প্রভাতী

জাত কি কারো আছে?

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

ক্রীত + কন = ক্রীতক৷ প্রাচীনকালে পৃথিবীর সব দেশে কিছু এমন সংখ্যক দুঃস্থ লোক ছিলেন বা থাকতেন যাঁদের জীবিকা ছিল সন্তান বিক্রী করা৷ পুত্র সন্তান বা কন্যা সন্তান দুই–ই তাঁরা বিক্রয় করতেন৷ ‘ক্রীতকঃ’ শব্দের অর্থ তাই কেনা পুত্র বা ক্রীত পুত্র অর্থাৎ পোষ্যপুত্রও হয়৷ তেমনি আবার ক্রীতদাসও(গোলাম, ইংরেজীতে ত্রপ্ত্ত্র্লন্দ্ব) হয়৷ ‘ক্রীতকঃ’ শব্দের স্ত্রীলিঙ্গরূপ ‘ক্রীতকী’৷ ‘ক্রীতক’ শব্দের অর্থ নিজের কন্যার সঙ্গে বিবাহ দেওয়া নিজ–জামাতা বা ঘরজামাইও হয়৷ বলা বাহুল্য এই সকল ঘরজামাই–এর অবস্থা ছিল ক্রীতদাসেরও অধম৷ রাঢ়ের প্রাচীন গানে আছে–‘‘ঘরজামাইয়ে শ্বশুরবাড়ী মেগের লাথি খায়’’, অথবা–

               ‘‘বাইরের জামাই মধুসূদন ঘরের জামাই মধো,

               ভাত খাও’সে মধুসূদন ভাত খেসে রে মধো’’৷

সেকালে অনেকে পয়সার বিনিময়ে ভাড়ার মেয়ে কিনতেন৷ এই ভাড়ার মেয়ের ব্যবসা করতেন হার্মাদেরা*(‘হার্মাদ/আর্মাদ’ কথার অর্থ জলদস্যু বা জলদস্যু–জাহাজ৷ এই জলদস্যুর অন্য নাম ছিল বোম্বাটিয়া বা বোম্বেটে)৷(‘‘রাত্রিদিন জেগে থাকে হার্মাদের ডরে’’৷ সেকালে বাঙলার উপকূল অঞ্চলের মানুষ রাত্রি–দিন জেগে পাহারা দিত......তাকিয়ে থাকত সমুদ্রের দিকে কখন হার্মাদেরা এসে তাদের বাড়ীর ছেলে–মেয়েদের ধরে নিয়ে যায় সেই ভয়ে৷) বাঙলার উপকূলে জলদস্যুর কাজ করত পোর্তুগীজেরা৷ এদের প্রধান কাজ ছিল চট্টগ্রাম, নোয়াখালি ও বাখরগঞ্জের উপকূলবর্ত্তী অঞ্চল থেকে শিশু–বালক–বালিকা, তরুণ–তরুণীদের অপহরণ করে পশ্চিম বাঙলার  উপকূল অংশে অবস্থাপন্ন লোকেদের কাছে বেচে দেওয়া৷ কোন কোন ক্ষেত্রে এর জন্যে এরা বেশ ভালো দর পেত৷ বর্দ্ধমান, হুগলী, মেদিনীপুর ও ২৪পরগণা অঞ্চলের অবস্থাপন্ন লোকেরা যাঁদের ঘরে ছেলের সংখ্যা একটু বেশী ছিল তাঁরা এইসব মেয়ে (ভারার মেয়ে) কিনতেন৷ মেয়ে সুশ্রী ও গুণসম্পন্না হলে তাদের সঙ্গে ছেলের বিয়ে দিতেন আর কুশ্রী হলে ক্রীতদাসী (বাঁদী) করে রাখতেন৷ পাছে জাতি–গোত্র জানাজানি হলে কুলীন জাতের বা উঁচু জাতের পক্ষে বিপত্তি দেখা দেয় বা জল–চল হবার সম্ভাবনা থাকে, তাই বলা হত ভাড়ার মেয়ের জাত জিজ্ঞেস করতে নেই৷ এ যেন সেই জল–চল জাতের ছোঁয়া কাঠ ছুঁলে স্নান করতে হয় বটে কিন্তু এক নৌকোয় যদি জল–চল ও জল–চল দুই জাতের লোক বসে ও সেক্ষেত্রে দায়ে পড়ে যদি ভাত খেতে হয় তবু জাত যায় না৷ তাই জাত বাঁচাবার জন্যে বলতে হয়, বৃহৎ কাষ্ঠে দোষঃ নাস্তি৷  অর্থাৎ কাঠ যদি খুব বড় হয় তা ছুঁয়ে ভাত খেলে জাত যায় না৷

অনেককাল আগে আমাদের বর্দ্ধমানে একটা ঘটনা ঘটেছিল৷ ছিলেন একজন ভট্টাচার্য বামুন–মস্তবড় কুলীন৷ ছোটজাতের কথা তো বাদ দিলুম, এমনকি বদ্যির দেওয়া ভাতও খেতেন না তাঁরা৷ তাঁরা কিনলেন একটি ভাড়ার মেয়ে চন্নগর বিবিরহাট থেকে৷ চন্নগর বিবিরহাটে তখন ভাড়ার মেয়ে বিক্রী হত–বিক্রী হত ভাড়ার ছেলেও৷ বিবিটি বেশ সুশ্রী সভ্যভব্য৷ তাঁরা ঘটা করে তার সঙ্গে বড় ছেলের বে’ দিলেন৷ কিছুদিন ভালভাবেই কাটল৷ পাড়ার লোকে এসে বউয়ের মুখ দেখে নানান উপহার দিয়ে যেতে লাগল৷ বউ একটু কম কথা বলত৷ বললেও মেপে–জুকে বলত পাছে মুখ ফসকে পূর্ববঙ্গীয় টান বেরিয়ে যায়৷ কিন্তু বিধি বোধ হয় অলক্ষ্যে বসে হাসছিলেন৷ একদিন বউ লাউ কাটবার সময় শাশুড়ীকে শুধোলে,–‘‘হ্যাঁ–মা কদুটা আজকেই কি কাটব?’’ শাশুড়ী তখন গালে হাত দিয়ে বসে পড়লেন৷ চোখ কপালে উঠে একেবারে শিবনেত্র হয়ে গেল৷ বললেন–এ কী কথা গো বউ লাউকে কদু বলে গো এ যে সব্বনেশে ব্যাপার গো আমি যে অনেক কিছু দুঃসংবাদের আঁচ করতে পারছি গো

বাড়ীর কর্ত্তা তখন এসে বললেন–‘‘গিন্নী, কী আর করবে কিল খেয়ে কিল চুরি  কর, এসব কথা তিন কাণ হতে দিও না, তুমি জানলে আর আমি জানলুম৷ এ কথা যেন অন্য কেউ না জানে ভূ–ভারতে৷ জানাজানি হয়ে গেলে আমাদের জাত–পাত –গোত্র কিছুই আর অবশিষ্ট থাকবে না৷’’

এমনই হয়েছিল বসিরহাটের বাঁড়ুজ্যে বাড়ীতে৷ এঁদের মেজ বউ ছিলেন ভাড়ার মেয়ে৷ বউ ছিল অসামান্যা সুন্দরী, রূপীয়সী৷ (বাংলার ‘রূপসী’ শব্দটি বৈয়াকরণিক বিচারে ভুল৷) একদিন হঠাৎ ভরদুপুরে দেখা গেল তার শাশুড়ী উঠোনের মাঝখানে পা ছড়িয়ে বসে চীৎকার করে হাপুস নয়নে কাঁদছে আর বলছে, ‘‘ওগো আমার এ কী হ’ল গো–আমার সোণার কপাল যে দিন–দুপুরে পুড়ে ছাই হয়ে গেল গো’’৷ গাঁয়ের লোক ছুটে এল৷ শাশুড়ীকে ঘিরে শুধোতে লাগল–‘‘হ্যাঁ গা কাঁদছ কেন গা.....কী হয়েছে গা? কে তোমার কপাল পোড়ালে গা.....সেটা আমাদের খোলসা করে বল৷’’

শাশুড়ী বললে–‘‘দিদি গো, দেখে আর বাঁচিনে, বউ কী যেন করতিছে চোখে আঁজন দিতিছে বউ, পীদিমকে চিরাগ বল্তিছে৷’’

এই হ’ল ভাড়ার মেয়ের কথা৷ এগুলিকে ভাল বাংলায় বলা হয় ক্রীতকী৷ তাহলে এ প্রসঙ্গে তোমরা আর একটা কথা জেনে রাখো৷ আজ যাঁরা জাতপাতের বড়াই করেন তাঁদের অনেকেই কয়েক পুরুষ আগেই জাত–পাত খুইয়ে বসেছেন যদি তাঁদের বাড়ীতে অতীতে কোনো ভাড়ার মেয়ে এসে থাকেন৷

ভাড়ার ছেলের ক্ষেত্রে যদি দেখা যেত ছেলে একটু বুদ্ধিমান, শিক্ষিত তাকে লোকে জামাই করে নিত.......করত ঘরজামাই৷ অন্যথায় তাকে গৃহভৃত্যের কাজে লাগিয়ে দিত৷ সে হত ক্রীতদাস.......গোলাম৷

আমার পরিচিত একটি চাটুজ্জ্যে পরিবারে এই ধরনের ব্যাপার অতীতে হয়েছিল৷ তাঁরা এই ধরনের একটি ভাড়ার ছেলে কিনেছিলেন তমলুকের কেলোমালের বাজার থেকে৷ সেকালে তমলুকেও ওইরকমের ভাড়ার ছেলে–মেয়ের ফলাও ব্যবসা চলত৷ ছেলে বিক্রির হাট ছিল কেলোমাল আর ভাড়ার মেয়ে পাওয়া যেত রাধামণির বাজারে (সেকাল থেকেই রাধামণির বাজার সুস্বাদু সন্দেশের জন্যে বিখ্যাত)৷ তারা কেলোমালের বাজার থেকে যে ১৪/১৫ বছরের ছেলেটাকে কিনে এনেছিল’ তাকে বাগাল হিসেবে কাজে লাগিয়ে দিল৷ সে গোরু চরাত, গোরু দেখাশোণা করত, ঘরদোর পরিষ্কার করত, আবার কাছে একটা চতুষ্পাঠীতে পড়তেও যেত৷ ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করলে সে পূর্ববঙ্গীয় টানে বলত আমি কেওট কৈবর্ত্ত৷ কয়েক বছর গেল, ছেলেটি সংসৃক্তে আদ্য মধ্য পাস করে বেরুল৷ চাটুজ্জ্যে মশায় অন্য কোনো পাত্র না পেয়ে তার সঙ্গে নিজের মেয়ের বে’ দিয়ে দিলেন৷ বিয়ের পরে তাকে পাড়ার লোকে জিজ্ঞেস করল, ‘‘হ্যাঁরে, তুই যে বলতিস তুই কেওট কৈবর্ত্ত তাহলে তুই ক্ষামুনের মেয়ে বিয়ে কি করে করলি?’’

সে তখন বর্দ্ধমানী বাংলায় বললে, আসলে তো আমি রাঢ়ী শ্রেণীর ব্রাহ্মণ৷ কিন্তু  বাগালের কাজ করতুম, তাই কর্ত্তামশায় বলেছিল তুই তো পড়াশুণা করিস নি, তাই তোকে কেউ জাত জিজ্ঞাস করলে কেওট কৈবর্ত্ত বলিস৷ নইলে নিন্দে হবে৷ এখন  আমি লেখাপড়া শিখেছি৷ তাই নিজেকে বামুন বলতে আর কোন ক্ষাধা নেই৷

হ্যাঁ, আরও একটা কথা৷ সেকালে অনেক সময় রূপগুণসম্পন্না মেয়ে বা ছেলেকে ওজন দরে কেনা হত সাধারণতঃ রজত বিত্তের বিনিময়ে (ব্দন্প্ত্লন্দ্বব্জ ত্ব্ব্ভপ্তপ্তন্প্সুগ্গ৷ শোণা যায় কোন কোন রাজরাজড়ারা সোণার ওজনেও ভাড়ার মেয়ে কিনতেন৷ এই ওজনদরে যে ছেলে কেনা হত পরে তাকে ক্রীতদাস রূপেও রাখা হত অথবা পোষ্যপুত্র বা ঘরজামাইও করা হত৷ তাদের বলা হত ‘ক্রীতক’৷ আর ওই ধরনের ওজন দরে কেনা মেয়েকে বলা হত ‘ক্রীতকী’৷

(শব্দ চয়নিকা, ১১/৯৮)

মজার মাস জষ্ঠি

লেখক
প্রণব কান্তি দাশগুপ্ত

লঙ্কানুনে আমের কুসি

খাও দুপুরে যত খুশি

কাঁটাল পাকে আঃ কী বাস!

কিংবা শশা সেটাও আশ

জষ্টি ভারী মজার মাস!

খেজুর ফুটি আর কী চাই---

তরমুজ কি গোটাটাই ?

খাও-না কচি তালের শাঁস---

জষ্টি ভারী মজার মাস!

শ্রীচরণে

লেখক
বিভাংশু মাইতি

আমার মনের বনে ফুটে ওঠা

ভাব-ভাবনার ফুলগুলো

ভক্তিভরে তোমার পায়ে

দিলুম আমি অঞ্জলি৷

আমার চিদাকাশে জেগে ওঠা

রামধনুর ওই রঙগুলি,

সযতনে রাঙিয়ে দিলুম

ওই আলতা বরণ পাগুলি

শক্তি ভক্তি, বুদ্ধি-বিবেক

যা কিছু মোর ঘরে আছে

সযতনে সঁপে দিলুম

সেই চরণের কাছে৷

সব কিছু মোর নিঃশেষে নাও

গ্রহণ কর মোরে,

সেই চরণে ঠাঁই যেন পাই

জন্ম-জন্মান্তরে৷

কোন আলোতে মন ভরালে

লেখক
রামদাস বিশ্বাস

কোন আলোতে মন ভরালে হৃদয় নাচে উল্লাসে৷

আলোয় আলোয় মন ভেসে যায় শীতল মলয় বাতাসে৷৷

ভুবন ভরা রঙের খেলায় নামালে আজ বিশ্ব মেলায়

শিমুল পলাশ আম্রমুকুল ভাঙলো দুয়ার মধু মাসে৷৷

ডাকলে এ কোন বাঁশির সুরে মাতাল মনন মরে ঘুরে

রঙের খেলায় ফুলের মেলায় তোমার চরণ ধরার আশে৷৷

শরণাগত

লেখক
রাসবিহারী বন্দ্যোপাধ্যায়

আমি তোমায় স্মরণ নিলাম

               ওগো দয়াময়,

মলিনতা দাও গো মুছে

               করো গো নির্ভয়৷

যেদিন আমি এলেন ফেলে

               ভুলিতে দাও অবহেলে

তোমার আশীষ মাথায় করে

               গাহি তোমার জয়৷

তুমি আছ সাথে সাথে

               তুমি হৃদয় মাঝে

তোমায় যেন স্মরণ করি

               আমার সকল কাজে৷

সুখের দিনে দুখের দিনে

               কাটবে না দিন তোমায় বিনে

সকল সময় পাই যেন গো

               তোমার বরাভয়৷

বাড়তি নম্বর ছিল পকেটে

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

প্রাচীনকালের মানুষ জামার পকেট রাখত সাধারণতঃ দুটি কারণে৷ একটি কারণ ছিল শীতের সময় হাত দু’টোকে পকেটে ভরে এই ব্যথার জগতেও খানিকটা স্বর্গসুখ ভোগ করা আর দ্বিতীয় কারণ ছিল–টাকা–পয়সা বা যেসব নেশার জিনিস আর পাঁচ জনকে দেখানো যায় না সেগুলোকে লুকিয়ে রাখা৷ ইংরেজীতে যাকে ‘পকেট’ বলি ফার্সীতে তাকেই বলি ‘জেব’, ভাল বাংলায় ‘কোষ্ঠক’৷ উত্তর ভারতে এই ফার্সী ‘জেব’ শব্দটি আজও ভাল ভাবেই চলে–উর্দুতে তো চলেই৷ স্থানীয় লোকভাষাগুলিতে যেমন অঙ্গিকা, মৈথিলী, ভোজপুরী, মগহী, অবধী প্রভৃতি ভাষাতেও ‘জেব’ শব্দটি ভালভাবেই চলে৷

আমার ব্যষ্টিগত জীবনেও ‘জেব’ শব্দটি অতীতের এক সোণালী স্মৃতিতে মাখানো রয়ে গেছে৷ সে সময় আমাকে যিনি ফার্সী পড়াতেন তাঁর নাম ছিল মউলবী হিদায়েতুল্লা৷ মানুষটি ছিলেন বড়ই ভাল৷ আমাদের মুঙ্গের জেলা তথা অঙ্গদেশের সাধারণ মানুষ খুব সোজা বুদ্ধির হয়৷ তিনি তার ব্যতিক্রম ছিলেন না৷ তিনি ইংরেজী জানতেন না কিন্তু উর্দু, আরবী, ফার্সীতে ছিলেন সুপণ্ডিত৷ মাতৃভাষা অঙ্গিকা ছাড়া বাংলাও জানতেন৷ আমি তাঁর ছিলুম অত্যন্ত স্নেহের পাত্র৷ ক্লাসে সবাইকার সামনেই আমাকে ববুয়া (খোকা) বলে ডাকতেন৷ একবার পরীক্ষার পরে দেখা গেল আমি ফার্সীতে একশ’র মধ্যে একশ’ তিন নম্বর পেয়েছি৷ গোটা ইস্কুলে হল্লা...হৈ হৈ ব্যাপার....রৈ রৈ কাণ্ড৷ মওলবী সাহেব একচোখোমি করেছেন৷ একশ’র মধ্যে এক’শ তিন নম্বর দিয়েছেন৷ কেউ কেউ বললে–জানতুম, মওলবী সাহেব খুবই ভাল–এখন দেখছি একটু আদিখ্যেতাও করেন৷ একশ’ এর মধ্যে একশ’ তিন নম্বর কি দেওয়া যায়?

আমাদের ইংরাজী সাহিত্য ও ফোনেটিক্স পড়াতেন মিঃ বি সি মিটার৷ তিনি মউলবী সাহেবকে শুধোলেন–মওলবী সাব, ইয়ে’ আপনে ক্যা কিয়া? একশো মেঁ একশো তিন নম্বর আপনে কৈসে দিয়া? মিটার সাহেব মওলবী সাহেবকে কথাটা জিজ্ঞেস করেছিলেন স্কুলের মাসড্রিলের সময়ে অর্থাৎ সে সময়ে স্কুলের সমস্ত ছাত্র মাঠে জড় হয়েছিল মিলিত ড্রিল করবার জন্যে৷ মওলবী সাহেব কিছুমাত্র বিস্মিত হলেন না....বিন্দুমাত্র ঘাবড়ালেন না.....তিলমাত্র হতচকিত হলেন না৷ বরং তিনি জোর গলায় সবাইকে শুণিয়ে শুণিয়ে বললেন–মাটার সা’ব, ম্যাঁ ক্যা কহুঁ৷ বাচ্চা ইতনা উম্দা লিখা হৈ জো মেঁনে আপনে জেব সে তিনি লম্বর দে দিয়া৷

দশাননের মুণ্ডুপাত

আমি যেখানকার কথা বলছি সেখানে যাত্রাগানের পালা ছিল ‘লক্ষ্মণের শক্তিশেল’৷ যাত্রাদলের বিবেকের কাজ হচ্ছে গানের মাধ্যমে যে ঘটনা হচ্ছে বা হতে চলেছে তার একটা আভাস দেওয়া৷ কিন্তু এখানকার বিবেক সে পথ না মাড়িয়ে রাবণের বিরুদ্ধে  জমিদারবাবুকে চটিয়ে দিয়ে বখশিসের ব্যবস্থা করতে চাইল৷

               ‘‘রাবণ আসিল জুদ্দে পইর্যা বুট জুতা,

               হনুমান মারে তারে লাতি–সর–গুতা৷

               সর কাইয়া রাবণ রাজা জায় গরাগরি,

               হনুমান বলে, ‘‘তোরে মাইরাসি সাপরি৷৷

               সাপর মারিনি তোরে মাইরাসি সাপরি’’৷

               সাপর মারিলে তুই জইতিস জমের বারি’’৷৷

জমিদারবাবু মহা খুশী৷ তিনি সঙ্গে সঙ্গে খাজাঞ্চিকে ডেকে বললেন–‘‘বিবেকডারে দশডা টাহা বক্শিস দাও৷’’ রাবণের ভূমিকায় যে নেবেছে সে নিষ্ঠার সঙ্গে পার্ট করে চলেছে৷ অস্ত্রের ঝনৎকার....পৌরুষের চরম অভিব্যক্তি৷ রাম একেবারে কোণঠাসা৷ ভয়ে ভাবনায় দুশ্চিন্তায় রামের মুখে কথা  সরে না৷ সে এক অসহনীয় পরিস্থিতি জমিদারবাবুর তা সহ্য হ’ল না৷ তিনি বললেন–‘‘রাবণডার এ্যাকডা মুণ্ডু কাইট্যা ফ্যালাইয়া দাও৷ আস্পর্দা কত দশানন দশানন আজ তাইক্যা নয়ানন অইয়া গেল৷’’

তোমরা জানো, নাটকের রাবণের একটা আসল মুণ্ডু থাকে আর বাকী নয়টা নকল মুণ্ডু৷ জমিদারের পাইক–বরকন্দাজরা একটা নকল মুণ্ডুকেটে দিলে৷ রাবণ লক্ষ্মণের ওপর চরম আঘাত হেনেছে...লক্ষ্মণের শক্তিশেল৷

হনুমান ছুটেছে মৃতসঞ্জীবনীর খোঁজে... বিশল্যকরণীর খোঁজে৷ রাক্ষসদের শিবিরে আনন্দের গুঞ্জরণ, রামের শিবিরে শোকের রোল, ক্রন্দনের আর্ত্তনাদ৷ জমিদারবাবু আর সহ্য করতে পারলেন না৷ তিনি বললেন–‘‘হারামজাদাডার অহনও আক্কেল অয় নাই৷ ওর আর্যাকডা মুণ্ডু কাইট্যা লও৷ দশানন দশানন আজ তাইক্যা আটানন অইয়া গেল৷’’

এর পরের দৃশ্য ঃ চাকা ঘুরে গেছে৷ লড়াইয়ে রাবণের হার হয়ে চলেছে৷ রাবণ কাতরভাবে শিবের উদ্দেশ্যে বলছেন–শিব, তুমি আশুতোষ৷ যত পাপই করে থাকি না কেন, আমি তোমার সন্তান৷ তুমি কৃপাদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাও৷ তোমার কৃপা ছাড়া আমার জয়ের তো কোনো পথই নেই, বাঁচবারও কোনো পথ নেই৷

রাবণ কাতরস্বরে বলে চলেছেন আর অঝোরে কেঁদে চলেছেন৷ দৃশ্য দেখে জমিদারবাবুর মনে দয়া হইল৷ তিনি বললেন–‘‘রাবণডার দুঃখু দেইখ্যা মন–প্রাণ বিগলিত অইয়া জায়৷ আহাহা, আহাহা ওর মুণ্ডু দুইডা আবার জোড়া লাগাইয়া দাও৷ আবার ওরে দশানন কইর্যা দাও৷’’

পরম প্রেম

লেখক
বিভাংশু মাইতি

তোমাকে ভালবাসি বলেই তো

রাত জেগে প্রীতির কাজল মাখি

বিকশিত শতদলে তোমাকে ধরে’ রাখি৷

তুমি ভালবাসো বলেই বলেই তো

দু’হাতে দুঃখ মাখি, কাঁটার পথে চলতে থাকি

নত শিরে অশ্রু নীরে সকল ব্যথা ভুলে থাকি৷

যদি কোনদিন ....

এমন হয় তুমি মুখ ফিরে চলে যাও অবহেলায়

আমার চোখে চোখ না রেখে দূরে ঠেলে দাও

তবু জেনে রেখো....

তবু তোমাকেই আমি ভালবাসবো আজীবন

তুমি যে মোর চিরশ্বাশত প্রেমের ভুবন৷

 

প্রভু হে আমার

লেখক
রাসবিহারী বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রভু হে আমার, আমি যে তোমার

দয়ার যোগ্য নই,

আঁধার নিশিথে একেলা চলিতে

জানিনাকো তোমা বই৷

বিপথে কখনো যদি যাই চলে

ফিরায়ো কঠোর শাসনের ফলে

আমারে গড়িতে যে বেদনা দাও

মাথা পেতে তাহা লই৷

যা কিছু আমার আছে আপনার

পারিনি তোমায় দিতে,

তোমার করুণা দিয়েছি ফিরায়ে

শকতি নাহিকো নিতে৷

যদি দয়া কর, যদি ভালোবাসো

দূরে নাহি ঠেলে, যদি কাছে আসো

তোমার আমার সব বাধা ঘুঁচে

আমি যে তোমার হই৷

তুমি এসেছো

লেখক
মনোজ পাতর

ভালবাসায় এসে কথা দেয় চুপি চুপি,

অন্তরে তাই ছবি আঁকি---

হৃদয়ে সেতার বেজে ওঠে.......

অনুরাগের রাগ-রাগীনিতে৷

ভক্তি-বিরহ এক হয়ে যায়,

আছড়ে পড়ে হৃদয় মন্দিরে৷

বুঝি তুমি এসেছো! আনন্দ আর ধরে না---

উপচিয়া যায়......

তব আলোকস্নাত স্মরণে,

শয়নে স্বপনে৷

আনন্দময় ভূবনে --- একান্ত গোপনে,

চেয়ে দেখি---একি!

কল্পনা নয় বাস্তব মূরতি,

অসীম আনন্দের প্রভু আনন্দমূরতি৷

জানি তুমি এসেছো---

চির অন্ধকারের নিদ্রা সরায়ে দিতে

তুমি এসেছো৷

আমার বকুল তলাতে

লেখক
রামদাস বিশ্বাস

বকুল গাছের তলাতে ব’সে দুপুর বেলাতে

গাঁথি মালা দেব ব’লে বন্ধু তোমার গলেতে৷৷

গরমকালে নিদাঘ বেলা অঙ্গ করে জ্বালা জ্বালা

মনটি বসাই যত্ন ক’রে বকুল ফুলের মালাতে৷৷

আদুল গায়ে পীত বাসে চিকনকালো মধুর হেসে

আড় বাঁশীটা নিয়ে বসো আমার বকুল তলাতে৷৷