প্রভাতী

একুশ তোমায় ভোলা না যায়

লেখক
শিবরাম চক্রবর্ত্তী

একুশের এই ফেব্রুয়ারী

               তোমায় কি ভুলতে পারি?

এই দিনেতেই ডাকার (ঢাকা) বুকে

               যুদ্ধ হয় যে জারি৷

রফিক, জব্বর, বরকত মিলে

               বাংলা ভাষা রক্ষায়,

খান সেনাদের বুলেট খেয়ে

               অমর হয়ে যায়৷

আজকের এই মহান দিনে

               শপথ নেওয়া চাই,

বাংলা ও বাঙালীর মোরা

               দুঃখ যেন ঘুচাই৷

মতদ্বন্দ্ব যতই থাকনা

               তারে শিকেয় তুলে,

বাঙালীর ভাব–ভাষার টানে

               যাই যেন সব ভুলে৷

আর চাই সৎ রাজনীতি

               প্রশাসনের স্বচ্ছতা

তা হলেই দুই বাঙলাই

               পাবে বেশি মান্যতা৷

গর্বের কথা–২১শের এই

               ফেব্রুয়ারীর দিনটাই

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার

               সম্মান পেল ভাই৷

প্রভাতসঙ্গীত

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

(১)

মধুর চেয়েও আরো মধুর আমার বাংলা ভাষা,

আমার প্রাণের ভাষা৷

শিরার স্রোতে ধমনীতে রক্তে মর্মে মেশা৷৷

ওষ্ঠে যখন এল হাসি, নাবল চোখে আলোর রাশি

বলেছিলুম কোলে বসি মা তুমি ক্লেশ নাশা৷৷

অনাদরে অবহেলায় তোমারে মা আজ কে কাঁদায়

জীর্ণবাসে ধূলায় লুটায় যে মোর সকল আশা৷

(২)

বাংলা আমার দেশ, বাংলাকে ভালবাসি

বাংলার দুঃখে কাঁদি বাংলার সুখে হাসি৷

বাংলার ভাইবোনেরা মোর খেলারই সাথী

বাঙালীর হিয়া অমরা ঢেলে যায় প্রীতিনীতি

বাংলার ফুল ফল জল প্রভাতের স্মিত শত দল৷

যুগান্তরের নিরাশার কুযাশা দিক নাশি

বাঙলীর যত আশা বাঙালীর প্রিয় ভাষা

বিশ্বৈকতাবাদে ফিরে পাক প্রত্যাশা

বাঙালীর ছেলেমেয়েরা বাঙালীর বোধি পসরা

সার্থক হোক হে প্রভু মহতের ভাবে মিশি৷

ভাঙে তো মচকায় না

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

সেই যে গল্প আছে না, একজন বাঙলাভাষী জমিদারের সখ হয়েছিল ঊর্দুভাষী  সাজবার৷ থাকতেন তিনি গ্রামে৷ গ্রামের লোককে তিনি বোঝাবার চেষ্টা করতেন যে তাঁর পূর্বপুরুষেরা আসলে উর্দুভাষী ছিলেন৷ বাঙলায় আসার পরে ভাষাতে কিছুটা বাংলা প্রভাব পড়ে গেছে, আসলে তাঁরা উর্দুভাষীই৷

গ্রামের লোকেরা ভয়ে ভক্তিতে সামনে কিছু বলত না৷ আড়ালে বলাবলি করত, এরা চৌদ্দ পুরুষ ধরে তো এখানকারই লোক, বাইরে থেকে আবার এল কবে ভদ্রলোক শেষে হালে পানী না পেয়ে তাঁর ঊর্দু বনেদীপনা দেখাবার জন্যে শহরে একটা বাড়ী কিনলেন৷ শহরের প্রতিবেশীদের বোঝাবার চেষ্টা করলেন তাঁরা পশ্চিমদেশীয় অর্থাৎ উর্দুভাষী, তবে বাংলা ভী থোড়া–বহুৎ জানেন৷ শহরের লোকেরা ভাবলে, হয়তো বা কথাটা সত্যি৷ এমন সময় একদিন জমিদার সাহবের বাড়ীতে একটা শোকাবহ ঘটনা ঘটে যাওয়ায় বাড়ীর মেয়েরা চীৎকার করে মড়াকান্না জুড়ে দিলে৷ জমিদার সাহেবের আশায় গুড়ে বালি পড়ল৷ মেয়েরা কান্না জুড়ে দিয়েছে বাংলা ভাষায়৷

পাড়ার লোকেরা এসে বললে–জমিদার সাহেব, আপনি তো উর্দুভাষী, তবে আপনার বাড়ীর মেয়েরা বাংলা ভাষায় কাঁদছেন কেন?

জমিদার সাহেব বললেন–হ্যাঁ, তারা মন্দ কাঁদছে না গোড়ার দিকে উর্দুতেই কাঁদছিল৷ আমি বললুম তোমরা যদি উর্দুতে কাঁদো বংগাল মুলুকের লোকেরা ভাববে তোমরা উর্দুতে সাদীর গান গাইছো৷ তাই বাংলায় কী করে মড়াকান্না কাঁদতে হয় আমি ওদের শিখিয়ে দিয়ে এলুম৷ তা মন্দ কাঁদছে না, শুণে মনে হবে কোন বংগালীন ঔরৎ কাঁদছে৷ আমার বাড়ীর নোকরানী গফুরের আম্মা যেমন ভাবে কাঁদে, এরাও প্রায় তেমনি ভাবেই কাঁদছে৷

পাড়ার লোক তো শুণে থ’৷ তারা বুঝে নিল জমিদার সাহেব একটি আস্ত মজনতালি সরকার৷ তোমরা মজনতালি সরকারের গল্প জান তো

মজনতালি সরকার ছিল একটি বেড়াল৷ তার সখ গেল, বনেদীয়ানা দেখিয়ে বনের রাজা হবে৷ একদিন রাত্রি তৃতীয় প্রহরে বনের জীবজন্তুরা সবাই বসেছে বন–উন্নয়ন পর্ষদের বিশেষ মীটিংয়ে৷ প্রধান আলোচ্য বিষয়, বনে পানীয় জল সরবরাহ ব্যবস্থা কীভাবে আরও ভাল করা যায় তাই নিয়ে৷ কুকুর, ছাগল, বাঘ, ভাল্লুক, সবাই আছে৷ সবাই নিজের নিজের বক্তব্য বলে যাচ্ছে৷ সভাপতির চেয়ারটি খালি রয়েছে৷ সিংহ আসতে একটু দেরী করছে কি না৷ এমন সময় মজনতালি সরকার সভাপতির চেয়ারে এসে বসে পড়ল৷ দু’তিন বার ম্যাঁও ম্যাঁও করে শরীর ফুলিয়ে দিলে৷ বন্য জন্তুরা দেখলে, আরে শরীরটাকে বেশ ফোলায় কমায় তো

সবাই বললে–জাহাঁপনা, আপনি কে জাহাঁপনা?

সে বললে–আমি মজনতালি সরকার৷ আমি বনের রাজা৷ এই যে বাঘ দেখছ ও আমার ভাগ্ণে৷ শাস্ত্রে আছে ‘নরাণাং মাতুলক্রমঃ’৷ পুরুষ মানুষকে দেখতে হয় মামার মত, আর মেয়েদের দেখতে হয় পিসির মত৷ তা চেয়ে দেখ না, বাঘের চেহারা কতকটা আমার সঙ্গে মিলেছে কি না? আমি মামা কি না

সবাই দেখলে, সত্যিই তো রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারটা দেখতে অনেকটা মজনতালি সরকারের মতন৷ সবাই মজনতালি সরকারকে রাজা বলে মেনে নিলে৷ লেট লতিফ* সিংহকে আর রাজা বলে মানছি না৷

মজনতালি সরকারের সভাপতিত্বে বন উন্নয়ন পর্ষদের মীটিং ভাল ভাবেই হল৷ ঠিক করা হ’ল, দশ কোটি নূতন বৃক্ষ লাগানো হবে৷ আগামী বৎসর ওই দশ কোটির মধ্যে যে ন’ কোটি গাছ মরে যাবে সেই শূন্যতা পূরণের জন্যে যাদের কন্ড্রাক্ট দেওয়া হবে তারাই বিনা মূল্যে পানীয় জল সরবরাহ করবে৷ এরপর মজনতালি সরকার বললে–তোরা দেখছি সবাই ছোট ছোট জানোয়ার৷ আমার চাপরাশি আর্দালীর কাজের জন্যে দু’একটা বড় জানোয়ার দরকার৷

সবাই বললে–আমাদের জঙ্গলে ঐরাবত হচ্ছে সব চেয়ে বড় জানোয়ার৷ দু’চারটা ঐরাবত আপনার কাছে পাঠিয়ে দোব৷

মজনতালি সরকার বললে–দেখব সে কত বড় জানোয়ার৷ বনের জানোয়ারা ক্যানেস্তারা টিন পেটাতে লাগল৷ আওয়াজ শুনে হাতীরা ছুটোছুটি শুরু করে দিলে৷ একটা প্রকাণ্ড ঐরাবতকে ছুটে আসতে দেখে মজনতালি সরকারের আর গাছের ওপর থাকতে ভরসা হল না যদি ঐরাবতের প্রচণ্ড ধাক্কায় গাছটা পড়ে যায় তবে মজনতালি সরকারের সঙ্গে সঙ্গে ভূমিসমাধি হবে৷ মজনতালি সরকার তখন একটা বট গাছের শিকড়ের তলে আশ্রয় নিলে৷ ঐরাবতের পা বড়বি  তো পড় শিকড়ের ওপর পড়ল৷ হাতীর পায়ের চাপে শিকড়টা মজনতালি সরকারের পেট চেক্টে দিলে৷ মজনতালি সরকারের পেট ফেটে গেল৷ তার তখন শেষ অবস্থা৷

এদিকে বনের জানোয়াররা তাদের রাজাকে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে৷ কোথায় রাজাবাহাদূর, কোথায় রাজাবাহাদূর শেষ পর্যন্ত তারা রাজা–বাহাদূরকে খুঁজে বের করলে৷ রাজ্য বাহাদূরের তখন অন্তিম দশা৷ তারা কাঁদতে কাঁদতে মজনতালি সরকারকে বললে ‘রাজা–বাহাদূর, আপনার এ দশা কে করলে?’

খাবি খেতে খেতে মজনতালি সরকার বললে– তোদের আমি কী অর্ডার করেছিলুম? আমি বলেছিলুম একটা বড় জানোয়ার আনতে৷ আর তোরা কি না পাঠালি ঐরাবতের মত একটা ছোট্ট জানোয়ারকে৷ প্রথমে তো তাকে দেখে বড় রাগ হ’ল৷ পরে এত হাসি পেল যে হাসতে হাসতে আমার পেট ফেটে গেল৷ মজনতালি সরকার মরে গেল৷

* স্বভাবগত ভাবে যে মানুষ কোথাও পৌঁছুতে বিলম্ব করে ভারতীয় ইংরেজীতে তাকে বলে ‘লেট লতিফ’৷

মাগো

লেখক
শিবাশীষ সেনগুপ্ত

মাগো জন্ম নেবো নানান সাজে

থাকবো তবু তোমার প্রাণের মাঝে

ফুল হয়ে থাকবো চাঁপা গাছে

তবুও তো থাকবো তোমার কাছে৷

 

তুমি যখন ডাকবে খোকন খোকন বলে

চুপটি করে থাকবো পাতার তালে

তুমি যখন শুয়ে

শীতল ছায়া দেবে তোমার আমার গায়ে

তুমি যখন যাবে ঠাকুর ঘরে

পড়বো আমি তোমার পায়ে ঝরে

ঘুম থেকে যেই উঠবে তুমি

দেখবে রঙ্গীন হয়ে ফুটছি আমি৷

নোতুন পৃথিবী

লেখক
বলরাম সরকার

আমি খুঁজে চলি এক নোতুন পৃথিবী

মানুষে মানুষে  যেথা নেই কোনো ভেদ

যেখানে  বঞ্চনা নেই, নেইকো শোষণ

পরিপূর্ণ বিকাশের অবাধ সুযোগ৷

যেখানে গ্যারান্টী মেলে অন্নবস্ত্রাদির

জীবনের নূ্যনতম সব প্রয়োজন

জ্ঞানের  আলোকে সবে উদ্ভাসিত হবে৷

আর হবে অণু সাথে ভূমার  মিলন৷

সেই পৃথিবীখানি গড়ে তুলবার

এসো আজ সবে মিল করি অঙ্গীকার৷

দেশ পূজ্য নেতাজী

লেখক
প্রভাত খাঁ

 

(১)

কীর্ত্তি যাঁর রহে এ ধরায়

স্মরণের  বালুকা বেলায়

তিনিই অমর হন৷

স্বাধীনতা, মানবতা তরে

যিনি যান সংগ্রাম করে৷

দেশ নেতা  হয়ে তিনি রণ৷

সার্থক নেতাই  হন দেশের নেতাজী

একসূত্রে বাঁধি  সবে রচি মহাজাতি

মুক্তির আশ্বাস দানি করি’ মহারণ৷

ব্যষ্টি স্বার্থ, যশ খ্যাতিমান

পায়েতে দলিয়া যিনি যান

তিনিই বরনীয়, স্মরনীয় দেশ পূজ্য হন৷

(২)

বিশ্ব কবি নেতাজী নামেতে যাঁরে করেন-বরণ

তাঁরেই পরমপিতা ‘ব্রজকৌস্তভ’ কণ

জ্বলন্ত ধূমকেতু, উল্কার

অনলশিখা হয়ে ইতিহাসে রণ

তোমার অসমাপ্ত  কর্মপূর্ণ করিবারে

জাগিতেছে  তরুণের  দল দিকে দিকে

ভ্রষ্টাচারী  দলনীতি করিতে দলন৷

নিস্পেক্টর আসছেন

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

শিক্ষাবিভাগের বিশৃঙ্খলা সম্পর্কে নানা মুখরোচক গল্প প্রচলিত আছে৷ গল্পগুলি তৈরী হয়েছিল কেন? চরম ঔদাসীন্য ও বিশৃঙ্খলার জন্যেই তো, তার সঙ্গে নৈতিকতা ও প্রজ্ঞাক্ষোধের অভাব তো রয়েইছে৷ ফাঁকি দিয়ে কোনো মহৎ কাজ হয় না একথা যেমন সত্য ঠিক তেমনই ফাঁকি দিয়ে পরীক্ষায় পাশ করলে বা করালেও জ্ঞানভৌমিক উন্নতি হয় না–পর্বতপ্রমাণ অনুপপত্তি থেকেই যায়৷

আমাদের পাড়ায় থাকতেন হিন্দী শিক্ষক শ্রীযুক্ত বাবু পুলকিত রায় (পুলকিত ঃ তিনি ‘পুল্কিৎ’ উচ্চারণ করতেন)৷ ছোটবেলায় আমাদের বিহারে শিক্ষককে সম্বোধন করা হত ‘মাটার সাহাব’ বলে৷ কেউ কেউ গুরুজীও বলত৷ পুলকিত রায় মশায় ইংরেজী জানতেন না৷ হিন্দী কেমন জানতেন তা আমার জানা নেই৷ ক্লাসে যেতেন হাঁটুর ওপরে তোলা একটি আধ–ময়লা ধুতি পরে, গায়ে থাকত পানের ছোপ ধরা একটি ফতুয়া, কাঁধে একটি গামছা৷ ফতুয়ার এক পকেটে থাকত একটি দেশলাই, অপর পকেটে এক ক্ষাণ্ডিল ক্ষিড়ি৷ দেশলাইয়ের কাঠিগুলো ব্লেডে করে লম্বালম্বি ভাবে চিরে দু’টো করে রেখে দিতেন৷ আসলে যতগুলো কাঠি থাকে এতে তার ডবল সংখ্যক কাঠি পাওয়া যেত৷ স্কুলে পৌঁছেই মাটার সাহাব পাশের টিউব–ওয়েলে স্নান করতেন–তার পরে ছাতু* খেতেন (ছোলার ছাতুর সংস্কৃত ‘শত্তুণ’, যবের ছাতু আর মুড়ির ছাতুর সংস্কৃত ‘ধানাকা’ বা ধানাচূর্ণ)৷ তেল–নুন–লঙ্কা মেখে ছাতু খেতে তেমন কিছু সময় লাগত না (আমিও ওই ভাবেই ছাতু খেতুম কারণ তা যে শুধু মুখরোচক তা–ই নয়, বিজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে ওইভাবে খেলে ছাতুকে তিক্ত–কটু–লবণ–ক এই ছয় রসের সন্তুলিত সমাবেশে মনোজগতে ও জড়জগতে এক অপূর্ব খোলতাইয়ের সৃষ্টি হয়৷ আ–দুধ দিয়ে খেলেও ছাতু মুখরোচক ও শক্তিবর্দ্ধক)৷ রাত্তিরে নিজের বাড়ীতে ভাত খেতেন৷ একদিন দেখলুম শ্রীযুক্ত বাবু পুলকিত রায় ফুলসাইজের ধুতি আর পাঞ্জাবী (উত্তর ভারতে  ‘পাঞ্জাবী’কে ‘বাংলা কুর্ত্তা’ বলা হয়) পরে  ইস্কুলে যাচ্ছেন৷ মুখে পান নেই, পকেটে বিড়ি–দেশলাইও নেই৷ আমি জিজ্ঞেস করলুম–‘‘কী হোল ছে মাটার সাহাব?’’

পুলকিত রায় বললেন–‘‘আই নিস্পেক্টার সাহাব এ্যাইতেই’’ (আজ ইন্স্পেক্টর সাহেব আসবেন)৷

*      *      *

শিক্ষার মান সম্বন্ধে নানান ধরনের গপ্প প্রচলিত আছে৷ গপ্পগুলো সত্যি  হোক বা না হোক, তার ভিত্তিটা বাস্তবধর্মী৷ একবার এক নিস্পেক্টর সাহেব বিদ্যালয় পরিদর্শনে আসবেন৷ শিক্ষক মশায়রা স্কুল বাড়ী পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন করে রাখছেন৷ ছাত্রদের বলে দিয়েছেন–চান করে মাথা আঁচড়ে আসবি পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন হয়ে আসবি কাচা জামা কাপড় পরে আসবি পায়ে জুতো পরেও আসবি৷

দু’একজন ছাত্র বললে–‘‘স্যার, আমার যে জুতো নেই৷’’

মাষ্টার মশায় বললেন–‘‘আর কারো কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে সেদিনকার মতো পরবি৷’’

আর একজন ছাত্র বললে–‘‘আমার মামাতো ভাইয়ের জুতো আছে কিন্তু তার জুতো তো আমার পায়ের মাপের চেয়ে বড়৷’’

মাষ্টার মশায় বললেন–‘‘বড় জুতো হলে ক্ষতি নেই, আস্তে আস্তে পা টেনে টেনে চলবি–ছোট জুতো না হলেই হল, তাহলে পায়ে গলবে না৷’’

হ্যাঁ, জুতো প্রসঙ্গে আমার ছোটবেলাকার একটি গল্প মনে পড়ে গেল৷ আমাদের বাড়ীতে কাজ করত জনৈক বুধুয়ার মা৷ তারবু জন্ম হয়েছিল কি না৷ বুধুয়া ইস্কুলে ভর্তি হয়েছিল৷ একদিন বুধুয়া এসে তার মাকে বললে–‘‘মা, কাল ইস্কুলে নিস্পেক্টর আসবেন৷ মাষ্টার মশায় বলেছেন জুতো পরে যেতে৷’’ তার মা সেইদিনই সন্ধেয় ক্ষর্দ্ধমানের রাণীগঞ্জ বাজার থেকে এক জোড়া জুতো কিনে এনে দিলে৷ পরের দিন বুধুয়া মাথায় অনেকখানি সরষের তেল ঢেলে চান করে টেরি কেটে নোতুন জুতো পরে ভাল করে সেজেগুজে ইস্কুলে গেল৷ কিন্তু তার ঠিকেয় ভুল হয়ে গেল৷ তাড়াতাড়িতে সেদিন সে প্যান্ট–শার্ট পরতে ভুলে গেছলো৷

শিক্ষক ছাত্রদের বলেছিলেন–‘‘ক্লাসে নিস্পেক্টর সাহেব যখন আসবেন আমি তাঁর পেছনে দাঁড়াব৷ তিনি যখনই কিছু জিজ্ঞেস করবেন আমি আভাসে ইঙ্গিতে তার উত্তরটা তোদের বলে দোব৷ তোরা সব সময় আমার দিকে তাকিয়ে থাকবি৷’’

ছেলেরা বললে–‘‘আচ্ছা স্যার, আমরা তা–ই করব৷’’

নিস্পেক্টর সাহেব প্রথমেই গেলেন সংস্কৃতের ক্লাসে৷ পণ্ডিত মশায় সেদিন আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলেন–কিছুতেই ক্লাসে ঘুমোব না৷ নিস্পেক্টর আসা মাত্রেই তিনি তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালেন৷ যথাবিধি নিস্পেক্টরের পেছনে গিয়ে দাঁড়ালেন৷ নিস্পেক্টর একটি ছাত্রকে শুধোলেন–‘‘আচ্ছা বল তো,  ‘গো’ শব্দের দ্বিতীয়ার বহুবচনে কী হবে?’’

ছেলেটি চালাক–তুখোড় হলেও উত্তরটা তার জানা ছিল না৷ সে জিজ্ঞাসু নেত্রে নিস্পেক্টরের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা পণ্ডিত মশায়ের দিকে চেয়ে রইল৷

‘গো’ শব্দের দ্বিতীয়ার বহুবচনে ‘গাঃ’৷ বাংলা ভাষায় শরীরকে ‘গা’ বলা হয় (গাত্র>গাত্ত>গাঅ>গা)৷ পণ্ডিত মশায় দু’হাতে করে নিজের মাথা থেকে পা পর্যন্ত ছঁুয়ে যেতে থাকলেন–ওপর থেকে নীচে, নীচে থেকে ওপরে৷ এইভাবে ছাত্রদের পণ্ডিত মশায় তাঁর নিজের গোটা গা–টাকেই দেখাতে লাগলেন৷

ছাত্রও মহা তুখোড় গুরু গুড় তো চেলা চীনী৷ সে ভাবলে–‘গা’ তো আমাদের ঘরোয়া বাংলা কথা৷ ওটা সংস্কৃতে চলবে না৷ ওর সংস্কৃত হচ্ছে ‘শরীর’৷ তাই সে নিস্পেক্টর সাহেবকে বললে–‘‘স্যার, ‘গো’ শব্দের দ্বিতীয়ার বহুবচন হচ্ছে ‘শরীরম্’৷’’

গাছ আমাদের প্রাণ

লেখক
দেবিকা পাল

বাড়ছে তাপ, গলছে বরফ,

গাছ লাগালে বাঁচবে জগৎ৷

গাছ লাগালেই হবে না ভাই

               গাছ বাঁচানো চাই৷

এ জগতে গাছের কোন বিকল্প যে নাই

               তাইতো বলি গাছ কেটো না,

                              গাছকে রাখো ধরে,

               তা নাহলে ভাই লক্ষ্মী সোনা

                              বাঁচবে কেমন করে?

একুশের ভাবনা

লেখক
জহরলাল সাহা

আবার এসেছে ফিরে

একুশে ফেব্রুয়ারী

সবুজ বাংলায় কৃষ্ণচূড়ার দেশে

আলতা মাটি রােে পলাশের দেশে

বাতাসে তুলেছে ঢেউ

আমি কি ভুলিতে পারি .......

তোমায়, হে একুশে ফেব্রুয়ারী

ওরা পাঁচ ভাই

শুয়ে আছে শীতল কফিনে

অমর–চিরমরতা পেয়ে আজো

যায়নি মুছে ধমনীর ফিনকি

ঢাকার সবুজ ঘাসে চাপ চাপ রক্ত

প্রতিটি হূদয়ে হূদয়ে

অফুরন্ত প্রাণ, শাশ্বত প্রেরণার কাছে

উদ্যত উর্দু বেয়নেট গেছে হেরে

সালাম, বরকত, জব্বর, রফিক, শফিক

তোমাদের হাজার সালাম

বাহান্নর একুশে থাকুক চির অম্লান

বাহান্নর পর একষট্টি

এপার বাংলায়

বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় শিলচরে

অসমের অসমীয়া প্রেমীরা

আরও এগারো প্রাণ নিল কেড়ে বাংলার

একাদশ দধীচির মালা নিয়ে কাঁদি

পরাবো কোথায়?

অমর অক্ষয় ওদের প্রাণ

আজও সব ভাষা দধীচির শুনি

               জাগৃতির আজান৷

ব্রহ্মপুত্রের বয়ে আনা মঙ্গোলীয় কৃষ্টি

গঙ্গা দিলো তাতে আর্য সংস্কৃতি

দামোদর সুবর্ণরেখা কংসাবতীর

অষ্ট্রিক রক্ত – অনেক রক্ত

গড়েছে বাংলায়–এ বিমিশ্র সভ্যতা

বাঙালীর ধমনীতে বইছে

কালো হলদে সাদা মিলে সংকর রক্ত

তাই এ সার্বজনীন চেতনা

একুশের বাংলা ভাষা দিবস

মাতৃভাষা দিবস গোটা দুনিয়ার

পলাশ রাঙা ধূন–

‘আমি কি ভুলিতে পারি ....’

কলিচুন আর কাতা দড়ি

গোবিন্দপুর সুতানুটি নিয়ে কলিকাতা

বাংলা ভাষা সংস্কৃতির পীঠস্থান

আজ হিন্দি সাম্রাজ্যবাদের পিঠের নীচে

জ্যান্ত কবরের অপেক্ষায়

মায়ের ভাষা

শিল্প সাহিত্য–যাত্রাপালা নাটক

আজ প্রয়োজন,

বড়ো প্রয়োজন

অগ্ণিক্ষরা একুশের

হে একুশে ফেব্রুয়ারী

অপেক্ষামান বাঙালীরা যে তোমারই৷

শোল–ঘাপটি

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

গাত্রূসম্কুচূ+ঘঞ+ণিনি=গাত্রসংকোচিন্’৷ ভাবারূঢ়ার্থে গাত্রসংকোচিন্ মানে যে শরীরকে সংকুচিত করে, যোগারূঢ়ার্থে যে পরিবেশগত ও মানসিক কারণে শরীরকে ছোট করে দেয়, ঘাপ্পি বা ঘাপটি মেরে বসে পড়ে৷ এই ঘাপ্পি বা ঘাপটি মারা আবার তিন ধরনের হয়৷

১) শোয়া–ঘাপটি ঃ যেমন হাত–পা কুঁকড়ে হাঁটু দু’টো বুকের কাছাকাছি এনে চিৎ হয়ে ক্ষা পাশ ফিরে শুয়ে থাকা৷ এতে শীত একটু কম লাগে৷ শীতের দিনে বিড়াল, কুকুর ও অন্যান্য অনেক জীবকে এই ভাবে শোয়া অবস্থায় দেখতে পাক্ষে৷ 

 তোমরা কখনো কখনো ঠান্ডায় অনেকক্ষণ থাকার পর শীতের রাতে যখন নেপের তলায় চলে যাও যদিও সে সময়টায় আমি তোমাদের নেপ সরিয়ে দেখিনি তবু অনুমান করি খানিকটা সময় শরীরকে কিছুটা তাতিয়ে না নেওয়া পর্যন্ত তোমরা ক্ষোধ হয় ঘাপটি মেরে শুয়ে থাক অর্থাৎ কুঁকড়ি হয়ে শুয়ে থাকো৷

২) বসা–ঘাপটি ঃ দ্বিতীয় ঘাপটি হল বসা–ঘাপটি বা তিন–মুণ্ডে বসা৷ দু’টো হাঁটু হল দু’মুণ্ড ও তোমার নাকের ডগা হল তিন মুণ্ড৷ দু’হাতে করে অনেক সময় পা দু’টোও জড়িয়ে ধরো৷ তোমরা অনেক ক্ষেত্রে দুঃখের সময়ে, শোকের সময়ে এইভাবে ক্ষসে থাকো৷ আবার অনেক সময় হাঁটাহাঁটি ভাল লাগছে না বলেও ওই ভাবে বসে থাকো৷ হুগলী জেলার কলাচাষীদের আমি সাধারণতঃ ওইভাবে উক্ষু হয়ে বসে কলার কাঁদির ছড়া গুণতে দেখেছি৷ তোমরা দেখোনি?

৩) দাঁড়িয়েও ঘাপটি মেরে থাকা যায়৷ এক হাতের কনুইয়ের ওপর বা কনুইয়ের ফাঁকে আরেক হাতের কনুই ঢুকিয়ে দিয়ে শীতের রাতের কষ্ট দূর করার চেষ্টা তোমরা করো না কি নিশ্চয় করো৷ এতে শীতের কষ্ট কিছুটা কমানো যায়৷

একটা মজার কথা ভেবে দেখ৷ পরচর্চা করবার সময় (কারো কারো মতে যা ডালমুট–চানাচুরের চেয়েও মুখরোচক) কেউ কিন্তু ঘাপটি মেরে বসে না, ভাল করে আসন পেতেই বসে৷ মেয়েরা যাঁতীতে সুপুরি কোচাবার সময় পা ছড়িয়ে দিয়ে বসেন....ঘাপটি মেরে বসেন না, কতকটা যেমন বসেন পা দিয়ে সলতে তৈরী করার সময়৷ যাই হোক্, এই ঘাপটি মারা হল এক ধরনের গাত্র সংকোচন৷

অনেকদিন আগে তোমাদের একবার শোল–ঘাপটির গপ্প বলেছিলুম না একজন ছিলেন জাঁদরেল হাকিম সাহেক্ষ তাঁদের ছিল পারিবারিক একটি হেয়ার–কাটিং সেলুন৷ আরেকজন ছিলেন জাঁদরেল মৎস্যজীবী তাঁর ছিল সাতখানা মাছ ধরার ডিঙ্গি৷ কেউ কারো চেয়ে কম নয়–ইজ্জতে, আভিজাত্যে, অর্থকৌলীন্যে৷

গোপেন্দ্রনাথ হাকিমের এজলাসে একটা খুনের মামলায় সাক্ষ্য দিতে এসেছেন সেই মৎস্যজীবী বৃন্দাবনচন্দ্র৷ গোপেন্দ্রনাথ হাকিম বৃন্দাবনচন্দ্রকে শুধোলেন–আচ্ছা, যখন লোকটাকে খুন করা হচ্ছিল লোকটা কোনো আবাজ করেনি?

বৃন্দাবনচন্দ্র ক্ষললে–হ্যাঁ, লোকটা তখন কই–কাতরান কাতরাচ্ছিল৷

হাকিম শুধোলেন––ওই বীভৎস কাণ্ড দেখবার সময় তুই কী করছিলি?

বৃন্দাবনচন্দ্র বললে–আমি তখন ভয়ে শোল–ঘাপটি মেরে ক্ষসেছিলুম৷

গোপেন্দ্রনাথ হাকিম বৃন্দাক্ষনচন্দ্রকে শুধোলেন–সময়টা তখন দিন না রাত্তির, আলো না অন্ধকার?

বৃন্দাবনচন্দ্র বললে–দিনও নয়, রাতও নয়, আলোও নয়, অন্ধকারো নয়, কেমন একটা আলো–আঁধারি৷ এই পুকুর পাড় ঘেঁসে মাছেরা যে সময় গাঁদি মারে তেমন সময়৷

গোপেন্দ্রনাথ হাকিম শুধোলেন–তুই তারপর কী করলি?

বৃন্দাবনচন্দ্র বললে–আমি জাল–কাটা বোয়ালের মত ঝপাঙ করে জলে লাফ দিয়ে পড়লুম, তারপর চ্যাঙ মাছের মত চোঁ চোঁ করে পুকুরের ওপারে পৌঁছে গেলুম...কাতলা মাছের মত কেৎরে গিয়ে একটা আঁব গাছের আড়ালে গিয়ে নুকোলুম৷

গোপেন্দ্রনাথ বললেন–তোর ভীমরতি হয়েছে, সবেতেই মাছের কথা, সবেতেই মাছ নিয়ে আদিখ্যেতা৷ যেন মাছ ছাড়া দুনিয়ায় আর কোনো কুলীন বামুণ নেই৷

কথাটা বৃন্দাবনচন্দ্রের গায়ে লাগল....লাগল না বলে বলতে হয় বিঁধল৷

গোপেন্দ্রনাথ বৃন্দাবনচন্দ্রকে শুধোলেন–আচ্ছা, বল তো এই যে খুনের ঘটনাটা ঘটল .... রক্তপাত হল এতে আন্দাজ কতখানি রক্ত বেরিয়েছিল বলতে পারিস?

বৃন্দাবনচন্দ্রের মুখেচোখে, ঠোঁটের কোণে অল্প হাসির ঝিলিক নেবে এল৷ সে ক্ষললে– তা ঠিক কী করে বলি ্বলুন হুজুর, তবে আপনি যাতে আন্দাজ পেতে পারেন সেই ভাবে বলছি...অ এই নাপতে বাটির এক বাটি হবে৷

যাই হোক্, এই ঘাপ্পি মারা বা ঘাপটি মারা কাকে বলে জেনে গেলে৷

হ্যাঁ, তবে মটকা মারা কিন্তু আলাদা জিনিস আর এই মটকা মারার সঙ্গে গরদ–মটকা–তসরে কোনো সম্পর্ক নেই৷ বাঙলা ভাষায় ‘মটকা’ শব্দটি তিনটি অর্থে ব্যবহূত হয়৷ প্রথমতঃ যে পলু পোকার গুটি খেয়ে প্রজাপতি গুটি কেটে বেরিয়ে যায় সেই গুটির গরদ মোটা ও নিকৃষ্ট মানের হয়৷ সেই মোটা ও নিকৃষ্ট মানের গরদকে মটকা ক্ষলা হয়৷

পাকা ঘর বাদে খড়, টিন, টালি প্রভৃতি দিয়ে ঘর তৈরী করলে ঘরের যেটা সর্বোচ্চ অংশ তাকেও মটকা বলে–‘‘চেয়ে দেখ মটকার ওপর একটা মুরগী বসে রয়েছে’’৷

‘মটকা’র তৃতীয় অর্থ হল ভাণ বা অছিলা৷ ‘‘চেয়ে দেখ, মনে হচ্ছে ও ঘুমুচ্ছে, আসলে কিন্তু ঘুমুয়নি, মটকা মেরে পড়ে আছে৷ যে ঘুমায় তাকে ডেকে বা ধাক্কা দিয়ে তোলা যায় কিন্তু যে মটকা মেরে পড়ে  থাকে তার ঘুম ভাঙ্গানো যায় না’’৷

হ্যাঁ, যদি কেউ কোনো জায়গায় ঢুকে নিজের পরিচয় গোপন রেখে বা নিজ উদ্দেশ্য চেপে রেখে চুপ করে একটা জায়গায় গিয়ে ্বসে থাকে তাকেও বলে ঘাপটি  মারা–ভাল বালায় ‘গাত্রসংকোচী’, কথ্য বাঙলায় ‘ভিজে বেড়ালটি’৷