প্রভাতী

মায়েরই তো খাচ্ছি

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

কিছু মানুষ আছে যাদের কুকার্য ধরা পড়বার ভয়ে তারা তাদের সেই কুকার্যের সমর্থনে যুক্তি খোঁজে৷ তারা ‘খল’ পর্যায়ভুক্ত৷

আমি একজন চাটুজ্জে–গিণ্ণীকে জানতুম৷ তিনি দুর্গা পূজার সময় প্রায়ই পূজামণ্ডপে তো থাকতেনই, যেখানে ভোগ রান্না হত সেখানেও তাঁকে খুব বেশী ঘোরাফেরা করতে দেখা যেত৷ একবার তিনি শাড়ীর নীচে লুকিয়ে কী যেন একটা নিয়ে যাবার সময় স্বেচ্ছাসেবকের হাতে ধরা পড়লেন৷ স্বেচ্ছাসেবকদের সাহসই হল না তাঁর জিনিসটা তল্লাসী করার৷ তারা পূজা কমিটির সেক্রেটারী জনৈক ঘোষ মশায়কে ডাকলেন৷

ঘোষ মশায় আমাকে বললেন–কী করা যায় বলুন তো

আমি বললুম–জনৈক মহিলাকে ডেকে তল্লাসি করে দেখ কী জিনিসটা নিয়ে যাচ্ছেন মহিলা৷ ছানাবড়াও হতে পারে... ধোকার ডালনাও হতে পারে... পোলাউও হতে পারে, আবার রুই মাছের কাঁটাও হতে পারে৷

তল্লাসি করা হল৷ দেখা গেল, রয়েছে পোলাও আর পায়েস৷ ধরা পড়বার পর মহিলা চীৎকার করে গালি দিতে দিতে হাত–পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে বললেন–পাপীতে দেশটা ভরে গেল অধর্ম....অধর্ম....এই অধর্ম সইবে না৷ নারায়ণ, বৈকুণ্ঠ থেকে তুমি সবই দেখছ৷ ঘোর কলি.....ঘোর কলি.....এই অধর্ম কতকাল চলবে৷ 

ঘোষ মশায় বললেন–অধর্ম মানে আপনি চুরি করে লোকের ঘর থেকে জিনিস নিয়ে পালাবেন আর অধর্ম করলুম আমরা আপনার চুরি করা অধর্ম হল না, আমাদের ধরাটা অধর্ম হল

চাটুজ্জে গিণ্ণী বললেন–চুরি কোন হারামজাদা বলে চুরি আমি তো মায়ের প্রসাদ নিয়ে যাচ্ছিলুম৷ মায়ের প্রসাদ পেয়েই না আমি আজন্ম নয়, জন্ম জন্ম বেঁচে আছি৷ কোন হারামজাদা না মায়ের প্রসাদ পেয়ে বেঁচে আছে তোরা কি নিজের পায়সায় খাস? এত আস্পর্ধা যে ছোট মুখে বড় কথা বলে৷ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবাই মায়ের প্রসাদ পেয়ে বেঁচে আছে...আমিও আছি, তোরাও আছিস৷ একে বলছিস চুরি তোদের সব্বনাশ হবে....তোদের সব্বনাশ হবে৷

আমি ঘোষ মশায়কে বললুম–দেখ, তোমার সবর্বনাশ হয় হোক, তবুও তুমি সর্বসাধারণের সমক্ষেই চুরিরাণী চাটুজ্জের মুখোস খুলে দাও৷

আমি আর সেখানে দাঁড়াইনি কারণ তখন সেখানে ছুটে চলেছে গালির ফোয়ারা৷ (শব্দ চয়নিকা ১৪শ খণ্ড)

 

উলুবেড়ে লোক্যাল

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

অনেকে ভাবে, বিতর্ক মানে তর্কসংক্রান্ত বা তর্কযুক্ত জিনিস৷ কথাটি আংশিকভাবে সত্য৷ বিশেষ ধরনের তর্ককে ‘বিতর্ক’ বলা হয়৷ কিন্তু এটাই ‘বিতর্ক’ শব্দের শেষ কথা নয়৷ ‘বিতর্ক’ মানে অতি জল্পন (অহেতুক বকবক করা)৷ এই বকবক করার সঙ্গে যদি বদ্মেজাজ বা প্রগল্ভতা সংযুক্ত থাকে তবে তা ‘বিতর্ক’ পর্যায়ভুক্ত–‘কষায়’ পর্যায়ভুক্ত হবে না৷ নীচে কয়েকটা বিভিন্ন স্বাদের বিতর্কের দৃষ্টান্ত দিচ্ছি–

একজন হাওড়া ইষ্টিশনে গেছে৷ একটু দেরী হয়ে গেছে৷ একজন ভদ্রবেশধারী মানুষকে জিজ্ঞেস করলে–দাদা, উলুবেড়ে লোক্যাল ছেড়ে গেছে? ভদ্রলোক মুখ ঝামটা দিয়ে খেঁকিয়ে বলে উঠলেন–উলুবেড়ে লোক্যালের খবর রাখা কি আমার ডিউটি? আমাকে কি টাইম–টেবল পেয়েছেন? আশ্চর্য সব বে–আক্কিলে লোক.........যত্ত সব........যত্ত সব....... এই জন্যেই দেশটার উন্নতি হচ্ছে না.......আমি এন্কোয়ারী অফিস নাকি?

কাছেই আর একজন মানুষ দাঁড়িয়ে ছিলেন৷ তিনি বললেন, উলুবেড়ে লোক্যালের খোঁজ নিচ্ছেন৷ হ্যাঁ, গাড়িটা আজ পাঁচ মিনিট দেরীতে ছাড়ছে৷ ছাড়ছে এগার নম্বরপ্লাটফরম থেকে৷ একটু তাড়াতাড়ি পা চালালে গাড়িটা ধরতে পারবেন৷ 

প্রথমোক্ত ঘটনাটি বিতর্কের দৃষ্টান্ত, দ্বিতীয়োক্তটিকে বলা হয় ‘প্রমিত বাক্’৷ প্রমিত  বাকে দরকার মত কথাটাই কেবল বলা হয়, আজেবাজে কথা বলা হয় না৷

সোনালী ভোর

লেখক
কৌশিক খাটুয়া

রঙ যদি নাহি থাকে অঙ্গে

থাকে যেন মনেরই সঙ্গে,

যে রঙে রঞ্জিত প্রভু তুমি,

সেই রঙে রাঙায়েছ বনভূমি৷

গোধূলি ও ঊষা রাঙা

অরুণ রাগে,

মধুপ গুঞ্জরিত সদা ফুল পরাগে৷

 

তোমার আগমণে

লেখক
সুকুমার রায়

আজি তোমার শুভ জনমদিনে

দোলায় ভুবন তোমার আগমণে

কতকাল পর এসেছিলে ধরায়

মোহনসাজে তুমি চিন্ময়৷

তন্দ্রাঘোরে বাজল ধবনী হৃদয়ে

স্পন্দিত মন তোমার পথ চেয়ে৷

উঠেছিল ঢেউ নন্দন কাননে

সুশোভিত ধরা বন্দিত মননে৷

 

তোমার জনমদিনে শুভপ্রাতে

শুনে চরণধবনী ধূলির ধরনীতে

ফুঠেছিল ফুল বন-উপবনে

তোমার চরণে নিবেদিত মনে৷

মৃদুছন্দ তালে সুরভিত পবনে

স্বাগত জানাতে বিনম্রবদনে৷

পূর্ণশশি যবে অপরূপ সাজে

ধরণীর শোভা যে প্রদীপ্ত বেশে৷

 

পূজনীয়

লেখক
শর্মিলা রীত

তোমাদের জন্য দেখেছিলাম এই পৃথিবীর আলো,

মা বাবার একটি সন্তান মানে, হাজার তারার আলো৷

আঁতুড় ঘরে তোমার গায়ের গন্ধ ছিল-

সব থেকে চেনা ও প্রিয়..

ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা আর আদর দিয়ে ভরা...

বাবার কাছে সব আবদার

শুধু শাষণ একটু কড়া৷

আজ তোমার সন্তান হয়েছে অনেক বড়ো,

দারুণ শীতে আর বলে না, মাগো জড়িয়ে আমায় ধরো৷

তোমার সন্তান হয়েছে আজ কেউ-

অফিসার, ডাক্তার কিংবা উকিল,

তোমরা হয়েছ বৃদ্ধ-

তাই ঘরে রাখা হয়েছে মুশকিল৷

যে বাবা তার সন্তানদের জন্য-

করত কঠোর পরিশ্রম

তাই কি তার আশ্রয় আজ শুধুই বৃদ্ধাশ্রম?

মা বাবার দুঃখমুছে, যত্নে রাখা

নয় কি মোদের করণীয়?

মাটির মূর্তি পূজোর আগে তোমরা হবে পূজনীয়৷৷

 

পাখীর সন্দেশ

লেখক
কৌশিক খাটুয়া

মোরা পাখীগণ ঘুরিয়া ভূবন

ভরেছি অনেক তথ্য,

ছন্দে ছন্দে প্রকাশ করি

যাহা কিছু দেখি সত্য৷

মানুষের মাঝে স্বার্থ, দ্বন্দ্ব,

কোথায় আত্মীয়তা,

বিশ্ব ভ্রমিয়া এসব মোদের

তিক্ত অভিজ্ঞতা৷

মুষ্টিমেয় দানবের হতবুদ্ধিতে

মানুষ নয়কো খুশি,

মানুষের মাঝে গড়ে অবরোধ

ভাগ্যকে কেন দূষি?

বর্ণবিদ্বেষ, শোষন, পীড়ন

নানান দুরভিসন্ধি,

গৃহযুদ্ধের ভয়াবহতায়

মানুষেরা গৃহবন্দি৷

শিক্ষা–স্বাস্থ্য নয়কো সবার

রয়েছে ক্রয়মূল্য,

এহেন সমাজে নারীর মর্যাদা

ভোগ্যপণ্যের তুল্য৷

বিশ্বজুড়িয়া পুঁজিবাদ গড়ে

শোষনের হাতিয়ার,

বিশ্বপিতা কার হাতে দেবেন

এই দুনিয়ার ভার

এখনও সময় রয়েছে মানুষ,

সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি,

একটু দরদ সমাজের লাগি,

পাল্টাও তব দৃষ্টি৷

সুন্দর হোক মানব সমাজ

সুন্দর পরিবেশ,

আমরাও তবে প্রচার করিব

মানবতার সন্দেশ৷

 

নববর্ষ করি স্পর্শ

লেখক
শিবরাম চক্রবর্ত্তী

আমরা বাঙালী ভালই জানি

বাঙালীস্তানের নববর্ষ,

আনন্দের সে এক মূর্ছনায়

বাঙালীর মন করে স্পর্শ৷

আমরা বাঙালী এই সময়

মনে প্রাণে বাঙালী তাই,

বাংলা ও বাঙালীর ভাবের

পোশাক পরে ঘুরে বেড়াই৷

আমরা বাঙালী অতিগর্বে

সবারে আজ বলতে চাই,

নোতুন বছর এলেই দেখ

ভাল মন্দ সব কেমন খাই৷

আমরা বাঙালী এই দিনটির

অপেক্ষাতে অতীত ভুলে,

নোতুনকেই করতে বরণ

নেচে চলি দু হাত তুলে৷

আমরা বাঙালী যে কোন রূপে

খুশির নববর্ষটারে

পরবাসে থাকলেও কেউ

সেথায়ও একে বরণ করে৷

আমরা বাঙালী নির্বিকারে

সারা বছরের সব কালিমা,

ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে আজ

দেখাই বাংলার এক মহিমা৷

আমরা বাঙালী ধর্মমতের

আর যত সব জাতপাতের

ভাঙতে বেড়া নোতুন বছর

ভাব নিই সবে বৃহতের৷

ডেণ্টিষ্টের দোকানে

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

যোগারূঢ়ার্থে ‘গঙ্গাক্ষেত্র’ বলতে সেই স্থানকে বোঝায় যে স্থান থেকে পদব্রজে এক অহোরাত্রের মধ্যে গঙ্গাতীরে পৌঁছানো যায়৷ বৌদ্ধোত্তর যুগে ভারতে যখন গঙ্গামহিমা প্রবল, অন্যান্য দেব–দেবীর মত গঙ্গাও একটি প্রতিপত্তিশালিনী দেবী, সেই সময় মানুষের গঙ্গাক্ষেত্রে বসবাস করাকে শ্লাঘার জিনিস বলে মনে করত৷ তাদের মনে একটা নিশ্চিততা থাকত যে মৃত্যুর পরে তাদের চিতাভস্ম গঙ্গানীরে একীভূত হয়ে থাকবে৷ সেই সময় একটা অলিখিত নিয়ম তৈরী হয়েছিল যে যারা গঙ্গাক্ষেত্রের অধিবাসী তাদের মধ্যে যারা সঙ্গতিসম্পন্ন তাদের দাহক্রিয়া গঙ্গাতীরে হবে ও তাদের চিতাভস্ম কলসোৎক্রান্ত জলে গঙ্গায় ভাসিয়ে দেওয়া হবে৷ অস্থি হরিদ্বারে, প্রয়াগ সঙ্গমে বা গঙ্গাসাগরে বিসর্জন দিতে হবে৷ যাঁরা গঙ্গাক্ষেত্রের বাইরে থাকতেন তাঁদের ক্ষেত্রে দাহক্রিয়া যে কোন জলাশয়ে করা যেতে পারে কিন্তু তৎপূর্বে মন্ত্রদ্বারা সেই জলাশয়ের জলকে গঙ্গা অথবা গোদাবরীর (দক্ষিণ গঙ্গা) জলের মত পবিত্র করে নেওয়া হবে ও দাহান্তে অস্থি প্রয়াগ বা হরিদ্বার বা গঙ্গাসাগরে বিসর্জন করা হবে৷ কখনও কখনও এমনও দেখা যেত যে কিঞ্চিৎ অবস্থাপন্ন মানুষেরা বার্দ্ধক্যে উপনীত হবার আগেই নিজের বাস্তুভিটা ত্যাগ করে অথবা বাস্তুভিটার দায়িত্ব পুত্রাদির হস্তে সমর্পণ করে নিজেরা গঙ্গাতীরে এসে বসবাস করতেন৷ যেমন বসবাস করেছিলেন ডাকার অ্যারিয়ল খাঁ থেকে আসা বনমালী ওঝা নদীয়ায় ফুলিয়ার গঙ্গার তীরে৷ এই বনমালী ওঝার পুত্র ছিলেন নামজাদা কবি কৃত্তিবাস ওঝা (মুখোপাধ্যায়) যিনি বাংলা রামায়ণ লিখেছিলেন৷ শ্রীহট্ট জেলার হবিগঞ্জ মহকুমার ডাকা–দক্ষিণগ্রাম থেকে নবদ্বীপে এসে বসবাস শুরু করেন জগন্নাথ মিশ্র৷ তাঁর পুত্র বিশ্বম্ভর মিশ্র পরবর্ত্তীকালে মহাপ্রভু চৈতন্যদেব নামে বিশ্ববিখ্যাত হয়েছিলেন৷ তোমরা লক্ষ্য করবে তুলনামূলক বিচারে বাংলার অন্যান্য জায়গার চেয়ে হাওড়া–হুগলী–বর্দ্ধম্ ও মুর্শিদাবাদের গঙ্গার তীরগুলোতে শিক্ষিত ব্রাহ্মণ–কায়স্থের বাস বেশী৷ তার কারণও ওই একটাই৷ চব্বিশ পরগণা জেলার দক্ষিণাংশে এই ধরণের সারস্বত মণ্ডলী সেকালে দেখা যায় নি৷ তার কারণ দক্ষিণ চব্বিশ পরগণায় চলেছিল তখনও গঙ্গা বদ্বীপে ভাঙ্গনের লীলাখেলা৷

তোমরা নিশ্চয়ই নজর দিয়েছ এইভাবে গড়ে উঠেছিল বালি, বেলুড়, উত্তরপাড়া, কোন্নগর, শ্রীরামপুর, বৈদ্যবাটী, ভদ্রেশ্বর, চন্দননগর, চুচঁড়ো, বাঁশবেড়ে, জীরাট, গুপ্তিপাড়া, কালনা, পূর্বস্থলী, নবদ্বীপ, অগ্রদ্বীপ, দাঁইহাট, কাটোয়া, উদ্ধরণপুর, গঙ্গাটিকরী, ঝামটপুর প্রভৃতি বর্দ্ধিষ্ণু সারস্বত স্থানগুলো৷ ভাঙ্গনের প্রাচুর্য্য থাকায় পূর্বদিকে নামজাদা কয়েকটি স্থান ভাটপাড়া, নবহট্ট (নৈহাটী), কাঞ্চনপল্লী, (কাঁচড়াপাড়া), গৌরীপুর (গরফে), কুমারহট্ট (হালিশহর) বাদে তেমন কোন বড় শহর গড়ে ওঠেনি৷ তাই মানুষের মুখে মুখে কথা উঠেছিল–রাঢ়ের গঙ্গাতীর কাশীর সমান৷ ‘‘গঙ্গার পশ্চিমকূল বারাণসী সমতুল’’৷ স্বামী বিবেকানন্দও সেইজন্যে রাঢ়েতেই তাঁর প্রধান কেন্দ্র স্থাপন করতে চেয়ে ছিলেন৷ সেকালে গঙ্গাক্ষেত্রে বসবাস করার জন্যে মানুষ রাঢ়ের গঙ্গাতীর (ভাগীরথী তীর) বাছত তো বটেই, যাঁরা একটু অবস্থাপন্ন তাঁরা বার্দ্ধক্যে পুত্র–পুত্রবধূর হাতে সংসারের ভার দিয়ে কাশীতে চলে যেতেন৷ অর্থাৎ তাঁরা গঙ্গাক্ষেত্রে বসবাসের জন্যে কাশীবাস করতেন৷ এই ভাবে গত প্রায় দেড় হাজার বছর ধরেই বাঙলার অনেক ব্রাহ্মণ ও কায়স্থ পরিবার কাশীতে গিয়ে বসবাস করে এসেছেন ও আজও করছেন৷ ভাষা ও সংস্কৃতিতে তাঁরা বাঙলার সকল প্রথাকেই মেনে চললেও ভূমিগত দূরত্বের জন্যে যোগাযোগ কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছল৷ এজন্যে তাঁরা একটা কাশীয়াল ব্রাহ্মণ সমাজ গড়ে নিয়েছিলেন৷ এতে রাঢ়ী–বারেন্দ্র বৈদিক সব শ্রেণীর ব্রাহ্মণরাই ছিলেন৷ এই কাশীয়াল ব্রাহ্মণরা আজ ছিন্ন–বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন৷ এখন তাঁদের সামাজিক আদান–প্রদান বাঙলার ব্রাহ্মণের সঙ্গেই হয়৷

আমার এক পরিচিত মানুষ ছিলেন৷ নাম কৃষ্ণগোপাল সান্ন্যাল৷ মেয়ের বিয়ের জন্যে তিনি তখন ছুটোছুটি করে বেড়াচ্ছেন৷ একদিন বাজারে বেল কিনতে গিয়ে দেখি পাশেই দাঁড়িয়ে সান্ন্যাল মশাই ..... তিনিও বেলের খরিদ্দার৷

পরের দিন শিবচতুর্দ্দশী কি না সান্ন্যাল মশায় আমাকে বললেন–অণিমার এবার একটা হিল্লে হ’ল৷ অনেক খুঁজে পেতে একটা পাত্র পেয়েছি৷ ছেলের বাড়ী কাশীতে৷ লক্ষ্ণৌয়ের ইঞ্জিনিয়ার৷

আমি বললুম–খুব ভাল কথা, খুব ভাল কথা৷

সান্ন্যাল মশায় বললেন–আসছে রবিবার দিন স্থির হয়েছে৷

পরের দিন সকালে আকন্দ ফুলের দোকানে আবার সান্ন্যাল মশাইয়ের সঙ্গে দেখা৷ তাঁর তখন ম্লান মুখ বিষাদে বিরস৷

আমি বললুম–এ কী হ’ল৷ কালকের পূর্ণিমার পর রাত কাটতে না কাটতে অমাবস্যা একেবারে দিনের বেলায় অমাবস্যা৷ হলটা কী

সান্ন্যাল মশায় বললেন–বিয়ে কেঁচে গেল৷

আমি বললুম–সে কী কথা পাত্রপক্ষের কি খাঁই বেড়ে গেছে, না কোন দুষ্ট মানুষ ভাংচি দিয়েছে?

সান্ন্যাল মশায় বললেন–খাঁইও বাড়েনি, ভাঁংচিও দেয়নি৷ পাকা দেখা মানে আশীর্বাদ তো হয়েই গেছল৷

আমি বললুম–তবে?

সান্ন্যাল মশায় বললেন–ওরা কেশেল বামুণ, ওদের ঘরে মেয়ে দি কী করে

সান্ন্যাল মশায়ের সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল তার পনের বছর পরে একটা দাঁত বাঁধানোর দোকানে৷ দেখলুম সান্ন্যাল মশায় ও তাঁর সঙ্গে বসে আছে অণিমা৷

আমি বললুম–কী ব্যাপার

সান্ন্যাল মশায় বললেন–অণিমার সামনের দুটো দাঁত পড়ে গেছে৷ না বাঁধালে চলে না৷ পাত্রপক্ষ দেখলেই বলবে–পাত্রী থুরথুরী বুড়ি আমাদের পাত্রের দিদিমা৷

আমি বললুম–দাঁত তো বাঁধাতেই হবে তবে অণিমার বয়স আর কতই বা হ’ল৷

সান্ন্যাল মশায় বললেন–এমন কিছু নয়৷ এই সবে পঁয়ত্রিশে পা দিয়েছে৷

যাই হোক আমাদের সামাজিক কুসংস্কার আর সেকালের কেশেল ব্রাহ্মণদের সম্বন্ধে নদীয়ার ব্রাহ্মণদের অনীহার গল্প শুণলে তো এই ফলটা কী ভাল হয়েছিল?

(শব্দ চয়নিকা, ১য়/১০৫)

আয় চৈতালী ঝড়

লেখক
শ্রী প্রণবকান্তি দাশগুপ্ত

 

আয় বসন্ত,আয় দুরন্ত, আয় চৈতালী ঝড়

আয়রে ভীষণ, আয়রে ভয়াল, আয়রে ভয়ংকর!

আনরে কাঁপন জীর্ণ শাখায়,

আনরে মরণ শুষ্ক পাতায়,

আনরে মাতন সবুজ পাতায়---হানরে অসুন্দর!

আয় বসন্ত, আয় দুরন্ত , আয় চৈতালী ঝড়!!

 

আয় ভাঙনের জয়গান গেয়ে, আয় মহা তাণ্ডবে,

এক ঘেয়েমির সুর-তাল কেটে আয় হতগৌরবে৷

আয় ধবংসের ডঙ্কা বাজিয়ে,

আয় সৃষ্টির অর্ঘ্য সাজিয়ে,

নবীন আশার পুলক জাগিয়ে আয় নতুনের চর!

আয় বসন্ত, আয় দুরন্ত, আয় চৈতালী ঝড়!!

 

ঋতুরাজ সমাগত

লেখক
কৌশিক খাটুয়া

শীতের জড়ত্বের অন্তে

বসন্তের চাপা চঞ্চলতা

ফাগুনের নানাবিধ গুনে

হৃদয়ের দীর্ঘ উদ্বেলতা৷

পলাশ-শিমুলে মিলে

অরণ্য রাঙানোর এত দায়!

বনবীথি সজ্জিত কৃষ্ণচূড়ায়

রঙীন বসন্ত শোভা পায়৷

পুষ্প কাননে-বনে

রঙীন পোষাকের নব সাজ,

দখিনা পবন যেন কয়

দুয়ারে এসেছে আজ ঋতুরাজ৷

শুষ্ক পাতা ঝরার শেষে

নবপত্রিকা শাখায় শাখায়

যেন হতাশার যবনিকা পরে

আশার ইঙ্গিত আলোক রেখায়৷

রঙীন ডানায় উড়ে প্রজাপতি

পুষ্পে পুষ্পে গুঞ্জরিত ভ্রমর,

জানিনা কী লগনে এই সমাবেশ

কোকিল কন্ঠে কুহু কুহু স্বর৷

চৈত্রের পূর্ণিমা তিথি

রঙের খেলায় সবে মাতি,

তাঁহার রঙে রঙ মিলিয়ে

প্রীতি ডোরে বরিব অতিথি