নারীর মর্যাদা

পণপ্রথা ও বিবাহ

পণপ্রথা সামাজিক অবিচারের আরেকটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত৷ ‘‘মানুষের সমাজ’’ পুস্তকটিতে বলেছি এই পণপ্রথার কারণ মুখ্যতঃ দু’টি–একটি অর্থনৈতিক ও অপরটি নারী–পুরুষের সংখ্যাগত তারতম্য৷ আর্থিক ব্যাপারে নারীর পুরুষ নির্ভরশীলতা কমে যাবার সঙ্গে সঙ্গে অথবা দেশ বিশেষে পুরুষের নারী নির্ভরশীলতা কমে যাবার সাথে সাথে পণপ্রথার উগ্রতা থাকবে না বটে কিন্তু এই কার্যকে ত্বরান্বিত করবার জন্যে তরুণ–তরুণীদের মধ্যে উন্নত আদর্শবাদ প্রচারেরও প্রয়োজন রয়েছে৷ আমাদের ছেলেমেয়েরা চাল, ডাল, নুন, তেল বা গোরু, ছাগল নয় যে তাদের নিয়ে হাটবাজারে দর কষাকষি চলবে৷    (আজকের সমস্যা) 

                        ণ্ণ     ণ্ণ     ণ্ণ

স্বাস্থ্য ও কৌশিকী নৃত্য

মানুষের অস্তিত্ব ত্রি–স্তরীয় অর্থাৎ এর তিনটে স্তর (Stratum) রয়েছে– শারীরিক  (Physical), মানসিক (Phychic) ও আধ্যাত্মিক (Spiritual)৷ এই যে তিনটে স্তর এদের কোনটিকেই অবজ্ঞা করা যায় না৷ শারীরিক স্তরের চেয়ে মানসিক স্তরের মহত্ত্ব অধিক, কিন্তু তাই বলে শারীরিক স্তরটাকেও (Physical stratum) উপেক্ষা করা যায় না৷ ঠিক তেমনি মানসিক স্তর (Psychic stratum) অপেক্ষা আধ্যাত্মিক স্তরের (Spiritual stratum) গুরুত্ব বেশী কিন্তু মানসিক স্তরটাও (Psychic stratum) অবহেলার জিনিস নয়৷ তাই তারও চর্চা আবশ্যক৷ তেমনি যারা আধ্যাত্মিক চর্চা করে না, কেবল শরীর ও মনেরই চর্চা করে তারা দেখতে মানুষের মত হলেও তাদের মানসিকতা স্থূল হয়ে

নারীর দুরবস্থা

খুব প্রাচীনকালে যখন মাতৃশাসিত সমাজব্যবস্থা ছিল সেই সময় সমাজে ছিল কন্যারই কদর৷ একজন নারীই হত সমাজের গোষ্ঠীমাতা৷ মানুষ তার নাম ধরে গোত্র–পরিচয় দিত৷ পুরুষেরা সেই গোত্রমাতার নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করে যেত৷

সে যুগ চলে গেল৷ পৃথিবীর অধিকাংশ এলাকা থেকে নারীর প্রাধান্য চলে গেল, এল পুরুষের শাসন.......সমাজ হ’ল পিতৃশাসিত৷ মানুষ পিতার পরিচয়ে নিজের পরিচয় দিত৷ সমাজ ব্যবস্থায় প্রবর্ত্তন হ’ল পিতৃগোত্রের ও প্রবরের৷

ক্রমবর্ধমান নারী–নিগ্রহ ঃ সমস্যার সমাধান কোথায়

অবধূতিকা আনন্দগতিময়া আচার্যা

‘রাজ্যে রাজ্যে নারী–নিঃগ্রহ, বধূহত্যা, নারী ধর্ষণ প্রভৃতি উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলেছে৷ এই সমস্ত রোধের জন্যে দেশে অনেক আইন রয়েছে, নূতন নূতন আইন তৈরীও হচ্ছে৷ কিন্তু সমস্যা আগের মতই রয়েছে৷ উদাহরণস্বরূপ দিল্লির গণধর্ষণ কাণ্ডের প্রসঙ্গ আনা যায়৷ এই ঘটনার পর দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠল৷ কঠোর আইন–প্রণয়ণের দাবী উঠল৷ সংসদেও সর্বসম্মতিক্রমে নারী নির্যাতন রুখতে কঠোর আইন আনার দাবী উঠল৷ কঠোর আইন পাশ করাও হ’ল৷ কিন্তু পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তনই পরিলক্ষিত হচ্ছে না৷ তাহলে এ সমস্যার সমাধান কীভাবে হবে?

প্রাচীনকালে নারীর স্থান

সুপ্রাচীনকালে যখন পৃথিবীর সর্বত্র মাতৃগত কুল–ব্যবস্থা ছিল, ছিল মাতৃগত দায়াধিকার ব্যবস্থাও, সেই সময় মানুষ মাতার পরিচয়ে নিজের পরিচয় দিত৷ পিতৃপরিচয় অনেকেরই থাকত না৷ যাদের থাকত, সেটাও খুব গৌণ জিনিস বলে গণ্য করা হ’ত৷ সেই সময়কার মানুষ স্বাভাবিক নিয়মে মাতা–মাতামহীর নামে নিজের পরিচয় দিত৷ কারও মাতা বা মাতামহী সদ্বংশজাতা, শিক্ষিতা ও প্রশংসনীয় স্বভাবের হলে লোকে তাঁর কথা বলতে গৌরব বোধ করত৷ 

(‘‘কৌঞ্জ’’, শব্দচয়নিকা’, ‘৯ম পর্ব)

নারী–পুরুষ উভয়েই পরমপুরুষের আদরের সন্তান

আমরা সবাই পরমপুরুষের সন্তান৷ তিনি সবাইকে তৈরী করে চলেছেন৷ সুতরাং বেঁটে, লম্বা, কালো, ফর্সা, আমি পুরুষ, সে মেয়ে–এসব ভেদের মধ্যে থাকার প্রয়োজন নেই৷ পরমপুরুষের সঙ্গে মনটা মিলিয়ে দিয়ে ভেবে দেখ কী করলে পরমপুরুষের ভালো লাগক্ষে, কী করলে ভাল লাগবে না৷ যা’ করলে তাঁর ভাল লাগবে সেই মত করবে৷ কোন পিতা চাইবে না তার একটা সন্তান শুকিয়ে মরুক, একটা সন্তান প্রয়োজনের চেয়েও বেশী খাক বা প্রয়োজনের চেয়েও বেশী জমিয়ে রাখুক৷ অর্থনৈতিক জীবনেও তোমাদের সেই রকমই চলতে হবে৷ সামাজিক জীবনে কোন পিতাই মনের দিক থেকে চাইবে না তার বিধবা মেয়ে অন্য রকম পোষাক পরুক, তার বিধবা মেয়ের ওপর সামাজিক নির্যাতন চলুক অর্থাৎ কোন শুভ কার্যে তাকে

নারী ও সামাজিক সুবিচার

(মহান দার্শনিক শ্রীপ্রভাতরঞ্জন সরকার তাঁর শব্দ চয়নিকা–২৬ খণ্ড গ্রন্থের বিভিন্ন স্থানে ‘নারীর মর্যাদা’ বিষয়ক অনেক কিছুই বলেছেন৷ ওই গ্রন্থ থেকে কিছু অংশ সংকলিত করে প্রকাশ করা হচ্ছে৷         –সম্পাদক)

অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা

এই সমাজে পুরুষেরা বিশেষ সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে৷ পুরুষদের ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরতার জন্যে পরিত্যক্তা নারীদের একাংশ পতিতাবৃত্তি গ্রহণ করতে ক্ষাধ্য হয়৷ যখন সমাজে নারীরা অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও পুরুষের সমান মর্যাদা পাবে তখন এই ধরণের বৃত্তি ক্ষন্ধ হয়ে যাবে৷ যে সব নারী ওই জঘন্য বৃত্তি পরিত্যাগ করে নিজের চরিত্র শুধরে নেবেন, সেই সব নারীকে উপযুক্ত মর্যাদা সমাজকে দিতে হবে৷ পতিতাবৃত্তি সামাজিক–র্থনৈতিক ব্যবস্থার কুফল৷

শিবজায়া পার্বতী

এবার বলতে হয় পার্বতীর কথা৷ ‘পার্বতী’ শব্দটার মানে কী? কেউ হয়তো বলবেন ‘পর্বতস্য দুহিতা’, ‘পর্বতস্য কন্যা’ ইত্যর্থে পার্বতী (ষষ্ঠী তৎপুরুষ) অর্থাৎ পাহাড়ের মেয়ে৷ এখন প্রশ্ণ হচ্ছে, পঞ্চভূতাত্মক শরীরে কোন নারী কি পাহাড়ের মেয়ে হতে পারে? কোন নদীকে বরং পাহাড়ের মেয়ে বললেও বলতে পারি৷ কোন নারীকে পাহাড়ের মেয়ে বলতে পারি কি?

প্রাগৈতিহাসিক সমাজে নারীর মর্যাদা

প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষ–সমাজে নারীর স্থান ছিল অন্যান্য যে কোন জীবের স্বাধীন নারীর মতই৷ পুরুষেরা যেমন প্রকৃতির কোলে নেচে গেয়ে হেসে খেলে জীবন কাটিয়ে দিত নারীরাও তা–ই করত৷ এই অবস্থা চলেছিল যখন মানুষ সমাজ বলতে কোন কিছুই গড়েনি তখন তো বটেই, তার পরেও মাতৃশাসনের যুগেও৷ কিন্তু যখনই পিতৃশাসিত সমাজ ব্যবস্থা এল তখনই নারীর অধিকার ক্রমশঃ সঙ্কুচিত করা হতে থাকল৷ গোড়ার দিকে ঠিক করা হ’ল মেয়েরা ততটুকু স্বাধীনতা ভোগ করবে যতটুকু বিবাহের পরে তার শ্বশুরকুল তাকে ভোগ করতে দেবে বা বিবাহের পূর্বে পিতৃকুল