আধ্যাত্মিক প্রসঙ্গ

ভারতবর্ষ ও আধ্যাত্মিকতা

এখন ভারতবর্ষ ও আধ্যাত্মিকতা সম্পর্কে কিছু আলোচনা করা যাক৷ এই দেশের নাম ভারতবর্ষ৷ জানতো, পৃথিবীতে যা কিছু শব্দ আছে সবই অর্থপূর্ণ৷ গ্রামের নামই হোক বা নদীর নাম, সবেরই একটা অর্থ আছে৷ এ দেশের নাম ভারতবর্ষ কেন রাখা হ’ল? প্রাচীনকালে এখানকার বাসিন্দা ছিল দ্রাবিড়, অষ্ট্রিক ও মঙ্গোলিয়ন৷ আর্যরা যখন এল তখন তারা এর নামকরণ করলে ‘ভারতবর্ষ’৷ এমন নাম কেন করা হ’ল?

চতুর্বর্গ ও সাধনা

সমাজে মানবিক প্রয়াস যেমন চারটে স্তরে বিন্যস্ত হয়ে রয়েছে –– কাম, অর্থ, ধর্ম, মোক্ষ৷ এই চতুর্ধাবিন্যস্ত মানুষের কর্মৈষণা তথা কর্মতৎপরতাকে আমরা বলি ‘চতুর্বর্গ’৷ এই চতুর্বর্গের মিলিত প্রয়াসেই সমাজের সামূহিক কল্যাণ, সামূহিক পরিণতি৷ কোনোটা সম্পূর্ণ ভাবে জাগতিক তথা পাঞ্চভৌতিক ক্ষেত্রে, কোনোটা পাঞ্চভৌতিক ক্ষেত্রের সঙ্গে মানসিক ক্ষেত্রকে সংযুক্ত করেছে, কোনোটা কেবল মানসিক আর কোনোটা মানসিক ক্ষেত্র ছেড়ে আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে গিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে, এই ভাবে বিভক্ত হয়ে রয়েছে৷ মানুষের অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসগৃহ –– এই যে পাঞ্চভৌতিক প্রয়োজনগুলো, এগুলো হ’ল কাম৷ তার পরেই হ’ল অর্থ – যা মানুষ বিভিন্ন ধরনের

অণুজীবের জন্মসিদ্ধ অধিকার

‘সর্বাজীবে সর্বসংস্থে ক্ষৃহন্তে তস্মিন্ হংসো ভ্রাম্যতে ব্রহ্মচক্রে৷

পৃথগাত্মানং প্রেরিতারঞ্চ মত্বা জুষ্টস্ততস্তেনামৃতত্৷৷’

তোমরা জান বিশ্বের সবাই পরমপুরুষের সন্তান৷ তিনিই এই বিশ্ব সৃষ্টি করেছেন৷ তিনিই সৃষ্টি করেছেন এই জগৎকে, সৃষ্টি করেছেন এই সমস্ত জীবিত প্রাণীকুলকে৷

সাফল্যের গুপ্ত রহস্য

অতীতে কয়েকবারই আমি তোমাদের একটা গল্প শুণিয়েছিলুম হর–পার্বতী সংবাদ থেকে৷ গল্প আছে, একবার পার্বতী শিবকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “সাফল্য লাভের রহস্য কী”? উত্তরে শিব বলেছিলেন, সাফল্য লাভের সাতটি গোপন রহস্য আছে৷

‘ফলিষ্যতীতি বিশ্বাসঃ

               সিদ্ধের্প্রথমলক্ষণ৷

দ্বিতীয়ং শ্রদ্ধয়া যুক্তং

               তৃতীয়ং গুরুপূজনম্৷৷

চতুর্থো সমতাভাবো

               পঞ্চমেন্দ্রিয়নিগ্রহ৷

ষষ্ঠঞ্চ প্রমিতাহারো

               সপ্তমং নৈব বিদ্যতে৷৷  

(শিবসংহিতা)

রাম ও নারায়ণ

একটা গল্প আছে৷ একবার হনুমানকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, /আচ্ছা হনুমান, তুমি তো বড় ভক্ত৷ তুমি জান যে নারায়ণ ও রামের মধ্যে কোন মৌলিক পার্থক্য নেই, তবু তুমি সর্বদাই রামের নাম নাও, কদাপি ভুলেও নারায়ণের নাম নাও না৷ যদিও রাম ও নারায়ণ মূলগত ভাবে একই সত্তা, তবু তুমি এমনটি কর কেন?*

যোগের তান্ত্রিক সংজ্ঞা

যোগ কী? তোমারা জান যে সংস্কৃত শব্দভাণ্ডারের প্রায় প্রতিটি শব্দের দু’টো করে মানে হয়৷ একটি হ’ল ব্যুৎপত্তিগত অর্থে সংস্কৃতে যাকে বলা হয় ভাবরূরার্থ, দ্বিতীয়টি হ’ল সাধারণ প্রচলিত অর্থ অর্থাৎ লোকে যে অর্থে শব্দটাকে সচরাচর ব্যবহার বা প্রয়োগ করে থাকে৷ এটির সংস্কৃত নাম যোগরূরার্থ৷

উদাহরণস্বরূপ, ধর, ‘পঞ্চানন’ শব্দটি৷ শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ অর্থাৎ ভাবরূরার্থ হচ্ছে ‘যার পাঁচটা মুখ আছে’৷ যোগরূরার্থ হচ্ছে শিব৷ দেশে পঞ্চানন নামে কত শত ভদ্রলোক আছেন৷ এখানে আসল অর্থটা হ’ল এমন কেউ বা এমন কিছু যার পাঁচটা মুখ আছে৷

প্রত্যাহার যোগ ও পরমাগতি

প্রাণায়ামের মত প্রত্যাহার যোগও স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়৷ কোন জীবিত সত্তার প্রাণবায়ুর গতিবিধিকে নিয়ন্ত্রণ করার যে পদ্ধতি তারই নাম প্রাণায়াম৷ ‘প্রাণান্ যময়ত্যেষ প্রাণায়ামঃ*৷ আধ্যাত্মিক সাধক এই প্রাণায়াম–পদ্ধতির দ্বারা দেহের প্রাণশক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে৷

প্রাণায়াম সম্পর্কে একটা বিশেষ কথা মনে রাখতে হবে, প্রাণায়ামের সঙ্গে বিন্দুধ্যানের সম্পর্ক রয়েছে৷ প্রাণায়াম অভ্যাসকালে মনকে একটা নির্দিষ্ট বিন্দুতে নিক্ষদ্ধ রাখতে হবে৷ প্রাণায়ামকে যদি বিন্দু ধ্যান থেকে বিচ্যুত করে নেওয়া হয় তাতে নিজের মানস শক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ ব্যাহত হবে, মন চঞ্চল হয়ে পড়বে৷

মন ও চিতিশক্তি

‘জাগ্রৎ–স্বপ্ণ–সুষুপ্ চৈতন্যং যদ্ প্রকাশতে৷

তদ্ ব্রহ্মামিতি জ্ঞাত্বা সর্বক্ষন্ধৈঃ প্রমুচ্যতে৷৷’

মানুষের মনের চারটে স্তর–জাগ্রৎ, স্বপ্ণ, সুষুপ্তি ও তুরীয়৷ যখন চেতন মন পুরোপুরি সচেতন ও সক্রিয় সেটা মনের জাগ্রৎ অবস্থা৷ আমরা সবাই এই জাগ্রৎ অবস্থায় বেশীর ভাগ সময় কাটাই৷ যখন চেতন মান সচেতন ও সক্রিয় নয়, কিন্তু অবচেতন মন সজাগ ও কোন কিছুর দ্রষ্টা তাকে বলি স্বপ্ণ বা dream৷ যেখানে চেতন ও অবচেতন দুই–ই নিষ্ক্রিয় অবস্থায় চলে যায় তাকে বলে সুষুপ্তির অবস্থা৷ আর যেখানে চেতন, অবচেতন ও অচেতন–মনের এই তিন অবস্থাই নিষ্ক্রিয় থাকে ও চিতিশক্তিতে সমাহিত থাকে সেখানে তাকে মনের তুরীয়াবস্থা বলা হয়৷

ঈশ্বরপ্রেম–সাফল্যের অপরিহার্য শর্ত্ত

তোমরা জান, অন্যান্য সকল বিষয়ে যত যত্নই নেওয়া হোক না কেন, তরকারিতে লবণ ঠিক মত না দিলে তা কখনও সুস্বাদু হয় না৷ তেমনই সসীম ও অসীমের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের যাবতীয় প্রয়াস বিফল হয় যদি ভক্তির অভাব ঘটে৷