প্রভাতী

পাটোয়ারী বুদ্ধি

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

‘ক্রথ্’ ধাতুর অর্থ হ’ল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে কাউকে হত্যা করা৷ দেবোদ্দেশ্যে বা ধর্মের নামে পশুহত্যা এই পর্যায়ে পড়ে৷ ক্রথ্  অচ্ ঞ্চ ক্রথ৷ ‘ক্রথ’ মানে যাকে হত্যা করা হচ্ছে৷ ক্রথ্  ল্যুট্ ঞ্চ ক্রথন মানে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে হত্যা করা, ধর্মের নামে হত্যা করা, অথবা যাকে হত্যা করা হচ্ছে৷ কেউ যদি ভাবে ধর্মের নামে পশু–হত্যা করলে উভয় পক্ষেরই লাভ অর্থাৎ মানুষের লাভ দুটো ঃ তার লোল জিহ্বা পাবে নিরীহ পশুর মাংস আর অর্জন করবে পুণ্য আর ওই নিরীহ হতভাগ্য পশু, যে জীবনে সবচেয়ে বড় ভুল করেছিল মানুষ নামে জীবকে বিশ্বাস করে, সে পাবে পশুজীবন থেকে মুক্তি–এ ধরনের জিনিসগুলি ভাবের ঘরে চুরি ছাড়া কিছুই নয়৷ সম্ভবতঃ মানুষ জাতের ইতিহাসে এই ধরনের স্বার্থপরতা ও ধর্মের নামে অধর্ম নির্মোকের প্রথম বিরোধিতা করেছিলেন গৌতম বুদ্ধ৷ সেই যে গল্প আছে না–

এজন পরম শাক্ত প্রতি বছর ঘটা করে কালীপূজা করতেন৷ হঠাৎ দেখা গেল পঞ্চাশ বছর বয়সে তার ভীমরতি ধরেছে৷ লোকে শুধোলে–হ্যাঁগো, এতদিন ধ’রে নিষ্ঠার সঙ্গে পুজো করে এলে আর এই পঞ্চাশ বছর পরে এমনকি ভীমরতি ধরল যে পুজোটিই বন্ধ ক’রে দিলে?

সে বললে–হ্যাঁ ভাই, কী আর করব৷ গত বছর অবধিও দু’চারটে দাঁত ছিল, এবছর একটা দাঁতও আস্ত নেই৷ অথচ বলি তো দিতেই হবে৷ কী করি বল৷ বলি না দিলে তো পুজোয় খুঁত হয়ে যাবে৷ তাই পুজোটিই বন্ধ করে দিলুম৷

দেবোদ্দেশ্যে কোন স্বার্থপূর্ত্তির পরে কোন বিশেষ ধরনের বলি দেওয়াকে ‘ক্রথ’ ধাতুর আওতায় আনা যায়, অর্থাৎ হে জগজ্জননী, হে বিশ্বমাতা, তুমি আমার ছেলেটাকে পরীক্ষায় পাস করিয়ে একটা চাকরি জুটিয়ে দাও মা৷ মেয়ের বিয়ের জন্যে হন্যে হয়ে ঘুরে মরছি৷ বিনা পণে একটি সৎপাত্র জুটিয়ে দাও মা, তোমাকে জোড়া পাঁঠা বলি দেব৷ এই পাঁঠা বলিও ‘ক্রথ’ ধাতুর অন্তর্ভূক্ত৷ দেবতার সঙ্গে এটি একটি দেনা–পাওনার –স্বার্থ বিনিময়ের খেলা ছাড়া আর কিছুই নয়৷

‘‘জগৎ যে মায়ের ছেলে

তার কি আছে পর–ভাবনা৷

তুমি তৃপ্ত করতে চাও মায়েরে,

হত্যা করে ছাগলছানা৷৷’’

এ ব্যাপারে আবার অনেক মানুষ ঈশ্বরের সঙ্গে পাটোয়ারী বুদ্ধির খেলাতেও নেবে পড়ে৷

একবার শুণেছিলুম একজন অতিভক্ত মায়ের কাছে মানত করেছিল তার ছেলেটার একটা চাকরি জুটলে আর মেয়েটা পাত্রস্থ হলে সে মায়ের মন্দিরে জোড়াপাঁঠা চড়াবে৷ যথাকালে মায়ের দওলতেই হোক বা অন্য কোন কারণেই হোক ছেলেটার একটা হিল্লে হ’ল, মেয়েটার মাথাতেও বিয়ের জল পড়ল৷ একবার তাকে নাকি স্বপ্ণে মা এসে বললেন–হ্যাঁরে, তোর কাজ করে দিলুম, জোড়াপাঁঠা চড়াচ্ছিস না কেন আমি আর কতকাল আলোচাল–মটরদানার সঙ্গে কাঁচকলা–ঘি–সন্ধব নুনের হবিষ্যি চালিয়ে যাব?

অতিভক্ত বললে–এই দেখ মা, বেমালুম ভুলে গেছলুম৷ সাতশ’ কাজে ব্যস্ত থাকি তো তা আমার আর কী দোষ৷ আমার সাতশ’ কাজে ব্যস্ত করে তুমিই তো রেখেছ৷ তা যাই হোক, পাঁঠার আজকাল আগুন–ছোঁয়া বাজার দর৷ আমার গ্যাঁট খসালেও অত টাকা নাববে না৷ তাই হাতীবাগান বাজার থেকে রোব্বারের হাটে তোমার জন্যে একজোড়া গোলাপায়রা এনে চড়িয়ে দোব৷

দিন গেল, মাস গেল৷ আবার ছ’মাস কেটে গেল৷ আবার নাকি মা এসে বলেছিলেন–হ্যাঁরে জোড়া পাঁঠা তো দিলি না, জোড়া পায়রারও তো মুখ দেখতে পেলুম না৷ তা তুই করছিস টা কী

সে বললে–দেখ মা, হাতীবাগান বাজারে গিয়ে পছন্দসই পায়রা পেলুম না৷ কোনটার ঠ্যাঙ ভাঙা, কোনটার ন্যাজ ছেঁড়া, ওই সব খুঁতের জিনিস দিয়ে তো আর তোমার সামনে বলি দেওয়া যায় না৷ আমাকে তো মা’র মন যুগিয়ে চলতে হবে৷ তাই ভাবলুম তোমার জন্যে এক জোড়া আখ বা একজোড়া ছাঁচি কুমড়ো বলি দোব৷

মা নাকি তাকে বলেছিলেন–যা করবার তাড়াতাড়ি সেরে ফেল৷ তোর জন্যে আমি তো আর আলাদা এ্যাক্কাউণ্ঢ (হিসেবপত্র.....খেরো খাতায়) রাখতে পারব না৷

আবার ছ’মাস কেটে গেল৷ আবার নাকি মা এসে তাকে বললেন–হ্যাঁরে আখও দিলি না, ছাঁচি কুমড়োও দিলি না৷ ভেবেছিলুম শীতের দিনে একটু আখ চিবিয়ে খাব, ছাঁচি কুমড়ো দিয়ে নারকোল–কুমড়ি রাঁধব৷ তুই কী রে কী ধরনের কুপুত্তুর তুই৷

অতিভক্ত বললে–আমার আর কী দোষ বল৷ আমি ভাল আখ ও ছাঁচি কুমড়োর খোঁজে অনেকের ক্ষেতেই ঢুঁ মেরেছি৷ ভাল আখ আর ছাঁচি কুমড়োর ক্ষেতে সর্বত্রই কড়া পাহারা বসানো হয়েছে৷ তোমার জন্যে যে দু–চারটে তুলে আনব তার জো নেই৷ তার চেয়ে ভাবছি তোমার নামে এক জোড়া গঙ্গা ফড়িং বলি দোব৷

মা নাকি তাতে বিরক্ত হয়ে চলে গেছলেন৷ বলেছিলেন–তুই আমার কাছে পাটোয়ারী বুদ্ধি খাটাচ্ছিস, তোকে দেখে নোব ব্যাটাচ্ছেলে৷

আরও ছ’মাস চলে গেল৷ অতিভক্ত একজোড়া গঙ্গা ফড়িংও বলি দিলে না৷ এবার নাকি মা এলেন রণরঙ্গিণী মূর্ত্তি নিয়ে বললেন–আজই একটা হেস্তনেস্ত করব, আজই একটা এসপার ওসপার হবে৷ বল তুই আমার জন্যে বলি দিবি কি দিবি না?

অতিভক্ত বললে–মা, তুমি তো সর্বত্রই আছ৷ তা আমাকে নিয়ে আর কেন লীলাখেলা করছ৷ তোমার মন্দির থেকে এক ঢিলের রাস্তাতেই তো গড়ের মাঠ৷ সকাল সন্ধ্যেতেই তো সেখানে ফড়িং ওড়ে যথেষ্ট পরিমাণে৷ বর্ষার ভিজে হাওয়ায় বড় বড় গঙ্গা–ফড়িং আসে৷ তুমি কোনদিন প্রাতর্ভ্রমণে বা সান্ধ্যভ্রমণে দু’চারটে বা দু–চার ডজন কেন, যত ডজন ইচ্ছে গঙ্গাফড়িং ধরো আর খেয়ো৷ আমাকে আর নিমিত্তের ভাগী কর কেন

হ্যাঁ বলছিলুম কি, এই অতিভক্ত যদি কোন একটা বলি সত্যিসত্যিই দিত তবে সে বলি ‘ক্রথ্’ ধাতুর আওতায় আসত৷ একথা বলাই বাহুল্য যে ধর্মের নামে এই ধরনের পাটোয়ারী বুদ্ধি মানুষ সমাজে যথেষ্ট ক্ষতি করেছে৷ বিশ্বের স্রষ্টী শক্তির, আদ্যাশক্তির নামে এই ‘ক্রথ্’ ধাতুর ব্যবহার নিশ্চয় কোন শুভ চিন্তার দ্যোতক নয়৷

সেরা দশ

লেখক
জয়তী দেবনাথ

রেজাল্ট রেজাল্ট বুকটাতে

                                             সেই কি ধুক-পুক!

সকালবেলা থেকেই যেন

                                             শুকনো চোখ মুখ!!

ঘুম ভাঙাতে লাগত আগে

                                             এলার্ম ডাকাডাকি---

সেখানে আজ স্টুডেন্টরা যেন

                                             কাকভোরের পাখি!!

রেজাল্ট পেয়ে চোখে মুখে

                                             সেই কি সুখের জ্যোতি!!

রেজাল্ট হাতে গর্বে বাবার

                                             ফাটছে বুকের ছাতি!!

মায়ের তখন চোখেতে জল

                                             বুকটা স্নেহে ভরা

বুকে টেনে মায়ের আদর

                                             সেই কি আশীষ ঝরা!!

মনটা তখন হুট করে

                                             ছুটল স্কুলপানে---

শিক্ষকদের চরণ ধূলি

                                             চাই যে মনে প্রাণে৷

সকলের আশীষটুকু

                                             তুলে নিলাম শিরে৷

এবার শুধুই ছুটব লক্ষ্যে

                                             হাজারো স্বপ্ণের ভিড়ে!!

তুমি যে......

লেখক
জ্যোতিবিকাশ সিন্হা

জীবন তরী, লড়াই গুরু

দমকা হাওয়া, বুক দুরু–দুরু

ভ্রষ্ট জনের দুষ্ট কর্ম

নষ্ট করে সমাজ ধর্ম

ঝঞ্ঝা–শনি, আঁধার রাতে

নিঃশঙক মানুষ এগিয়ে যাবেই–

তুমি যে গো রয়েছো সাথে৷

আসবে যাবে জীবন মরণ

সকল সময় তোমার শরণ

মত্ত যতই দুঃশাসন–নাচার

সত্য–ধর্ম সদা হাতিয়ার

নবারুণ রাঙা নবীন প্রভাতে

উদ্বেল মানুষ নোতুন আবেগে

তুমি যে গো রয়েছো সাথে৷৷

রামফল সিংয়ের কোষ্ঠী গণনা

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

যদিও জন্মকালের রাশি–লগ্ণের অবস্থিতি অনুযায়ী ব্যষ্টি ও রাষ্ট্রের ভাগ্য গণনা করাই প্রাচীনকালের প্রথা কিন্তু পরবর্ত্তীকালে করকোষ্ঠী বা ত্ন্ত্রপ্তপ্পন্ব্দব্ধব্জ্ এই বিদ্যাটি ভারতের পুরাতন বিদ্যা নয়৷ শাকদ্বীপী ব্রাহ্মণেরা বিদেশ থেকে এটি ভারতে এনেছিলেন৷ সমুদ্রের ওপার থেকে এদেশে এসেছিল, তাই এর নাম সামুদ্রিক বিদ্যা) শাস্ত্রের উদ্ভাবন ও প্রচলন হয়৷ নাম অনুযায়ী ও ব্যষ্টির সংস্কার সম্পর্কিত সংখ্যা অনুযায়ীও আরও পরবর্ত্তীকালে ভাগ্য গণনার কাজ শুরু হয়৷ স্ফটিক দর্শন ন্তুব্জম্ভব্দব্ধ্ত্রপ্ত, নখদর্শন ন্প্ত–ন্ধ্ত্রম্ভ্রনুন্ধগ্ প্রভৃতি  বিদ্যাগুলির প্রচলন হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ৩০০০ বছর আগে৷ গণনা বিদ্যায় বা গণকের আওতার মধ্যে এরা সবাই আসে৷ বলা বাহুল্য মাত্র, জ্যোতিষের এই বিভিন্ন ধারার গণনা নিরঙ্কুশ বা ত্রুটিমুক্ত নয়৷ অবশ্য কেউ কেউ বলতে পারেন যে, যে সকল তথ্যের ভিত্তিতে গণনা করা হয়ে থাকে, সেই তথ্যে যদি ভুল থাকে বা গণনার অঙ্কে যদি ভুল থেকে যায় তাহলে ফলেতে তো ভুল থাকবেই৷ এই জন্যে জ্যোতিষ শাস্ত্রের নিন্দা করা বৃথা৷ তাঁদের বক্তব্য একেবারে ফ্যালনা নয়৷ তবে কোনো মানুষেরই জ্যোতিষের মুখাপেক্ষী হয়ে বসে থাকা উচিত নয়৷ পুরুষকারের সাহায্যেই মানুষকে এগিয়ে যেতে হবে ও এটাই বলিষ্ঠ পদক্ষেপ৷

‘‘দৈবং নিহত্য কুরু পৌরুষমাত্মশক্ত্যা৷’’

কোথাও জ্যোতিষীর গণনা যদি নিষ্ঠার সঙ্গেও করা হয়ে থাকে তাহলেও তা যে সবাইকার ক্ষেত্রে সমভাবে ফলে যাবে এমন কথা হলপ করে বলা যায় না৷

রাজার ছেলে ও প্রজার ছেলে দু’জনেই যদি একই সময়ে জন্মায় তাহলে কোনো তারিখে প্রদোষ আট ঘটিকায় যদি রাজকুমারের রাজ্যাভিষেক অনুষ্ঠিত হয় তাহলে প্রজার  ছেলেটিকে হয়তো সেই সময়ে যাত্রার দলের রাজার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেখা যাবে৷ লোকে সেই সময়ের জন্যে তাকেও রাজা বলে ডাকবে৷

সেই যে কথা আছে না একটি নবজাত শিশু–তার নাম রামফল সিং৷ গণকঠাকুর খড়ি পেতে গুনে বললেন, এর গ্রহসংস্থান যেমন..........দশা–ন্তর্দশা যেমন তাতে এর খুবই প্রাচুর্য্যের মধ্যে দিন কাটবে৷ আমি যে দেখছি, এর ডাইনে বাঁয়ে সামনে পেছনে থাকবে কেবল গাড়ির পর গাড়ি৷ এ কী কম ভাগ্যের কথা

বন্ধু–বান্ধব আত্মীয়–স্বজন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগল কবে রামফলের সেই সৌভাগ্যের দিন আসবে৷ ২৪ বছর পর দেখা গেল রামফল সিং ট্রাফিক কন্ষ্টেবল হয়ে চউরাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে আছে আর তার সামনে পেছনে ডাইনে বাঁয়ে হুস্ হুস্ করে গাড়ি চলছে৷

তা যাই হোক, গণকঠাকুররা যে সব সময় ভুল করেন একথা আমি বলছি না৷ কিছু কিছু জিনিস মিলে যেতে আমিও দেখেছি৷ তবে তোমরা যেন জ্যোতিষ বিদ্যার মুখ চেয়ে বসে থেকো না৷

একবার হজরৎ মোহম্মদের দুই দল শিষ্যের মধ্যে তুমুল বাদ–বিতণ্ডা শুরু হয়ে গেল৷ একদল বললে, তক্দির বা ভাগ্যে যা আছে তাই হবে৷ কোনো চেষ্টা করা বৃথা৷ আর একদল বললে, মানুষ তদ্বির অর্থাৎ চেষ্টা করেই সব কিছু পাবে৷ যুধ্যমান দু’দলই হজরৎ মোহম্মদের কাছে যখন পৌঁছুল, তখন উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে তিনি বললেন, তক্দিরে যা আছে তা–ই হবে কিন্তু তোমরা তদ্বির করে যাও৷

 

চেনা

লেখক
নব্যদূত

নাম না জেনেও চিনি তারে

                              পথে ঘাটে মাঠে---

আগ বাড়িয়ে থাকে সে যে

                              নিত্যনতুন ঠাটে৷

চেনা তারে হয়না যে শেষ

                              জীবন পলে পলে

চিনি বলেই রয় অচেনা

               ভাবান্তরে অজানা কৌশলে৷

স্বার্থ যখন জেগে ওঠে

                              বিবেক অন্ধকারে,

রূপান্তরের অন্যরূপ

                              আঁধার পারাপারে৷

কী কঠিন এই মানুষ চেনা৷

                              সাথেই যখন থাকে,

দিনে রাতে ছন্দে তালে

                              স্বরূপ নিয়েই মাতে৷

ওরা যখন অট্টালিকায়

                              তুমি পথের ধারে,

বন বনানীর সবুজ পাতা

                              ফুলে ফলে ভরে৷

হাত বাড়িয়ে চাইছে ওরা

                              দেওনা একটি ফল,

একটি কেন আরো নেও

                              বাড়াও তোমার বল৷

‘রবি ঠাকুর’

লেখক
জয়তী দেবনাথ

সাহিত্যের রাজা তুমি

                              কবির তুমি গুরু৷

তব অসীম জ্ঞান সাগরে,

                              নেই যে শেষ-শুরু৷

রবি গো তোমার উদয় ছিল,

                              নেই যে অস্তাচল৷

               তাই তো তোমার কিরণ আজও

                              রাঙায় ধরা তল৷

কলমে তোমার ওগো কবি

                              ছিল কেমন জাদু!

তোমার কাব্য হৃদয় মাঝে,

                              যেন মাখায় মধু৷

তোমার গানের কথা-সুর

                              জোড়ায় হৃদয় খানি

সঙ্গীত জগৎ চিরকাল

                              তোমার দানে ঋণী৷

তোমার গীতি কাব্য যেন,

                              সিঞ্চিত কি সুধায়৷

তাইতো রবি অমর তুমি

                              সাহিত্যেরই পাতায়৷

দর্জি

লেখক
তোতন আদক

এক যে আছে দর্জি

কাপড় কেটে জামা বানায়

যেমনটি তার মর্জি৷

 

এসে দ্যাখেন খদ্দের,

বাবুর দেওয়ার জামার ছিটে

প্যান্ট করেছে বৈদ্যের৷

ও আমার বন্ধুরে

লেখক
রামদাস বিশ্বাস

ও আমার বন্ধুরে তোর লাগি মোর

জলভরা চোখ পথের ধারে স্থির৷

ও তুই আসবি বলে এলি না

কথা দিয়ে রাখলি না

খাইলি না মোর আপন হাতে

তৈরী ননী খির৷৷

হাওয়া লেগে শুকনো পাতা

খস খসিয়ে সরে

বুঝি আমার বন্ধু আসে

বুক ধড়ফড় করে

চাহিয়া দেখি কেহ না

ধুক পুকুনি থামে না৷

বুকের ব্যথা দাপিয়ে মরে

ঝরে আঁখি নীড়৷৷

জল খাই না পিপাসাতে ভাতের খিদে নেই

কেউ শুধালে আমি পাই না খুঁজে খেই

কথা রাখো মাথা খাও

একবারটি দেখে যাও

মানের গোড়ায় ছাই দিয়েছি

মান রাখো মানে নীড়৷

শ্রীচরণে

লেখক
বিভাংশু মাইতি

আমার মনের বনে ফুটে ওঠা

ভাব-ভাবনার ফুলগুলো

ভক্তিভরে তোমার পায়ে

দিলুম আমি অঞ্জলি৷

আমার চিদাকাশে জেগে ওঠা

রামধনুর ওই রঙগুলি,

সযতনে রাঙিয়ে দিলুম

ওই আলতা বরণ পাগুলি

শক্তি ভক্তি, বুদ্ধি-বিবেক

যা কিছু মোর ঘরে আছে

সযতনে সঁপে দিলুম

সেই চরণের কাছে৷

সব কিছু মোর নিঃশেষে নাও

গ্রহণ কর মোরে,

সেই চরণে ঠাঁই যেন পাই

জন্ম-জন্মান্তরে৷

ও কী করে এসেছিল

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

‘ইহ’ মানে ‘এই জগতে’৷ মনে রাখা দরকার ‘অত্র’ আর ‘ইহ’ এক জিনিস নয়৷ ‘অত্র’ মানে এখানে–এই স্থানে আর ‘ইহ’ ব্যবহূত হয় অনেক ব্যাপকার্থে......‘এই লোকে’/‘এই জগতে’৷ ‘ইহ’‘ঠক্’ প্রত্যয় করে আমরা পাচ্ছি ‘ঐহিক’ শব্দটি৷ তার বিপরীত শব্দ হচ্ছে ‘পরত্র’ থেকে ‘পারত্রিক’ ‘ইহলৌকিক’–বিপরীত শব্দ ‘পারলৌকিক’৷ ‘ইহলোক’–বিপরীত শব্দ ‘পরলোক’৷ ‘ইহ তিষ্ঠ’ না বলে ‘অত্র তিষ্ঠ’ বলা ক্ষেশী সঙ্গত হবে৷ ‘ইহ তিষ্ঠ’ মানে ‘এই জগতে থাকো’৷ আর ‘অত্র তিষ্ঠ’ মানে  ‘এইখানটিতে থাকো’৷ সুপ্রাচীনকাল থেকেই ‘ইহ’ শব্দটি অব্যয় রূপে ব্যবহূত হয়ে এসেছে৷

ইহলোক আর পরলোকের মধ্যে অনাদিকাল থেকে অনন্তকাল পর্যন্ত থেকে যায় এক সূক্ষ্ম স্বর্ণরেখা৷

সে অনেক দিন হয়ে গেল৷ তখন দিল্লীতে নিজের বাড়ী ছিল না৷ থাকতুম কখনো হোটেলে, কখনো ভাড়া বাড়ীতে৷ সেবার হোটেলেই ছিলুম৷ সান্ধ্য–ভ্রমণ সেরে হোটেলে ফিরলুম রাত্রি প্রায় সাড়ে আটটায়৷ বাথরুমে গিয়ে ক্ষেসিনে হাত–মুখ ধুচ্ছি, হঠাৎ পেছন দিক থেকে শুনলুম আগেকার সুপরিচিত মিষ্টি আওয়াজ–‘কেমন আছো?’ ভাবলুম–এ কী এ যে আমার ছোটবেলাকার অতিপরিচিত দুলু পালিতের আওয়াজ দুলু একাধারে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, আবার দূর সম্পর্কের আত্মীয়ও৷ দুলুর বাড়ী ছিল মগরার কাছে......অভিজাত পরিবারের ছেলে৷ দুলু পালিত, ব্রজগোপাল সান্ন্যাল ও আমার মধ্যে ছিল নিবিড় বন্ধুত্ব৷ দুলু পালিত ও ব্রজ সান্ন্যাল ছিল অত্যন্ত রূপবান৷ ওদের মনের সৌন্দর্য ছিল আরও বেশী৷ পরোপকার ছিল তাদের সহজাত সংস্কার৷ কিন্তু এখানে এই হোটেলের বাথরুমে সেই দুলুর আওয়াজ কোত্থেকে এল কী করেই বা এল আমি স্বপ্ণও দেখছি না, সুস্থ শরীরে, সুস্থ মস্তিষ্কে বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাত–মুখ ধুচ্ছি–এ তো শোনার ভুল হতে পারে না, ভাবার ভুলও হতে পারে না

দুলু এবার একটু অভিমানের সঙ্গে বললে–‘‘তুমি কি আমার ওপর রাগ করেছো? আমার দিকে তাকাচ্ছো না কেন?’’

হ্যাঁ, বলে রাখি, দুলু আমায় বড্ড বেশী ভালক্ষাসত৷ সে  আমাকে  ছোটবেলায় কয়েকবারই বলেছিল–যেমন কৃষ্ণলীলার সুদামা–কৃষ্ণের সম্ক্ষন্ধ তেমনই আমাদের সম্ক্ষন্ধ৷ সুদামা কৃষ্ণকে বড্ড ভালবাসত৷ কৃষ্ণও সুদামাকে খুব ভালবাসত৷ ও আমাকে বলত–‘‘দেখ, আমরা একে অন্যকে এত বেশী ভালক্ষাসব যে কৃষ্ণ–সুদামাকেও হার মানিয়ে দোক্ষ৷’’

আমি বলেছিলুম–‘‘আমি তেমন পারক্ষ কিন্তু তুমি কি তেমন পারবে?’’

ও বলেছিল–‘‘নিশ্চয় পারক্ষ, দেখে নিও’’

আজ সেই দুলুর আওয়াজ পেলুম৷ আর সে অভিমানের সুরে বলছে–‘‘আমি তার দিকে তাকাচ্ছি না কেন’’

আওয়াজ আসছিল যেন আমার পেছনের দিক থেকে৷ পেছনের দিকে দেওয়ালে তাকিয়ে দেখি, দেওয়ালের গায়ে দুলু আলোকোজ্জ্বল পূর্ণাবয়বে দাঁড়িয়ে রয়েছে, আর আমার দিকে চেয়ে আনন্দে হাসছে৷ আমি তাকাতেই  সে আনন্দে উচ্ছল হয়ে উঠে বললে–‘‘কেমন আছো? তোমার জন্যে ক’দিন হ’ল আমার মনটা ছটফট করছিল৷ এখন তোমাকে কাছে পেয়ে ক্ষাঁচলুম৷’’

আমি বললুম–‘‘আমি বেশ ভালই আছি৷ এক্ষার কলকাতায় গিয়ে তোমার সঙ্গে দেখা করব৷’’

ও বললে–‘‘নিশ্চয়, নিশ্চয়৷’’ তারপর একটুখানি পরে বললে–‘‘আমাকে তোমার পছন্দমত কোনো কাজে লাগিয়ে নাও৷ এতে আমার  সুক্ষিধে হবে এই যে, সব সময় তোমার কাছে থাকা যাবে৷ যদি কখনো কাছে না–ও থাকা যায় অর্থাৎ কাজ নিয়ে বাইরে কোথাও যেতেও হয় তাহলেও মনে এই পরিতৃপ্তি থাকবে যে তোমার কাজ করতেই বাইরে যাচ্ছি৷’’

আমি বললুম–‘‘তেমনটিই হবে৷ আমি ক’দিনের মধ্যেই কলকাতায় ফিরছি৷’’

এমন সময় টেলিফোনের আহ্বান আসায় শোবার ঘরে চলে এলুম৷ ফোন ধরতেই ওদিক থেকে আওয়াজ এল–‘‘আমি ব্রজগোপাল সান্ন্যাল কলকাতা থেকে বলছি৷’’

ব্রজগোপাল আমার ছোটবেলাকার বন্ধু৷ ও ভালভাবেই জানত, দুলু পালিত আমাকে ছাড়া থাকতেই পারে না....কতকটা যেন ত্ব–এর পাশে হু–এর মত৷

আমি ব্রজকে বললুম–‘‘কী বলছো?’’

ব্রজ বললে–‘‘আমাদের ছোটবেলাকার বন্ধু দুলু পালিত ক’দিন ধরেই বড্ড বেশী অসুস্থ৷ আমি এখন ওর বাড়ী থেকেই ফোন করছি৷’’

আমি বললুম–‘‘কী হয়েছে?’’

ব্রজ বললে–‘‘কী হয়েছে বোঝা যাচ্ছে না৷ নাড়ীর গতি স্বাভাবিক, কোনো রোগ–ভোগ নেই, জ্বর–জ্বালাও নেই৷ ডাক্তার বলছে, কোনো রোগই ধরা পড়ছে না’’৷

আমি বললুম–‘‘তবে কী হয়েছে?’’

ব্রজ বললে–‘‘ও কেবল শুয়ে শুয়ে এপাশ ওপাশ করছে আর তোমার কথা বলছে৷ বলছে কতদিন দেখা হয়নি, আবার কবে দেখা হবে কে জানে পরিচিত কাউকে দেখলেই তাকে তোমার কথা জিজ্ঞেস করছে, আর বলছে, কবে দেখা হবে কে জানে’’

আমি ব্রজকে জানালুম যে, সব কাজকর্ম ফেলে রেখে আমি কালকের প্লেনেই  দিল্লী থেকে কলকাতা পৌঁছোচ্ছি৷ আর বিমান বন্দর থেকে সোজা ওর বাড়ীতেই যাব৷

ব্রজ আশ্বস্ত হয়ে ফোন ছেড়ে দিল৷ আমি আবার বাথরুমে গেলুম দেওয়ালের দুলুর সঙ্গে আরও কথা বলতে–সেই কোটপ্যান্টপরা আলোকোজ্জ্বল দুলু৷ বললুম–‘‘তারপরে বলো কী খবর৷ এখন তাহলে ভালই আছো৷’’

ও বললে–‘‘ভাল বলে ভাল, খুব ভাল৷ তোমাকে কাছে পেয়ে কত যে ভাল লাগছে কী বলব৷ মনে হচ্ছে এমন ভালর মধ্যে মরাও ভাল৷’’ সেই যে কবি বলেছেন না–

‘‘এমন চাঁদের আলো মরি যদি সেও ভালো

 সে মরণ স্বর্গসমান৷’’

আমি বললুম–‘‘মরণের কথা–টথা বলবে না, তাহলে আমি ভীষণ রেগে যাব৷ তোমাকে বকাঝকা করব৷ আমার মেজাজটা তো তুমি ভালভাবেই জানো৷’’

ও বললে–‘‘তোমাকে আমি রাগতে দোব না, মরণের কথা বলব না৷’’

আমি বাথরুম থেকে হাত–মুখ ধুয়ে ফিরছি৷ ঘড়িতে তখন ন’টার ঢং ঢং আওয়াজ শুনলুম৷ আর দুলুর দিকে তাকাতেই দেখি, দুলুর চিত্র শাদা দেওয়ালে মিশে গেল৷ আমার খাবার সময় হয়েছে দেখেই বোধ হয় ও চলে গেল৷

শোবার ঘরে এলুম৷ কয়েক মিনিট পরে কলকাতা থেকে ফোন এল৷ আবার সেই ব্রজগোপাল সান্ন্যালের কন্ঠস্বর৷ ও বললে–‘‘তোমাকে অত্যন্ত দুঃসংবাদ জানাচ্ছি, আমাদের দুলু এইমাত্র ঠিক ন’টার সময় আমাদের ছেড়ে অন্যলোকে চলে গেল৷ বুঝলে, আমার সব কিছুই গোলমেলে ঠেকছে৷ বুঝতে পারছি না কোন্টা ইহলোক, কোন্টা পরলোক৷