নারীর মর্যাদা

মুক্তির আনন্দ সোপান

ফরিদা নার্গিস

বর্তমান বিশ্ব এক চরম সঙ্কটের মধ্য দিয়ে চলেছে৷ বিশেষ করে নারীর ক্ষেত্রে অবদমন একটু বেশি মাত্রায় ঘটে চলেছে৷ আর নারী জাতির এই অবদমনের পেছনে সামাজিক–আর্থনৈতিক যত রকমের কারণ আছে, তার মধ্যে ধর্মমত (Religion) গত কারণ প্রধান দায়ী৷ আবার এই ধর্মমতের পেছনে ইন্ধন জুগিয়ে চলেছে নেপথ্যের সেই পুঁজিবাদী শক্তি৷ পুঁজিবাদী শক্তির সহায়তায় ধর্মমতগুলির বাড়াবাড়ি রকমের অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার ও প্রথা পদ্ধতি মানব প্রগতির রথকে পিছনের দিকে টানছে৷ নারী জাতিকে ঠেলে দিচ্ছে অন্ধগলির পঙ্কিল আবর্তে৷ এর এক দিকে আছে পুঁজিবাদের ভোগ সর্বস্ব জীবনধারা অন্যদিকে ধর্মমতগুলির হাজারো বিধি নিষেধের বেড়াজাল৷ আর এই দুইয়ের পিষ্টনে নারীর জীব

বৈধব্য ও সতীদাহ

বিচার–বুদ্ধি–মনীষার্ উন্মেষের ফলে প্রাচীনকালের যে সমস্ত অনুষ্ঠান বা বিধি বর্জিত হয় তাকে ‘ক্রিয়ালোপ’ বলে৷ পরিবেশগত চাপে বা প্রাকৃতিক কারণে যে সকল রীতি–বিরাজ বন্ধ হয়ে যায় তাকেও ‘ক্রিয়ালোপ’ বলে৷ এককালে কুসংস্কারের ফলে ভারতের মানুষ সদ্যবিধবা নারীকে জীবন্ত অবস্থায় স্বামীর চিতায় পুড়িয়ে মারত৷ আজ সে প্রথা অবলুপ্ত৷ আমি দেখেছি বর্দ্ধমান জেলার যে সকল গ্রামে তথাকথিত উচ্চবর্ণীয় মানুষেরা বেশী সংখ্যায় বাস করেন, বিশেষ করে যে সমস্ত গ্রামে ব্রাহ্মণ–কায়স্থের বাস সেই সমস্ত গ্রামে এমন কিছু কিছু  জায়গা আছে যাকে বর্দ্ধমানের স্থানিক ভাষায় ‘আগুন–খাকী’ বলা হয়৷ আগুন–খাকী মানে যে সব নারী জীবিত অবস্থায় আগুন খেয়েছিলেন অ

স্মৃতির অন্তরালে-‘‘জনৈক বঙ্গ মহিলা’’

কণিকা দেবনাথ

‘আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে

  আসে নাই কেহ অবনী পরে,

  সকলের তরে সকলে আমরা

  প্রত্যেকে আমরা পরের তরে৷’’

আজ থেকে প্রায় ১৪০ বছর আগে এক বঙ্গললনার কলমে রূপ পেয়েছিল সমসমাজতত্বের ভাবনা৷ সেই সময় বাঙলা দেশে নারী শিক্ষা খুবই দুর্লভ৷ নারীজাতিকে গৃহকোণে আবদ্ধ রাখাই সামাজিক প্রথা৷ অবশ্য তারও ৫০ বছর আগে রাজা রামমোহন রায় হিন্দু সমাজের নিষ্ঠুরতম প্রথা সতীদাহ নিষিদ্ধ করেন ও নবজাগরণের দীপ জ্বেলে দিয়ে যান৷ গোঁড়া হিন্দু সমাজপতিরা তখনও ক্রোধে ফঁুসছে৷ কুসংস্কারের কুহেলিকা ছিন্ন করে বেরিয়ে আসার মানবিকতা তাদের ছিল না৷

আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে নারীর স্থান

সম্পতি আমাকে একটি দুরূহ সমস্যার সম্মুখীন হ’তে হয়েছিল৷ সমস্যাটা বা প্রশ্নটা হয়তো কিছুটা দুরূহ কিন্তু উত্তরটা খুবই সরল৷ প্রশ্ন ছিল, মহিলারা মুক্তি–মোক্ষের অধিকারী কি না৷

কিছুদিন আগে তোমাদের বলেছিলুম যে তন্ত্রে বলা হয়েছে, ‘‘দেহভৃৎ মুক্তো ভবতি নাত্র সংশয়ঃ’’৷ আত্মজ্ঞান লাভের নূ্যনতম যোগ্যতা হ’ল এই যে সাধককে মানুষের শরীর পেতে হবে৷ এটাই হ’ল তার নূ্যনতম যোগ্যতা৷ কৈ, এখানে তো উল্লেখ করা হয়নি যে সে সাধক নারী বা পুরুষ হবে৷ এর থেকে এটাই পরিষ্কার যে নারী–পুরুষ উভয়েই মুক্তি–মোক্ষ লাভের সমান অধিকারী৷           

অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা

এই সমাজে পুরুষেরা বিশেষ সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে৷ পুরুষদের ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরতার জন্যে পরিত্যক্তা নারীদের একাংশ পতিতাবৃত্তি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়৷ যখন সমাজে নারীরা অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও পুরুষের সমান মর্যাদা পাবে তখন এই ধরণের বৃত্তি বন্ধ হয়ে যাবে৷ যে সব নারী ওই জঘন্য বৃত্তি পরিত্যাগ করে নিজের চরিত্র শুধরে নেবেন, সেই সব নারীকে উপযুক্ত মর্যাদা সমাজকে দিতে হবে৷ পতিতাবৃত্তি সামাজিক–অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কুফল৷

শিবোক্তি

জীবজগৎ যেমন মুখ্যতঃ দুই বিভাজনে বিভক্ত–যুথবদ্ধ ও এককজীবী, ঠিক তেমনি ঘর–সংসারের ব্যাপারেও জীবজগৎ দুই ভাগে বিভক্ত৷ এক ঃ ঘরকন্না করা সংসারী (যেমন হাতী, সিংহ, পায়রা প্রভৃতি) দুই ৪ স্বৈরী বা স্বৈরিণী (যেমন বাঘ, কুকুর, ছাগল, বেহাল প্রভৃতি)৷

প্রাগৈতিহাসিক সমাজ

প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষ–সমাজে নারীর স্থান ছিল অন্যান্য যে কোন জীবের স্বাধীন নারীর মতই৷ পুরুষেরা যেমন প্রকৃতির কোলে নেচে গেয়ে হেসে খেলে জীবন কাটিয়ে দিত নারীরাও তা–ই করত৷ এই অবস্থা চলেছিল যখন মানুষ সমাজ বলতে কোন কিছুই গড়েনি তখন তো বটেই, তার পরেও মাতৃশাসনের যুগেও৷ কিন্তু যখনই পিতৃশাসিত সমাজ ব্যবস্থা এল তখনই নারীর অধিকার ক্রমশঃ সঙ্কুচিত করা হতে থাকল৷ গোড়ার দিকে ঠিক করা হ’ল মেয়েরা ততটুকু স্বাধীনতা ভোগ করবে যতটুকু বিবাহের পরে তার শ্বশুরকুল তাকে ভোগ করতে দেবে বা বিবাহের পূর্বে পিতৃকুল তাকে যে সুযোগটুকু দেবে৷

নারীর প্রতি অবিচার ঃ ভাষা ব্যবহারে

এই দশ লাখ বৎসরের মানুষের ইতিহাসে মানুষের প্রতি সুবিচার করা হয়নি৷ মানুষের একটি শ্রেণী, একটি বর্গের প্রতি বেশী বাড়াবাড়ি করা হয়েছে, বেশী আদিখ্যেতা করা হয়েছে, ও তা, করতে গিয়ে অন্যকে তাচ্ছিল্য করা হয়েছে৷ একজন মানুষ লড়াই করল, মরল, আত্মদান দিল, কাগজে বড় করে তা ছেপে দেওয়া হ’ল, আর সে মরে যাওয়ার পর ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলিকে নিয়ে তার বিধবা স্ত্রীকে কী ধরণের অসুবিধায় পড়তে হ’ল সেকথা খবরের কাগজে বড় করে ছাপানো হ’ল না অর্থাৎ একতরফা বিচার করে আসা হয়েছে৷ যদিও ব্যাকরণগত ব্যাপার, আর হঠাৎ বদলানো যায় না, তবু ‘ম্যান’ ‘man’ এই কমন জেণ্ডারের মধ্যে ‘ম্যান’, আর ‘ওম্যান’(woman) দুই–ই এসে যায়৷ অথচ ‘ওম্যান’ এই কমন জেন্ডারে

প্রাগৈতিহাসিক সমাজ

প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষ–সমাজে নারীর স্থান ছিল অন্যান্য যে কোন জীবের স্বাধীন নারীর মতই৷ পুরুষেরা যেমন প্রকৃতির কোলে নেচে গেয়ে হেসে খেলে জীবন কাটিয়ে দিত নারীরাও তা–ই করত৷ এই অবস্থা চলেছিল যখন মানুষ সমাজ বলতে কোন কিছুই গড়েনি তখন তো বটেই, তার পরেও মাতৃশাসনের যুগেও৷ কিন্তু যখনই পিতৃশাসিত সমাজ ব্যবস্থা এল তখনই নারীর অধিকার ক্রমশঃ সঙ্কুচিত করা হতে থাকল৷ গোড়ার দিকে ঠিক করা হ’ল মেয়েরা ততটুকু স্বাধীনতা ভোগ করবে যতটুকু বিবাহের পরে তার শ্বশুরকুল তাকে ভোগ করতে দেবে বা বিবাহের পূর্বে পিতৃকুল তাকে যে সুযোগটুকু দেবে৷

অগস্ত্যপত্নী–কৌশিতকী

কৌশিতকী ছিলেন মহর্ষি অগসেত্যর পত্নী৷ মহর্ষি অগস্ত্য তাঁর জীবন কাটিয়ে দিয়েছিলেন আদর্শের প্রচারে, মানবিকতার সম্প্রসারণে৷ তাঁকে এই কাজে প্রতি পলে বিপলে সাহায্য করে থাকতেন তাঁর স্ত্রী কৌশিতকী৷ কৌশিতকী ছিলেন অত্যন্ত বিদুষী মহিলা ও ব্যাপক মানব হূদয়ের অধিকারিণী৷ কখনও অগস্ত্য তাঁকে নির্দেশনা দিয়ে কাজ করাতেন, কখনও বা তিনিও নব নব ভাব–তত্ত্ব উদ্ভাবনের দ্বারা মহর্ষি অগস্ত্যকে নির্দেশনা দিতেন৷ এই ভাবে উভয়ে মিলেমিশে কাজ করে গেছলেন মানব জীবনে দেবত্ব ভাবের উত্তরণের জন্যে৷