প্রভাতী

তির্যক

লেখক
প্রণবকান্তি দাশগুপ্ত

বোটের আগে জোট

জোট বাঁধলে বোট

বোটের শেষে ঘোট

ঘোট মেটাবে নোট৷

J J J

 

মন্ত্রী আসেন এম.পি. আসেন

আসেন জোড়হস্ত

সমাজ-সেবার হরেক বুলি

শোণান উদয়-অস্ত৷

জিতলে বোটে বুড়ো আঙুল

দেখিয়ে ছোটেন দিল্লি

শিকের পানে চেয়েই থাকে

আমরা ােকা িিল্ল৷

J J J

 

ঘুষ কমিশন তার সঙ্গে

কর্তা আনেন কাটমানি

তাই গিন্নীর দেমাক বাড়ে

আহ্লাদে হন আটখানি৷

ত্রিবেণী সঙ্গম

লেখক
আনন্দম্ মহানন্দম্

তিন মেয়েতে বন্ধু হয়ে

বেশ চলছো হেলেদুলে

যাচ্ছ বুঝি ত্রিবেণী ঘাট

নইলে এমন চালে চলে

এ তোমরা কেমন রাধা

তিন চুলে এক বেণী বাঁধা

পথ হারাতে চাওনা জানি

বেণী এমন তাই বলে৷

মার্গ জানি সোজা নয়

যেন বেণীর আঁকাবাঁকা

সব বাঁকেতেই হারিয়ে যাবার

যেন বিধি আছে লেখা৷

সাবধানেতে যেও কিন্তু

ছয় চক্রেতে পা ফেলে

ত্রিকুটিতে হারিয়ে যেও

 সে সখার সাগর জলে৷৷

 

আনত প্রার্থনা

লেখক
সাধনা সরকার

পৃথিবীর একটি নাম

বড় প্রিয়

‘‘আনন্দমূরতি’’

ভালবাসি প্রণত আমি ও আমরা

জীবনের সব দিয়ে

এসো প্রভু এসো প্রিয়

এসো তুমি দীপ জ্বালো

দীপ নেভা অন্ধ মনে

রাশি জড়তার স্তূপ ঘিরে

না যেন আবর্তিত হয়

এ জীবনের মানে৷

শুভ নববর্ষে

লেখক
প্রভাত খাঁ

‘বন্দেমাতরম্’ মন্ত্রে উদ্ভাসিত বঙ্গজননী

শুভ নববর্ষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাঙালী সমাজের

শপথ নেবার ক্ষণ মাতৃঋণ পরিশোধের৷

যুগ যুগ ধরে নিষ্ঠুর লোভী শোষক যারা বর্বরের

মতো মাকে লুণ্ঠিত, ধর্ষিত, খণ্ডবিখণ্ডিত রক্তাক্ত করে,

তাদের উচিত শিক্ষা দেবার তরে

সঠিক সময় হয়েছে বর্তমান কালচক্রে

ওই আহ্বান বাণী

কাণ পেতে শোণ আকাশে-বাতাসে

আজ আর মিথ্যা জাতপাত ধর্মমতের

ভেদাভেদ নয়, সবাইকে মায়ের সন্তান হয়ে

বজ্রকণ্ঠে উচ্চারণ করতে হবে---বাঙলা মোদের মা,

বাঙলার বুকে সার্বিক শোষণমুক্তির লক্ষ্যে

সবাই এক হয়ে লড়ব,

দুঃখিনী মায়ের মুখে হাসি ফোটাবো৷

গণের দায়িত্ব গণেশ নিলেন

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

তোমরা শুণেছ অথবা ছোটবেলায় তোমাদের জোর করে শোণানো হয়েছে বা ভয় দেখানোর জন্যে বলা হয়েছে যে ভূত বলে একটা অদ্ভুত জিনিস আছে৷ ছোটবেলায় যখন পিসিমার কোলে শুয়ে বা বসে হাত–পা ছুঁড়ে বলতে–দুধ খাব না, তখন পিসিমা একটা ভয়ের গল্প শোণাতেন৷ তখন ভয়ে হাত–পা নাড়া বন্ধ করে দিতে, পিসিমা হঠাৎ এক ঝিনুক দুধ মুখে ঢেলে দিতেন৷ সেই থেকে তোমার মনে শুরু হয়েছিল একটা ভূতের ভয়......একটা অজানা আতঙ্ক৷ এই ভূতেরা নাকি আকাশে বাতাসে ঘুরে বেড়ায়......গা ভাসিয়ে দেয় হাওয়ার গতিধারায়৷ রাতবিরেতে.... অন্ধকারে.....আলো–আঁধারিতে কাউকে একলা পেলে তাকে হাতছানি দেয়...দিন–দুপুরে বড় বাড়ীতে একলা ঘরে ভূতের কাল্পনিক পদধ্বনিতে গা ছমছম করে....আর সব ইন্দ্রিয় কাজ করা বন্ধ করে দেয়....কাণ হয়ে থাকে খাড়া....সে আসছে হয়তো বা সে আসে....মনে হয় দিনের বেলা ভুল করতুম তর্ক করে এই বলে যে ভূত নেই কিন্তু বর্তমানে যে পরিবেশে রয়েছি সেই পরিবেশে কেবল আমি রয়েছি আর রয়েছে ভূত....একজন ভয় পাচ্ছি....আরেকজন ভয় পাওয়াচ্ছে৷ এই যে ভূতেরা এরা আলো দেখলে পালিয়ে যায়৷ এক সঙ্গে অনেক মানুষের জটলা দেখলে গা ঢাকা দেয়৷ সমাজে এরা কখনো কখনো ভয়ের বস্তু হিসেবে চিহ্ণিত বলে আদর–কদর পায় না৷ মানুষ যখন ভীতিগ্রস্ত অবস্থায় থাকে না তখন সুযোগ মত ভূতের ওপর এক হাত নেয় কিন্তু সে একলা থাকলে রাতের অন্ধকারে তাদের অপদেবতা বলে সম্মান জানায়৷ যেমন চোরেরা পুলিশ অফিসারের কাছে পৌঁছে গেলে ভয়ে ভক্তিতে সালাম জানায় কিন্তু দূর থেকে দেখতে পেলে ডাইনে বাঁয়ে যে গলিটাই দেখতে পায় সেই গলিটায় ঢুকে পড়ে৷ ভূতেদের কিন্তু ব্যথা এখানেই৷ তারা সামাজিক স্বীকৃতি পায় না৷

হ্যাঁ, ওদের কথা তো জানই৷ এমনিতে অনেকেই বলে থাকে দেবতাদের সংখ্যা নাকি তেত্রিশ কোটি৷ যখন পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা তেত্রিশ কোটির চেয়ে কম ছিল, দেবতা ছিলেন ৩৩ কোটি অর্থাৎ মাথাপিছু গড়ে একের বেশী দেবতা৷ সুতরাং মানুষকে ট্রাম–বাসে চলবার সময় একবার বাঁ দিকে, একবার ডানদিকে কপাল ঠুকতে হত৷ আবার সেই মানুষই যখন শাস্ত্রচর্চা করত ওদের বলত সব লৌকিক দেবতা৷ কারও সম্বন্ধে বলত ওরা পৌরাণিক দেবতা, কারো সম্বন্ধে বলত ওরা আসলে জৈন দেবতা৷ শরীরের অনেক অঙ্গকে কাটাকুটি করে করে দেওয়া হয়েছে খাঁদুরাণী বা খাঁদুবিবি৷ কারো সম্বন্ধে বলা হয় বিবর্ত্তিত বেনামা বৌদ্ধদেবতা৷ কোনো পেত্নী বা পেঁচো ভূতে ধরলেই তখন  এদের শরণাপন্ন হয়৷ এদের বামুন–পুরুত নেই৷ জাত–বাঙ্গালী পুরুত এদের পুজো করে থাকেন৷ কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুজোর বাড়ীর মেয়েছেলেরাই একটু আধটু উপবাস অধিবাস করে বাংলা পাঁচালী পড়ে পাঁচালীর পুঁথিটি কপালে তিনবার ঠেকিয়ে পুজো শেষ করে দেয়৷ তারপর প্রসাদ বিতরণ করা হয় বাতাসা, কলা, কখনো কখনো জলখাবারের সময় গরম ভাজা জিলিপি৷ এই যে দেবতারা এদের সংখ্যা যে কত তা আজ বলা যায় না৷ কারণ প্রতি দশম বর্ষে মানুষের আদমসুমারী হয় কিন্তু এই ভূতেদের বা দেবতাদের আদমসুমারী হয় কিনা বলতে পারছি না৷ কোন্ গণক বা এনিউমারেটর এই কাজ করেন তাও ঠিক জানা নেই৷ এই ধরনের দেবী–দেবতাকে অনেক সময় মানুষ সুস্থ মনে মানে না, কিন্তু বিপদে আপদে মানে৷ কোন দেবী সম্বন্ধে বলা হয়–অমুক রোগ বলতে নেই....বলতে হয় মায়ের দয়া হয়েছে....বিহারে বলা হয় ‘‘মাতা হোল ছে’’  (মাতা হয়েছে)৷ কলেরা হলে ফাসী–উর্দু–হিন্দোস্তানী বলে ‘হ্যায়জা’, সংস্কৃতে ‘বিসূচিকা’, বাংলায় ‘ওলাওঠা’৷ ওলাওঠা হলে ওলাইচণ্ডীর প্রতি ভক্তি বাড়ে৷ অন্য সময় বলা হয় ‘ওলাইচণ্ডী’ লৌকিক দেবী৷ গ্রামাঞ্চলে গ্রীষ্মকালে সাপের উপদ্রব একটু বাড়ে ভরা বর্ষায় ও ভাদ্রের শেষ পর্যন্ত৷ তাই বিষহরি বা মনসার এই সময়টিতে প্রভাব হয় বেশী এতে জাতপাতের বিচার নেই...হিন্দু–মুসলমানের ভেদ নেই৷ ওলাবিবির মত মনসাও সবাইকার দেবী৷ মনসার ভাসান বা পাঁচালীতে ছোঁয়াছুঁয়ি নেই৷ একই গ্রামে অর্জুন মণ্ডল নামে তিন বন্ধু–একজন হিন্দু, একজন মুসলমান, একজন খ্রীষ্টান–মনসার ভাসানে তিন জনই গান গায়৷ এই সকল দেবীদেবতারা ভক্তি–শ্রদ্ধা পায় না৷ সেই জন্যে প্রাচীনকালে পুরাণকারেরা নানানভাবে ভয়ের সূচিকাভরণ করে (injection) এই সকল দেবতাদের প্রতি ভক্তি জাগাবার চেষ্টা করেছেন–তৈরী করেছেন রকমারি গল্প যা শোণানোর সঙ্গে সঙ্গে একেবারে ভয়ে–ভক্তিতে স্বেদ–ঘর্ম দেখা দেয়৷ এই দেবতাদের চরিত্র এমনভাবে আঁকা হয়েছে যেন তারা সব সময় রেগে টং হয়ে রয়েছে....শাপ দেবার জন্যে জিব উঁচিয়ে রয়েছে৷ তবু এই সকল দেবদেবীরা সাময়িকভাবে মর্যাদা পান–অন্য সময়ে নয়৷ কায়স্থদের ঘোষ–বোস–মিত্র–গুহ বিয়ে বাড়ীর ছাদনা তলায় একরাত্রির শাহানশাহ হয়ে যান, তারপরে লোকে তাদের কথা ভুলে যায়৷ এই যে সব দেবী–দেবতা যারা শাস্ত্রমতে স্বীকৃত দেব–দেবী তো নয়ই....কোথাও কোথাও শাস্ত্রে অস্বীকৃত–এদেরও অনেক সময় লোকে ভয়ে উপদেবতা বলে থাকে৷ ভূতকে সে ভয়ে বলে থাকে অপদেবতা৷ এই সকল অপদেবতা ও উপদেবতারা (উপ মানে কাছাকাছি) পৌরাণিক গল্পমতে একবার তাদের উপেক্ষার মর্মজ্বালা সহ্য করতে না পেরে শিবের শরণাগত হয়েছিল৷ শিব তাদের শরণ দিয়েছিলেন এই শর্তে যে তারা সৎপথে চলবে... ভক্তিরসে জারিত হয়ে থাকবে....পারস্পরিক মারামারি, কাড়াকাড়ি, হানাহানি করবে না...নিরীহের মুণ্ডুপাত করে রক্ত মোক্ষণ করবে না৷ এই উপদেবতা ও অপদেবতারা শিবকে নাকি বচন দিয়েছিল তারা অহেতুকভাবে কাউকে অকালে যমালয়ে পাঠাবে না৷ তাই এরা পেল শিবের আশ্রয়৷ শিবের আশ্রয় পাওয়া এইসব উপদেবতা–পদেবতা নাম দেওয়া হল ‘গণ’৷ ঠিক হল, শিব যেখানে যাবেন শিবের আগে বা পরে, বিশেষ করে সেটা যদি হয় সোমবার অথবা বিশেষ করে হয় চৈত্র মাস তাহলে সেই অপদেবতা বা উপদেবতারা শিবের আগে বা পরে চলতে থাকবে৷ এই গণেরা যাতে কোন অবাঞ্ছিত কাজ না করে বসে তাই এদের আচরণের ওপর যে নিয়ন্ত্রণ থাকা দরকার তা শিব অনুভব করেছিলেন৷ সেই আশায় শিব কার্ত্তিককে বলেছিলেন–‘‘কার্ত্তিক, তুমি এদের দায়িত্ব নাও৷’’

কার্ত্তিক বললেন–‘‘পিতৃদেব আপনি যা আদেশ দেবেন আমি তা পালন করব৷ কিন্তু মুসকিল হচ্ছে দু’জায়গায়৷ প্রথমতঃ আপনি যখন তাণ্ডব নাচেন তখন আপনার জটা থেকে দলে দলে সাপেরা মাটিতে পড়তে থাকে৷ আপনি তো জানেন সাপ ময়ূরের প্রিয় খাদ্য৷ ওই সময় যদি ময়ূরকে অন্য কাজে ব্যস্ত না রাখা হয় তাহলে সর্পকুল ধ্বংস হওয়া সুনিশ্চিত৷ কবি বিদ্যাপতিও পার্বতীর মুখ দিয়ে বলিয়েছেন ঃ

‘‘কার্ত্তিক পোষল ময়ূর সেহ নাগে খাবত হে৷’’

পিতৃদেব, আরও একটি কথা হচ্ছে এই যে ময়ূরটি আমার অনেকদিন ধরেই বাত রোগে জরাজীর্ণ রয়েছে .......চৌরঙ্গী বাত৷ মাথার ঝুমকো থেকে পায়ের কড়ে আঙ্গুলের নখ পর্যন্ত বাতগ্রস্ত৷ ডাক্তার বলছে, এর সর্বাঙ্গে ব্যায়াম দরকার৷ তাই ময়ূরের স্বাস্থ্যের কথা ভেবে আমি ময়ূরকে আমার সঙ্গে বিশ্বপরিক্রমায় ব্যস্ত রাখতে চাই৷ এই অবস্থায় আমাকে যদি গণেদের তদারকিতে ব্যস্ত থাকতে হয় তাহলে বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে৷ তবু আপনি যখন বলছেন, করব৷ তবে আপনি একবার দাদা গণেশকে শুধিয়ে দেখতে পারেন৷

শিব ওই কথা গণেশকেও বললেন৷

গণেশ বললেন–‘‘বাবা, তুমি যখন বলছ তখন আমি নিশ্চয় করব৷ এক্ষুণি এই মুহূর্ত থেকেই করব৷’’

শিব আশ্বস্ত হলেন৷

গণেশের ওপর তদারকি বা খবরদারির দায়িত্ব দেবার ফলে গণেশকে নাম দেওয়া হল গণেশ (গণ  ঈশ)–গণেদের নিয়ন্ত্রক.... controller of Ganas..

তাহলে তোমরা ‘গণ’ শব্দের এই মানেটাও বুঝে গেলে তো  (শব্দ চয়নিকা, ১৬/১২১)

নবীন বরণ

লেখক
মণিদীপ রায়

আলো-ছায়া খেলে যায় কত ভাবে এসে,

গাছে গাছে ফোটে ফুল কত ভালবেসে৷

হাসি খেলি নাচি মোরা খিল খিল করে’

আসে যে বা কাছাকাছি নিই তায় বরে৷

হাত ধরে চলি মোর এ পথ ’পর

হরিহর মন সাথে, নাহি তাই ডর৷

নববর্ষের বাসনা

লেখক
প্রণবকান্তি দাশগুপ্ত

নববর্ষের প্রত্যুষে আজ আমি

               করজোড়ে নতজানু

এই বর মাগি, ধরি চরণ দু’টি---

এ জীবন হতে নোতুন জীবনে

               ফের যেন জেগে উঠি৷

তোমার মন্ত্রে হব নবজাত

তোমার আশীর্বাদী আলোকে হবো শুদ্ধস্নাত৷

জন্ম-মৃত্যু দুইয়ের কাল সীমায়

অন্তত এক অন্তবর্তী জীবন দাও আমায়৷

আমারে করো তোমার ভূমা মনের মনসিজ

মৃত্যুরে বন্ধক রেখে তোমার চরণে

তোমারই বরে হবো আমি দ্বিজ৷

তোমার তো কিছুই নয় অসাধ্য

তোমার ধর্মে তোমার কর্মে

               আমারে করো বাধ্য৷

নোতুন পৃথিবী

লেখক
অনির্বাণ

নববর্ষ এলো আজি নবীনের বেশে

বাতাসে রয়েছে শুধু নোতুনের ডাক

আকাশে গৈরিক ছটা তপ্ত ধূলা ওড়ে

তার সাথে শেষ হ’ল চৈত্রের সাধ৷

পুরোনো বিদায় নিল নোতুনকে ডেকে

এল রে নোতুন দিন নোতুন পসরা নিয়ে

বইতে হবে না আর পুরোনো ক্লান্তির বোঝা

বিগত না পাওয়ার ব্যথা দিল ভুলিয়ে৷

ঐক্যমন্ত্রের ভাবনা নিয়ে নোতুনের সাজে

সত্য-শিব-সুন্দরের ধবজা তুলে ধ’রে

ভাল হোক মন্দ হোক সবকিছু ভুলে

সবাইকে বাঁধতে হবে প্রীতি-রাখী ডোরে৷

হাত হাত ধ’রে সবে চলো এগিয়ে

সুখে দুঃখে বেদনায় আনন্দ-উৎসবে

একের ধ্যান করে এক মনপ্রাণে

নোতুন পৃথিবী আজ গড়ে নিতে হবে৷

নববর্ষের নোতুন আলো

লেখক
আচার্য প্রসূনানন্দ অবধূত

নববর্ষের নোতুন আলো

নাশুক সবার মনের কালো

হিয়ার মাঝে প্রদীপ জ্বেলে

তন্দ্রা ভেঙ্গে জাগিয়ে দিলে৷

প্রাণের পরাগ ছড়িয়ে দিলে

স্বপ্ণলোকের সুর শোনালে

কে তুমি মোর মন রাঙালে?

বিশ্বদোলায় সবে দোলালে৷

মধুর পরশে হরষে মাতালে

আলোর পথের দিশা দেখালে

বললে সবে এগিয়ে চল

নোতুন পৃথিবী গড়ে

পর্বতের মূষিক প্রসব

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

যে কথা আগে বললুম, কুক্কুর বর্গীয় ও মার্জার বর্গীয় জীবেদের সম্বন্ধে যে কথা খাটে কতকটা সেই কথাই খাটে উদ্ভিদ বর্গীয়ের সম্বন্ধেও৷

আমার জানা এক বসু মহাশয় সাত সমুদ্র তের নদী ঘুরে শেষ পর্যন্ত এসে বসলেন পৈত্রিক ভদ্রাসনে৷ বর্ধমান জেলার রায়না থানার পলাশন গ্রামে৷ ভদ্রলোক ও তাঁর স্ত্রী দুজনেই দারুন রকমের বৃক্ষপ্রেমিক৷ এধরণের বৃক্ষপ্রেমিককে তাইলা্যণ্ডে ‘বৃক্ষশ্রী’ উপাধি দেওয়া হয়, ভারতে দেওয়া হয় ‘কৃষিপণ্ডিত’৷ সেবার ভদ্রলোক গ্রামে এসে গাছের ক্যাটালগ দেখে বিভিন্ন দেশ থেকে সেরা সেরা গাছ আনতে লাগলেন ও বর্ধমান জেলার মাটিতে তাদের ফুলোতে ও ফলাতে থাকলেন৷ একবার তিনি শুণলেন এক অদ্ভুত রকমের ফুলের কথা৷ ফুলটির রঙ শ্বেত শুভ্র (Milky white)৷ পাপড়িগুলো সাজানো কতকটা যেন গোলাপের মত৷ গন্ধে আকাশ বাতাস মধুময় হয়ে ওঠে–গাছে দারুণ আঠা৷ আঠার ফলে চোরেরা ফুল তুলতে সাহস করে না৷ অর্থাৎ এই ফুল একদিকে যেমন বাগানের শোভা বর্দ্ধন করে অন্যদিকে  তেমনি তস্করের হাত থেকে নিজেই নিজেকে রক্ষা করে৷ দক্ষিণ আমেরিকার একটা বিশেষ গ্রীষ্মপ্রধান আর্দ্র অঞ্চলে এদের বাস৷ এদের বাঁচাতে গেলে শিশুকালে তালপাতা কিংবা কলাপাতার ঠোঙা দিয়ে সকাল দশটা থেকে চারটে পর্যন্ত ঢাকা দিয়ে রাখতে হয়৷ এদের গায়ে সন্ধ্যায় ফুরফুরে হাওয়াও লাগাতে হয়৷ এ্যামোনিয়া সারের সঙ্গে সর্ষের খইল ও তার সঙ্গে কম্পোজ সার সমপরিমাণে মিশিয়ে চালুনিতে  ভালভাবে চেলে সমপরিমাণ ক্ষোন–ডাষ্ট মিশিয়ে শতকরা পাঁচ ভাগ গ্যামাক্সিন মিশিয়ে শেকড়ের আশপাশে ছিটিয়ে দিতে হয়৷ তবে শেকড়ের এক ইঞ্চি দূরত্বের মধ্যে ওই সার থাকা চলে না৷

ভদ্রলোক স্ত্রীকে বললেন, ‘‘শুণছ গো, গাছ নিয়ে নোতুন একটা গবেষণা করার সুযোগ এল৷ আমাদের বদ্দমান জেলায় যা কেউ কখনও দেখে নেই এবার তেমনটি হব্যে’’৷ ভদ্রলোক সঙ্গে সঙ্গে দক্ষিণ আমেরিকা রবাণা হয়ে গেলেন৷ চার পাঁচদিনের মধ্যে ফিরে এলেন৷ এসে বোসগিন্নীকে বললেন, ‘‘দেখ এবার সাগরসেঁচা মাণিক আননুম্৷ ক্ষদ্দমানের মাটিতে সেই মাণিকের গাছ হব্যে’’৷

ভদ্রলোকের কাজেকর্মে কোনখানটিতে তিলমাত্র খুঁত রইল না৷ প্রাণ ঢেলে বীজগুলোকে তোবাজ করতে লাগলেন৷ অনেক কষ্ট করে সার সংগ্রহ করলেন৷ বোসগিন্নী ওই সারকে চালবার জন্যে বর্ধমান–রাণীগঞ্জ বাজার থেকে বিশেষ ধরণের মিহি চালুনি আনালেন৷ ভদ্রলোক সন্ধ্যের সময় নিয়মিতভাবে বীজতলার পাশে বসে সিঙ্গুর থেকে কিনে আনা তালপাতার পাখায় বাতাস করে যেতে থাকলেন৷ কাঁধের গামছাটা মধ্যে মধ্যে বাঁ হাতে তুলে নিয়ে ঘাড়–মাথা–কপাল–মুখ্ ঘাম মুছে যেতেন৷ মধ্যে মধ্যে চশমাটা খুলে নিয়ে ভাপে ঢাকা কাঁচ দু’টো ধুতিতে মুছে নিতেন৷ এই গলদ্ঘর্ম অবস্থা বোস মশায়ের চলেছিল বেশ কিছুদিন ধরে৷ যখন ভদ্রলোকের মনে হত সিঙ্গুরের ছোট পাখায় আর শাণাচ্ছে না তখন তারকেশ্বরের গাজনের মেলা থেকে কিনে আনা ক্ষিরাট আকারের তালপাতার পাখা দিয়ে দু’হাতে ক’রে হাওয়া করে যেতেন৷

যথাকালে বীজ থেকে অঙ্কুরোদগম হ’ল৷ ভদ্রলোক বড় করে একটা সত্যনারায়ণ দিলেন৷ গাঁ শুদ্ধ লোক পেসাদ পেয়ে গেল........শুভেচ্ছা জানাল, ওই দক্ষিণ আমেরিকার ফুলের গাছের অঙ্কুর যেন তাড়াতাড়ি বের হয়৷ গাছের পাতা এলে যেন তাদের অবশ্যই ডাকা হয়৷ ফুল দেখবার নেমতন্ন যেদিন করা হবে সেদিন যেন আরো একবার একটা বড় করে সত্যনারায়ণ দেওয়া হয়৷

বোসবাবু বললেন, সে আর বলতে যেদিন বীজ থেকে অঙ্কুর বেরুবে বুঝতে হবে আমার মানব জীবন সার্থক হয়েছে৷ যেদিন পাতা বেরুবে সেদিন আমার নয়, গোটা বদ্দমান জেলার সকলের মানব জীবন সার্থক হয়েছে, আর যেদিন ফুল আসবে সেদিন আমাদের অক্ষয় স্বর্গবাস৷

যথাকালে পাতা বেরুল৷ বোসমহাশয় স্বগতভাবে বললেন এমন পাতা কোন স্বপ্ণলোকে কখনও কোথাও দেখেছি দেখেছি ক্ষলে মনে হচ্ছে৷ বসুগৃহিণী মনে মনে বললেন–এই ধরণের পাতা আমার বাপের বাড়ীতে কোন্নগরের মিত্তির বাড়ীর পেছনের দিকে আস্তাকুঁড়ের পাশে যেন দেখেছি একথা মনে হচ্ছে৷ তবে আস্তাকুঁড়ের পাশে দেখেছি একথা তো কত্তাকে বলতে পারি না৷ যাই হোক কত্তাকে চেপেই যাই৷

গাছটি আরও বড় হ’ল৷ বসু মহাশয় পাড়ার লোকদের কোন খক্ষর দিলেন না, কারণ তার মনে যেন কেমন কেমন ঠেকছে৷

বসুমহাশয় বললেন, ‘‘গিন্নী, আমারও যেন কেমন কেমন লাগছে৷ তবে এখন কথাটি না বলাই ভালো৷ কিছুদিন আর মুখ খুলো না, ফুল আসুক তখন দেখা যাবে৷’’

দেখতে দেখতে গাছে কুঁড়ি এল৷ ভদ্রলোকের বুকের ধড়ফড়ানি বেড়ে গেল৷ বসু গিণ্ণী বললেন, ‘‘কত্তা আমারও শরীরটা যেন তেমন ভাল লাগছে না৷ রগ টনটন করছে .....কেমন গা বমি বমি করছে........অম্লশূলের ব্যথাটা যেন কেমন চেগে উঠেছে৷ আমি কপালে গামছা বেঁধে একটু শুয়ে পড়ি৷

পরদিন সকালের কথা৷ রোজ ভোরে বসুমশায় গিণ্ণীকে ডাকেন–এসো গো, চল গাছ দেখি গে৷ আজ আর গিণ্ণীকে ডাকলেন না৷ নিজেই ধীর পায়ে বাগানে গাছটির কাছে বসলেন৷ গাছটির কাছে আসার সময় তার আর পা সরছিল না–হাঁটু নড়ছিল না৷ গাছের পাশে এসে তিনি আস্তে আস্তে বসে পড়লেন৷

ফুল এসেছে৷ শুধু একা আসেনি৷ সঙ্গে নিয়ে এসেছে বসু পরিবারের জন্যে হতাশার হিমালয়৷ ভদ্রলোক না ডাকলে কি হবে, বসুগিণ্ণী নিজের থেকেই এলেন৷ রগে তখন গামছা বাঁধা৷ গাছটির কাছে এসে তিনি ধপাস করে পড়ে গেলেন ৷ ভাগ্যিস বসুমশায় পাশেই ছিলেন, তাই তিনি গিণ্ণীর হাত ধরে ফেললেন৷ নইলে গিণ্ণী তো মুখথুবড়ে গাছটির ওপরেই পড়ে যেতেন৷

কর্ত্তার চোখে জল......গিণ্ণীর জীর্ণ মুখে হতাশার কাজল চিহ্ণ৷ এত কষ্ট করে, এত সার দিয়ে, এত পাখার বাতাস করে ঘটা করে সত্যনারায়ণ দিয়ে যে গাছটিকে আজানুম,সে যে আমাদেরই আস্তাকুড়ের পাশে অযত্নে গজিয়ে ওঠা ঘেঁটু ফুল৷

গিণ্ণী বললেন, ‘‘ঘেঁটুফুল গো ঘেঁটুফুল৷’’

কর্ত্তা বললে, ‘‘ঘেঁটুফুল গো ঘেঁটুফুল৷’’

কর্ত্তা বললে, ‘‘ভাল বাংলায় যাকে বলি ঘণ্ঢাকর্ণ’’৷

যাই হোক যে কথা জীবজগতের বেত্রে প্রযোজ্য উদ্ভিদ জগতের বেত্রেও তাই প্রযোজ্য.......বুঝলে

(শব্দ চয়নিকা, ১১/১৯১)