প্রভাতী

শামিয়ানা নেতা

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

‘কেণিকা’ শব্দের একটি অর্থ হল শামিয়ানা৷ শব্দটি ফার্সী৷ এ ক্ষেত্রে ৰাঙলার নিজস্ব শব্দ ‘কেণিকা’৷ রোদ ও অল্প বারিপাতের হাত থেকে কোনো উৎসব বা অনুষ্ঠানকে ৰাঁচাবার জন্যে শামিয়ানার ব্যবহার হয়ে থাকে৷ এই ‘শামিয়ানা’ শব্দটি ৰাংলা ভাষায় এসেছে ৰড় জোর ৪০০ বছর৷ ছোটৰেলায় আমি একজন শামিয়ানা–নেতার নাম শুনেছিলুম৷ তোমরা নিশ্চয় জানো, নেতা হবার জন্যে অনেকের সখের প্রাণ গড়ের মাঠ হয়ে থাকে৷ যোগ্যতা নেই, তবু নেতা হতে হবে৷ তাই তারা অনেক সময় অন্যকে দিয়ে ভাষণ লিখিয়ে নিয়ে নিজেরা তা কতকটা মুখস্থ করে জনসভায় ছেড়ে দেয়৷ হাততালির ব্যবস্থা আগে থেকেই করা থাকে৷ এদের জন্যে ‘শামিয়ানা–নেতা’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়৷

আমার জানা জনৈক শামিয়ানা–নেতা কয়েকৰারই ম্যাট্রিকে ঘায়েল হয়ে শেষ পর্যন্ত নেতা হবার পদটি নিরাপদ মনে করে সেটিকেই ৰেছে নিলেন৷ ৰলা ৰাহুল্য, লিখিত ভাষণ মুখস্থ করে তার ভালই চলছিল৷ কিন্তু যতিচিহ্ণের (Punctuation) জ্ঞান না থাকায় ভাষণ একটু ওলট–পালট হয়ে যেত৷ তাঁর সহকর্মীরা একদিন তাঁকে ৰললেন–‘‘দেখিয়ে, আপ্ পাঙ্ক্চুয়েশন শিখ লিজিয়ে৷’’

তিনি ৰললেন–প্রোনাউন ঔর প্রপার নাউন তো মুঝে মালুম হৈ (হ্যায়)৷ বহী চীজ না৷

সহকারীরা ৰললেন–পাঙ্কচুয়েশনভী ঐসা হী হৈ, পর্ থোড়া ইধ্র্–উধ্র্৷ জৈসা ‘বাটার’ (water) ঔর ৰাটার (butter)–দোনো করীৰ্ করীৰ্ এক হী হৈ, দোনো হী তরল হৈ৷ মগর থোড়া ফারাক্ ভী রহতা হৈ৷

তাঁরা তখন শামিয়ানা–নেতাকে যতিচিহ্ণ ৰোঝালেন৷ ৰললেন–জৰ্ হমলোগ কমা লিখেঙ্গে উস্কে ৰাদ আপ্কো বান্ (ওয়ান) বল্নে কা টাইম ছোড়না পড়েগা৷ জব্ ফুলিষ্টপ্ লিখেঙ্গে তব্ আপ্কো বান, টু, থীরী (ওয়ান, টু, থ্রী) কা টাইম ছোড়না পড়েগা৷

শামিয়ানা–নেতা ৰললেন–হান্ জী, ম্যায় সমঝ্ লিয়া৷

সহকারীরা লিখে দিলেন–‘‘প্যারে সজ্জনোঁ, মুঝে আজ কাফী হর্ষ্ হৈ, কি ম্যায় আপলোগোঁকা পাশ্ পঁহুচ গ্যয়া৷ মগর কহ্না যহী হৈ কী শীর্ফ আজ হী কে লিয়ে নহীঁ, বল্কি অনন্তকালকে লিয়ে ম্যায় আপলোগোঁকা পাশ আনা চাহতা হুঁ–, ঔর অনন্তকাল তক্ আপ্লোগোঁকো সাথ রহনা চাহতা হু৷’’ শামিয়ানা–নেতা কমা, ফুলষ্টপ, আর ৰান–টু–থীরীর হিসাৰ ভালভাৰে শিখে নিলেন৷ এবার তিনি শামিয়ানার নীচে দাঁড়িয়ে ভাষণ শুরু করলেন–

‘‘প্যারে সজ্জনোঁ কমা বান মুঝে আজ কাফী হর্ষ্ হৈ কমা কি ম্যায় আজ আপ্লোগোঁকা পাশ্ পঁহুচ্ গয়া ফুলিষ্টপ ৰান, টু, থীরী (ওয়ান, টু, থ্রী) মগর কহ্না যহী হৈ কমা ৰান শীর্ফ্ আজ হী কে লিয়ে নঁহী ৰল্কি অনন্তকালকে লিয়ে ম্যায় আপ্লোগোঁকা পাশ আনা চাহতা হুঁ কমা ঔর অনন্তকাল তক্ আপ্লোগোঁকা সাথ রহনা চাহতা হুঁ ফুলিষ্টপ বান টু থীরী৷’’

শ্রোতা–জনতা সোল্লাসে হাততালি দিয়ে তাঁকে সম্ৰর্দ্ধনা জানালেন৷ নেতা তো হাততালিই চাইছিলেন৷ তাঁর ভাষণটা প্রদত্ত হয়েছিল সম্ভবতঃ অল ইণ্ডিয়া চোর এ্যাণ্ড ডাকু কন্ফারেন্সে (নিখিল ভারত চোর ও ডাকাত সম্মেলন)৷ তাহলে তোমরা ৰুঝলে শামিয়ানা–নেতা কাদের ৰলে৷

*      *      *      *

ওই রকম একজন নেত্রীও ছিলেন৷ তিনি ছিলেন ৰ্রিটিশ ভারতের জনৈক দেশীয় রাজ্যের মহারাণী৷ তাঁর ভাষণ লিখে দিতেন ভারতের জনৈক নামজাদা ৰ্যারিষ্টার৷ একবার এলাহাৰাদে সর্বভারতীয় মহিলা সম্মেলন হয়েছিল৷ ৰ্যারিষ্টার সাহেৰের লেখা ভাষণটি মহারাণী ভালভাৰেই পড়ে নিয়েছিলেন৷ কিন্তু সভাস্থলে দাঁড়িয়ে বিপুল জনসমাবেশ দেখে মহারাণীর মাথা ঘুরে যায়......ভিরমি যাৰার উপক্রম হয়, সমস্ত ভাবনাই তাঁর তখন গুৰলেট হয়ে যায়৷ মহারাণী ছিলেন শামিয়ানা–নেত্রী৷ সুতরাং  ভাষণের সুযোগ তিনি তো ছাড়ৰেন না, তা মুখস্থ থাক, বা না থাক ৰলৰেনই৷ তিনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিন–চার ৰার ৰললেন–ম্যায় ক্যা কহুঁ...ম্যায় ক্যা কহুঁ...ম্যায় ক্যা কহুঁ৷ তারপর রুমাল দিয়ে সযত্নে টিপ ৰাঁচিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বললেন–ৰড্ডী গরম...ৰড্ডী গরম...ৰড্ডী গরম৷ তারপরে মহারাণীর গলার স্বর আর ৰেরুল না, আগাগোড়া ভাষণটি ভুলে গেলেন আর কি ‘‘এক গেলাস পানী’’ ৰলে ধপাস করে চেয়ারে ৰসে পড়লেন৷

এৰার ৰ্যারিষ্টার ভদ্রলোক উঠে দাঁড়ালেন৷ তিনি বললেন–আজ যে সকল বিদূষী মহিলা এই সভায় এসে ভাষণ দিয়ে আমাদের কৃতার্থ করলেন তাঁদের অন্যতমা হচ্ছেন আমাদের এই মহারাণী৷ সত্যিই এঁর ভাষণের তুলনা ভারতে কেন, সমগ্র বিশ্বে বিরল৷ এখন আমাদের খতিয়ে দেখার দিন এসেছে যে ভারতের মহিলারা আজ কত দুঃখে আছেন আর তাঁদের সেই দুঃখ দেখে মহারাণীর কোমল প্রাণ আজ কী পরিমাণ বিগলিত হয়েছে, কী পরিমাণ দ্রবিত হয়েছে৷ মহারাণী প্রথমেই ৰললেন–‘‘ম্যায় ক্যা কহুঁ ম্যায় ক্যা কহুঁ ম্যায় ক্যা কহুঁ’’ অর্থাৎ ভারতীয় নারীর দুঃখ–দুর্দশার ইতিকথা এত পর্বতপ্রমাণ যে মহারাণী এর কোন্খানটা ৰলৰেন আর কোন্খানটা না ৰলৰেন ভেবে পাচ্ছেন না৷... ভারতীয় নারীর দুঃখের ইতিহাস মহারাণীর কোমল প্রাণকে এমন ওতঃপ্রোতভাবে গলিয়ে দিয়েছে যে মহারাণী ভেবে পাচ্ছেন না যে কোন্খানটি থেকে তাঁর বর্ণনা শুরু করৰেন আর কোথায় বা হৰে তার পরিসমাপ্তি৷ তাই মহারাণীর দরদী মন ৰলছে, ‘‘ম্যায় ক্যা কহুঁ...ম্যায় ক্যা কহুঁ...ম্যায় ক্যা কহুঁ’’৷ উঃ ভাবতেই পারছি না মহারাণীর কী অপূর্ব মমতা...মহীয়সী নারীর কী বিরাট হূদয়বত্তা তারপর মহারাণী বললেন... মহারাণী কী ৰললেন...ৰললেন–ৰড্ডী গরম... ৰড্ডী গরম... ৰড্ডী গরম৷ অর্থাৎ অত্যাচারের নাগপাশে আজ ভারতীয় নারী পিষ্ট৷ শুধু যে রান্নাঘরের আগুনের উত্তাপেই তারা জ্বলেপুড়ে মরে যাচ্ছে তাইই নয়, অত্যাচারের নাগপাশের উষ্ণতাতেও তাদের দম ৰন্ধ হবার উপক্রম৷ সেই রান্নাঘরের উত্তাপ, সেই নাগপাশের দাবদাহ মহারাণীর কোমল মনকে স্পর্শ করেছে৷ মহারাণীর ওষ্ঠের মধুর হাসি মরুভূমির মারব জ্বালায় হারিয়ে গেছে৷ মহারাণী তাঁর অন্তরের বিদগ্ধ অনুভূতি, অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন কবির মাধুর্য্যময় মুন্সীয়ানায় ছোট্ট কয়েকটি শব্দে বললেন–‘‘ৰড্ডী গরম...ৰড্ডী গরম...ৰড্ডী গরম’’ অর্থাৎ এ অত্যাচারের অনল জ্বালা আমি সহ্য করতে পারছি না......এ উষ্ণতার ক্লেশ আমার কাছে অসহনীয়৷

শ্রোতা–জনতা করধ্বনি দিলেন৷ ৰ্যারিষ্টার সাহেৰ শামিয়ানা–নেত্রীকে অদ্রিতুঙ্গে উঠিয়ে দিলেন৷

*      *      *      *

তোমরা একজন শামিয়ানা–নেতার পরিচয় পেলে–একজন নেত্রীর পরিচয়ও পেলে৷ কেমন লাগল

 

গেল ভয় এল জয়

লেখক
শিবরাম চক্রবর্তী

দেড়শো বছর আগের সেই

 বাঙলার রসগোল্লা,

বাঙালী প্রথম সৃষ্টি করে

ভারি করেন পাল্লা৷

অনেক তর্ক-বিতর্কের পর

জি আই-এর লোক শেষে

রসগোল্লা বাঙলার সৃষ্টি,

বলেন মিষ্টি হেসে৷

ছানাটারে গোল্লা করে

গরম চিনির রসটায়,

ফেলে তারে ফোটালেই

‘রসগোল্লা’ নাম হয়৷

স্বাদে গন্ধে মন মাতিয়ে

বাঙালীর হয় প্রিয়,

সকল মিষ্টি বাদ দিয়ে

সে হয় ধ্যানের ধ্যেয়৷

কলকাতার রসগোল্লা

ভারত জয়ের পরে

বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছায়,

জি আই-এর হাত ধরে৷

বাঙলা ও বাঙালীদের

দেওয়ার শেষ নেই,

আর এক ইতিহাস গড়ল

তারা রসগোল্লাতেই৷

 

প্রভু এসেছিলে এ সুন্দর ভূবনে

লেখক
সুকুমার রায়

তুমি এসে আমার মন মাতালে

সুপ্ত চেতনায় আলো ঝরালে

আঁধারের যাতনা গেল যে মুছে

হতাশ হৃদয়ে আনন্দ ভরেছ

আজি এ প্রভাতে নোতুন সাজে

মধুময় করেছ সকল কাজে৷

 

তোমারী নামে সংসার মাঝে

সঁপেছি তোমায়, সকল কাজে

দিবানিশি যে জীবন ধারায়

সত্যপথের সাধনাই সহায়

অমৃতলোকের যাত্রী যে মোরা

হৃদয়ে পেয়েছি প্রীতি ধারা

থামাতে মানা অনিত্য ছায়

শ্রীনাম ধরে চলব ঝড়ো বায়৷৷

 

প্রভু এসেছিলে এ সুন্দর ভূবনে

তোমারী সাজানো মনোরম কাননে

ব্যথিত হৃদয়ে প্রীতি ঢেলেছ

অমৃতলোকের আনন্দ এনেছ

সহসা চলে গেলে কোন গগণে

দাওনি ধরা, অনন্তলীলা কে জানে৷৷

 

প্রভু এসেছিলে এ সুন্দর ভূবনে

সংবাদদাতা
সুকুমার রায়
সময়

তুমি এসে আমার মন মাতালে

সুপ্ত চেতনায় আলো ঝরালে

আঁধারের যাতনা গেল যে মুছে

হতাশ হৃদয়ে আনন্দ ভরেছ

আজি এ প্রভাতে নোতুন সাজে

মধুময় করেছ সকল কাজে৷

 

তোমারী নামে সংসার মাঝে

সঁপেছি তোমায়, সকল কাজে

দিবানিশি যে জীবন ধারায়

সত্যপথের সাধনাই সহায়

অমৃতলোকের যাত্রী যে মোরা

হৃদয়ে পেয়েছি প্রীতি ধারা

থামাতে মানা অনিত্য ছায়

শ্রীনাম ধরে চলব ঝড়ো বায়৷৷

 

প্রভু এসেছিলে এ সুন্দর ভূবনে

তোমারী সাজানো মনোরম কাননে

ব্যথিত হৃদয়ে প্রীতি ঢেলেছ

অমৃতলোকের আনন্দ এনেছ

সহসা চলে গেলে কোন গগণে

দাওনি ধরা, অনন্তলীলা কে জানে৷৷

উদীচী

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

এক ভদ্রলোক থাকতেন কলকাতায়৷ তাঁর নাম–ধরো, মনোরঞ্জন ঘোষ–দস্তিদার৷ বাড়ী তাঁর বাখরগঞ্জ জেলার গাভা গ্রামে৷ এক বার তিনি গ্রামে যাবেন৷ গ্রামে যে লোকটি তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁর পরিবারকে দেখাশোনা করে, ধরো তার নাম গোপাল দাস৷ মনোরঞ্জনবাবু গোপালকে চিঠি লিখে জানালেন, অমুখ তারিখে গ্রামে যাচ্ছি৷ তুমি ষ্টীমার ঘাটে উপস্থিত থেকো৷

মনোরঞ্জনবাবুর অনুপস্থিতিতে ও অজ্ঞাতে তাঁর পরিবারে এমন অনেক ঘটনাই ঘটে গেছে যা এখনো পর্যন্ত তাঁর জানবার ও শোণবার সুযোগ হয়নি৷ ষ্টীমার থেকে নেবে মনোরঞ্জনবাবু গোপালকে জিজ্ঞেস করলেন–হ্যাঁ গোপাল, বাড়ীর সব খবর ভাল তো?

গোপাল বললে–হ্যাঁ কত্তা, সবাই ভাল, সব কিছুই ঠিকঠিক চলছে৷

তারপরে একটু ঢ়োক গিলে একটু উদীচী করে বললে–কেবল সেই এ্যাল্সেশিয়ান* কুকুরটি মারা গেছে৷

* আমরা প্রায় সকলেই এ্যালসেশিয়ান কুকুরের সঙ্গে পরিচিত৷ এ্যাল্সেশিয়ানকে কুকুর বলেই আমরা ধরি কিন্তু আসলে এটি ঠিক কুকুর নয়, এটি নেকড়ের একটি অতি নিকট প্রজাতি৷ তবে নেকড়ের সঙ্গে এর কয়েকটি মৌলিক পার্থক্যও আছে৷ বিশেষ করে চারটি পার্থক্য খুবই লক্ষণীয়৷

প্রথম পার্থক্য হল, নেকড়ের ঘ্রাণশক্তি অতি প্রবল সত্য কিন্তু এ্যাল্সেশিয়ানের ঘ্রাণশক্তি নেকড়ের চেয়েও তীব্র দ্বিতীয় পার্থক্য এই যে নেকড়ে কুকুরকে দেখলেই খাক বা না খাক, হত্যা করে৷ এ্যাল্সেশিয়ান অতটা কুকুরবিদ্বেষী নয়৷ পোষমানা এ্যাল্সেশিয়ান তো একেবারেই নয় তৃতীয় পার্থক্য হ’ল, নেকড়ে নিজের ওজনের আড়াই গুন ওজন খাদ্য খেতে পারে৷ তারপর অবশ্য কয়েকটা দিন মড়ার মত পড়ে থাকে৷ এ্যাল্সেশিয়ান কিন্তু অত বেশী খায় না চতুর্থতঃ নেকড়ে সহজে পোষ মানতে চায় না৷ কিন্তু এ্যাল্সেশিয়ান পোষ মানে ও অত্যন্ত প্রভুভক্ত৷ প্রাচীনকালে নেকড়ে ও শৃগালের বিমিশ্রণে যখন কুকুরের উৎপত্তি হয়েছিল এ্যাল্সেশিয়ানেরও উৎপত্তি তখন হয়েছিল কি না কাগজে–কলম তার কোন প্রমাণ নেই৷ তবে এ্যাল্সেশিয়ান নেকড়ে–শৃগালের বিমিশ্রণ হলেও তার মধ্যে নেকড়ের প্রভাব বেশি৷

পৃথিবীর সমস্ত প্রাচীন ভাষাতেই নেকড়ের উল্লেখ আছে, নামও আছে, কিন্তু এ্যাল্সেশিয়ানের নেই৷ সংস্কৃতে নেকড়েকে বলা হয় ‘বৃকব্যাঘ্র’৷ বৈদিক যুগের কিছু কিছু মানুষ নেকড়ে বাঘকে হত্যা করে তার মাংস, বিশেষ করে তার হূৎপিণ্ড খেত–এমন কিছু কিছু ভাসা ভাসা তথ্য পাওয়া যায়৷ অতি ঔদারিক হিসেবেও নেকড়ের কথা সংস্কৃত সাহিত্যে তো

 আছেই, প্রাচীন বাংলা সাহিত্যেও আছে৷

অতি ঔদারিকতার জন্যে মধ্যম পাণ্ডব ভীমের একটি নাম ছিল বৃকোদর (‘বৃকের  উদরের ন্যায় উদর যাহার’ এই ব্যাসবাক্যে বহুব্রীহি সমাস)৷ সেই মহাভারতে আছে না, পাণ্ডবরা যখন অজ্ঞাতবাসে ছিলেন তখন পাঁচ ভাই ভিক্ষালব্ধ অন্ন মাতা কুন্তীকে যখন এনে দিতেন তখন কুন্তী সেই অন্ন দু’ভাগে বিভক্ত করতেন৷ এক ভাগ কুন্তী ও চার ভাই মিলে খেতেন, অন্য ভাগ খেতেন ভীম একাই৷ ‘অর্ধ্ব খান কুন্তী সহ চারি সহোদরে/অর্ধেক ব’টিয়া দেন বীর বৃকোদরে৷৷’

সেই যে গল্প আছে না, কুন্তী ও চার ভাইকে একাদশীর ব্রত পালন করতে দেখে এক শুভক্ষণে ভীমেরও ইচ্ছা হ’ল একাদশীতে উপবাস করবার৷ ভীম বললে–মা, আম্মোও একাদশী করবো৷ সবাই যখন পারে আম্মোও পারি৷

কুন্তী বললেন–না বাবা, তোমার কষ্ট হবে, তোমাকে করতে হবে না৷

ভীম বললে–মা, কষ্টের জন্যেই তো জীবন৷ কষ্ট করতে এই মধ্যম পাণ্ডব পিছপা নয়৷ ‘‘দেহ আজ্ঞা করি উপবাস/ব্রত আমি পালিব নিশ্চয়৷’’

কুন্তী বললেন–আচ্ছা, তুমি চেষ্টা করো৷ তবে আমি তোমার জলখাবার তৈরী রাখব৷

ভীম সকাল ছ’টায় ঘড়ির দিকে তাকিয়ে কুন্তীকে বললে–এই তো মা, দেখ ছ’’টা বাজল৷ এখনও আমি খাইনি৷ সওয়া ছ’টার সময় বললে, মা দেখ, ছ’টা বেজে পনের মিনিট, এখনও আমি তোমার কাছে জলখাবার চাইনি৷

কুন্তী বললে–আমি কিন্তু জলখাবার তৈরী রেখেছি৷ কেবল দুধটা একটু জ্বাল দিয়ে দোব৷

সাড়ে ছ’টার সময় ভীম বললে–মা, একটু যে ক্ষিদে পাচ্ছে৷ ‘‘তবু আমি দমিব না মাতঃ’’৷

কুন্তী বললেন–জলখাবার কি দোব?

ভীম বললে–মা, আরও একটু দেখি৷

ভীমের হাতঘড়িতে তখন পৌনে সাতটা৷ ভীম বললে–মা, আর যে থাকতে পারছি না৷ এতক্ষণ পেটের ভেতর ছুঁচোয় কেত্তন গাইছিল, এখন যে কীৎ কীৎ খেলছে৷

কুন্তী বললে–বাবা, একটু ধৈর্য ধরো, আমি দুধটা জ্বাল দিয়ে নি’৷

দুষ্ট লোকেরা বলে, ভীম তারপর গরম দুধে ভিজিয়ে সাড়ে সাত মণ খই খেয়ে একাদশীর ব্রত উদ্যাপন করেছিল৷

ভীমের স্মরণে আজও সেই তিথিকে লোকে ভৈমী একাদশী বলে থাকে৷ যাই হোক, ভীমের নামে কেন ভৈমী একাদশী হয়েছিল বুঝলে তো

হ্যাঁ, বলা হচ্ছিল এ্যাল্সেশিয়ান কুকুরটির কথা৷ এ্যাল্সেশিয়ান কুকুর মারা গেছে শুণে মনোরঞ্জনবাবু মুষড়ে পড়লেন৷ তারপরে টাল সামলে নিয়ে গোপালকে শুধোলেন–হ্যাঁ গোপাল, তা কুকুরটার হয়েছিল কী?

গোপাল বললে–কী আর হবে কত্তা বাঘের লেখা ও সাপের দেখা, জন্ম–মৃত্যু–বিয়ে তিন বিধাতার নিয়ে–এই ব্যাপারে মানুষ আমরা কী করতে পারি ওই পোড়া মাংস খেয়েই কুকুরটা মরল৷

মনোরঞ্জনবাবু বললেন এ্যাঁ পোড়া মাংস কীসের পোড়া মাংস?

গোপাল উদীচীর পথ ধরে চলেছে৷ সে বললে–ওই যেদিন আপনার বাড়ীটা পুড়ে গেল না সেদিন আস্তাবলের ভেতরে থাকা ঘোড়াটাও যে পুড়ে মরে গেল৷ ওই পোড়া ঘোড়ার মাংস খেয়েই এ্যাল্সেশিয়ানটা মরল৷

মনোরঞ্জনবাবু বললেন–এ্যাঁ আমার অমন প্রাণচঞ্চল আরবী ঘোড়াটা আর নেই৷ তুই বলিস কী রে

গোপাল বললে–ওই যেদিন বুড়ী মা কলেরায় মারা গেলেন তার ঠিক দু’দিন পরে৷

মনোরঞ্জনবাবু বললেন–এ্যাঁ মা–ও নেই৷ বলিস কী গোপাল উদীচী করতে করতে গোপাল বললে–হ্যাঁ কত্তা, বুড়ী মা–ও গত হয়েছেন৷

মনোরঞ্জনবাবু বললেন–কবে কলেরা হয়েছিল? আমি যে কিছুই জানি না৷

গোপাল বললে–তারিখটা ঠিক মনে নেই কত্তা৷ তবে খোকাবাবু যেদিন মারা গেল তার হপ্তা খানেকের মধ্যে৷

মনোরঞ্জনবাবু বললেন–এ্যাঁ খোকাটাও নেই তবে তুই যে বললি সব কিছুই এক রকম চলছে৷

গোপাল বললে কত্তা, উদীচী করছিলুম, ধাপে ধাপে বলছিলুম৷

মনোরঞ্জনবাবু কাঁদতে কাঁদতে বললেন–খোকার কী হয়েছিল রে?

গোপাল বললে মা–মরা বাচ্চা ছেলে কি বাঁচে গিন্নী–মা মারা যাবার পর থেকেই তার ঠিক মত দেখাশোনা হচ্ছিল না৷ তাই খোকাকে আর বাঁচানো গেল না৷

স্ত্রীও মারা গেছেন শুনে মনোরঞ্জনবাবু বললেন–এ্যাঁ বলিস কী সেও নেই৷ তবে আর কাদের জন্যে গ্রামে যাব চল্, ষ্টীমার ঘাটেই ফিরে যাই৷

 

স্বপ্ন

লেখক
জয়তী দেবনাথ

 

স্বপ্নে ঘেরা মনটা যে 

            মোর বড়োই অভিলাষী

হাজারো রঙের স্বপ্ণ

            শুধুই বুনছে রাশি-রাশি৷

সপ্নে সব বাসা বাঁধে

            মনের আঙিনায়

আর যে শুধুই বায়না ধরে

            আকাশ ছুঁতে চায়৷

কতভাবে বোঝাই তাদের,

             কতই হিসাব কষে

আকাশ যে বড্ড দূরে,

            অচেনা এক দেশে৷৷

বাস্তব বিমুখ মন যে তবু

            শোনে না কোনো বারণ

প্রশ্রয় শুধুই দেয় শখেদের

            কারণে-অকারণ৷

কি করে বোঝাই আমি,

            অবাধ্য মনটারে

না-পাওয়ার সেই স্বপ্নগুলো

            কত্তো আঘাত করে৷

সব ভুলে তবু স্বপ্ন দেখতে

            আজও ভালোবাসি

আঁধার পথে মোর স্বপ্ণগুলোই

            ফোটায়  আলোক রাশি৷৷

 

এক পরিবার

লেখক
বিভাংশু মাইতি

হিন্দু নয়, মুসলমান নয়

মানবতার কথা বল

ধর্ম নিয়ে ধুরন্ধরদের

রাজনীতির  মুখোশ খোল৷

            ধর্ম মানে মনের স্ব-ভাব

            সব মানুষের একই ধর্ম

            একগোত্র এক পরিবার

            অন্তরেতে একই মর্ম৷

সকলে মোরা আনন্দ চাই৷

অমৃতের পুত্র সবাই

এক  সঙ্গে মিলেমিশে

একই লক্ষ্যে চলো তাই৷

            বুঝতে হবে এ সত্যসার

            বোঝাতে হবে বিশ্বজনে

            তবেই  হবে আসল সমাজ        

            আসবে শান্তি সবার মনে৷

‘‘রাধে বদন তুলে.......’’

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

সেকালে কোলকাতায় বসবাসকারী উৎকলবাসীদের মধ্যে গুড়ুকী তামাকের ব্যাপক প্রচলন ছিল৷ স্থানীয় লোকেদের সে তামাকের রসৰোধ ছিল না৷ যে দু’একজন লোকের তার রসৰোধ হয়েছিল তাঁরা গোপনে ওড়িষ্যাবাসীদের কাছে গিয়ে গুড়ুক সেবন করে আসতেন৷ সাধারণতঃ ওড়িষ্যাবাসীরা মানুষ হিসেবে খুব ভাল হয়৷ কেউ কিছু চাইলে তারা না দিয়ে থাকতে পারে না৷ তারাও তাই গুড়ুক–আকাঙক্ষী লোকেদের গুড়ুকী দানে তৃপ্ত করত৷ লোকে বলে, কোনো অজানা–শাস্ত্রে নাকি আছে ঃ

‘‘তাম্রকূটং মহদ্দ্র ব্যং শ্রদ্ধয়া দীয়তে যদি৷

অশ্বমেধসমপূণ্যং টানে টানে ভবিষ্যতি’’৷

অর্থাৎ তাম্রকূট একটি মহৎ বস্তু৷ কেউ যদি শ্রদ্ধার সঙ্গে কাউকে তামাক অফার করে (উপহার দেয়), তাহলে গ্রহীতা যতবার সেই তামাকে টান দেবেন ততবার তামাক–পাতা অশ্বমেধ যজ্ঞের সমান পুণ্যফল পেতে থাকবেন৷ এই ছিল সেকালকার গুড়ুকী তামাকের রসকথা৷

কৃষ্ণযাত্রা চলছে৷ নাটক রীতিমত জমে উঠেছে৷ কৃষ্ণের ভূমিকায় যে নেৰেছে তার অভিনয়ের তারিফ সবাই পঞ্চমুখে করছে৷ স্মারককে বলতে হবে, ‘‘রাধে, বদন তুলে চাও৷’’ এমন সময় স্মারকের কাশি পেয়ে  গেছে৷ কাশির চোটে সে কথা বলতে পারছে না৷ ওই রকমের একটা চরম নাটকীয় মুহূর্তে ঝানু অভিনেতা কৃষ্ণটি তো আর মুখ ৰুজে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না৷ সে উশ্খুশ্ করছে–কী বলি কী বলি এমন সময় কন্সার্ট পার্টির একজন আরেকজনকে গুড়ুকী তামাক অফার করতে করতে বললে ঃ ‘‘নাও দাদা, গুড়ুক খাও৷’’

যাত্রার কৃষ্ণের মুশকিল আশান হ’ল৷ তার ঘাম দিয়ে ম্যালেরিয়ার জ্বর ছাড়ল৷ সে বললে–‘‘রাধে, বদন তুলে গুড়ুক খাও’’

তুমি কতবার ভুল ভাঙালে

লেখক
রামদাস বিশ্বাস

তবু শতবার শুধু ভুলই করি৷

ভুলের বাসরে ব্যাথা না পাশরে

ভুলে ভুলে শুধু জ্ব’লে মরি৷৷

ভুলের বোঝা সব সরিয়ে দিয়ে

চ’লে গেলে তব অলকায়

কেন যে আমাকে রেখে গেলে

একা বিরহ ব্যাথায়৷

আরো শত ভুলে জীবনের কুলে

শূন্য সাজি সতত ভরি৷৷

যা কিছু স্বপ্ণ দেখি ভুলকে নিয়ে

ভুলে ভরা এই দুনিয়ায়

তোমাকে ভুলে সখা

খুঁজি কারে গোলকধাঁধায়৷

ভুলে গেছি তোমাকে বিপাকে প’ড়ে

ডাকি দয়াল হরি৷৷

---শান্তিনিকেতন, ১৫/৫/২০০৫

 

শীতের দিনে

লেখক
শিবরাম চক্রবর্ত্তী

শীতের দিনে দিনটি ছোট

সময় ছুটে চলে,

সোহাগ মাখা রোদে বসে

সুখের কথা বলে৷

 

শীতের দিনে রাতটি বড়

শুয়ে মজা লেপে,

সকাল বেলায় ঘুম না ভাঙ্গায়

বাবা যান ক্ষেপে৷

 

শীতের দিনে রান্না ঘরে

একবারটি যাওনা,

মূলো বেগুন কপি পালং

রান্না কত খাওনা৷

 

শীতের দিনে পিঠে পুলি

খেজুর গুড়ের পায়েস,

মা–ঠাকুরমা বানিয়ে দিলে

খেয়ে হয় আয়েস৷

 

শীতের দিনে খেজুর গাছ

কাটলেই রস পড়ে

সেই রস সব দেখলে ভাঁড়ে

লোভে জিভটি নড়ে৷

নলেন গুড়ের গন্ধে–

কচিকাঁচারা উনুন ঘিরে

বসে যায় আনন্দে৷