প্রভাতী

শামিয়ানা নেতা

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

‘কেণিকা’ শব্দের একটি অর্থ হল শামিয়ানা৷ শব্দটি ফার্সী৷ এ ক্ষেত্রে বাঙলার নিজস্ব শব্দ ‘কেণিকা’৷ রোদ ও অল্প বারিপাতের হাত থেকে কোনো উৎসব বা অনুষ্ঠানকে বাঁচাবার জন্যে শামিয়ানার ব্যবহার হয়ে থাকে৷ এই ‘শামিয়ানা’ শব্দটি বাংলা ভাষায় এসেছে বড় জোর ৪০০ বছর৷ ছোটবেলায় আমি একজন শামিয়ানা–নেতার নাম শুনেছিলুম৷ তোমরা নিশ্চয় জানো, নেতা হবার জন্যে অনেকের সখের প্রাণ গড়ের মাঠ হয়ে থাকে৷ যোগ্যতা নেই, তবু নেতা হতে হবে৷ তাই তারা অনেক সময় অন্যকে দিয়ে ভাষণ লিখিয়ে নিয়ে নিজেরা তা কতকটা মুখস্থ করে জনসভায় ছেড়ে দেয়৷ হাততালির ব্যবস্থা আগে থেকেই করা থাকে৷ এদের জন্যে ‘শামিয়ানা–নেতা’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়৷

আমার জানা জনৈক শামিয়ানা–নেতা কয়েকবারই ম্যাট্রিকে ঘায়েল হয়ে শেষ পর্যন্ত নেতা হবার পদটি নিরাপদ মনে করে সেটিকেই বেছে নিলেন৷ বলা বাহুল্য, লিখিত ভাষণ মুখস্থ করে তার ভালই চলছিল৷ কিন্তু যতিচিহ্ণের (Punctuation) জ্ঞান না থাকায় ভাষণ একটু ওলট–পালট হয়ে যেত৷ তাঁর সহকর্মীরা একদিন তাকে বললেন–‘‘দেখিয়ে, আপ্ পাঙ্ক্চুয়েশন শিখ লিজিয়ে৷’’

তিনি বললেন–প্রোনাউন ঔর প্রপার নাউন তো মুঝে মালুম হৈ (হ্যায়)৷ বহী চীজ না৷

সহকারীরা বললেন–পাঙ্কচুয়েশনভী ঐসা হী হৈ, পর্ থোড়া ইধ্র্–উধ্র্৷ জৈসা ‘বাটার’ (water) ঔর ৰাটার butter–দোনো করীব করীব এক হী হৈ, দোনো হী তরল হৈ৷ মগর থোড়া ফারাক্ ভী রহতা হৈ৷

তাঁরা তখন শামিয়ানা–নেতাকে যতিচিহ্ণ বোঝালেন৷ বললেন–জব হমলোগ কমা লিখেঙ্গে উস্কে বাদ আপ্কো বান্ (ওয়ান) বল্নে কা টাইম ছোড়না পড়েগা৷ জব্ ফুলিষ্টপ্ লিখেঙ্গে তব্ আপ্কো বান, টু, থীরী (ওয়ান, টু, থ্রী) কা টাইম ছোড়না পড়েগা৷

শামিয়ানা–নেতা বললেন–হান্ জী, ম্যায় সমঝ্ লিয়া৷

সহকারীরা লিখে দিলেন–প্যারে সজ্জনোঁ, মুঝে আজ কাফী হর্ষ্ হৈ, কি ম্যায় আপলোগোঁকা পাশ্ পঁহুচ গ্যয়া৷ মগর কহ্না যহী হৈ কী শীর্ফ আজ হী কে লিয়ে নহীঁ, বল্কি অনন্তকালকে লিয়ে ম্যায় আপলোগোঁকা পাশ আনা চাহতা হুঁ–, ঔর অনন্তকাল তক্ আপ্লোগোঁকো সাথ রহনা চাহতা হু৷’’ শামিয়ানা–নেতা কমা, ফুলষ্টপ, আর ক্ষান–টু–থীরীর হিসাব ভালভাবে শিখে নিলেন৷ এবার তিনি শামিয়ানার নীচে দাঁড়িয়ে ভাষণ শুরু করলেন–

‘‘প্যারে সজ্জনোঁ কমা বান মুঝে আজ কাফী হর্ষ্ হৈ কমা কি ম্যায় আজ আপ্লোগোঁকা পাশ্ পঁহুচ্ গয়া ফুলিষ্টপ ৰান, টু, থীরী (ওয়ান, টু, থ্রী) মগর কহ্না যহী হৈ কমা বান শীর্ফ্ আজ হী কে লিয়ে নঁহী বল্কি অনন্তকালকে লিয়ে ম্যায় আপ্লোগোঁকা পাশ আনা চাহতা হুঁ কমা ঔর অনন্তকাল তক্ আপ্লোগোঁকা সাথ রহনা চাহতা হুঁ ফুলিষ্টপ বান টু থীরী৷

শ্রোতা–জনতা সোল্লাসে হাততালি দিয়ে তাঁকে সম্ক্ষর্দ্ধনা জানালেন৷ নেতা তো হাততালিই চাইছিলেন৷ তাঁর ভাষণটা প্রদত্ত হয়েছিল সম্ভবতঃ অল ইণ্ডিয়া চোর এ্যাণ্ড ডাকু কন্ফারেন্সে (নিখিল ভারত চোর ও ডাকাত সম্মেলন)৷ তাহলে তোমরা বুঝলে শামিয়ানা–নেতা কাদের বলে৷

*      *      *      *

ওই রকম একজন নেত্রীও ছিলেন৷ তিনি ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের জনৈক দেশীয় রাজ্যের মহারাণী৷ তাঁর ভাষণ লিখে দিতেন ভারতের জনৈক নামজাদা ব্যারিষ্টার৷ একবার এলাহাক্ষাদে সর্বভারতীয় মহিলা সম্মেলন হয়েছিল৷ ব্যারিষ্টার সাহেবের লেখা ভাষণটি মহারাণী ভালভাবেই পড়ে নিয়েছিলেন৷ কিন্তু সভাস্থলে দাঁড়িয়ে বিপুল জনসমাবেশ দেখে মহারাণীর মাথা ঘুরে যায়......ভিরমি যাক্ষার উপক্রম হয়, সমস্ত ভাবনাই তাঁর তখন গুক্ষলেট হয়ে যায়৷ মহারাণী ছিলেন শামিয়ানা–নেত্রী৷ সুতরাং  ভাষণের সুযোগ তিনি তো ছাড়বেন না, তা মুখস্থ থাক, বা না থাক বলবেনই৷ তিনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিন–চার ক্ষার বললেন–ম্যায় ক্যা কহুঁ...ম্যায় ক্যা কহুঁ...ম্যায় ক্যা কহুঁ৷ তারপর রুমাল দিয়ে সযত্নে টিপ ক্ষাঁচিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বললেন–বড্ডী গরম...বড্ডী গরম...বড্ডী গরম৷ তারপরে মহারাণীর গলার স্বর আর বেরুল না, আগাগোড়া ভাষণটি ভুলে গেলেন আর কি ‘‘এক গেলাস পানী’’ ক্ষলে ধপাস করে চেয়ারে ক্ষসে পড়লেন৷

এক্ষার ব্যারিষ্টার ভদ্রলোক উঠে দাঁড়ালেন৷ তিনি বললেন–আজ যে সকল বিদুষী মহিলা এই সভায় এসে ভাষণ দিয়ে আমাদের কৃতার্থ করলেন তাঁদের অন্যতমা হচ্ছেন আমাদের এই মহারাণী৷ সত্যিই এঁর ভাষণের তুলনা ভারতে কেন, সমগ্র বিশ্বে বিরল৷ এখন আমাদের খতিয়ে দেখার দিন এসেছে যে ভারতের মহিলারা আজ কত দুঃখে আছেন আর তাঁদের সেই দুঃখ দেখে মহারাণীর কোমল প্রাণ আজ কী পরিমাণ বিগলিত হয়েছে কী পরিমাণ দ্রবিত হয়েছে৷ মহারাণী প্রথমেই বললেন–‘‘ম্যায় ক্যা কহুঁ ম্যায় ক্যা কহুঁ ম্যায় ক্যা কহুঁ’’ অর্থাৎ ভারতীয় নারীর দুঃখ–দুর্দশার ইতিকথা এত পর্বতপ্রমাণ যে মহারাণী এর কোন্খানটা বলবেন আর কোন্খানটা না বলবেন ভেবে পাচ্ছেন না৷... ভারতীয় নারীর দুঃখের ইতিহাস মহারাণীর কোমল প্রাণকে এমন ওতঃপ্রোতভাবে গলিয়ে দিয়েছে যে মহারাণী ভেবে পাচ্ছেন না যে কোন্খানটি থেকে তাঁর বর্ণনা শুরু করবেন আর কোথায় বা হবে তার পরিসমাপ্তি৷ তাই মহারাণীর দরদী মন বলছে, ‘‘ম্যায় ক্যা কহুঁ...ম্যায় ক্যা কহুঁ...ম্যায় ক্যা কহুঁ’’৷ উঃ ভাবতেই পারছি না মহারাণীর কী অপূর্ব মমতা...মহীয়সী নারীর কী বিরাট হৃদয়বত্তা তারপর মহারাণী বললেন...মহারাণী কী বললেন...বললেন–বড্ডী গরম...বড্ডী গরম...বড্ডী গরম৷ অর্থাৎ অত্যাচারের নাগপাশে আজ ভারতীয় নারী পিষ্ট৷ শুধু যে রান্নাঘরের আগুনের উত্তাপেই তারা জ্বলেপুড়ে মরে যাচ্ছে তাইই নয়, অত্যাচারের নাগপাশের উষ্ণতাতেও তাদের দম বন্ধ হবার উপক্রম৷ সেই রান্নাঘরের উত্তাপ, সেই নাগপাশের দাবদাহ মহারাণীর কোমল মনকে স্পর্শ করেছে৷ মহারাণীর ওষ্ঠের মধুর হাসি মরুভূমির মারব জ্বালায় হারিয়ে গেছে৷ মহারাণী তাঁর অন্তরের বিদগ্ধ অনুভূতি, অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন কবির মাধুর্য্যময় মুন্সীয়ানায় ছোট্ট কয়েকটি শব্দে বললেন–‘‘বড্ডী গরম...বড্ডী গরম...বড্ডী গরম’’ অর্থাৎ এ অত্যাচারের অনল জ্বালা আমি সহ্য করতে পারছি না......এ উষ্ণতার ক্লেশ আমার কাছে অসহনীয়৷

শ্রোতা–জনতা করধ্বনি দিলেন৷ ব্যারিষ্টার সাহেব শামিয়ানা–নেত্রীকে অদ্রিতুঙ্গে উঠিয়ে দিলেন৷

*      *      *      *

তোমরা একজন শামিয়ানা–নেতার পরিচয় পেলে–একজন নেত্রীর পরিচয়ও পেলে৷ কেমন লাগল

মানবতা বাঁচাও

লেখক
শ্রীপথিক

১৯৮২’র ৩০শে এপ্রিল

বিজন সেতু লাল হয়ে গেল৷

সতের জন সন্ন্যাসী–সন্ন্যাসিনীর্ রক্তাক্ত দেহ

লুটিয়ে পড়েছিল ধূলায়৷

রক্তের নদী, পিশাচের নৃত্য

আগুনের লেলিহান শিখার মাঝখানে

‘বাঁচাও বাঁচাও’ রব–

‘বাঁচাও মানবতা’–

সেদিন সে কাতর আহ্বান

সবার অলক্ষ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল

দিক থেকে দিগন্তে–

দেশ থেকে দেশান্তরে৷

সেই  আহ্বান

সেই মশালের প্রদীপ্ত শিখা

একটি থেকে দু’টি, দু’টি থেকে চারটি......

এমনি করে বাড়তে বাড়তে হবে একদিন

মশাল মিছিল৷

আর সেই মশালের অগ্ণিতে

জ্বলে পুড়ে ছাই হবে

রাবণের স্বর্ণ লংকা৷

কিন্তু দানবেরা এখনও যে লুকিয়ে

কেউ প্রকাশ্যে কেউ অপ্রকাশ্যে

কেউ নিজ বেশে, কেউ ছদ্মবেশে

তাই তো–এ মশাল মিছিল    আজও চলছে৷

গ্রামে–শহরে বাজারে–বন্দরে

ভেতরে–বাইরে

সে পাপ শক্তি যে

আজও বিষাক্ত নখর নিয়ে

হিংস্র জন্তুর মত

ওত পেতে বসে আছে

তাই–

মহাভারতের শেষ সংগ্রামের জন্যে

প্রস্তুত হও পাণ্ডবেরা

যে যেখানে আছ

ন্যায় সত্য ধর্মের অভেদ্য বর্মে

হও সুসজ্জিত৷

প্রণাম সপ্তদশ দধীচি

লেখক
শ্রীমতী জয়া সাহা

আজও চারিদিকে খুনোখুনি, জঙ্গীহানা, সন্ত্রাস৷

মনুষ্যাকৃতি বর্বরেরা করে চলেছে উল্লাস৷

কালের স্রোতে সময় এগিয়ে চলে

তিরিশে এপ্রিল আবার ফিরে আসে

তিরিশে এপ্রিল এমনি এক দিনে,

একগুচ্ছ তাজা প্রাণ,  পড়েছিল ঝড়ে৷

নরঘাতকের অপ্রত্যাশিত আক্রমণে৷

তাজা রক্তে রাঙায়িত হয়েছিল মহানগরীর মাটি৷

বিজন সেতু তুমি হায় চিরসাক্ষী

তুমি চিরদিনের চিরকালের  প্রহরী৷

সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী-সন্ন্যাসিনীদের করুণ চিৎকার৷

আজও আকাশে-বাতাসে রয়েছে মিশে

পাপাচারীদের কীর্তি পড়ে গেছে জমা

ওরা কোনও দিন পাবে না, পাবে না ক্ষমা৷

৩০শে এপ্রিলের দিনে তাদের স্মরণে---

শত শত প্রণাম জানাই মোরা সেই দধীচি জনে৷

 

মাভৈ

লেখক
ডঃ সাধনা সরকার

পৃথিবীর গভীরতর আনন্দ

তুমি এসেছিলে

ভালবেসেছিলে

সুগন্ধে ভেসেছে অমল বিমল

তীর্থকারেরা৷

এমন সুগন্ধীর সময়

রক্তকরবী স্নান সেরেছে

তোমার পেলব হাতে

ভয় নেই

মাভৈঃ তোমার মন্ত্রক্ষরা

তরুলতা বিটপিতে আর

আমাদের আত্মকথা৷

 

বর্ণমালা......... কালীর গলায় মুণ্ডমালা অক্ষমালা

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

‘অক্ষ’ শব্দটির অনেকগুলি অর্থ রয়েছে৷ ‘অ’ বর্ণমালার প্রথম অক্ষর ও ‘ক্ষ’ বর্ণমালার শেষ অক্ষর৷ এই ‘অ’  ও ‘ক্ষ’–এর মাঝখানে রয়েছে আরও ৪৮টি অক্ষর৷ অক্ষরের মোট সংখ্যা ৫০৷ তাই ‘অক্ষ’ বলতে বোঝায় ৫০টি বর্ণকে৷ বর্ণমালার পরিবর্তে তাই অক্ষমালাও ব্যবহৃত হয়ে থাকে৷ অথর্ববেদীয় ভদ্রকালীর বর্ণনায় বলা হয়েছে, কালান্তরের দেবী মহাকালী বা ভদ্রকালী এই ৫০টি অক্ষরকে ধারণ করে রাখেন৷ সেকালের মানুষের লিপিজ্ঞান ছিল না৷ কিন্তু বর্ণ বা অক্ষর জ্ঞান ছিল৷ মন্ত্রাদি গুরুপ্রমুখাৎ শিষ্য কর্ণের মাধ্যমে গ্রহণ করতেন৷ সংসৃক্তে কাণকে ‘শ্রুতি’ বলা হয়৷ এই কারণে কাণের মাধ্যমে শেখা বেদকে ‘শ্রুতি’ বলা হ’ত৷

হ্যাঁ, সেকালের মানুষ লিখতে জানত না৷ তাই তারা ৫০টি অক্ষরের পরিবর্তে মানুষের ৫০টি মুখ কল্পনা করে নিত৷ ভাবনা নেওয়া হ’ত, সৃষ্টির আদ্যাক্ষর ‘অ’ আছে ভদ্রকালীর হাতে, বাকীগুলো আছে গলার মালা হিসেবে যদিও মহাকাল নামে কোন অবিচ্ছিন্ন সত্তা নেই৷ তাই দার্শনিক বিচারে মহাকাল বা মহাকালী সত্তা যুক্তির সমর্থন পায় না৷ কাল প্রতি মুহূর্তে তৈরী হচ্ছে ক্রিয়ার গতিশীলতার ওপর মননের পরিমাপে৷ তবু সেকালের মানুষ ভেবেছিল হয়তো বা প্রলয় হবে, হয়তো বা সবকিছু ধ্বংস হবে৷ সেকালের মানুষ বিজ্ঞানের উপযুক্ত জ্ঞানের অভাবে প্রলয়ের কল্পনা করেছিল, একদিন সব কিছু ধবংস হয়ে যাবে–এই ধরনের ভয় দেখানো হয়েছিল৷ প্রলয়কালে ভদ্রকালী বর্ণগুলিকে রক্ষা করবেন যদিও দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক যুক্তি প্রলয়বাদের বিরুদ্ধে৷*(বিশ্বের কখনও তাপগত মৃত্যু–thermal death–হবে না, সত্তাবিশেষের তাপগত মৃত্যু অবশ্যই হতে পারে বা হবে কিন্তু সে ক্ষেত্রেও কঠিন জড়ে রূপান্তরিত সত্তা অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ ও সমিতির–clash and cohesion– ফলে প্রচণ্ডবেগে ভেঙ্গে পড়বে ও তার পরিণামে বিরাট পরিমাণ শক্তি ছুটে বেরিয়ে আসবে–Immense heat energy will be released from the broken structures –যা বিশ্বের তাপগত মৃত্যু হতে দেবে না৷) যাই হোক সেকালের মানুষ যা ভাবত তাই বলছি৷ তারা ভাবত, ভদ্রকালী প্রলয়কালে ধবনি রক্ষা করবেন৷ অক্ষরজ্ঞান ছিল না৷ তাই অক্ষরের দ্যোতক হিসেবে মানুষের মুখকে ব্যবহার করত৷ তাই শেষ পর্যন্ত মানুষ অক্ষমালাকে মুণ্ডমালা বলে ধরে নিয়েছিল৷ ভদ্রকালীকে কল্যাণের প্রতীক বলে গ্রহণ করে শান্তি পেয়েছিল৷

প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা ভাল, বেদ যাঁরা তৈরী করেছিলেন, তাঁরা বেদ লিখে যাননি৷ বেদের ঋক্ বা শ্লোক মুখে মুখে তৈরী করে তাঁরা শিষ্যদের শিখিয়ে গেছেন গানের সুরে গেয়ে গেয়ে৷ তাই সুর ছিল, ছন্দ ছিল, ব্যাকরণ ছিল, কল্প ছিল, নিরুক্ত ছিল, ছিল না লেখাপড়ার মধ্যে কোন কিছু৷ বেদ শিক্ষার যে ছ’টি অঙ্গ অর্থাৎ ছন্দ, কল্প, নিরুক্ত, ব্যাকরণ (এতে মতভেদ আছে), জ্যোতিষ ও আয়ুর্বেদ (এতেও মতভেদ আছে? অনেকের মতে আয়ুর্বেদ নয়, ধনুর্বেদ)–এই ছ’টি অঙ্গকে বলা হ’ত বেদাঙ্গ৷ এই বেদাঙ্গ ছিল অলিখিত কারণ মানুষের তখন লিপি–জ্ঞান ছিল না৷ লিপি–জ্ঞান না থাকায় সেকালের মানুষ বেদকে শ্রুতি (কাণে শুণে শেখা কাণের একটা নাম ‘শ্রুতি’) হিসেবে রেখে দিয়েছিলেন৷ পরবর্তীকালে মানুষের যখন লিপি জ্ঞান হ’ল, তখনও বেদকে তাঁরা লিখতে চাইলেন না৷ তখন তাঁদের মাথায় পর্বতপ্রমাণ এমন একটা কুসংস্কার জমে গেছে যে বেদ বুঝি লিখতে নেই৷ তাঁরা তলিয়ে দেখলেন না যে পূর্বপুরুষদের লিপি–জ্ঞান ছিল না বলেই তাঁরা বেদ লেখেননি, থাকলে নিশ্চয়ই লিখতেন৷

উৎস

(‘‘বর্ণবিচিত্রা’’ থেকে গৃহীত৷–সম্পাদক৷)

জিজ্ঞাসু

মানুষ মানুষকে ঠকাচ্ছে, দুর্বল বুদ্ধির  মানুষ ধূর্তবুদ্ধি দ্বারা প্রতারিত হচ্ছে শোষিত হচ্ছে, কেউ কেউ  সেই কারণেই ঠকে  শিখছে, সচেতন হচ্ছে৷ আবার  এমনও মানুষ আছে যে বিশ্বাস করে এটা তার ভাগ্যে ছিল, ধূর্ত বুদ্ধি মানুষেরা ওই দুর্বলতার সুযোগ নেয়৷ প্রশ্ণ---কিসের কারণে একজন মানুষ ধূর্ত নিষ্ঠুর ও নৃশংস হয়ে  যায়? যে বাচ্চা জন্ম থেকেই মা বাবার স্নেহ যত্নে সুরক্ষা পায়না,  জীবনের কোন মানে খঁুজে পায় না, চোখের সামনেই দেখছে সর্বনাশা ধূর্তবুদ্ধিরাই  সমাজেরই  হীরো, বুঝে নিচ্ছে এখানে  বাঁচতে  হলে হয় চাটুকার  ইঁদুর হয়ে পায়ের তলায় থাকো  অথবা সবাই  কে কিনে  নিয়ে সিংহ  হয়ে থাকো৷  এমন পরিবেশ থেকেই জন্ম হয় ও বেড়ে ওঠে মানুষ নামে  যে প্রাণীটি  সে তখন আর সুস্থ থাকে না, হয় শয়তান, অসুর ধূর্তবুদ্ধি অসামাজিক, মদ্যপ, লম্পট৷

মূল অসুখটা কোথায়? মানুষের সমাজই  তো তৈরী হয় নি৷ তাই তো একসাথে  পথ চলার পরিবেশ  নেই৷  হাজার রকমের ভয়, অসুখ, দারিদ্র্য তো আছেই ৷ তার থেকেও বড় কথা, শুধুমাত্র কি খাওয়ার জন্যে, আত্মরক্ষার জন্যে এত লড়াই কেন? কোন মানুষ বা কোন প্রাণীই সহজে মরে যেতে চায় না? সবাই বেঁচে থাকতে চায়৷

কিন্তু কিসের কারণে, কী উদ্দেশ্যে  এই মানুষের  বেঁচে থাকা---সেটা জানা নেই৷ এর ফল হ’ল ভয়ানক৷ এই অজ্ঞানতার জন্যে, সারা পৃথিবীর মানুষ লোভ, লালসা, রোগ, শোক বা অকারণে ধর্ম  বা রাজনীতি  বা জাতপাত বা ভাষা বা চামড়ার শাদা কালো নিয়ে ভাতৃঘাতী যুদ্ধে লিপ্ত, অসুখী, অসুস্থ,অশান্ত৷ বিজ্ঞানের এত গতি, এত সুবিধা পেয়েও মানুষ বাধ্য হয়ে নেশার দাস হয়ে অকালে ঝরে যাচ্ছে ৷ কারণ তাকে কেউ জানায়নি যে মানুষের জীবন অনন্ত সম্ভাবনা দিয়ে ভরা৷ কত কাজ করা বাকী, কত কিছু হওয়া বাকী! পৃথিবীটা একদিন একটা পরিবার হয়ে এক সাথে বেড়ে উঠবে৷ এই কথাটা বুঝে নেবার সময় এসে গেছে৷

ফোঁস কথার ফ্যাসাদ 

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

‘খরগ্রহ’ শব্দের ভাবারূঢ়ার্থ হল যেখানে  অনেক গাধা রয়েছে৷ যোগারূঢ়ার্থে এক-একটি মানে হল গাধার আস্তাবল৷  দ্বিতীয় মানে হচ্ছে প্রাচীনকালে যখন দ্রুতগামী যানবাহনের ব্যবস্থা ছিল না তখন রাজপথ ধরে দূর দূরান্তে মানুষ চলত পদব্রজে৷ অবস্থাবান মানুষেরা ও নারীরা চলতেন শিবিকায় (দোলায়)৷ পাল্কী জিনিসটা তখনও আমাদের দেশে আসেনি৷ ওটি  এনেছিলেন ইয়ুরোপীয়রা৷ Palanquin’ শব্দ  থেকে ‘পাল্কী’ শব্দটি এসেছে৷ এই শিবিকা বা দোলার ব্যবহার  নারীদের জন্যে  তো করতে হতই, অবস্থাপন্ন মানুষেরাও বেশী দূর যেতে হলে শিবিকায় বা দোলায় যেতেন৷ ছোটখাট দোলা (দ্বিদোলা) দু’জন লোক কাঁধে বহন  করত৷ আর বড় দোলা বহন করত চারজন  লোকে (চতুর্দোলা)৷ দূর পাল্লার পথে গো-শকট, গর্দভ-শকট, ঘোটক শকটের ব্যবস্থা তো ছিলই৷ তবে  সাধারণতঃ মালবাহী শকটের জন্যে  গর্দভ শকট অধিক ব্যবহৃত হত৷  এই ‘শকট’ শব্দ থেকে ওড়িয়ায় ‘শগর’ শব্দটি  এসেছে৷

 যাইহোক, সরকারী ডাক ও কিছুটা বে-সরকারী ডাক বহনের  জন্যেও ঘোটক-শকট অথবা অশ্বারোহী মানুষ কাজ করে দিত৷ দূরগামী মানুষ ও শকটের  জন্যে প্রতি যোজন অন্তর (আন্দাজ ছ’ক্রোশ বা বার মাইল) একটি করে চটি (প্রাচীন তামিলে চউলট্রি ও সংসৃকতে ‘চউট্রি’, বাংলায় ‘চটি’ শব্দ এসেছে) বা সরাই থাকত৷ হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চলে তীর্থযাত্রীদের জন্যে আজও এই ধরনের চটি রয়েছে৷ আমাদের আসানসোলের কাছে রয়েছে নিরসাচটি, বর্ধমানের কাছে নঈসরায়, মুঙ্গেরের কাছে রয়েছে পূরসরায় ও সোফিয়াসরায়, কাশীর কাছে রয়েছে মোগল সরায়৷  তা সেই  সরকারী সরক ধরে যে যোজনান্তর চটি বা সরায় থাকত সেখানে যাত্রীদের জন্যে জ্বালানী কাঠ, জল ও কাঁচা খাদ্যের ব্যবস্থা থাকত৷  লোকেরা নিজে রেঁধে খেতেন৷ যাঁরা রাঁধতে পারতেন না তাঁদের জন্যে রেঁধে দেবার লোকও থাকত৷  এই চটি বা সরায়ের  কাছাকাছি জায়গায় থাকত খরগৃহ, যেখানে  পরিশ্রমে ক্লান্ত পশুরা বিশ্রাম নিত,তাদের  দানা-পানী পেত৷ যাঁরা ডাক বহন করতেন (ডাকহরকরা) তাঁরা ওখানে এসে অনেক সময় বিশ্রাম নিতেন! আবার  অনেক সময়  কর্মচারী-বদলও ওই স্থানে  করে দেওয়া হত৷  কর্মচারী বদলের সঙ্গে সঙ্গে  অনেক সময় বাহক  পশু বা শকটের  পরিবর্তনও করে দেওয়া হত৷ এখন তোমরা উত্তর ভারতের  দিকে  যাবার সময় বিহার ও উত্তর প্রদেশের পথপার্শ্বে কিছু কিছু এই ধরণের  গুমটি হয়তো দেখে  থাকবে৷ তা’ পশুদের জন্যে নির্দিষ্ট সেই গুমটিতে গোরু, গাধা, ঘোড়া, যাই থাকুক না কেন তাদের সাধারণ শব্দ ছিল ‘খরগ্রহ’৷

খরগ্রহের  কথা বলতে গিয়ে একটি গল্পের কথা মনে পড়ল৷ একবার এক সুকল-ইন্সপেক্টর সাহেব বেশ পণ্ডিত মানুষ তো ছিলেনই, সংসৃকতে ছিল তাঁর অসামান্য দখল৷ যে বিদ্যালয় পরির্দশনে গেছলেন সেখানকার সংসৃকতের পণ্ডিত মশায়ও ছিলেন ধুরন্ধর পণ্ডিত৷ মানুষটি বেশ ভাল, তবে একটু স্পষ্টবাদী৷ ইন্সপেক্টর সাহেবের বিদ্যালয়টির কোন কিছুই পছন্দ হল না৷ সংসৃকতের ক্লাশে  গিয়ে তিনি তো রেগেই টং৷ পণ্ডিতজীর দিকে তাকিয়ে রোষকোষায়িত নয়নে বললেন--- এটি কি বিদ্যালয়, না  ‘খরগ্রহ’ (গাধার ঘর) ?

পণ্ডিত মশায় তাঁর কথাটা গায়ে না মেখে হাসতে হাসতে  ললেন--- একটা অনুরোধ রাখবেন স্যর?

ইন্সপেক্টার সাহেব বললেন--- কী অনুরোধ! কিসের অনুরোধ! কেন অনুরোধ!

পণ্ডিতজী ললেন--- আপনি  দয়া করে দরজার চউকাঠের  বাইরে দাঁড়ান স্যার, নইলে আমি মনে অত্যন্ত ব্যথা পাব৷

ইন্সপেক্টর সাহেব বললেন--- আমি ঘরে থাকলে ব্যথা পাবেন, আর আমি চউকাঠের বাইরে দাঁড়ালে ব্যথা দূর হবে, এ কেমনতর কথা৷

পণ্ডিতজী বললেন--- ‘‘খরগ্রহ’’ মানে যে ঘরে গাধারা থাকে৷ আমরা তো গাধা আছিই...ছিলুম... থাকবও৷ কিন্তু আপনাকে আমরা একমূহুর্তের জন্যেও  গাধা বলে ভাবতে চাই না৷ তাই  আপনাকে  অনুরোধ করছি আপনি  ঘরের বাইরে থাকুন৷

     *          *    *    *

‘খর’ সম্বন্ধে আরো একটি ছোট্ট গল্প মনে পড়ল৷ একবার নাকি পাটনা সচিবালয় থেকে কোন একজন বি.ডি.ও, সাহেবের কাছে একটি পত্রাঘাত গেছল যে তিনি যেন আগামী চবিবশ  ঘণ্টার মধ্যে জানিয়ে দেন তাঁর ব্লকে কতগুলি ‘খর’ অর্র্থৎ গাধা আছে৷

তোমরা সেই পটনা সচিবালয়ের গল্প জান তো? একবার আকল্মন্দ সিং বাঁকীপুর রেল ইষ্টিশান থেকে (এখন ইষ্টিশানটির নাম হয়েছে পটনা জংশন) সেক্রেটারিয়েট যাচ্ছিলেন৷ ইষ্টিশনে তিনি রিক্সাওলাকে বলেছিলেন--- ‘‘মুঝে সচিবালয় লে চলো’’৷

রিক্সাওলা তাঁর কথা ঝতে না পেরে লেছিল--- সা’ব, রাষ্ট্রভাষামে বোলিয়ে, সচিবালয় মুঝে মালুম নেহী হৈ৷ আকল্মন্দ সিং লেছিলেন---  সচিবালয় তুমহে মালুম নহীঁ?  সচিবালয়! সচিবালয়! জিস্কো আংরেজীমেঁ সেক্রেটারীয়েট  কহতেঁ হৈ৷

রিক্সাওলা তাকে বলেছিল--- বহী বোলিয়ে সেক্রেটারীয়েট, আপ রাষ্ট্রভাষা মেঁ  কিঁউ নহী বোলতে হেঁ?  কিঁউ আপ আংরেজীমেঁ ‘সচিবালয়’ ‘সচিবালয়’ বোলতা হেঁ? আজকাল আংরেজী কা জমানা নহীঁ হৈ৷

তা’সে যাইহোক, সেই পটনা সচিবালয় থেকে পত্র দণ্ডটি পেয়ে বি.ডি.ও সাহেব তাঁর বি. এল ডব্লিউ Village  level worker)  বা গ্রামসেবককে বললেন---তিনি যেন চবিবশ ঘন্টার মধ্যে তথ্যটি পটনা সচিবালয়ে পাঠিয়ে দেন৷ বি.এল. ডব্লিউ. তো খবরটা শুণে ভয়ে চক্ষুস্থির ৷ চবিবশ ঘন্টার মধ্যে  সে কী করে তাদের বাহাত্তরটি গ্রামে গিয়ে গাধার সংখ্যা নিয়ে আসবে৷ যখন তেইশ ঘন্টা উর্ত্তীণ হয়ে গেল তখন বি.ডি. ও  সাহেবের  কাছে  গিয়ে কেঁদে  কেটে আছড়ে পড়ে বললে--- স্যার, আর চাকরি বাঁচানো গেল না৷  আমি মাত্র দশটি গ্রামে এযাবৎ ঘুরতে পেরেছি৷ এখন যেভাবে হো’ক আমার চাক্রিটা বাঁচিয়ে দিন স্যর!

বি.ডি.ও সাহেব বললেন---সে জন্যে ঘাবড়াচ্ছো কেন? তুমি শুধু জানিয়ে দাও, আমি কেবল তিনটি গাধার সন্ধান জানি৷

বি.এল.ডব্লিউ. বি.ডি.ওকে  শুধোলেন--- তিনটি গাধা কে  কে  স্যর !

বি.ডি. ও সাহেব ললেন--- এক গদ্হা তুম, দুসরা গদহা মঁৈ, অঔর তীস্রা গদ্হা সচিবালয় কা বহ আফুসার জিন্হোনে গদ্হাওলা রাপোর্ট মাংগা৷

(শব্দ চয়নিকা-১৩শ খণ্ড)

ধোঁয়ার কুণ্ডলী

লেখক
শ্রীপথিক

কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়ায়

ক্ষুদ্র আমার এই ঘরখানি বিষাক্ত হয়ে গেছে৷

ছাতের এ আবরণ খুলে দাও

এ ধোঁয়ার কালি  নীলাকাশে মিলেমিশে

নিষ্কলঙ্ক নীল হয়ে যাবে৷

তোমার বীণা

লেখক
কৃষ্ণলাল দাস

তোমার বীণার সুরে সুরে

     বিশ্বভুবন গেছে ছেয়ে

পরশ তাহার পেলাম খুঁজে

     তোমারই গান গেয়ে গেয়ে৷

সেই সুরের মধুর তানে

     লাগল দোলা আমার প্রাণে

মাতাল হল মন যে আমার

     সেই সুরের পরশ পেয়ে৷

তোমায় আমি খুঁজে ফিরি

     আমার সুরে সুরে

কোথায় তোমার নিবাস ওগো

     কোন্ সে সুদূরে

তোমার সুরে হলে হারা

তবেই তোমার পাই গো সাড়া

     তোমার বীণার আনন্দধারা

     এবার গেল ছেয়ে৷

 

সৃষ্টি করে’ বিশ্বটাকে

লেখক
সাক্ষীগোপাল দেব

সৃষ্টি করে’ বিশ্বটাকে

     রইলে সবার অলখে

সৃষ্টি স্থিতি প্রলয় খেলা

     করছ তুমি পলকে৷৷

সাজিয়ে দিলে আলোক মেলায়

     মাতছো কত রঙের খেলায়

করছো লীলা সবার সাথে

     উঠছো চিতে ঝলকে৷৷

তোমার লীলায় তুমি হারা

     নেইকো কিছুই তুমি ছাড়া

সৃষ্টি থেকেই খঁুজছো তুমি

     সৃষ্টিছাড়া তোমাকে৷৷