প্রভাতী

বৃক্ষমিত্র

লেখক
প্রদীপ রঞ্জন রীত

অক্সিজেন যদি বাঁচার মন্ত্র,

কার্বন-ডাই অক্সাইড হচ্ছে বিষ

বিষ গ্রহণের কাজটাই গাছ করছে অহর্নিশ

এই প্রক্রিয়ার নামটাইতো ফটোসিন্থেসিস৷

কার্বন-ডাই অক্সাইড নিচ্ছে

কিন্তু অক্সিজেন করছে দান

অমৃতটা দিচ্ছে কিন্তু হলাহলটা পান

গাছের  কাছেই বাঁধা প্রাণীর পিতৃদত্ত প্রাণ৷

পত্ররন্ধ্রে বাষ্পমোচন সৃজন করে বৃষ্টি

বৃক্ষ বিনা ধবংস হত এই সুন্দর সৃষ্টি

তবুও কবে গাছের দিকে

পড়বে সবার দৃষ্টি?

ফার্ণিচারের  তক্তা-দাতা, ভূমিক্ষয়কে রোধ

গাছের ঋণ কোনদিনই

করতে পারব শোধ?

গাছকে কবে বাসব ভাল,

জাগবে শুভ বোধ?

ফুল দিচ্ছে ফল দিচ্ছে, দেয় জ্বালানী কাঠ

ভেষজগুণের তরুলতা, মহৌষধির হাট,

বৃক্ষবিনা এই পৃথিবী রুক্ষ মরুর মাঠ৷

সবুজ সবুজ গাছ গাছালি এই ধরণীর ভূষণ,

বৃক্ষের কি আছে জুড়ি রোধ করতে দূষণ,

গাছ বসানো কবে হবে

সব মানবের মিশন?

 

গেল ভয় এল জয়

লেখক
শিবরাম চক্রবর্ত্তী

দেড়শো বছর আগের সেই বাঙলার রসগোল্লা,

বাঙালী প্রথম সৃষ্টি করে ভারি করেন পাল্লা৷

অনেক তর্ক-বিতর্কের পর জি আই-এর লোক শেষে

রসগোল্লা বাঙলার সৃষ্টি, বলেন মিষ্টি হেসে৷

ছানাটারে গোল্লা করে গরম চিনির রসটায়,

ফেলে তারে ফোটালেই ‘রসগোল্লা’ নাম হয়৷

স্বাদে গন্ধে মন মাতিয়ে বাঙালীর হয় প্রিয়,

সকল মিষ্টি বাদ দিয়ে সে হয় ধ্যানের ধ্যেয়৷

কলকাতার রসগোল্লা ভারত জয়ের পরে

বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছায় জি আই-এর হাত ধরে৷

বাঙলা ও বাঙালীদের দেওয়ার শেষ নেই,

আর এক ইতিহাস গড়ল তারা রসগোল্লাতে

আমার তুমি

লেখক
জ্যোতিবিকাশ সিন্হা

দুরন্ত প্লাবনের উচ্ছ্বাসে,  কার আহ্বান ভেসে আসে

অশনি-ইঙ্গিতে ঝঞ্ঝা-সঙ্গীতে প্রলয় ঘোষে

বজ্রনাদে কম্পিত ধরণী৷

সে কি তুমি, বল,  সে কি তুমি!

বিশ্বচরাচরে অহঃরহ

কার অফুরন্ত অপার স্নেহ

আশিস ঢালি, সবে যায় চুমি৷

সে কি তুমি, বল,  সে কি তুমি!

প্রখর গ্রীষ্ম অবসানে বরষার রিমঝিম

আনে আনন্দ-বারতা বিরামহীন

সকল চিত্ত মাঝে, মধুর ছন্দে বাজে

কার চরণধবনি---

সে কি তুমি, বল,  সে কি তুমি!

 

জলটান

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

সংস্কৃত ‘মদ’ ধাতুর একটি অর্থ হল যা শুষে আরাম পাওয়া যায় (ভাবারূঢ়ার্থ), যোগারূঢ়ার্থে জল, সরবৎ, পানা, ফলের রস ও যে কোন তরল বস্তু যা পানীয় পর্র্যয়ভুক্ত৷ উপরি-উক্ত যে বস্তু খেলে জলটান হয় অর্র্থৎ যে আহার গ্রহণের পর বার্রার  জলতেষ্টা পায় সেই বস্তুকে ম+ড= ‘ম’ নামে আখ্যাত করা হয়ে থাকে৷ যেমন কম জলে  ছাতু গুলে খেলেও বার বার জলতেষ্টা পায়৷ এই ধরনের জলতেষ্টাকে ‘জলটান’ লা হয়৷

তোমরা সেই লা গড়ের ব্রজবল্লভ সাকের জলটানের  গল্প শুনেছ তো! যদি না শুনে থাক তো একবার লি৷ ব্রজবল্লভ সাক থাকতেন লাগড়ে--- তাঁর পৈতৃক ভদ্রাসনে*৷

কিন্তু ব্রজবল্লভ  সাকের  অন্তরঙ্গ  বন্ধুরা শে কিছুটা দূরে থাকতেন ন-হুগলীতে, অপর অন্তরঙ্গ বন্ধু বিজিত বসু  থাকতেন  ৰাজেশিবপুরে৷ বিজিত ড়জ্জের  ছেলেটি লেখাপড়া সমাপ্ত করে সদ্য সেই যে কী যে একটা সরকারী বিভাগ আছে যেখানে খাদ্যশস্য ওজন করে দাম দিয়ে গুদামজাত করা হয় সেই বিভাগটিতে অল্পদিন হল কাজ পেয়েছে৷ আর বিজিত বসুর  ছেলেটি এম.এ. পাশ করেছে, হুগলীর কোন একটি কলেজে  তার পেপেচুরির চাকরি হলো-হলো৷

একদিন প্রাতভ্রর্মণ সেরে ব্রজবল্লভ বসাক বাড়ী ফিরে আসতেই তাঁর স্ত্রী সেয়ানাসুন্দরী বললেন, ‘‘ওগো শোন, তোমার বন্ধু বিজির্তর্ৰাৰু এইমাত্র খর পাঠিয়েছেন, আজ রাত্তিরে ওঁর ছেলের উ-ভাত৷ তোমাকে নেমতন্ন রক্ষা করতে যেতেই হৰে৷ নইলে উনি মনে ভারী দুঃখু পাৰেন৷ কাজকর্মে অত্যধিক ব্যস্ত থাকায় নিজে আসতে পারলেন না৷ নইলে তিনি নিজেই এসে তোমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন’’৷

ব্রজবল্লভ বসাক সেয়ানা সুন্দরীকে শুধোলেন---‘‘কোন জায়গাটার  নাম করেছে ল তো--- নহুগলীর না ৰাজেশিবপুরের’’৷

সেয়ানাসুন্দরী ললেন---‘‘অত তো জিজ্ঞেস করিনি৷ কারণ যে লোকটি এসেছিল সে ললে  বিজির্তর্ৰাৰু ব্রর্জর্ৰাৰুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ৷ নাম নিলেই ঝতে পারৰেন’’৷

ব্রজবল্লভ বসাক বললে---‘‘তাও তো জিজ্ঞেস করিনি কারণ লোকটি বললে, নেমতন্নকারীর নাম শুণলেই ব্রর্জাবু  বুঝতে পারবেন , বেশী বলার দরকার  পড়বে না’’৷

ব্রজবল্লভ মহাফাঁপরে পড়লেন৷ তিনি এবার বাস্তব বুদ্ধি প্রয়োগ করলেন৷ বিজিত বাঁডুজ্জের ছেলেটি চাকরী করে৷ সুতরাং চাকরী পাওয়ার পরে নিশ্চয় তার বিয়ের ঘটকালি শুরু হয়েছিল৷ তাই তার বিয়েই বেশীই সম্ভব৷ বিজিত বসুর ছেলেটি পেপেচুরির কাজ পার্ৰে, তারপরে পাত্রীর সন্ধান হবে, তারপরে দেনাপাওনার কথা হবে, ঠিকুজী গোষ্ঠী বিচার করে তারপরে পাকা দেখা হবে৷ তারপরে না বিয়ে! শতকরা ৯৯.৯ ভাগ সম্ভাবনা বিজিত বাঁড়ুজ্জের এক্সছলের বিয়ে৷

বলাগড় থেকে ৰাজেশিবপুর যেতে গেলে সোজা ট্রেনে  যাওয়া যাবে না৷ গঙ্গা পার হতে হবে৷  কিন্তু বনহুগলী যেতে গঙ্গা পার হতে হয় না৷ কিন্তু নহগলী যেতে গঙ্গা পার হতে হয় না৷ ব্রজবল্লভ বসাক কী করৰেন৷ ঘনিষ্ঠ বন্ধু তো৷ আত্মীয়ের  চেয়ে বন্ধুর টান বেশী৷ তাই তিনি যেভাবেই হোক বনহুগলীতে গিয়ে পৌঁছুলেন সন্ধ্যে একটু আগেই৷ বন্ধুর ছেলের বিয়ে...... একেবারে ৰাইরের লোকের মত এসেই হাতটি ধুয়ে পাতে সে  পড়া যায় না৷  দরকার পড়লে ময়দা মাখতে হৰে, নুচি লেতে হৰে, এমনকি  কোমরে গামছা জড়িয়ে নুচি ভাজতে হৰে কিংবা  হাতে ডালের ৰালতি,ডান হাতে হাতা নিয়ে  পরিবেশন করতে হবে৷ ঘাম মোছবার জন্য কাঁধে একটি গামছাও রাখতে হবে ৷ তাই একটু আগেই  যাওয়া দরকার৷

বনহুগলীতে পৌঁছলেন ব্রজবল্লভ বসাক৷ কিন্তু এ কি! বিজিত বাঁড়ুজ্জের বাড়ী দেখে বিয়ে বাড়ী লে তো মনেই হচ্ছে না৷  বাইরের দিকে একটা আলোও জ্বলছে না৷ সামনে বৈঠকখানায় একটা কম পাওয়ারের আলো টিমটিম করে জ্বলছে  কড়া নেড়ে দরজা খোলাতে হল৷

বিজিত বাঁড়ুজ্জে বললেন--- ‘‘এসো এসো, ব্রজ, তোমার যে আজকাল টিকিটই পাই না৷

ব্রজবল্লভ ঘরে ঢুকে যা দেখলেন তাতে তারমনে নেৰে  এল সন্দেহের  কালো ছায়া৷ এ ৰাড়ী তো বিয়ে-ৰাড়ী নয়৷ পরিস্থিতি সামলাবার জন্যে বিজিত বাঁড়ুজ্জের সঙ্গে তিনি দু’চারটি কুশল সংবাদের আদান  প্রদান করলেন ৷ বিজিত বাঁড়ুজ্জের চোখ মুখ দেখে মনে হল তার ঘুম আসছে৷ তখন রাত্রিমান পৌনে ন’টা৷ বিজিত বাঁড়ুজ্জে হাঁই তুূলতে তুলতে ললেন, ‘‘ একটু সকাল সকাল খাই কী না  আর  বোঝ তো বয়স হয়েছে--- বিশেষ কিছু সহ্য হয় না৷ রাত্তিরে খই দুধ খেয়ে শুয়ে পড়ি ৷ ওটা একটু হাল্কা জিনিস তো৷’’

ব্রজবল্লভ বসাক ললেন, হ্যাঁ, আমিও অনেকক্ষণ ধরে উর্ঠ উর্ঠ করছিলাম৷ অনেকদিন পরে তোমাকে দেখে এত আনন্দ হচ্ছে যে কী ল৷ ......আচ্ছা চলি৷ তা তোমার  ছেলেটি এখন কী করছ?’’

বিজিত বাঁড়ুজ্জে ললেন,---‘‘ছেলের বিয়ে -থার কী হল?’’

বিজিত বাঁড়ুজ্জে বললেন,---‘‘পাত্রীর খোঁজ তো চলছে, তবে পাত্রী পছন্দ হচ্ছে  তো দেনা-পাওনায় মিলছে না, আবার দেন-পাওনা মিলছে তো পাত্রী পছন্দ হচ্ছে না৷ তবে আশা করি সামনের  মাঘ মাসে বিয়ের ব্যবস্থা হৰে৷ সে   খবর তো তুমি আগেই  পেয়ে যাৰে’’৷

ব্রজবল্লভ বসাক বাড়ীতে ফিরে এলেন৷ কড়া নাড়তেই সেয়ানা-সুন্দরী দরজা খুলে দিলে৷ ঘরে ঢুকেই  ব্রজবল্লভ স্ত্রীর দিকে একটু বিষণ্ণ্ মুখে তাকালেন৷ সেয়ানাসুন্দরী শুধোলে,---‘‘ব্রজবল্লভ বসাক বললেন,---‘‘আগে এক গেলাস ঠাণ্ডা জল দাও দিকি’’৷

ব্রজবল্লভ ধপাস্ করে চেয়ারে সে হাতটা রাখলেন ডালগালের নীচে৷ জোরে একটা               দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন৷ মনে মনে বললেন, নুচি-পোলাও দুই-ই৷ সেয়ানাসুন্দরী জল নিয়ে এলো৷ ব্রজবল্লভ বসাককে বললে,---‘‘কী করেছিল তোমাকে আর বলতে হবে না, আমি  ঝে নিয়েছি’’৷

ব্রজবল্লভ বসাক ললেন---‘কী করেছিল ল  দেখি’?

সেয়ানাসুন্দরী বললে,---‘নিশ্চয়ই পোলাও’৷

ব্রজবল্লভ শুধোলেন--- ‘কী করে ঝলে’?

সেয়ানাসুন্দরী ললে---‘ওটুকু আমি জানি গো জানি, পোলাও খেলে দারুণ জলটান হয়’৷

সোহাগ আদর

লেখক
আচার্য গুরুদত্তানন্দ অবধূত

আদর খেতে ভালবাসি

তাতেই ফোটে হাসি

চারিধারে প্রীতির মেলা

যেন রাশি রাশি৷

মায়ের বুকে অতিসুখে

করি আমি খেলা

ভাই বোনেরা ঘিরে থাকে

ফুরায় নাক বেলা৷

পিতার শাসন প্রিয় অতি,

আশীষ কান মলা

কতভাবে তালিম সে যে

যায়না সে বলা৷

গুরুজনের  স্নেহ সে যে

যোগায় মনে বল

জীবন জ্যোতি প্রিয় অতি

নাশে হলাহল৷

তোমার কথা ভাবতে গেলে

লেখক
সাক্ষী গোপাল দেব

তোমার কথা ভাবতে গেলে

                হারাই আমি নিজে

তোমার কথা ফুরায় নাকো

                বলব আমি কি যে৷৷

তুমি অরূপ রূপের মাঝে

                ছড়িয়ে আছো মোহন সাজে

আমার আঁখি রূপে বিভোর

                তোমার মনসিজে৷৷

তোমার রূপের জ্যোতিঃ রাশি

                মনের যত তম নাশি

দেয় ভরিয়ে আলোর বিভায়

                সকল বিশ্ববীজে৷৷

আজ তুমি

লেখক
জ্যোতিবিকাশ সিন্হা

আকুল দু’টি নয়নে

চেয়ে থাকি পথপানে

ভাবি, এই বুঝি তুমি এলে৷

তুমি আসবে তাই,

সীমাহীন খুশির দোলায়

আজ হৃদয় আমার দোলে৷৷

 

ঝরাপাতার শীতের পরে

যেন ফাগুন-হাওয়া আমার ঘরে

ঋতু-পরাগের সুবাস ঢালে৷

মনোবীণার গোপন তারে

অচেনা সুরের ঝংকারে

অনন্ত সুখের অমিয় ধারায়

                আমায় তুমি ভাসালে৷৷

 

আকাশ জল সবই ভাল

মধুর প্রীতি ধারা

সোহাগ মেশা সুর ও লয়

করে মাতোয়ারা৷

দেশাত্মবোধক গান

লেখক
সন্তোষ মাহাত

আমরা –

আমরা নতুন প্রভাতের সূর্য্য,

আছে তরুর মতো ধৈর্য্য,

আছে ভীমের মতো শৌর্য৷ আমরা –

মোরা আকাশের মতো নির্মল,

মোরা তারার মতো উজ্জ্বল৷

মোরা সুধীর শান্ত যোগী

বিষয় বাসনা ত্যাগী৷

করি ভগবানের আরাধনা

দিয়ে হূদয়ের অর্ঘ্য৷ আমরা –

মোরা হিংসা ভেদা–ভেদ ঠেলে দূরে,

রাখবো পৃথিবীটাকে আলো করে৷

বাসবো না পর কোন জনে,

সবারে নেব বুকে টেনে৷

মোরা সত্যটাকে করবো স্বর্গ

দিয়ে মোদের কর্ম৷ আমরা –

মোরা ভয় করিনা ঝড় ঝঞ্ঝা,

মোদের ওড়াতে দেব না মনোবাঞ্ছা৷

এগিয়ে যাব বাধা ঠেলে,

জিনবো শত্রু অবহেলে৷

চলার পথে প্রকাশিবো মোরা

মোদের শৈর্ষ বীর্য৷ আমরা –

আমরা নতুন প্রভাতে সূর্য্য৷

 

প্যাঁজ ফুলুড়ি

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

কারও পয়সা থাকলেই তার জেল্লা থাকে না, পয়সা থাকলেই তা’ সম্পত্তি পদবাচ্য হয় না৷ এই তো আমাদের চুঁচড়ো-চরকডাঙ্গার শ্রীযুক্ত াু চাওয়া - চাটা চাটুজ্জেকে তোমরা অনেকেই  জানো! তার কত টাকা আছে কেউ জানে না৷ লোকে বলে, কুবের নাকি একবার তার টাকা গুণতে এসে অতি পরিশ্রমে অজ্ঞান হয়ে গেছলেন কিন্তু সেই চাওয়া-চাটা চাটুজ্জের  সম্পত্তি কি জেল্লাদার সম্পত্তি? তা কি ‘ভ’ পদবাচ্য? না, তা নয়৷ একটা ছোট্ট গল্প বলি, শোন ঃ

চাওয়া-চাটা-চাটুজ্জের বাড়ীই ছিল চউষট্টিটা--- চুঁচড়ো, চন্নগর আর চাতরায়৷ চাওয়া-চাটা বেশ মেপেজুকে কথা বলত৷ ভারী গলায় কথা বলে তার মনের ভেতরকার  ফাঁপা অবস্থাটা চাপা দেওয়ার চেষ্টা করত৷ ভারী গলায় কথা তো বলৰেই, কারণ যার আছে বাড়ী তার কথা ভারী ভারী, যার আছে ধান  তার কথা টান টান, আর যার আছে টাকা তার কথা ভাড়ী ভাড়ী৷ ধান হাতে থাকে গ্রামের মানুষের৷ তাদের কথায় একটা টান থাকে৷ টাকা যার থাকে সে সোজা কথা বলে না--- কা কথা বলে৷

তা সে যাই হোক, আমাদের চাওয়া-চাটা চাটুজ্জে বাড়ীর পর বাড়ী কিনে গেছে৷ অথচ তাঁর সম্পত্তি ভোগ করবার দ্বিতীয় কোন উত্তরাধিকারী ছিল না৷ তার বংশে সে-ই ছিল একমাত্র বংশধর৷ সে ভাবারূঢ়ার্থেও অর্থাৎ কিনা সব সময়ই তার হাতে একটা বাঁশের লাঠি থাকত৷ টাকা থাকলেই যে লোকে বাড়ী কিনবে এমন কথা নেই৷ তবে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীতে বিভিন্নধরনের রুচি থাকে বই কি৷ তাই না বলা হয়ে থাকে , হাতে কিছু টাকা এলে কে কী করে!

‘‘বাঙ্গালীর বাড়ী, সাহেবের গাড়ী’’

মিঞাসাহেবের হাঁড়ি, মেয়েমানুষের শাড়ী’’৷

বাঙ্গালীর হাতে দু’পয়সা এলেই একটা বাড়ী করে ফেলে৷ আর সাহেবরা দু’চার টাকার মুখ দেখলেই আলট্রামর্র্ডণ মডেলের নাই হোক, একটা হাত-ফেরতা (সেকেন্ড হ্যাণ্ড) গাড়ী কিনে ফেলে৷  আর মিঞাসাহেবের তকদির খুলে গেলে তিনি তখন কোর্র্ম- কাৰাৰ- কোপ্তা-শিক-কাৰাৰ-মিঠা পোলাউ-নমকিন পোলাউ-মুর্গমসল্লম্-করেকা পশীন্দা-বিরিয়ানী ইত্যাদি......ইত্যাদি খেয়ে কিছুদিন আনন্দ করে নেন অর্থাৎ স টাকা-পয়সা হাঁড়িতেই ঢালেন৷ আর মেয়েমানুষের শাড়ী সম্বন্ধে বেশী বলা অবাঞ্ছনীয় তো বটেই, বরং তাতে ঝুঁকিও(risk) রয়েছে....শাড়ী সম্বন্ধে বেশী কথা বললে ঘরে শান্তি ভঙ্গের সম্ভাবনা৷

তা সে যাই হোক, আমাদের চাওয়া- চাটাচাটুজ্জেরজীবনের্-জ্ঞান- আরাধনা- উপাসনা সৰ কিছুই ছিল ওই টাকা৷ সে বলত, অন্য চিন্তা করৰার সময় কোথায়! সুদের হিসাব মেলাতেই তো ২৪ ঘন্টা কেটে যায়৷ ভাল করে ঘুমোবার জন্যে একঘন্টা সময়ও হাতে পাই না৷

একদিন সৌরকরোজ্জ্বল সুপ্রভাতে চাওয়া-চাটা--চাটুজ্জের শ্মশান বৈরাগ্য এল৷ সে ভাবলে--- এতটাকা কিসের জন্যে? আজ অন্ততঃ ভালোমন্দ কিছু খাই৷ জন্মের শোধ খেয়ে নিই৷ সে তখন কম্বাইণ্ড হ্যাণ্ড ভোলাকে ডাকলো৷

চাওয়া--চাটা-চাটুজ্জে খেত পুঁইশাকের চ্চচড়ি আর ভাত৷ পুঁইশাক বাজার থেকে কিনতে যাবে কোন দুঃখে! বাড়ীর উঠোনেই ভোলাকে দিয়ে চাষ করাত৷ ভোলা বাসন মাজত, রান্না করত. ঘরদোর পরিষ্কার করত, বাজারে যেত শপিং করতে  আর পুঁইশাকের মার্কেটিং করতে কারণ তার বাড়ীর উঠোনে যে পরিমাণ পুঁইশাক হত, তা একজনের প্রয়োজনের তুলনায় কিছুটা বেশী৷ ভোলা যাতে বেশী দরে পুঁইশাক বাজারে ৰেচে আসে  তাই ভোলাকে লেছিল---এই পুঁই ৰেচার টাকা থেকেই তোর মাইনে দেব৷

তা সে যাই হোক শ্মশান বৈরাগ্যের দিন  সে ভোলাকে ডেকে বললে---‘দেখ ভোলা, আজ একটু ভালমন্দ খাওয়ার স্বাদ হয়েছে৷  আজ নিয়ে আয় একসের ছানার পোলাও’ ৷

ভোলা আনন্দে আটখানা হয়ে বললে--- ‘এই আনছি কর্ত্তা, এক্ষুনি আনছি! এই গেলুম আর এলুম৷ টাকাটা দিন৷ ’

চাওয়া-চাটা  একটু থেমে বললে--- ‘আচ্ছা দেখ , ছানার পোলাও কেন, আজ ছানার পায়েস খাওয়া যাক৷ এখানে পাওয়া যাবে,  না চন্নগরে যেতে হবে’?

ভোলা বললে--- ‘হ্যাঁ কর্তা, এখানেই পাওয়া যাবে৷  খড়োবাজারের একটা দোকানে পাওয়া যাবে’৷

চাওয়া-চাটা বললে--- ‘খড়োবাজার তো এখান থেকে অনেকটা ৷ তবে এক কাজ কর, আজ এক সের ক্ষীরের মালপো নিয়ে আয়৷’

ভোলা বললে---‘এই এক্ষুনি আনছি কর্ত্তা৷ টাকাটা দ্যান৷ আমি দৌড়ুতে দৌড়ুতে  গিয়ে দৌড়ুতে দৌড়ুতে এনে দিচ্ছি’৷

চাওয়া-চাটা বললে--- ‘দেখ সবই তো হ’ল৷ কাগজে বিজ্ঞাপন দেখছিলুম, একটা নোতুন ধরণের মিষ্টি উঠেছে---নাম ‘রসমাধুরী’৷ সে কি আমাদের  চুচড়োর  বাজারে পাওয়া যাবে? ভোলা বললে--- ‘খোঁজ নিয়ে দেখবো,  চুচড়োয় যদি না পাওয়া যায় চন্নগরে তো পাওয়া যাবেই’৷

চাওয়া-চাটা ডান-গালে হাত দিয়ে খানিকক্ষণ ভাবলে.....বাঁ গালে হাত দিতে খানিকক্ষণ কাশল৷ তারপর বললে--- ‘দেখ,  আজ ওসব থাক৷ আজ এক পয়সার প্যাঁজ-ফুলুড়ি নিয়ে আয়৷ পেঁয়াজী আর প্যাঁজ ফুলুড়ির  তফাৎ বুঝিস তো’৷

ভোলা বললে---‘আজ্ঞে না কর্ত্তা’৷

চাওয়া-চাটা বললে --- ‘পেঁয়াজের চেয়ে বেসন একটু বেশী থাকলে  তাকে বলা হয় প্যাঁজ ফুলুড়ি, আর তা ভাজা হয় ছাঁকা তেলে ছানচা দিয়ে৷ আর পেঁয়াজীতে বেশন থাকে নামে মাত্র ভাজা হয় চাটুতে তেল ছিটিয়ে৷ তেলেভাজাওলারা বেশী লাভ করতে গিয়ে অনেক সময় প্যাঁজ-ফুলুড়ির বদলে পেঁয়াজীকেই চালিয়ে দেয়৷  ঠিক দেখে শুনে  আনিস যেন প্রত্যেকটি প্যাঁজফুলুড়িই হয়৷

ভোলা বললে--- ‘আজ্ঞে কত্তা , আপনি লিশ্চিন্ত থাকুন৷ আমি সব দেখে শুনে আনবো’৷

চাওয়া-চাটা বললে--- ‘‘হ্যাঁ, দেখেশুণে আনবি৷ এক পয়সার প্যাঁজ-ফুলুড়িতে আমার                      দু দিনের চারবার জলখাবার হয়ে যায়৷

ভোলা বললে---‘এই যাই কত্তা৷ পয়সাটা দ্যান’৷

চাওয়া-চাটা বললে --- ‘পয়সা! পয়সা দিলে তো সবাই আনতে পারে!  একটা দিন বিনা পয়সায় আনতে পারিস না ?  সবাই চেনা জানা লোক৷ চেয়েচিন্তে এক পয়সার প্যাঁজ-ফুলুড়ি আনতে পারবি না৷’

খানিকবাদে একটা শালপাতা হাতে নিয়ে ভোলা সশরীরে চাওয়া-চাটার সামনে এসে দাড়াল৷ চাওয়া-চাটা শুধোলে---‘‘ কি ব্যাপার ! কি এনেছিস?--- পেঁয়াজী না প্যাঁজ-ফুলুড়ি’’?

ভোলা বললে ‘দোকানদার আমায় বললে, শালপাতায় পেঁয়াজী থাকলে সবাই খায়, কিন্তু পেঁয়াজীর এই শালপাতাটা তোর কত্তাকে খেতে দিগে যা’৷

আমার ছড়া পাতায় পাতায়

লেখক
সাধনা সরকার

আমার ছড়া তোমার ছড়া

                ছড়ায় ভুবন ভরা

আম আঁটিটার ভেপু যেন

                মনটা খুশী করা৷

অনেক ডাকের মিলন সুরে

                কী আনন্দ মোদের

স্বপ্ণ নাচে তালে তালে

                অনেক ভেতরের৷

আহা কী আনন্দ! আনন্দনগরে

                আকাশ-বাতাসে

হাজার শিশুর গন্ধ গানে

                পলাশ ফোটা বাসে৷

রাঙা মাটি ডাকছে যেন

                আয়রে কাছে আয়,

ছড়ার হাসি ছড়ার খুশী

                পড়ার পাতায় পাতায়৷

 

খেলার মজা

আচার্য গুরুদত্তানন্দ অবধূত

ছুটোছুটি খেলাতে মজা

আয় তোরা আয় না

ঘরের কোনে বসে বসে

করিস শুধু বায়না

লুকোচুরি খেলার মাঠে

খঁুজে কেহ পায় না

ছোঁ মেরে ধরতে গিয়ে

ধরাই যেন যায় না৷

খ্যাপা বাউল মাতে গানে

দেখে নিজ আয়না

অরূপ রতন খঁুজি মনে

কিছু আর চায় না৷