ইংলণ্ড বিশ্বসেরা হ’ল নাকি ইংলণ্ডকে বিশ্বসেরা করা হ’ল

সংবাদদাতা
ক্রীড়া প্রতিনিধি
সময়

শেষ ম্যাচ দিয়েই শুরু করা যাক৷ বিশ্বকাপ ফাইনাল৷ উপভোগ্য লড়াই দেখা গেছে ব্যাটে বলে৷ ৫০ ওভারের ম্যাচে দুই দলই ২৪১ রান করেছে৷ ম্যাচ টাই হ’ল৷ এবার সুপার ওভার৷ সেখানেও টাই---দু-দলের রান সমান সমান৷ নিয়ম ছিল সুপার ওভারে যে দল বেশী বাউণ্ডারী মারবে সেই দলই জয়ী হবে---যদি দু-দলেরই রান সমান সমান হয়৷ এই নিয়মে চ্যাম্পিয়ন হয়ে গেল ইংলণ্ড৷ যে ম্যাচে বিশ্বসেরা হওয়ার লড়াই সেই ম্যাচে এই নিয়ম কতটা গ্রহণযোগ্য তা নিয়ে ক্রিকেট বোদ্ধাদের মধ্যে মতবিরোধ থাকবেই৷ ফুটবলে তো পেনাল্টি হয়৷ সেখানে ফল সমান সমান হলে ‘সাডেন-ডেথ’ বলে একটি নিয়ম রয়েছে৷ ক্রিকেটেও সেই ধরণের ব্যাটে-বলের ক্ষুদ্র প্রতিযোগিতা সুপার ওভারের পরে করা যেত না? বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলার শেষটা কিন্তু একেবারেই বিশ্বক্রিকেটের নিয়মকে একটা হাস্যকর পর্যায়ে এনে দিল৷

এই বিশ্বকাপে বেশ কতকগুলি নিয়ম যেন ক্রিকেটের সঙ্গে বেমানান মনে হয়েছে৷ যেমন বৃষ্টি বিঘ্নিত ম্যাচ৷ বিশ্বকাপের মত প্রতিযোগিতায় বৃষ্টির জন্য খেলা না হলে দু’দলই এক পয়েণ্ট করে পাবে৷ খেলা হয়নি বলে দ’দলেরই রান শুন্য৷ রানই যেখানে ফল ঘোষণায় বিবেচ্য৷ তাহলে খেলা হয়ে রান যদি সমান সমান হয় দু’দলের মধ্যে পয়েণ্ট সমান ভাবে ভাগ হয়ে যাবে৷ অর্থাৎ কেউই জেতে নি, কেউ হারে নি৷ সেই নিয়মেই ইংলণ্ড ও নিউজিল্যাণ্ডের মধ্যে ফাইনালে কে জিতেছে বা কে হেরেছে? এই প্রশ্ণের জবাব তো একটাই৷ দু’দলই তো পরস্পরের বিরুদ্ধে সমান দক্ষতা দেখিয়েছে৷ তাহলে বিশ্বজয়ীর মুকুট দু’টি দলেরই প্রাপ্য৷ নিয়মের ঘেরাটোপে ইংলণ্ডকে জয়ী ঘোষণা করা হ’ল৷

এই বিশ্বকাপে ডার্কওয়ার্থ-লুইস---নিয়মটি প্রযোজ্য হয়েছে৷ দেখা গেছে এই নিয়মের ঘেরাটোপে প্রতিদ্বন্দ্বী দু’টি দলের মধ্যে একটি দল বেশী সুবিধা পেয়েছে৷ ম্যাচের নিষ্পত্তির ঘটাতেই হবে ফলাফলের মাধ্যমে---এই যুক্তিতে খেলোয়াড়দের দক্ষতাকে একপ্রকার জলাঞ্জলী দেওয়া হয়েছে৷ নিয়মের মাপকাঠিতে অবাস্তব ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়েছে৷ বৃষ্টি বা অন্য কোন কারণে খেলা বিঘ্নিত হলে চলে আসছে নানান অঙ্ক৷ প্রতি ওভারে কত রান করতে, প্রতি পাঁচ, দশ, কুড়ি ওভারে কত রান দেওয়া চলবে না---এইসব নানান সূক্ষ্ম অঙ্ক কষে খেলোয়াড়দের ব্যাট, বল বা ফিল্ডিং করতে হবে৷ ৫০ ওভারের খেলায়, কোন কারণে ওভার কম করে খেলা হলে যে দল বেশী রান করবে সে-ই জয়ী---এমন সাধারণ অঙ্ক অনেক সময়ই বিচার্য বিষয় হয়নি৷ এই সব বিভিন্ন নিয়মগুলি খেলার প্রয়োজনেই করা হয়েছে৷ এখন দেখ্তে হবে এতে কি ক্রিকেটের মান বাড়ছে না কমছে, অন্যভাবে প্রশ্ণ রাখা যায় ক্রিকেটের স্বার্থে সমস্ত নিয়মাবলী কি সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য?

আসছে আম্পায়েরর সিদ্ধান্ত নিয়ে নানান প্রশ্ণ৷ আম্পায়ার একজন মানুষ তাঁর ভুল হতেই পারে৷ সেই জন্য কিছু নিয়ম আনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু তাতে সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণভাবে ত্রুটিমুক্ত করা যায়নি৷ অনেক ক্ষেত্রেই ভুল সিদ্ধান্তের জন্য বিশেষ কোনও দল সুবিধা পেয়ে গেছে আর অন্য দলকে ক্ষতি স্বীকার করে নিতে হয়েছে৷ যেমন এই বিশ্বকাপে অষ্ট্রেলিয়া-দক্ষিণ আফ্রিকার একটি ম্যাচে একজন েৃষ্ট্রলিয় ব্যাটসম্যানকে ভুল সিদ্ধান্তের জন্য প্যাভেলিয়নে যেতে হয়েছে, অথচ তিনি আউট ছিলেন না৷ অষ্ট্রেলিয়ার কাছে ওই ম্যাচটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল এই কারণে যে ওই ম্যাচে অষ্ট্রেলিয়া জিতলে প্রথম সেমিফাইনালে খেলত অষ্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যাণ্ড, অন্য সেমিফাইনালে মুখোমুখি হ’ত ভারত ও ইংলণ্ড৷ এতে ফাইনালিষ্ট দল পাল্টে যেতে পারত৷ নিউজিল্যাণ্ড ভারত ম্যাচে ধোনীর রান আউটের সময় নিউজিল্যাণ্ড ফিল্ডাররা ক্রিকেটের নিয়ম মানেননি---এমন অভিযোগও উঠে এসেছে৷

তবে নিয়মকেই অগ্রাধিকার দিয়ে ক্রিকেট খেলতে হবে, দেখাতে হবে স্পোর্টসম্যানশিপ৷ ব্যাপারটা এমন আমাকে নিয়ম মানতেই হবে, আর তুমি নিয়ম ভাঙ্গলেও স্পোর্টসম্যানশিপ দেখিয়ে অনিয়মকে নিয়ম বলে আমাকে মেনে নিতে হবে৷ ক্রিকেটের নিয়ামকরা এর জবাব কি দেবেন?

যাই হোক বিশ্বকাপে জয়ী হয়েছে ইংলণ্ড৷ সেই দলের খেলোয়াড়রা জানিয়েছেন ‘এই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা যায় না৷’ অভিনন্দন ইংলণ্ড দলকে যারা আগামী চার বছরের জন্য বিশ্বের এক নম্বর দল৷ কিন্তু নিউজিল্যাণ্ড দলকে অনেক বর্তমান ও প্রাক্তন খেলোয়াড়রা অভিনন্দন জানাচ্ছেন৷ অনেকেই বলছেন আই সি সি-র উচিত ক্রিকেটের অনেক নিয়ম নিয়ে ভাবনা চিন্তা করার৷ প্রয়োজনে কিছু নিয়ম পাল্টানোও প্রয়োজন৷ এতে ক্রিকেটেরই উন্নতি হবে৷ দক্ষ বা কুশলী খেলোয়াড়রা সঠিক সম্মান পাবে৷ বিশ্বক্রিকেট সকলের কাছে আরও আনন্দদায়ক হয়ে উঠবে৷