প্রভাতী

গোবর গণেশ গায়েন

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

 

 যে সোজা পথে চলে না, মার প্যাঁচ করে দিন কাটে সে কুট্টনী........কুটনী৷ এই কুট্টনীর স্বভাবসংক্রান্ত ব্যাপারকে বলব কৌট্টনী বা কৌট্টনিক৷ কুট্টনী+অন=কৌট্টনী আর কুট্টনী+ঠক=কৌট্টন্৷ এই মার প্যাঁচ সংক্রান্ত বিদ্যাকে বলা হয় কুট্টনী বিদ্যা বা কৌট্টনী বিদ্যা৷ যারা গোমরামুখো, যারা ‘‘রাম গরুড়ের ছানা হাসতে তাদের মানা’’ তাদের সম্বন্ধে কথ্য বাংলায় বলা হয় কুট্টনী–মুখ৷

এ প্রসঙ্গে আমার একটি পুরোনো গল্প মনে পড়ে যাচ্ছে৷

আমার বিশেষ পরিচিত জনৈক রেল–অফিসার ছিলেন–ধরো, তাঁর নাম গোবর গণেশ গায়েন৷ ভদ্রলোক সব সময় মুখ বেঁকিয়েই থাকতেন৷ আমি যখন লোকের আড়ালে বলতুম–‘‘হ্যাঁরে, অমন গোমড়া মুখ করে থাকিস কেন?’’ সে বলত–‘‘হাসলে লোকে আমার মাথায় চড়ে বসবে, আমাকে মানবে না৷’’

আমি বলতুম–‘‘আচ্ছা না হয় হাসলি না, কিন্তু কথা বলিস না কেন?’’ সে বলত–‘‘কথা বললে সস্তা হয়ে যাব৷’’

আমি বলতুম–‘‘সেজন্যে তুই দূরে থেকে খাস্তা থাকতে চাইছিস?’’ সে না হেসে বলত–‘‘হ্যাঁ’’৷

একবার আমাদের একটা বড় রকমের পিকনিক হয়েছিল৷ পোলাও–কালিয়া ও ভাল–মন্দ খাবারের এলাহী বম্যাপার৷ কাশী থেকে এসেছিল লাউয়ের আকারের প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড শীতের বেগুন৷ রান্নাবান্না হয়ে যাবার পর দেখা গেল পঞ্চাশ/ষাটটা বড়বড় বেগুন বাড়তি হয়েছে৷ সবাই মিলে ঠিক করা গেল এই বেগুনগুলো পুড়িয়ে পোলাও–কালিয়ার মাঝে মাঝে খেয়ে মুখ পালটে নেওয়া যাবে৷ যেমন ভাবা তেমনি কাজ৷ খেতে বসে প্রথমেই পরিবেশন করা হ’ল বেগুন পোড়া৷ সবাইকে উৎসাহ দেবার জন্যে শ্রীমান গোবর গণেশ গায়েনের মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল–‘‘বাঃ, বেগুনপোড়াটা ফার্স্ট–ক্লাস হয়েছে৷’’

আর একজন বললে–‘‘না, ফার্স্ট–ক্লাস নয়, এয়ার–কণ্ডিশণ্ড্ হয়েছে৷’’ গোবর গণেশ আবার কথা বলে ফেললে৷ সে একটু গম্ভীরভাবে বললে–‘‘যাই হোক, খেতে ভালই  হয়েছে৷’’ তার কথা লুফে নিয়ে আমার আর একটু বেশী পরিচিত শ্রীসমর সেনগুপ্ত সুযোগের তিলমাত্র অপব্যয় না করে গোবর গণেশকে উদ্দেশ্য করে বললে–‘‘বেগুনপোড়া যখন একবার ভাল লেগেছে স্যার তখন দেখবেন ওই পোড়ার মুখে বাকীগুলোও ভাল লাগবে৷’’

গোবর গণেশ ঠাট্টাটা না ক্ষুঝে আরও গম্ভীরভাবে ভোজনে মনোনিবেশ করলে৷

এই কুটনী স্বভাবের লোকেদের কেউই পছন্দ করে না৷ ওরা যেমন লোককে অবহেলা করে, লোকেও তেমনি সুযোগ ক্ষুঝে ওদের বিশ কথা শুনিয়ে দিতে ছাড়ে না৷ তোমরা কিছুতেই এই ধরনের কুট্টনী ক্ষুদ্ধিকে প্রশ্রয় দিও না৷ এতে সমাজেরও ক্ষতি, তোমাদেরও ক্ষতি৷

ধরা আর সরা

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

দেশজ শব্দে ‘ট’ যথাযথভাবেই বজায় থাকে৷ আর ‘ড’ বা ‘ড়’ মৌলিক শব্দ হিসেবেই থেকে যায়৷ যেমন, আজ ভুলোর সঙ্গে ভোঁদার আড়ি হয়ে গেল৷ ওরা বলছে, ওরা আর একসঙ্গে মার্বেল খেলবে না, একটা পেয়ারাও আর কামড়াকামড়ি করে খাবে না৷ গোপনে কান পেতে শোনাকেও আড়িপাতা বলে৷ এটিও বাংলা দেশজ শব্দ৷

সেই যে একজন মহিলা আহ্লাদে আটখানা হয়ে তার এক বন্ধুকে বলেছিল–তোমার সঙ্গে দেখা হওয়ায় আমার যে কী আনন্দ হচ্ছে তা ভাষায় বলতে পারছি না৷ বন্ধু বলেছিল, তোমার যে কী আনন্দ হচ্ছে তার একটু আভাস আমায় দাও৷ মহিলাটি বলেছিল, আহ্লাদের আতিশয্যে আমার এখন ধরাকে সরা মনে হচ্ছে৷ সেই সময় হয়েছে কী, একজন চাষীর গোরু হারিয়ে গেছে৷ সে গোরু খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত হয়ে যে বাড়ির বারান্দায় বসেছে সেই বাড়িরই ঘরের ভেতর ওই মহিলাটি বলছে– আমি আনন্দের আতিশয্যে ধরাকে সরা মনে করছি৷ চাষী আড়ি পেতে কথাটা শুনে নিলে৷ এবার সেও আনন্দের আতিশয্যে ধেই ধেই করে নাচতে নাচতে ঘরের বাইরে থেকে ওই মহিলাটিকে গড় করে বললে–মা লক্ষ্মী, এই বিরাট ধরাটা যখন তোমার কাছে সরা হয়ে গেছে তখন দয়া করে বলে দাও, ওই সরার কোন্খানটিতে আমার গোরুটা রয়েছে৷

সেয়ানে সেয়ানে

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

‘চাবি’ শব্দটি আমরা পোর্তুগীজদের কাছ থেকে পেয়েছি৷ এঁদের ভাষায় ‘ন্তুড়্ত্র’–এর উচ্চারণ কতকটা ‘শ’–এর মত৷ তাই ‘চাবি’–কে আমি স্পেন ও পোর্তুগাল দু’য়েতেই ‘শাবি’ উচ্চারণ করতে শুনেছি৷ আজ এই ‘চাবি’ শব্দটি বাঙলা তথা সমগ্র উত্তর ভারতে ব্যাপকভাবে প্রচলিত৷ অথচ আজ থেকে ৪৫০ বছর আগেও শব্দটির সঙ্গে এদেশের কারো পরিচয় ছিল না৷ উত্তর–ভারতে ‘চাবি’–কে বলা হত  ‘কুঞ্জী’ আর বাঙলায় বলা হত ‘কাঠি’৷ তালা–চাবিকে রাঢ়ে এখনও কেউ কেউ ‘কুলুপ–কাঠি’ বলে থাকেন৷ এমনকি যাঁরা ‘চাবি’ বলেন তাঁরাও কেউ কেউ ‘চাবিকাঠি’ বলে থাকেন৷ বলেন–সিন্দুকটি তোমার চাবিকাঠিটি আমার৷ ‘কুঞ্জী’ শব্দটি এককালে উর্দু ভাষায় ব্যাপকভাবে চলত৷ আজ তার প্রভাব কমে এসেছে৷ সেই যে উর্দুতে একটা গল্প আছে না–

একজন পরীক্ষার্থী পড়াশুনা মোটেই করেনি কিন্তু সে ছিল ক্ষেশ সুরসিক৷ উত্তর পত্রের প্রতিটি পাতাতেই ও প্রতিটি প্রশ্ণের উত্তরেই সে কেবল লিখে গেছে–

‘‘হজারোঁ কী কিস্মৎ তেরে হাথোঁ মে হৈ

অগর পাস কর্ দেঁ তো ক্যা বাত হৈ৷’’

(হাজার হাজার লোকের ভাগ্য তোমার হাতে রয়েছে৷ যদি পাস করেই দিলে, তাতে ক্ষতিটা কী?)

পরীক্ষক মশায় ছিলেন আরও ক্ষেশী রসিক ৷ পরীক্ষার্থী যেখানে যেখানে ওই পঙ্ক্তি ক’টি লিখেছিল তিনি ঠিক তার নীচেই প্রতিটি পাতায় লিখে দিলেন–

‘‘কিতাবোঁ কী কুঞ্জী তেরে হাথোঁ মে হৈ

অগর ইয়াদ কর্ লেঁ তো ক্যা বাত হৈ৷’’

(বইয়ের চাবি তোমার হাতেই রয়েছে৷ যদি মুখস্থই করে নিলে তাতে ক্ষতিটা কী?)

লিমেরিক

লেখক
প্রণবকান্তি দাশগুপ্ত

দুর্ভাগ্য আছে লেখা কপালে

জ্যোতিষি এক বলে গেছেন সকালে৷

রবার দিয়ে ঘষে ঘষে

সারাটা দিন বসে বসে

মুছছি লেখা মরি পাছে অকালে৷

উপলব্ধি

লেখক
ভবেশ কুমার বসাক

স্মরণ করে তোমারে পাই,

রাতুল চরণে দিলে ঠাঁই

তোমাকে কোটী প্রণাম জানাই৷

তোমার সুরে নাচি, নাচাই

তোমার গানে মনকে মাতাই

তোমার কথায় তোমাকে পাই৷

স্বপ্ণ হলেওসত্যি তুমি

আছো হৃদে জানি,  মানি

তুমিই আমার অন্তর্যামী

আমার তুমি তোমার আমি৷

মিলনমেলা

লেখক
আচার্য গুরুদত্তানন্দ অবধূত

আকাশের হৃদয় আছে

বাতাসের প্রাণ আছে৷

তাইতো ভালবাসাবাসি

পাই সবারে কাছাকাছি,

হেসে খেলে চলছি ভবে

বৃহৎ এক অনুভবে

একই আত্মা সবখানে

নাচায় তনুমনপ্রাণে৷

একই জ্যোতির খেলা জানি

প্রাণে প্রাণে তাকেই আমি টানি

চলছি ধরায় ভাবস্রোতে

ধরি তাহায় ছন্দগীতে,

বুঝি সবই মধুর অতি

কাজের তাই নাই বিরতি,

মিলন মেলা তাতেই স্থিতি

তারই ধ্যানে নিত্য মাতি৷

জ্যোতির ধারা সকল প্রাণে

মাতলো সবাই মহাতানে.....

নবীন-প্রবীণ নাই ভেদাভেদ

কারও চিতে নাই কোন খেদ,

আপন মানি সবারে আজ

দেখি সবে বৃহৎ এক রাজ,

সবাতে এক মধুরণন....

তবে কি এ সোণার স্বপন,

রাজার রাজে করি বরণ

ধরি সেই চিত্ত হরণ!

কবি বিদ্যাপতির সঙ্গে কবি চণ্ডীদাসের সাক্ষাৎকার

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

তোমরা জান এমন কিছু কিছু জায়গা পৃথিবীতে রয়েছে যেখানে এককালে কোন বিশেষ মহান পুরুষ বাস করতেন অথবা যেখানে একাধিক মহাপুরুষের অবস্থিতি ছিল, যেখানে আজও লোকেরা শ্রদ্ধা নিবেদন করতে যান৷ যেমন ধরো মুঙ্গের শহরের কষ্টহারিণী ঘাটে মিথিলার নামজাদা কবি বিদ্যাপতির সঙ্গে বাঙলার নামজাদা কবি চণ্ডীদাসের সাক্ষাৎকার হয়েছিল৷ সেই কষ্টহারিণী ঘাটটি আজ যে কেবল ধর্মপিপাসু মানুষেরই তীর্থক্ষেত্র তাই নয়, সাহিত্যের ব্যাপারেও যাঁরা একটু–আধটু উঁকি–ঝঁুকি মারেন তাঁরাও স্থানটিকে একবার দেখে যান......শোনা যায় সাক্ষাৎকারের সময় চণ্ডীদাস ছিলেন যুবক, বিদ্যাপতি ছিলেন বৃদ্ধ৷ উভয়ের মধ্যে বয়সের পার্থক্য ছিল অনুমানিক চল্লিশ বৎসর৷ বিদ্যাপতি ছিলেন বিস্পী (বিসর্পীঃ বর্ত্তমান মধুবনী জেলায়) গ্রামের অধিবাসী৷  গঙ্গাস্নান করতে তিনি  খুক্ষ ভালবাসতেন৷ তাই তিনি মিথিলার সিমারিয়া ঘাটে (প্রাক্তন মুঙ্গের জেলায় ও অতি আধুনিক কালে নবগঠিত বেগুসরাই জেলায়) স্নান করতে আসতেন৷ কবি বিদ্যাপতির নাম–যশের সঙ্গে পরিচিত হওয়ায় চণ্ডীদাস নৌকাযোগে গঙ্গা পার হয়ে মুঙ্গের শহরে কষ্টহারিণী ঘাটে আসেন৷ কাশী পার হবার পর গঙ্গা পূর্ববাহিনী অর্থাৎ পশ্চিম দিক থেকে পূর্বে চলেছে৷ আর সাহেবগঞ্জের পর থেকে গঙ্গা দক্ষিণবাহিনী৷ গঙ্গা যতক্ষণ পূর্ববাহিনী ততক্ষণ গঙ্গার উত্তরে থাকে কাশীরাজ্য, মিথিলা ও অঙ্গদেশ৷ কিন্তু গঙ্গা যখন দক্ষিণাভিমুখী তখন গঙ্গার পশ্চিমে এসে যায় রাঢ় ও পূর্বে এসে যায় বরেন্দ্র ও সমতট৷

যাই হোক এই যে চণ্ডীদাসের কথা বলছি তিনি ছিলেন রাঢ়ের বর্জ্যভূমি বা বীরভূমের নানুর গ্রামের কবি৷ তিনি ছিলেন রাঢ়ের বর্জ্যভূমি বা বীরভূমের নানুর গ্রামের কবি৷ তিনি ছিলেন দুর্গাদাস বাগচীর পুত্র (বরেন্দ্র শ্রেণীর ব্রাহ্মণ)৷ চণ্ডীদাস বাগচী তাঁর সাহিত্য–ভণিতায় নিজের নাম রেখেছিলেন দ্বিজ চণ্ডীদাস৷ বাঙলায় মোটামুটি নাম–করা আরও দু’জন চণ্ডীদাস ছিলেন৷ একজন ছিলেন বাঁকুড়ার ছাতনার (মতান্তরে মানভূমের হুড়া থানায়) চণ্ডীদাস পাণিগ্রাহী (তিনি ছিলেন উৎকল শ্রেণীর ব্রাহ্মণ)৷ সাহিত্য–ভণিতায় তিনি নিজেকে বড়ু চণ্ডীদাস নামে পরিচিত করেন৷ আধুনিক বাঙলা ভাষায় লিখিত সর্বপ্রাচীন গ্রন্থ ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্ত্তন’ তাঁরই রচিত৷ তবে সাহিত্য কৃতিতে অথবা সাহিত্য কীর্ত্তিতে দ্বিজ চণ্ডীদাসের নামই বেশী জেল্লাদার৷ বাঙলার সাহিত্যাকাশে আরও একজন চণ্ডীদাস ছিলেন–তিনি চণ্ডীদাস ভট্টাচার্য্য–বর্দ্ধমান জেলার পশ্চিমাংশের অধিবাসী৷ তিনি সাহিত্য–ভণিতায় নিজেকে দীন চণ্ডীদাস নামে আখ্যাত করেন৷

আসল কথায় আসা যাক৷ এই দ্বিজ চণ্ডীদাস রাঢ়ের বন্ধুর উপত্যকা পেরিয়ে এসেছিলেন মুঙ্গের শহরে৷ বাঙলায়–মিথিলায় তখন সুর বংশের রাজত্ব শেষ হয়ে সেন রাজত্ব সবে শুরু হয়েছে৷ পণ্ডিতেরা বাংলায় সাহিত্যকর্ম না করে সংস্কৃতে করাই তখনও বেশী পছন্দ করে চলেছেন৷ সেই সময়কার কবি জয়দেব পমার বাঙলায় সাহিত্য চর্চা না করে সংস্কৃতেই সাহিত্য চর্চা করে গেছেন৷ সম্ভবতঃ তিনিই রাঢ়ের শেষ বনেদী সংস্কৃতে সাহিত্যসেবী ছিলেন৷ তাঁর রচনার ভাষা সরল সংস্কৃত–বৌদ্ধ মহাযানী সংস্কৃতের অনুরূপ অর্থাৎ সংক্ষেপে অনুস্বার–বিসর্গযুক্ত্ বাংলা৷

কবি জয়দেবের সময় তথা চণ্ডীদাসের সময় রাঢ়–বাঙলায় কেন্দুবৃক্ষের (ছোটগাব) জঙ্গল ছিল.........ছিল বুনো বেলেরও৷ তবু কতকটা এই রকমের অবস্থা রাঢ়ের পার্শ্ববর্ত্তী মগধ, কৌশল, উৎকলেরও ছিল৷ তাই এই তিন দেশেই ‘কেন্দুবিল্ব’ নামে একাধিক  গ্রাম ছিল৷ কবি জয়দেবের গ্রাম যে কেন্দুবিল্বে ছিল, তা ছিল অজয় নদীর উত্তরপাড়ে–বর্দ্ধমান জেলার ঠিক বিপরীত দিকে৷ জয়দেব সংস্কৃতের কবি ছিলেন বটে কিন্তু তাঁর সংস্কৃত এতই সহজ বোধ্য ছিল যে তিনি রাঢ়ের মানুষের চোখের মণি হয়ে উঠেছিলেন৷ তাঁর গ্রামটিকে অশিক্ষিত গ্রাম্য লোক আজও বলেন ‘জয়দেব–কেঁদুলি’৷ সুপ্রাচীনকাল থেকে সেখানে যে মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে, গ্রামের মানুষ আজও তাকে জয়দেব–কেন্দুলির মেলা বলে থাকেন৷

জয়দেবের সঙ্গে বিদ্যাপতির সাক্ষাতের কোন নজির বা দন্তকথা প্রচলিত নেই যদিও কবি বিদ্যাপতি কেবল মৈথিলীতেই নয়, সংস্কৃতেও অনেক কিছু লিখে গেছেন৷ সংস্কৃতে রচিত ‘দুর্গাভক্তি–তরঙ্গিনী’ গ্রন্থটিও তাঁরই সাহিত্যকৃতি৷

এখন মূল বক্তব্যে ফিরে আসা যাক্৷ মুঙ্গেরের এই কষ্টহারিণী ঘাটে গঙ্গা উত্তরবাহিনী, অথচ তার পূর্বে বা পশ্চিমে গঙ্গা পূর্ববাহিনী৷ গঙ্গা এখানে উত্তর বাহিনী হওয়ায় গঙ্গা–ভক্তসমাজে এর একটা বিশেষ মাহাত্ম্য ছিল৷ তাই সম্ভবতঃ এখানে বাঙলার কবি চণ্ডীদাসের সঙ্গে মিথিলার কবি বিদ্যাপতির সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা হয়েছিল৷ এই ধরণের যেসব বিশেষ স্থানে নামজাদা মানুষেরা একত্রিত হন লোকে সেই স্থানগুলিকে মনে রাখেন৷ যেমন রাণাঘাট শহরের উত্তরের দিকে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তৎকালীণ ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট নবীনচন্দ্র সেনের ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকার হয়েছিল (নবীনচন্দ্র সেন ছিলেন চট্টগ্রাম জেলার নোয়াপাড়া গ্রামের অধিবাসী) যেমন হয়েছিল রাজশাহীতে সেখানকার উকিল লব্ধপ্রতিষ্ঠ কবি রজনীকান্ত সেনের (কান্তকবি) সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের৷ রজনীকান্ত সেন ছিলেন পাবনা জেলার ‘ভাঙ্গাবাড়ী’ গ্রামের বাসিন্দা৷ রাজশাহীতে তিনি ওকালতি করতেন৷ রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর প্রীতির বন্ধন এতই গভীর ছিল যে শিলাইদহ থেকে রবীন্দ্রনাথ রাজশাহীতে তাঁর বাড়ীতে যেতেন৷ কান্তকবি নাকি–একবার রবীন্দ্রনাথকে বলেছিলেন–আপনি কোমল ভাবের কবিতা তো অনেক লিখেছেন, এবার বীর রসের কিছু লিখুন৷ রবীন্দ্রনাথ তার পরের দিনই সন্ধ্যাবেলায় কান্তকবিকে সেই সুপ্রসিদ্ধ কবিতাটি শুণিয়ে দেন যা আজও অনেকের মুখে মুখে ফেরে–

‘‘পঞ্চনদীর তীরে বেণী পাকাইয়া শিরে

................................... নির্মম, নির্ভীক৷’’

এই ধরণের মহান পুরুষদের সাক্ষাৎকারের স্থানগুলির জন্যেও তোমরা ‘কোটী’ শব্দ ব্যবহার করতে পার৷

(‘কোটী’ মানে পূতভুমি

–শব্দ চয়নিকা, ৭/২১০)

কাঁচা বেঁশো হ্যাংলামিকাঁচা বেঁশো হ্যাংলামি

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

‘ক্রুড্’ ধাতুর একটি অর্থ ‘হ্যাংলামি করা’ বা ‘ন্যালা খ্যাপামি করা’ –কাঁচা বাঁশের মত হ্যাংলামি বা ন্যালা খ্যাপামি যা শুণলেই বোঝা যায়, দেখলেই ধরা যায় অথবা এমনও কেউ কেউ থাকে যারা ধরা পড়বার জন্যেই এই রকম হ্যাংলামি বা ন্যালাখ্যাপামি করে থাকে৷ যেমন নেম্তন্ন বাড়ীতে তোমার আরও কয়েকটা রসগোল্লা খাবার ইচ্ছে হল৷ তুমি পাশের ভদ্রলোকটির পাত দেখিয়ে বললে......ও দাদা, এদিকে, এদিকে, এঁর পাতে কয়েকটা রসগোল্লা দিন৷

রসগোল্লা পরিবেশনকারী কাছে এলে তাকে বললে–আমায় আর দেওয়া কেন আমার পাতে পরে দেবেন (আসলে পরিবেশনকারী তাকে দিতে আসেন নি, এসেছিলেন পাশের লোকটিকে দিতে)৷ পরিবেশনকারী দিতে গেলে বললে–না, আমার আর চাই না, পেট ভরে গেছে৷ আবার হ্যাংলামি করে বললে–তা দেবেন যখন অন্ততঃ চারটে দিন৷ একগণ্ডার কমে কি ভাল দেখায় এতে পরিবেশনকারী বুঝে নিলেন, যিনি পরিবেশনকারীকে ডেকেছিলেন তাঁরই রসগোল্লা দরকার......আর চারটে দরকার৷ এই ধরণের হ্যাংলামির জন্যে ক্রুড/ক্রুড়, শব্দটি চলবে৷ চলবে ক্রু+যৎ = ক্রড্য শব্দটিও (ক্রুড়া হয় না)৷ একবার দেখেছিলুম জনৈকা মহিলা–তিনি ছিলেন একজন মস্তবড় অফিসারের মাতাঠাকুরাণী–একজন মধ্যবিত্তের বাড়ীতে গিয়ে তার লক্লকে লাউগাছটি দেখে বলেছিলেন–লাউ–এর ডগাগুলো ভারী সুন্দর দেখাচ্ছে তো৷ পোস্ত–বাটার সঙ্গে লাউডগা সেদ্ধ খেতে খুব ভাল লাগে৷ চাকরটাকে রোজই বাজারে পাঠাই৷ এসে বলে বাজারে আজকাল লাউডগা পাওয়া যাচ্ছে না৷ লাউডগা–পোস্ত সেই যে কোন মান্ধাতার আমলে খেয়েছিলুম, আজও যেন জিবে লেগে আছে৷ লাউ–ডগার মালিক কি আর করেন মহিলার সঙ্গে কিছু লাউডগা পাঠিয়ে দিলেন৷ যাই হোক, এই কাঁচাবেঁশো হ্যাংলামি ভালভাবেই বুঝলে৷ সুতরাং ওই হ্যাংলা মহিলা হচ্ছেন ‘ক্রুড্যা’৷

আমার পরিচিত ভোলা মোড়লের ভাল রকমের বেগুনের চাষ ছিল৷ বর্ষার শেষে একদিন সে তার বেগুনবাড়ী থেকে বছরের প্রথম ফসলটি তুলে নিয়ে বাড়ীর দিকে যাচ্ছিল৷ আশা করেছিল, বর্ধমানের বাজারে নতুন মুক্তকেশী বেগুনের ভালই দর পাবে........তার একটু টেনেটুনে সংসার চলত৷ রাস্তায় সে পড়ে গেল হরু ভটচাজের খপ্পরে৷ হরু ভট্চাজ্ বললে–কি রে ভোলা, আজকাল তোর দেমাগে যে মাটিতে পা–ই পড়ে না৷ বামুন–বোষ্টমের প্রতি শ্রদ্ধাভক্তি হারালে ফল কি ভাল হয়? জানিস তো মাথার ওপর নারায়ণ রয়েছেন৷ তিনি আমাকেও দেখছেন, তোকেও দেখছেন, বেগুনগুলোকেও দেখছেন৷ যাই হোক, বেগুনগুলো বেশ তেল কুচকুচে৷  কম আঁাঁচে পোড়াতে গেলে গায়ে তেলও মাখাতে হবে না৷ তা তু’ এক কাজ কর গা৷ আমাকে বেগুনগুলো দিতে হবে না৷ তু’ ওগুলো পুড়িয়ে যেন আমার প্রসাদ খাচ্ছিস ভেবে নিজেই খা গা যা৷ ভোলা মোড়ল আর কি করে তার বুকের পাঁজর–ভাঙ্গা আট–দশটা বেগুন হরু ভটচাজকে দিয়ে দিলে৷ এই হরু ভটচাজ ছিল একটি নির্ভেজাল ‘ক্রুডা’৷

কোন একটা বিয়ে বাড়ীতে ভিয়েন বসেছে৷ অনিমন্ত্রিত পুণ্ডরীকাক্ষ ভট্টাচার্য্য হঠাৎ সেখানে পৌঁছে গেলেন৷ পুণ্ডু ভট্চাজ্ ছিলেন আমাদেরই বর্ধমান জেলার পুতুণ্ডু গ্রামের বাসিন্দে৷ মস্ত বড় ভিয়েন, কলকাতা থেকে বাছাইকরা হালুইকারেরা এসেছে৷

পুণ্ডু ভটচাজ্ বললেন–খাওয়াদাওয়ায় আমার তেমন আগ্রহ নেই৷ কিন্তু রান্নাবান্না দেখতে বড্ড ভালবাসি.....সেই ছোটবেলাকার স্বভাব৷

সবাই বললে–এসো,এসো, বসো, বসো৷ দেখো, কেমন খাবার তৈরী হচ্ছে৷

দেখে বোঝা গেল হালুইকারেরা খুব উন্নত মানের চমচম*(*সংস্কৃতে ‘চম্’ ধাতু হল গোগ্রাসে গিলে খাওয়া৷ একপক্ষের সৈন্য অন্য পক্ষের দেশে গিয়ে সব কিছুকে গোগ্রাসে গিলে খায়৷ এই অর্থে চম্ ধাতুূউস্ প্রত্যয় করে ‘চম্’ শব্দটি পাচ্ছি৷ ‘চমু’ মানে সৈন্যবাহিনী৷ ‘চমূড্ণ্’ করে ‘চম্’ শব্দটি পাচ্ছি, অর্থাৎ যা দেখে গোগ্রাসে গিলে খেতে লোকের ইচ্ছে হয়৷) তৈরী করছে৷ পুণ্ডু ভট্চাজ্ আর নোলা সামলাতে পারছে না৷ প্রাণে আকুতি জেগেছে, চমচম একেবারে খোলা থেকে নোলায় চলে আসুক৷ সে তখন স্বগতভাবে বললে, (বললে এমন ভাবে যাতে আর পাঁচটা লোকের বধির কর্ণেও তা প্রবেশ করে)–এককালে চমচম খেতে খুবই ভালবাসতুম৷ কবে সেই খেয়েছিলুম.......বাহাক্ষপুরের ঘোষেদের বাড়ীতে৷ এখনও যেন ভুলতে চাইলেও ভুলতে পারছি না৷ মন বারে বারে সেই চমচমে ফিরে যেতে চায়৷ এখন দু’চারটে চাখতে পারতুম কিন্তু সন্ধ্যে হয় হয়৷ সন্ধ্যে আহ্ণিক না করে খাই বা কি করে– তিন কাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে–সে কথাও ভুলি কি করে৷

হালুইকারেরা বললে–সন্ধ্যে হতে এখনও একটু দেরী আছে৷

পুণ্ডু ভটচায্ আকাশের দিকে তাকিয়ে বললে–হ্যাঁ মনে হয় আধঘন্টাটাক সময় আছে৷

হালুইকারেরা বললে–তক্ষে দুটো সন্দেশ চেখেই দেখুন৷ আমার মনে হয় গণ্ডাখানেক চেখে নিয়ে হাত মুখ ধুয়ে ফেলাও সম্ভব৷

হালুইকারেরা কি আর করে পুণ্ডু ভট্চাজ্কে একটা শাল পাতায় মুড়ে চারটে চমচম দিলে৷ এও সেই কাঁচা বেঁশো হ্যাংলামি৷ পুণ্ডুরীকাক্ষ ভট্টাচার্য হলেন একটি ডাকসাইটে ‘ক্রুড্ড’৷ যাই হোক, তোমরা ‘ক্রুড্’ ধাতুর রকমারি ব্যবহার দেখলে তো৷ (শব্দ চয়নিকা)

 

নিয়ম

লেখক
ভবেশ কুমার বসাক

যানবাহনে উঠলে পড়ে

    টিকিট কাটতে হয়,

বিন-টিকিটে চলাফেরা

    নিয়ম কিন্তু নয়৷

বাজার থেকে যাহাই কিনি

    নিয়ম আছে ভাই

নিয়ম করে সবকিছুরই

    ট্যাকসো দেওয়া চাই৷

দেশের জন্যে দশের জন্যে

    করের নিয়ম করা

করের ফাঁকি ধরা পড়লে

    শাস্তি আছে ধরা৷

আমি বাঁচি তুমিও বাঁচো

    এটাই কিন্তু নিয়ম,

সুখ-দুখ্টা ভাগ করে নিই

    এটাই তো জীবন৷

সংসারেতে কষ্ট করে

    বাঁচে অনেক প্রাণ

নিয়মমত সব দুঃখী

    পাক পরিত্রাণ৷

নিয়ম এমন কঠোর হোক

    সবার খুলুক চোখ

নূ্যনতম চাহিদাটুকু

    সবার পূরণ হোক

চাষীভাই চাষ করে

লেখক
রামদাস বিশ্বাস

চাষীভাই চাষ করে হাল আর বলদ নিয়ে

কেউ তার খোঁজ রাখে না খায় সে কি দিয়ে৷

সর্ষে বুনে ফোটাবে সে কত হলুদ ফুল

মউমাছিরা গান শোনাবে আনন্দে আকুল৷

সর্ষে তেলে তেল মাখাবে চাটুকারের দল

সরল চাষী বুঝবে না তার মনে কত ছল৷

মাথার ঘাম পায়ে ফেলে চাষী খেটে মরে

আড়ৎ ভরা সর্ষে জমে বড়লোকের ঘরে৷