প্রভাতী

মূর্খ ব্রাহ্মণপুত্ত্রের গল্প

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

তোমরা অনেকেই আসকে পিঠে খেয়েছ (বাঙলায় কোথাও কোথাও সরাপিঠে বা চিতুই পিঠেও বলা হয়৷ তবে কলকাতায় আমরা আসকে পিঠেই বলি)৷ আসকে পিঠেতে থাকে অনেক ছিদ্র৷ তোমরা সেই ছড়াটা নিশ্চয়ই জানো–

‘‘ঘুঘু তো দেখেছ জাদু ফাঁদ তো দেখনি৷

আসকে খেয়েছ জাদু ফোঁড় তো গোণনি৷’’

তোমরা সংস্কৃত ভাষায় হয়তো সেই মূর্খ ব্রাহ্মণপুত্ত্রের গল্প পড়েছ৷ সে গুরুগৃহ থেকে অনেক শাস্ত্র অধ্যয়ন করেছিল৷ জ্ঞানে বৈদুষ্যে তার জুড়ি মেলা ভার, কিন্তু তার বৈয়বহারিক বুদ্ধি বলে কোনো জিনিস ছিল না৷ সে যখন গুরুগৃহ থেকে স্বগৃহে ফিরছে তখন পথে সে একজনের অতিথি হয়েছিল৷ তারা তাকে আসকে পিঠে খেতে দিয়েছিল৷ সে কখনও আসকে পিঠে দেখেনি৷ সে সঙ্গে সঙ্গে শাস্ত্র খুলে আসকে পিঠের পরিচিতি জানবার চেষ্টা করলে, কিন্তু কিছুতেই কোনো হদিশ পেলে না৷ তবে এক জায়গায় সে পেলে ঃ

               ‘‘ছিদ্রেষ্বনর্থাঃ বহুনি   ভবন্তি৷’’   

এর আসল মানে হচ্ছে কোনো কিছুতেই যদি সামান্য একটু ছিদ্র বা খুঁত থেকে যায় তবে পরে সেই ছিদ্রটুকুকে কেন্দ্র করে বিরাট বড় অনর্থ ঘটে যেতে পারে৷ এ যেন সেই গত মহাযুদ্ধের সময় দামোদরের বাঁধ ভেঙ্গে বন্যার ব্যাপার৷ বাঁধেতে একটি ইঁদুরের গর্ত ছিল৷ সেই ছোট্ট গর্ত থেকে জল চুঁইয়ে বাইরে আসতে আসতে বাঁধ ভেঙ্গে বিরাট বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছিল৷ তা সে যাই হোক্, ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ভাবলে এই যে ছিদ্রযুক্ত খাদ্যবস্তু এর থেকে নিশ্চয়ই বড় রকমের অনর্থ ঘটবে৷ তাই সে আসকে পিঠে ফেলে রেখে চোঁ দৌড়........চোঁ দৌড়.......বাপ্রে বাপ্৷ জেনে শুনে অনর্থ ঘটাতে আছে

            * *             *

তার সঙ্গে আর একজন যে সাথী ছিল,  তার অবস্থাও ছিল তেমনি৷ তিনি নদীর ধারে বসে আকাশের তারা গুণছিলেন আর ভাবছিলেন, রাত্রে এখন কোথায় যাই৷ এমন সময় দেখলেন, নদীর ধারে একটি গাধা৷ তিনি তখন শাস্ত্র খুলে ওই জীবটির পরিচিতি জানার চেষ্টা করলেন৷ পরিচয় ঠিক পেলেন না বটে, তবে একটা জায়গায় দেখলেন, লেখা আছে–

‘‘রাজদ্বারে শ্মশানে চ যস্তিষ্ঠতি সঃ বান্ধবঃ৷৷’’

উনি ভাল করে তাকিয়ে দেখলেন গাধাটার কাছেই রয়েছে শ্মশান৷ সে যখন শ্মশানে উপস্থিত রয়েছে তখন সে নিশ্চয়ই বান্ধব৷ তখন তিনি গাধার কাছে গিয়ে গলা জড়িয়ে ধরে আদরের সঙ্গে বললেন–বন্ধু হে আমার জন্যে একটি আস্তানা করে দাও৷ গাধা ভয়ে হাত–পা ছুঁড়ে চীৎকার শুরু করে দিলে৷ গাধার চীৎকার শুনে গাধার মালিক রজক লাঠি নিয়ে তেড়ে এল ও মূর্খ পণ্ডিতের ওপর লাঠ্যৌষধি প্রয়োগ করলে৷ মূর্খ পণ্ডিত তখন দাদারে দাদা........পালারে পালা.........ন্যাজ তুলে পালা৷

*        *        *

ওদেরই আর একজন সঙ্গী ছিল৷ তিনি আর এক বাড়িতে অতিথি হয়েছিলেন৷ গৃহস্বামী তাঁকে সেমাইয়ের পায়েস খেতে দিয়েছিলেন৷ পণ্ডিত–তনয় জীবনে কখনও সেমাই দেখেননি৷ শুধু আলো–চাল আর কাঁচকলা সেদ্ধ খেয়ে খেয়ে দিন কেটেছে৷ সেমাই দেখে তিনি পুঁথি খুলে ভাবতে লাগলেন এটা আবার কী জিনিস৷ সেমাই দেখতে লম্বা সুতোর মত৷ তাই সংস্কৃত নাম ‘সূত্রিকা’৷ পণ্ডিতের এটা জানা ছিল না৷ তবে তিনি একটা জায়গায় একটা সূত্র পেলেন–‘‘দীর্ঘসূত্রী বিনশ্যতি’’৷ ‘দীর্ঘসূত্র’ মানে procrastination (মানে, হচ্ছে–হবে.......আচ্ছা, আজ হবে না, কাল হবে.........কাল হবে না, পরশু হবে.........এই ধরনের মনোভাব)৷ ‘দীর্ঘসূত্রী বিনশ্যতি’–এর আসল মানে হল, যে মানুষ হচ্ছে......হবে করে দিন কাটায় তার বিনাশ অনিবার্য৷ মূর্খ পণ্ডিত ভাবলে এই সেমাই তো বেশ লম্বা লম্বা সুতো৷ সুতরাং এগুলো নিশ্চয়ই দীর্ঘসূত্র, আর যখন ‘দীর্ঘসূত্রী বিনশ্যতি’ বলা হয়েছে তখন এগুলি খেলে নিশ্চয়ই মরে যাব৷ গৃহস্বামী আমাকে মারবার জন্যেই এগুলি খেতে দিয়েছেন৷ সে তখন পালারে পালা বলে পালাল৷

*        *        *

ওই বন্ধুদের আর একজন বন্ধু ছিল৷ সে কোথায় যাবে ভেবে কোনো কূলকিনারা পাচ্ছিল না৷ তাকিয়ে দেখলে তার সামনে দিয়ে আর একজন লোক যাচ্ছে৷ সে খোঁজ নিয়ে জানলে লোকটি একজন ‘কুসীদজীবী’ অর্থাৎ ‘মহাজন’৷ সংস্কৃতে ‘মহাজন’ বলতে যেমন মহৎ লোককে বোঝায় তেমনি কুসীদজীবীকেও বোঝায়, পয়সাওয়ালা লোককেও বোঝায়, আবার খুচরো ব্যবসায়ীরা পাইকারী ব্যবসায়ীদেরও মহাজন বলে থাকে৷ মূর্খ পণ্ডিত শাস্ত্র খুলে দেখলে, শাস্ত্রে লেখা আছে–‘‘মহাজনো যেন গতঃ সঃ পন্থা’’৷ অর্থাৎ মহাজন যে পথে গেছেন সেইটাই প্রকৃষ্ট পথ, বাকীদেরও সেই পথ অনুসরণ করা উচিত৷ সুতরাং সে ওই মহাজনের পেছনে পেছনে চলতে শুরু করলে৷ মহাজন লোকটি বার বার পেছনে তাকিয়ে দেখলে, একটা লোক তাকে অনুসরণ করছে৷ তখন তার মনে হল লোকটা বুঝি চোর–ডাকাত৷ তাই সে মূর্খ পণ্ডিতকে ধরে উত্তম–মধ্যম দিয়ে দিলে৷ মূর্খ পণ্ডিতের তখন অবস্থা–‘‘পালানোই জীবনের সারসত্য’’৷ পণ্ডিতপুঙ্গব তখন শাস্ত্র ভুলে গেয়ে চলেছে–দাদারে দাদা........পালারে পালা...........ন্যাজ তুলে পালা৷

পালাব না তো  কি, তোর ভয়ে দাঁড়িয়ে থাকব

মাষ্টারের প্রশ্ণ ছাত্রের উত্তর

লেখক
রতন কুমার দে

মাষ্টার জিগাই ছাত্রকে

সীতার নাম তুমি জানকী

ছাত্র বলে

স্যার তুমি তো নাম বলে দিলে

(আমি) (ছাত্র) বলবো কি

মাষ্টার জিগাই ছাত্রকে

তুমি বলতে পার

সীতা কাদের জননী?

ছাত্র বলে জানি স্যার

সীতার আসল ছেলেদের নাম জানিনি

মাষ্টার বলে, তবে বললি কেন জানি

সীতা ছেলে গর্ভে ধারণ করেনি

মাষ্টার বলে তুই আজ শিখলি

এত কাল মাষ্টারি

ঠিক জানি নি

ঠিক পড়াই নি৷

সবুজ পৃথিবী

লেখক
অনন্যা সেনগুপ্ত

প্লাস্টিক বা থার্মোকল

তবেই বন্ধ হবে

যবে তৈরী হবার জায়গাগুলো

আর রবে না ভবে৷

বিকল্প হিসেবে সেই

পাতার ব্যবহার ফেরাতে

দেশীয় উপকারী গাছ

প্রচুর হবে লাগাতে৷

স্বপ্ণ দেখি আবার ফাঁকা মাঠে

হবে সবুজ বন

আনন্দে ভরবে তখন

সকল জীবের মন৷

নেতাজী

লেখক
 জয়তী দেবনাথ

শতকোটি প্রণাম তোমায়

ধন্য তুমি বীর৷

এই ভারতের গর্ব তুমি ৷

উচ্চ তোমার শীর৷৷

 

তোমার জ্যোতিতে উজ্জ্বল হল

এই ভারত-গগন৷

দেশমাতার সেবায় তুমি

সঁপিলে তনু-মন৷৷

 

তোমার কীর্তিতে মুগ্দ আজি

সকল ভারতবাসী৷

ভারত-গীতে বাজে আজও

তোমার মধুর বাঁশী৷৷

 

হে বীর তুমি আজও আছ

সবার বরণীয়

যুগে যুগে থাকবে তুমি

হয়ে স্মরণীয়৷৷

 

তোমার ছোঁয়ায় ধন্য হ’ল

এই ভারতের ভূমি,

সবার হৃদয় জুড়ে সদা

থাকবে মহান তুমি৷

তুমিই মোদের পাথেয় হবে

ওগো সুধী পথিক,

মতানৈক্যের এই যুগে

তোমার পথই সঠিক৷৷

মজার ছড়া

লেখক
কল্যাণী ঘোষ

কাজছাড়া নাই গতান্তর,

বাতজ–বেদনায় আতান্তর৷

কর্মফলে মন্বন্তর,

ডাক্তারে–ডাক্তারে–       হস্তান্তর......

চিকিৎসা ক্ষেত্রে মতান্তর৷

আছে কি? যাদু মন্তর?

ভাবি কেন? অবান্তর?

ক্রমেই বিকল দেহ–যন্তর....

নিষ্প্রাণ হলেই          ছাই–এ রূপান্তর৷৷

কথা বেচে

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

প্রকাণ্ড বড় মিউজিয়াম (প্রত্নশালা)৷ কিউরেটর (তত্ত্বাবধায়ক) নিযুক্ত হয়েছেন একজন অতিজল্পক মানুষ৷ বিতর্কেই তিনি বেঁচে আছেন.......বিতর্কেই তিনি চাকরি বজায় রেখেছেন......... বিতর্কেই তিনি পদোন্নতির আশা পোষণ করেন৷ দর্শনার্থীদের সম্বোধন করে তিনি একটি ছোট্ট করোটি (মাথার খুলি) দেখিয়ে বললেন–আপনারা জেনে হয়তো অবাক হবেন.........সত্যিই তো, অবাক হবারই কথা.........এই করোটিটি হচ্ছে ইতিহাসধন্য পুরুষ রাণা প্রতাপের৷ উপস্থিত দর্শনার্থীদের মধ্যে ছিলেন একজন ইতিহাসের অধ্যাপক৷ তিনি বললেন, কিন্তু স্যর, রাণা প্রতাপ তো ছিলেন তাগড়া আকারের দশাসই চেহারার মানুষ৷ তাঁর করোটি এত ছোট হবে কেন?

কিউরেটর বললেন–আপনি ভারী সুন্দর কথা বলেছেন......এই তো ইতিহাসের অধ্যাপকের মতই কথা৷ তাহলে শুনুন–এই করোটিটি রাণা প্রতাপের অল্প বয়সের৷ তখন তিনি ছোট ছিলেন, তাই তাঁর করোটিও ছোট ছিল৷ তিনি যখন বড় হয়েছিলেন, তাঁর করোটিও  বড় হয়েছিল, আপনি যেমন বলছেন স্যর.......কিন্তু সেই বড় করোটিটি আমাদের মিউজিয়ামে নেই ৷ কিন্তু স্যর,আমরাও হাত গুটিয়ে বসে নেই৷ সেটি জোগাড় করার জন্যে আমরা উদয়াস্ত চেষ্টা করে যাচ্ছি৷ আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আসছে বার যখন আপনার পদার্পণ হবে, তখন আপনাকে  সেটা দেখাতে পারব৷

‘কাঁচা বেঁশো হ্যাংলামি

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

‘ক্রুড্’ ধাতুর একটি অর্থ ‘হ্যাংলামি করা’ বা ‘ন্যালা খ্যাপামি করা’ –কাঁচা বাঁশের মত হ্যাংলামি বা ন্যালা খ্যাপামি যা শুণলেই বোঝা যায়, দেখলেই ধরা যায় অথবা এমনও কেউ কেউ থাকে যারা ধরা পড়বার জন্যেই এই রকম হ্যাংলামি বা ন্যালাখ্যাপামি করে থাকে৷ যেমন নেম্তন্ন বাড়ীতে তোমার আরও কয়েকটা রসগোল্লা খাবার ইচ্ছে হল৷ তুমি পাশের ভদ্রলোকটির পাত দেখিয়ে বললে......ও দাদা, এদিকে, এদিকে, এঁর পাতে কয়েকটা রসগোল্লা দিন৷

রসগোল্লা পরিবেশনকারী কাছে এলে তাকে বললে–আমায় আর দেওয়া কেন আমার পাতে পরে দেবেন (আসলে পরিবেশনকারী তাকে দিতে আসেন নি, এসেছিলেন পাশের লোকটিকে দিতে)৷ পরিবেশনকারী দিতে গেলে বললে–না, আমার আর চাই না, পেট ভরে গেছে৷ আবার হ্যাংলামি করে বললে–তা দেবেন যখন অন্ততঃ চারটে দিন৷ একগণ্ডার কমে কি ভাল দেখায় এতে পরিবেশনকারী বুঝে নিলেন, যিনি পরিবেশনকারীকে ডেকেছিলেন তাঁরই রসগোল্লা দরকার......আর চারটে দরকার৷ এই ধরণের হ্যাংলামির জন্যে ক্রুড/ক্রুড়, শব্দটি চলবে৷ চলবে ক্রু+যৎ > ক্রড্য শব্দটিও (ক্রুড়া হয় না)৷ একবার দেখেছিলুম জনৈকা মহিলা–তিনি ছিলেন একজন মস্তবড় অফিসারের মাতাঠাকুরাণী–একজন মধ্যবিত্তের বাড়ীতে গিয়ে তার লক্লকে লাউগাছটি দেখে বলেছিলেন–লাউ–এর ডগাগুলো ভারী সুন্দর দেখাচ্ছে তো৷ পোস্ত–বাটার সঙ্গে লাউডগা সেদ্ধ খেতে খুব ভাল লাগে৷ চাকরটাকে রোজই বাজারে পাঠাই৷ এসে বলে বাজারে আজকাল লাউডগা পাওয়া যাচ্ছে না৷ লাউডগা–পোস্ত সেই যে কোন মান্ধাতার আমলে খেয়েছিলুম, আজও যেন জিবে লেগে আছে৷ লাউ–ডগার মালিক কি আর করেন মহিলার সঙ্গে কিছু লাউডগা পাঠিয়ে দিলেন৷ যাই হোক, এই কাঁচাবেঁশো হ্যাংলামি ভালভাবেই বুঝলে৷ সুতরাং ওই হ্যাংলা মহিলা হচ্ছেন ‘ক্রুড্যা’৷

আমার পরিচিত ভোলা মোড়লের ভাল রকমের বেগুনের চাষ ছিল৷ বর্ষার শেষে একদিন সে তার বেগুনবাড়ী থেকে বছরের প্রথম ফসলটি তুলে নিয়ে বাড়ীর দিকে যাচ্ছিল৷ আশা করেছিল, বর্ধমানের বাজারে নতুন মুক্তকেশী বেগুনের ভালই দর পাবে........তার একটু টেনেটুনে সংসার চলত৷ রাস্তায় সে পড়ে গেল হরু ভটচাজের খপ্পরে৷ হরু ভট্চাজ্ বললে–কি রে ভোলা, আজকাল তোর দেমাগে যে মাটিতে পা–ই পড়ে না৷ বামুন–বোষ্টমের প্রতি শ্রদ্ধাভক্তি হারালে ফল কি ভাল হয়? জানিস তো মাথার ওপর নারায়ণ রয়েছেন৷ তিনি আমাকেও দেখছেন, তোকেও দেখছেন, বেগুনগুলোকেও দেখছেন৷ যাই হোক, বেগুনগুলো বেশ তেল কুচকুচে৷  কম আঁচে পোড়াতে গেলে গায়ে তেলও মাখাতে হবে না৷ তা তু’ এক কাজ কর গা৷ আমাকে বেগুনগুলো দিতে হবে না৷ তু’ ওগুলো পুড়িয়ে যেন আমার প্রসাদ খাচ্ছিস ভেবে নিজেই খা গা যা৷ ভোলা মোড়ল আর কি করে তার বুকের পাঁজর–ভাঙ্গা আট–দশটা বেগুন হরু ভটচাজকে দিয়ে দিলে৷ এই হরু ভটচাজ ছিল একটি নির্ভেজাল ‘ক্রুডা’৷

কোন একটা বিয়ে বাড়ীতে ভিয়েন বসেছে৷ অনিমন্ত্রিত পুণ্ডরীকাক্ষ ভট্টাচার্য্য হঠাৎ সেখানে পৌঁছে গেলেন৷ পুণ্ডু ভট্চাজ্ ছিলেন আমাদেরই বর্ধমান জেলার পুতুণ্ডু গ্রামের বাসিন্দে৷ মস্ত বড় ভিয়েন, কলকাতা থেকে বাছাইকরা হালুইকারেরা এসেছে৷

পুণ্ডু ভটচাজ্ বললেন–খাওয়াদাওয়ায় আমার তেমন আগ্রহ নেই৷ কিন্তু রান্নাবান্না দেখতে বড্ড ভালবাসি.....সেই ছোটবেলাকার স্বভাব৷

সবাই বললে–এসো,এসো, বসো, বসো৷ দেখো, কেমন খাবার তৈরী হচ্ছে৷

দেখে বোঝা গেল হালুইকারেরা খুব উন্নত মানের চমচম (সংস্কৃতে ‘চম্’ ধাতু হ’ল গোগ্রাসে গিলে খাওয়া৷ একপক্ষের সৈন্য অন্য পক্ষের দেশে গিয়ে সব কিছুকে গোগ্রাসে গিলে খায়৷ এই অর্থে চম্ ধাতু+উস্ প্রত্যয় করে ‘চম্’ শব্দটি পাচ্ছি৷ ‘চমু’ মানে সৈন্যবাহিনী৷ ‘চমূড্ণ্’ করে ‘চম্’ শব্দটি পাচ্ছি, অর্থাৎ যা দেখে গোগ্রাসে গিলে খেতে লোকের ইচ্ছে হয়৷) তৈরী করছে৷ পুণ্ডু ভট্চাজ্ আর নোলা সামলাতে পারছে না৷ প্রাণে আকুতি জেগেছে, চমচম একেবারে খোলা থেকে নোলায় চলে আসুক৷ সে তখন স্বগতভাবে বললে, (বললে এমন ভাবে যাতে আর পাঁচটা লোকের বধির কর্ণেও তা প্রবেশ করে)–এককালে চমচম খেতে খুবই ভালবাসতুম৷ কবে সেই খেয়েছিলুম.......বাহাবপুরের ঘোষেদের বাড়ীতে৷ এখনও যেন ভুলতে চাইলেও ভুলতে পারছি না৷ মন বারে বারে সেই চমচমে ফিরে যেতে চায়৷ এখন দু’চারটে চাখতে পারতুম কিন্তু সন্ধ্যে হয় হয়৷ সন্ধ্যে আহ্ণিক না করে খাই বা কি করে– তিন কাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে–সে কথাও ভুলি কি করে৷

হালুইকারেরা বললে–সন্ধ্যে হতে এখনও একটু দেরী আছে৷

পুণ্ডু ভটচায্ আকাশের দিকে তাকিয়ে বললে–হ্যাঁ মনে হয় আধঘন্টাটাক সময় আছে৷

হালুইকারেরা বললে–তক্ষে দুটো সন্দেশ চেখেই দেখুন৷ আমার মনে হয় গণ্ডাখানেক চেখে নিয়ে হাত মুখ ধুয়ে ফেলাও সম্ভব৷

হালুইকারেরা কি আর করে পুণ্ডু ভট্চাজ্কে একটা শাল পাতায় মুড়ে চারটে চমচম দিলে৷ এও সেই কাঁচা বেঁশো হ্যাংলামি৷ পুণ্ডুরীকাক্ষ ভট্টাচার্য হলেন একটি ডাকসাইটে ‘ক্রুড্ড’৷ যাই হোক, তোমরা ‘ক্রুড্’ ধাতুর রকমারি ব্যবহার দেখলে তো৷                  (শব্দ চয়নিকা)

ভয় কি বা তার

লেখক
বিভাংশু মাইতি

অণুতে অণুতে আছো অণুসূত

তবু পাই না তোমার দেখা,

অন্তরে নেই আছো অন্তরে

চিদাকাশে তুমি রাকা৷

অনলে অনিলে সাগরে সলিলে

আছো তুমি সর্বত্র

আছো ছায়া-সম দিবস রজনী

মনে আছো মনোমিত্র৷

জেনেও জানি না তুমিই আমার

পরম জীবন দেবতা

বুঝেও বুঝি না তোমার মহিমা

নভোনীলে লেখা বারতা৷

বিভূপদে তব করি গো আকুতি

হৃদয়েতে দাও ভকতি

জগৎ মাঝারে যেন যুঝিবারে

পাই গো অপার শকতি৷

ভয় কি বা তার

যে আছে তোমার

অভয় চরণ স্মরণে

সঁপে যে দিয়েছে সকল সত্তা

জীবনে-মরণে-মননে৷

শ্রাবণী পূর্ণিমা

লেখক
জ্যোতিবিকাশ সিন্হা

শ্রাবণের বর্ষণস্নাত নির্জন গঙ্গাতীর

মৃদুমন্দ বহে সুশীতল স্নিগ্দ সমীর

নীল নভে খণ্ড খণ্ড মেঘমালা

পূর্ণচন্দ্র সাথে অবিরাম লুকোচুরি খেলা

জ্যোৎস্না ধৌত বটবৃক্ষতলে উপবিষ্ট

শুভ্রবেশ, সৌম্যকান্তি জ্যোতির্ময় পুরুষশ্রেষ্ঠ৷

সহসা আগুয়ান, নৃশংস দস্যু, নাম কালীচরণ

‘পতিতপাবন’ হরির সর্বস্ব করিতে হরণ৷

মহাসম্ভূতি তারকব্রহ্ম রূপে যিনি আবির্ভূত

তাঁরই অহৈতুকী কৃপায় পাতকী হ’ল সর্বপাপ মুক্ত

সিদ্ধ মন্ত্রপাতে চিত্তে উদ্ভাসিল দিব্যানুভূতি

শ্রাবণী পূর্ণিমার পুণ্যলগ্ণে পূর্ণ প্রকাশিত

আনন্দঘন বিশ্বমাঝে তুমি আনন্দমূরতি৷

মিনতি

লেখক
শ্রীপথিক

মোর জীবনের আত্মা গো তুমি

মানস–কুসুম মধুরতা

(মম) মূর্ত্ত জীবনাদর্শ গো তুমি

 পরমারাধ্য ওগো পিতা৷

প্রাণের আগুনে তুমি তাপ প্রভু

অন্তর নীরে শীতলতা

হূদি চন্দনে গন্ধ তুমি গো

মানব দেহের মানবতা৷

কৌটায় ভরা সে প্রাণ ভোমরা

চুরি গেলে সেই রূপকথা–রাক্ষসীর

কিছুই থাকে না আর–৷

তুমি ছাড়া প্রভু তেমনি আমার

    থাকে না কিছুই বাকী

         শূন্য জীবনাধার৷

তাই, হে পরমপ্রিয় চিরসখা মোর

তোমার চরণে চাহি নাক আর কিছু

    শুধু এ মিনতি রেখো,

    অনন্তকাল ধরে তুমি মোর

         জীবন পাত্রখানি

         পূর্ণ করিয়া থেকো৷