ভূতি-পদচিহ্ণ আঁকা পবিত্র আনন্দনগর৷

অতর্কিতে হানে আক্রমণ হিংস্র নর-শয়তান হাজারে হাজারে

সত্য ধর্ম মানবতার শত্রু কুচক্রী ইঙ্গিতে---

প্রতিরোধে আগুয়ান ত্যাগব্রতীগণ অকুতোভয় ধর্ম-সমরে

পঞ্চ দধীচি বিসর্জিল অমূল্য জীবন দুর্বৃত্তের অস্ত্রাঘাতে৷

আত্ম বলিদানে সমুজ্জ্বল ৫ই মার্চ, পুণ্য দধীচি দিবস

যন্ত্রণা-তপ্ত অশ্রু মুছি, একসাথে নিই শপথ---

ত্যাগ সেবা মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ কর্মব্রত নিরলস

পঞ্চদধীচির আদর্শ শিখায় প্রদীপ্ত মানুষ যত

ঢালি জীবন যৌবন বিশ্বপিতার চরণ কমলে

নাশি সকল দুঃশাসন, দুষ্টচক্র, পাপের গড়

বিশ্ববিধাতার অনন্ত অমেয় আশীর্বাদ বলে

গড়বই পৃথিবীর আলোকবর্তিকা মহান আনন্দনগর৷