প্রভাতী

বন্ধু

লেখক
বাসনা বিশ্বাস

বন্ধু তুমি পরম বন্ধু,

    থাকো আমার সাথে৷

দুঃখের রাতে সুখের দিনে

    আনন্দ প্রভাতে৷

যখন আমি একা একা

    হারিয়ে ফেলি দিশা৷

ছদ্মবেশে বন্ধু সেজে

    ঘুচাও যে দুর্দশা৷

মায়ার ডালে বদ্ধ হয়ে

    যখন তোমায় ভুলে থাকি

ধুলো খেলা দিয়ে আমায়

    ভুলিয়ে রাখো নাকি?

ঝড়–তুফানে গহন বনে –

    দুঃখের নিশি রাতে–

তোমার পরশ পাইগো আমি

    নীরব নিভৃতে৷

দুঃখের রাতে তোমার সাথে

    ক্ষণিক অনুভবে

তোমার পরশ পাই যে আমি

    হূদয় আবেগে৷

চোখের জলে বুক ভেসে যায়

    পেলে তোমার ছোঁয়া৷

দুঃখ মাঝে আনন্দ পাই

    কাটে ভবের মায়া৷

মাঝে মাঝে কৃপা করে

    দুঃখ দিও প্রভু

দুঃখের বাতি জ্বেলে তোমার

    আরতি করিব৷

নোতুনের ডাক

লেখক
সুকুমার সরকার

আবার এক ফাল্গুন এসে গেছে৷

স্তব্ধ নগরীতে তোমার পদধ্বনি

নোতুন পৃথিবীতে নতুন এক বার্তা এনেছিল৷

আমি চিরকালের ডাক হরকরা

ঘরে ঘরে নতুনের বার্তা পৌঁছাতে গিয়ে

জীর্ণ কঙ্কালে কখনো যদি মুখ থুবড়ে পড়ি

আর একবার পদধ্বনি দিও একান্ত গোপনে

শব্দের কারিগর প্রতিটি অলিখিত ভাষার

রাগবৈভব ফুটিয়ে তোলো শিমূল পলাশের বনে৷

 

আমি শুধু পিঠে করে বয়ে নিয়ে যাবো

নোতুনের ডাক৷


 

জীবন রণাঙ্গণ

লেখক
অনির্বান

জীবনের পথ ধরে যেতে যেতে

কতবার থেমে গেছি৷

অজানা ভয় আর অজানা শঙ্কায়৷

তারপর৷

একটা সময় পরে, অজানা সে পথিকের,

কোমল স্পর্শ পেয়ে শান্ত হ’ল মন৷

তাই বার বার জিতে গেছি জীবন রণাঙ্গণে৷

অবাক বিস্ময়ে ভেবেছি,

কে তুমি অজানা পথিক

জীবনের অন্ধকারে আলো জ্বেলে পথে পথে৷

এলে তুমি নিয়ে যেতে, তোমারই কাছটিতে৷

একাকী দিনের শেষে, কখনো গভীর নিশীথে

ভেবে গেছি একা একা নিদ্রাহীন সময়কে মেপে

কখনো গভীর রাত, তারা ভরা সন্ধ্যাকাশ৷

ভেবে গেছি কে তুমি, কেন ধরা দাও না আমায়

শেষের সময় এসে ভাবি, শুধু ভাবি আমি৷

বিশ্বভরা বিরাটের মাঝখানে,

তুমি ওগো কত না বিরাট৷

 

মামার বাড়ির ময়না

লেখক
চিরস্মিতা ভৌমিক

আমার মামার বাড়িতে একটা ময়না পাখি এনেছিল, তখন আমার বয়স পাঁচ বছর৷ যখন আমার সাগরদাদা পাখিটাকে বাড়িতে আনে তখন ময়না পাখিটা খুব ছোট ছিল৷ সে কিছু বলত না চুপ করে থাকত৷ দাদাভাই পাখিটার নাম দিল মিঠু৷ একমাস পরে আমার দাদাকে সাগর বলে আর আমাকে সোনাই বলে ডাকল৷ কয়েক মাস পরে যখন আমি মামার বাড়িতে যাই তখন মিঠুকে বারান্দায় একটা খাঁচায় দেখতে পাই৷ দেখা মাত্রই বলে উঠল, মনাগো দেখ সোনাই এসেছে৷ আমার দিদুকে মিঠু মনা বলে ডাকত৷ মিঠু লঙ্কা দিয়ে ভাত খেতে পছন্দ করত৷ কিন্তু যেদিন রাগ করত সেদিন দিদুকে জোর করে তাকে ভাত বা কলা খাইয়ে দিতে হত কিন্তু ভুজিয়া পেলে সব রাগ গলে যেত৷ ভুজিয়া মিঠুর সব থেকে প্রিয় ছিল৷ তবু একদিন খাঁচার দরজা খোলা পেয়ে মিঠু ফুরুৎ করে উড়ে যায়৷ অনেক দিন পরে দাদাভাই যখন বারান্দায় বসে কাঁদতে কাঁদতে বলছিল, মিঠু তুই কোথায় চলে গেলি? তখন নারকেল গাছ থেকে উত্তর দিল, এইতো সাগর আমি এখানে৷ তারপর পুনরায় তাকে খাঁচায় পুরে দাদাভাই বলল, তুই কেন চলে গিয়েছিলি? মিঠু বলল, কেন তোমরা আমাকে খাঁচায় বন্ধ করে রাখ? দাদাভাই বলল, ঠিক আছে এখন থেকে তোর খাঁচার দরজা খোলাই থাকবে৷ সন্ধ্যা হলে দাদাভাইকে বলত, সাগর পড়তে বস৷ আর আমাদের বলত, সোনাই দুষ্টুমি বন্ধ কর৷ কোনদিন আমি তোমাদের ফেলে কোথাও যাবনা৷ সন্ধ্যার আগে মিঠু বারান্দার খাঁচাটাতেই থাকত, সন্ধ্যা হলে দাদাভাই ঘরে নিয়ে আসত৷ বারান্দায় দুটো চেয়ার ছিল৷ আমি ও আমার দাদাভাই সন্ধ্যার আগে যখন বারান্দায় বসতাম তখন মিঠু আমাদের হরে কৃষ্ণ, ফুলে ফুলে, আমরা সবাই রাজা নানান গান শোনাত৷ আমি প্রায় সময়ই মামারবাড়ি যাই৷ বারান্দায় দুটি চেয়ার ঠিক সে জায়গায়ই আছে৷ খাঁচাটাও আছে কিন্তু মিঠু আর নেই৷ খাঁচাটা ফাঁকা পড়ে আছে৷

কারণ মিঠু অসুস্থ হয়ে মারা গেছে৷ এখন আর কেউ বলে না, সোনাই দুষ্টুমি বন্ধ কর আর সন্ধ্যার আগে কেউ গানও শোনায় না৷ বলেছিলি তো আমাদের ছেড়ে কোথাও যাবি না৷ এখন কেন তুই আমাদের ফেলে চলে গেলি? আমি জানি তুই আমাদের মধ্যেই বেঁচে আছিস৷

দানও নিলেন, দক্ষিণাও নিলেন

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

একটি প্রাচীন বাংলা গানে ‘কোদণ্ড’ শব্দটি কোদাল অর্থে ব্যবহৃত হয়েছিল৷ গানটি রচনা করেছিলেন সুবিখ্যাত পাঁচালী গায়ক দাশরথি রায়–সংক্ষেপে দাশু রায়৷ বাংলার এই জন্মসিদ্ধ প্রতিভা দাশু রায় কবিতায় কথা বলতে পারতেন......পারতেন গানেও কথা বলতে৷ সংস্কৃত শাস্ত্রেও ছিল তাঁর প্রচণ্ড দখল......আর প্রচণ্ড দখল ছিল যেমন বাংলায় তেমনি সংস্কৃতেও৷ তার সঙ্গে তিনি ছিলেন মজলিশী মেজাজের মানুষ৷ লোককে হাসাতে পারতেন দারুণ৷

সেই যে গল্প আছে না দাশু রায় একবার ক্ষর্দ্ধমান জেলার একটা প্রকাণ্ড মাঠ পার হচ্ছিলেন৷ সেকালে ক্ষর্দ্ধমান জেলার গ্রামগুলি ছিল খুব বড় বড় আর দূরে দূরে অবস্থিত৷ এখনও দেখবে, বাংলার বড় বড় গ্রামগুলির বেশীর ভাগই ক্ষর্দ্ধমান জেলায়৷ সেকালের সেই মাঠে রাত্তিরে তো বটেই, এমনকি দিনে দুপুরেও লেঠেলরা ওৎ পেতে বসে থাকত রাহাজানির উদ্দেশ্যে৷ একবার দাশু রায় ওই ধরনের একটা বড় মাঠ পার হচ্ছিলেন৷ সন্ধে তখন হব–হব৷ দাশু রায় যাচ্ছিলেন একটা বড় বট গাছের পাশ দিয়ে৷ হঠাৎ গাছের ওপর থেকে লাফিয়ে নেবে পড়ল কয়েকজন লেঠেল৷ তারা দাশু রায়কে বললে–তোমার কাছে যা কিছু আছে সব দিয়ে দাও৷

দাশু রায় বললেন–আমি গরীব ব্রাহ্মণ......আমি দান–টান বুঝি না......আমি পরিগ্রহ বুঝি৷ তোমাদের সঙ্গে যা কিছু আছে তোমরাই সে সব আমাকে দাও৷

ডাকাতরা পড়ল মহা ফ্যাসাদে৷ বামুণ দান চাইছেন৷ না দিয়েই বা থাকে কি করে আবার এদিকে না কাড়লে ডাকাত হিসেবেই বা মান বাঁচে কী করে৷ তারা তখন দাশু রায়কে বললে–তোমাকে চিনেছি ঠাকুরমশায়, তুমি তো দাশু রায়৷ তা’ তুমি আমাদের একটা মজার কথা শোনাও৷ আমরা তাতে সন্তুষ্ট হয়ে তোমাকে ছেড়ে দোব৷

দাশু রায় বললেন–এ অবস্থায় কার ঠোঁটেই বা মজার কথা আসে বল তা গাছের নীচে তো দেখছি তোমরা তিনটি মূর্ত্তিমান দাঁড়িয়ে আছ৷ তোমাদের আত্মীয়–স্বজন জ্ঞাতি–কুটুম্ব আর ক’জন ওই গাছের ওপরে হুপ্ হুপ্ করছে বল তো

ডাকাতরা ক্ষুঝলে, দাশু রায় তাদের বাঁদর বলে গালি দিলেন৷ কিন্তু বলবার কিছুই ছিল না৷

দাশু রায় বললেন–কথা বেচে খাওয়াই আমার জীবিকা৷ আমার যে প্রাপ্য পূরণ তা দিয়ে দাও৷ ডাকাতরা তাদের যথাসর্বস্ব দাশু রায়কে পেণ্ণামী হিসেবে দিয়ে দিলে৷

*      *      *

সেই দাশু রায় একবার চুঁচড়োয় এসেছেন ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের সভায় পাঁচালী গাইতে৷ চুঁচড়ো তখন সংস্কৃত পণ্ডিতদের কেন্দ্র হিসেবে প্রসিদ্ধি অর্জন করেছিল (আর যে সকল স্থান সেকালের রাঢ়ে প্রসিদ্ধি অর্জন করেছিল তারা হ’ল ভাণ্ডারহাটি, ত্রিবেণী, দশঘরা, বাঁশবেড়ে, জনাই, পেঁড়ো–বসন্তপুর, মাকড়দা, বালী, তমলুক, কাঁথি, মেদিনীপুর, সবঙ্গ, চন্দ্রকোণা, বিষ্ণুপুর, ইন্দাশ (বাঁকুড়া), সিমলাপাল, সোণামুখী, বর্দ্ধমান, কালনা, পূর্বস্থলী, কাটোয়া, কেতুগ্রাম, ইন্দাশ (বীরভূম), শিউরী, মলুটী, সর্পলেহনা, কঙ্কালীতলা, কুন্তলা, করীধ্যা (বীরভূম) প্রভৃতি স্থান৷ সেখানে রাঢ়ে বিভিন্ন স্থান থেকে বড় বড় পণ্ডিতরা এসেছেন....হচ্ছে দাশু রায়ের পাঁচালী গান৷ তিনি তাঁর গানের এক জায়গায় কোদাল অর্থে ‘কোদণ্ড’ শব্দটি ব্যবহার করলেন (গানের প্রথম লাইনটি ছিল ‘দোষ কারোর নয় গো মা’)৷ পণ্ডিতেরা একে অন্যের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন৷

তাঁরা বললেন–এ কী কথা দাশু রায়ের মত পণ্ডিত মানুষ ‘কোদণ্ড’ শব্দটি ভুল অর্থে ব্যবহার করলেন পাঁচালী গান হওয়ার পরে পণ্ডিতদের সভা বসল৷

তাঁরা বললেন–যদিও ‘কোদণ্ড’ শব্দটি কোদাল অর্থে চলে না কিন্তু দাশু রায়ের মত প্রখ্যাত পণ্ডিত ও প্রতিভাধর মানুষের সম্মান রক্ষার জন্যে আমাদের উচিত কোদাল অর্থে ‘কোদণ্ড’ শব্দটিকে মেনে নেওয়া৷ সংস্কৃতে এমন আর্ষ প্রয়োগের ঘটনা অজস্র রয়েছে৷ সুতরাং আরেকটি আর্ষ প্রয়োগ বাড়লই বা তাই তখন থেকে ‘কোদাল’ অর্থেও ‘কোদণ্ড’ শব্দটি চলে আসছে৷

এই লব্ধপ্রতিষ্ঠ দাশু রায় ছিলেন বর্ধমান জেলার পূর্বস্থলীর নিকটবর্ত্তী চুপী গ্রামের সন্তান৷ কবি সত্যেন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষেরাও এই চুপী গ্রামের অধিবাসী ছিলেন৷ এখন তোমরাই বিচার বিবেচনা করে আমাকে জানাও তোমরা চুঁচড়োর পণ্ডিত সমাজের এই বাতিক মানতে রাজী আছো কি না অর্থাৎ কোদাল অর্থে ‘কোদণ্ড’ শব্দটি ব্যবহার করবে কি না৷ কোদালের নিজস্ব সংস্কৃত হচ্ছে ‘কুদ্দালিক’৷

জীবন মানে

লেখক
শিবাশীষ সেনগুপ্ত

জীবন মানে হঠাৎ পাওয়া

জীবন মানে আশা

জীবন মানে তুমি আমি

জীবন ভালোবাসা৷

জীবন মানে সূর্য ওঠা

জীবন মানে ফুল

জীবন মানে অঙ্ক কষা

জীবন মানে ভুল

জীবন মানে ছুটির হাওয়া

জীবন মানে আজ

জীবন মানে ইঁদুর দৌড়

জীবন মানে কাজ৷

 জীবন মানে বাঁচার লড়াই

জীবনই রাজনীতি

জীবন মানে ছন্নছাড়া

জীবনই পরিস্থিতি

জীবন শত দুঃখ

জীবন মানে স্বপ্ণ দেখা

জীবন মানে সুখ

জীবন মানে আঘাত  পাওয়া

জীবন মনে একা

নব্যমানবতাবাদ

লেখক
গোবিন্দ সরকার

 বিধাতার  এক অমোঘ সৃষ্টি  ব্রহ্মাণ্ড ধরা,

জীবজন্তু  কীটপতঙ্গ অরণ্যাদিলতা,

অচল মরু  ঝর্র্ণ ধারা  মন্দাকিনী স্রোতা৷

বিস্ময়কর সৃষ্টি যে তাঁর মানুষ  হল সেরা৷

 প্রিয় সৃষ্টি মানুষে কেন লোভ  হিংসা দ্বেষ?

আগ্রাসনী স্বার্থযুদ্ধে ধবংস বিভীষিকা,

সুখ স্বস্তি মেলে কী কভু ? দেখে শুধু মরীচিকা৷

যাপন জীবন  হাহাকারময়  অনুশোচনীয় শেষ৷

 

সেরার অভিধা মানুষ  এবে মানবিক হও  দেখি,

প্রেম ভালবাসা সেবা কর্মে ধরাকে  করতো সুখী৷

তিমির রাত্রি অবসান  হোক ভরুক  প্রভাত দ্যুতি,

নব্যমানবতা ছড়িয়ে  পড়ে  শ্রষ্টা আনন্দমূর্ত্তি৷

 সকলজীবে হার্দিকে  প্রেম মনন অনুভবি,

নবচেতনার প্রভাত আলোকে দীক্ষিত হয় কবি৷

নোতুন পৃথিবী

লেখক
আচার্য প্রসূনানন্দ অবধূত

নববর্ষের নোতুন আলো

নাশুক সবার মনের কালো

হিয়ার মাঝে প্রদীপ জ্বেলে

তন্দ্রা ভেঙ্গে জাগিয়ে দিলে৷

প্রাণের পরাগ ছড়িয়ে দিলে

স্বপ্ণলোকের সুর শোনালে

কে তুমি মোর মন রাঙালে?

বিশ্বদোলায় সবে দোলালে৷

মধুর পরশে হরষে মাতালে

আলোর পথের দিশা দেখালে

বললে সবে এগিয়ে চল

নোতুন পৃথিবী গড়ে তোল৷

 

গঞ্জের গজার গপ্পো

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

‘ঠাঠ’ মানে আধার৷ এই আধার অর্থে ‘ঠাঠ’ শব্দের সঙ্গে তোমরা কেউ কেউ হয়তো পরিচিত আছ৷ পুরোহিতেরা তাঁদের নারায়ণের  সিংহাসনের যে আধারটিতে শালগ্রাম শিলা বসিয়ে রাখেন সেটিকেও ঠাঠ বলা হয়৷ তোমরা সেই ঠাঠের শালগ্রাম শিলার গল্প জানো তো? তবে শোনো, তাড়াতাড়ি শোনাচ্ছি৷

এক পুরোহিত তাঁর নারায়ণের সিংহাসন সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন দু’ক্রোশ দূরে এক শাঁসালো রসালো যজমানের বাড়িতে৷ অর্ধপথে এসেই পুরোহিত মশায় দেখলেন তিনি সিংহাসনের ঠাঠে শালগ্রাম শিলা রাখতে ভুলে গেছেন৷ কী করা যায়............কী করা যায় পুরোহিতেরা মানুষ চরিয়ে খান৷ সঙ্গে সঙ্গে মগজে বুদ্ধি খেলে গেল৷ রাস্তার পাশে পড়ে–থাকা একটা শুকনো শামুককে নিয়ে তিনি ঠাঠে বসিয়ে দিলেন৷ ভাবলেন–যজমান অতশত বুঝবে না৷ তারপর পুরোহিত মশায় যজমান বাড়িতে এসে যথারীতি পুজোয় বসলেন–অঙ্গন্যাস, করন্যাস, আচমনাদি যথাবিধি সারলেন৷ এবার মন্ত্রপাঠ করে পঞ্চপাত্র থেকে ছোট্ট হাতায় খানিকটা জল নিয়ে শালগ্রাম শিলার  ওপর ঢেলে শালগ্রাম শিলাকে* স্নান করাতে লাগলেন৷

এদিকে ব্যাপারখানা যা হবার তাই হল৷ জল পেয়ে শুকনো শামুকের খোল জেগে উঠল৷ সে তখন ঠাঠ ছেড়ে চলতে শুরু করলে– ঠাঠ ছেড়ে সিংহাসনে, সিংহাসন ছেড়ে মেঝেতে  তার চলার ধারা নির্বাধ গতিতে হতে থাকল৷ পুরোহিতের তো তখন চক্ষু ছানাবড়া৷ যজমান বললে–এ কী হল ঠাকুর মশায়, এ কী হল ঠাকুর মশায়

একটু আগেই বলেছি, পুরোহিত মানুষ চরিয়ে খান৷ তাঁর উর্বর  মস্তিষ্কে আবার বুদ্ধি খেলে গেল৷ তিনি যজমানের দিকে চেয়ে বললেন, তোর কী সৌভাগ্য রে বেটাচ্ছেলে, তোর বাড়িতে এসে ঠাঠ ছেড়ে নারায়ণ চলতে শুরু করে দিয়েছে৷ এ যে সমগ্র মানুষ জাতির ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ঘটনা৷ অচল নারায়ণকে সচল হতে দেখে আজ শুধু তোর আর আমার নয়, বিশ্বের সমস্ত মানুষের আজ পৃথিবীতে আসা সার্থক হল৷ তবে এই ইতিহাস–সার্থক ঘটনাটিকে আরও ক্ষেশী মর্যাদা দিয়ে এক কাজ কর, তুই যা কিছু পুজোর উপকরণ–নৈবেদ্য, ধুতি–শাড়ী, দান–দক্ষিণা দিবি বলে ঠিক করেছিলি তার দশ গুণ বাড়িয়ে দে যাতে ঘটনাটা চিরদিন মনে থাকে–তোরও মনে থাকে, আমারও মনে থাকে৷

যজমান দেখলে–একটা শামুক জল পেয়ে চলছে৷ ত বুও ভয়ে ভক্তিতে মুখে কুলুপ এঁটে থাকতে হল৷ সে কেবল একবার ভয়ে–ভক্তিতে পুরোহিতকে বললে– ঠাকুর মশায়, কালীর জন্যে একটা শাড়ি দিয়েছিলুম৷ এখন কি দশটা শাড়ি দিতে হবে

পুরোহিত মশায় বললেন–এক কথা কতবার বলব

যজমান বললে–ঠাকুর মশায়, কালী তো দিগম্বরা৷ শাড়ি তো তিনি পরেন না৷

পুরোহিত মশায় বললেন–এত বিদ্যে কে তোকে দিয়েছে বল তো শ্মশানে তিনি শাড়ি পরেন না, কিন্তু শহরে বাজারে যখন আসবেন তখন নিশ্চয়ই সামাজিক মর্যাদা অনুযায়ী ভাল শাড়ি পরেই আসবেন৷ হয় মুর্শিদাবাদী ছাপা সিল্কের শাড়ি কিংবা বেনারসী শাড়ি৷ তা এখনই যদি চুঁচড়ো–চন্নগরের বাজারে অতগুলো মুর্শিদাবাদী, বেনারসী শাড়ি জোগাড় করতে না পারিস তাহলে দুচারটে ভাল পাড়ের ভাল খোলের ধনেখালি–শান্তিপুরী শাড়ি হলেও কাজ চলবে৷ মায়ের তাতে কোনো আপত্তি হবে না, আমার তো হবেই না৷

যজমান বললে–কিন্তু ঠাকুর মশায় শিব ঠাকুর তো দিগম্বর, কিংবা তিনি বাঘছাল পরে থাকেন৷ তাঁকে দশটা ধুতি দিয়ে কী হবে–কী কাজে লাগবে?

পুরোহিত মশায়–তুই কিছুটা জ্ঞানের কথা বললি বটে, তবে শেষ রক্ষে করতে পারলি না৷ শিবের সম্বন্ধেও ওই একই কথা৷ তিনি শ্মশানে বাঘছাল পরে থাকেন বা দিগম্বর হয়ে ঘুরে ক্ষেড়ান কিন্তু দিন দুপুরে আমাদের চুঁচড়ো–চন্নগরে তো আর দিগম্বর হয়ে বা বাঘছাল পরে আসবেন না৷ আসবেন হয় ফিনফিনে ধুতি আর গিলে–করা পাঞ্জাবী পরে কিংবা ফুলপ্যান্ট আর বুশ শার্ট পরে৷  তবে দেখ ফুল প্যাে ন্টর অনেক ঝামেলা৷ আগে থেকে মাপ নিতে হয়৷ ভাল দর্জি দিয়ে কাটিং–সেলাই করাতে হয়৷ অত ঝামেলায় কেন যাবি  তার চেয়ে ভাল খোলের ভাল পাড়ের কয়েকটা শান্তিপুরী–ফরাসডাঙ্গ্ ধুতি দিলেই চলবে৷ আমাদের চুঁচড়ো–চন্নগরের বাজারে যে–কোনো সময় পয়সা ফেললেই ডজন ডজন ফরাসডাঙ্গা–শান্তিপুর্ ধুতি পাওয়া যাবে৷ আলু বেচার টাটকা টাকা তো তোর হাতেই রয়েছে৷ শিব ঠাকুর আশুতোষ আপনভোলা মানুষ৷ যা দিবি তাতেই সন্তুষ্ট হবেন৷ তুই যদি চটের মত মোটা ধুতিও দিস শিব ঠাকুরের তাতে কোনো আপত্তি হবে না কিন্তু আমার তো আক্কেল আছে৷ আমি কোন্ প্রাণে বলব–ঠাকুর, এই ধুতিটা কোমরে জড়াও৷ আমি প্রাণ থাকতে তা পারব না৷ আমি তো আর জ্ঞান–গম্যি খুইয়ে বসিনি৷

মা সেদিন স্বপ্ণাদেশে বললেন–দেখ, পৌরোহিত্য করতে তোকে অনেক হাঁটাহাঁটি করতে হয়, রোদ–জল সইতে হয়৷ সেদিন গোটু থেকে সুগিন্দে (সুগন্ধ্যা) হয়ে চন্নগর যাবার পথে তোকে রোদে জলে নাস্তানাবুদ* হতে হয়েছিল৷ তোর দুঃখু দেখে আমার বুক ফেটে যাচ্ছিল৷ তোর যজমানকে বলিস, তোকে যেন একটা আধুনিক মডেলের সাইকেল আর ভাল জাতের একটা ছাতা দেয়৷ তুই তো মায়েরই সন্তান৷ তোকে সাইকেল, ছাতা দিলে মা সন্তুষ্ট হবেন৷

মা আমায় আরও বললেন–তোর যজমানকে বলিস দু’টো জিনিসই চন্নগর গঞ্জেই পাওয়া যাবে৷ এজন্যে কলকাতা দৌড়ুতে  হবে না৷ আর গঞ্জে যখন যাচ্ছেই তখন সের পাঁচেকের মত গঞ্জের নামজাদা গজাও যেন নৈবিদ্যিতে দিয়ে দেয়৷ তাতে নৈবিদ্যির শোভা বাড়বে...... বেশ খোলতাই হবে৷

যজমান বললে–ঠাকুর মশায় তুমি যেমনটি বলেছ তেমনটিই হবে৷

যজমান সব কিছু দিলে বটে কিন্তু মনের মধ্যে খুঁতখুঁতুনি রয়েই গেল৷ সে যে নিজের চোখে দেখেছে জল পেয়ে শামুকটি চলতে শুরু করে দিয়েছিল৷

তোমরা তা হলে গঞ্জের গজার গপ্পো বুঝে নিলে তো.....

কবি জয়দেব তাঁর দশাবতার স্তোত্রে  বুদ্ধকে বিষ্ণুর অবতার বলে বর্ণনা করে লিখলেন–

‘নিন্দসি যজ্ঞবিধেরহহ্ শ্রুতিজাতং৷

                সদয়হূদয়দর্শিতপ্৷

কেশবধৃত বুদ্ধশরীর, জয় জগদীশ হরে৷৷’’

বুদ্ধকে বিষ্ণুর অবতার রূপে স্বীকার করলেন বটে কিন্তু শ্লোকটিতে মনের খুঁতের কথাটিও ব্যক্ত করে দিলেন৷ শ্লোকটির মানে হচ্ছে–‘‘এটা খুবই দুঃখের বিষয় যে বেদবিহিত যজ্ঞবিধিকে তুমি নিন্দা করেছিলে– অহো অহো কারণ পশুহত্যা দেখে তোমার হূদয় দ্রবীভূত হয়েছিল৷ হে বুদ্ধরূপধারী নারায়ণ, আমি তোমাকে নমস্কার করছি৷’’

বুদ্ধত্বের প্রতীক শালগ্রাম শিলাকে সে সময়কার মানুষ বিষ্ণু বা নারায়ণের প্রতীক রূপে পুজো করতে শুরু করে দিলে৷ অর্থাৎ শালগ্রাম শিলা বুদ্ধশিলা থেকে নারায়ণ শিলা হয়ে গেল৷

সৃষ্টি করে’ বিশ্বটাকে

লেখক
সাক্ষীগোপাল দেব

সৃষ্টি করে’ বিশ্বটাকে

     রইলে সবার অলখে

সৃষ্টি স্থিতি প্রলয় খেলা

     করছ তুমি পলকে৷৷

সাজিয়ে দিলে আলোক মেলায়

     মাতছো কত রঙের খেলায়

করছো লীলা সবার সাথে

     উঠছো চিতে ঝলকে৷৷

তোমার লীলায় তুমি হারা

     নেইকো কিছুই তুমি ছাড়া

সৃষ্টি থেকেই খুঁজছো তুমি

     সৃষ্টিছাড়া তোমাকে৷৷