আধ্যাত্মিক প্রসঙ্গ

আত্মোপলব্ধি ও মানবতার সেবা

‘আত্মমোক্ষার্থং জগদ্ধিতায় চ’, এটি একজন সাধকের জীবনের আদর্শ হওয়া উচিত৷ মানুষের কাজ করা উচিত, আর কাজ করার সময়ে মনে রাখা দরকার, সে যা কিছুই করছে তা আত্মমোক্ষের জন্যে৷

শ্রাবণী পূর্ণিমা

......আমাদের এই শ্রাবণী পূর্ণিমা–অনেকেই জান, এটা জানা জিনিস আমি তখন খুবই ছোট্ট৷ তখন বিদ্যাসাগর কলেজে পড়ি৷ একদিন সন্ধ্যায় একটা ঘটনা ঘটল৷ একজন লোক–সে লোকটি দুষ্ট প্রকৃতির ছিল৷ আমরা এই কথাটা ব্যবহার করছি এই জন্যে যে আজ যে মানুষটা দুষ্ট, কাল সে সাধু হতে পারে৷ আজ যে মূঢ় কাল সে জ্ঞানী হতে পারে–এ সবকিছু আপেক্ষিক জগতের আপেক্ষিকতার দ্বারা অভিষিক্ত৷ তাই এর কোন শাশ্বত রূপ নেই৷ কোন মানুষকে স্থায়ীভাবে দুষ্ট বলা চলে না৷ সব সময় মনে রাখতে হবে যে আমি এই দুষ্টের ভেতরে যে ভাল জিনিসগুলো নিহিত রয়েছে সেইগুলোকেই জাগিয়ে দিয়ে, বাড়িয়ে দিয়ে একে ভাল করে তুলবো৷ ভাল মানে কী?–না, সংস্কৃত ‘ভদ্র’ শব্দ থেকে ‘ভাল’ শব্দটা এসে

ত্রিভুবনের পরিভাষা

পরমপুরুষের পরম রচনাত্মক শক্তি নিজ আন্তরিকতা তথা ভূমামনের চেতনাশক্তির সাহায্যে ভৌতিক জগতের জড় অথবা জীব সত্তার বিভিন্ন রূপ প্রদান করে থাকে৷ প্রত্যেক বস্তু তাঁরই রচনা, প্রত্যেক বস্তু তাঁরই দ্বারা সংরক্ষিত ও পালিত হয়ে থাকে৷ শেষ পর্যন্ত তাঁরই বিরাট ভূমামনে সমস্ত জাগতিক সত্তার অন্তিম পরিণতি ঘটে যায়৷ অর্থাৎ পরমসত্তার মানসিক আধার ভূমিতে সব কিছুর লয় হয়ে যায়৷ এই কারণে আমি বলি কোন বস্তুই ক্ষুদ্র নয়, কোন বস্তুই অনাবশ্যক নয়৷ যদি অগুন্তি প্রোটোপ্লাজম দ্বারা এই সামূহিক শরীর তৈরী হয়ে থাকে, তাহলে তোমার মনও একটি সামূহিক মন৷ এছাড়া প্রত্যেক প্রোটোপ্লাজম একটি জীবিত সত্তা৷ আর এই কারণে প্রত্যেক জীবিত সত্তার নিজস্

সৎ কী ও অসৎ কী?

‘সৎ’ কী ও ‘অসৎ’ কী– এ সম্পর্কে যে বিচারবোধ তাকে সদাসৎ বিবেক বলে, যা ‘সৎ’–কে ‘অসৎ’ থেকে ও ‘অসৎ’–কে ‘সৎ’ থেকে পৃথক করে দেয়৷ ‘সৎ’ কী? লৌকিক ভাষায় ‘সৎ’ মানে ভালো– সৎ ব্যষ্টি, সজ্জন ব্যষ্টি৷ আর আধ্যাত্মিক অর্থে ‘সৎ’ মানে অপরিণামী সত্তা– যাতে কোনো পরিবর্তন হয় না৷ আর ‘অসৎ’ মানে যা পরিণামী, যার অবস্থান্তর ঘটে৷ ‘সৎ’ বস্তু একই, বাদবাকী সব অসৎ৷ ‘অসৎ’ মানে খারাপ নয়, পরিবর্তনশীল৷

 ঈশ্বর সম্প্রাপ্তি একমাত্র লক্ষ্য

মানুষ সাধনা করে ঈশ্বর প্রাপ্তির জন্য৷ এখন ঈশ্বর সম্প্রাপ্তিটা কেমন জিনিস? –না, নিজের সত্তাটা, নিজের অস্তিত্ববোধটা পরমপুরুষে মিলিয়ে দেওয়া৷ এই মিলিয়ে দেওয়ার উপায়টা কী? সাধনার দ্বারা নিজেকে, নিজের সমগ্র সত্তাবোধকে পরমপুরুষের কাছে নিয়ে যাওয়া ও এর সঙ্গে সঙ্গে আর কী করা?

মানুষের কর্তব্য

এই যে শরীর, এই যে মন, এ সবের জন্যে তো অর্থের, অন্ন–বস্ত্রের আবশ্যকতা আছে ঠিক কথা৷ মানুষ অর্থোপার্জনের চেষ্টা করবে, ঘরবাড়ী, জমি–জায়গার জন্যে চেষ্টা করবে৷ এ সবই ঠিক৷ কিন্তু যখন এই চেষ্টা করবে, চেষ্টা করার সময় মনে এই ভাবনা রাখতে হবে যে, ‘‘আমি এই সব পাওয়ার জন্যে চেষ্টা করছি এইজন্যে যে এ সব আমার আধ্যাত্মিক সাধনার সহায়ক হবে৷ এই সব জাগতিক বস্তুর লাভের উদ্দেশ্যে এ সবের সাধনা করছি না৷’’ মানুষ যখন নিজের স্থূল ভাবকে সূক্ষ্মভাবে রূপান্তরিত করতে থাকবে, তখন ক্রমশঃ সে বৈয়ষ্টিক ভাবনার দ্বারা পরিচালিত না হয়ে সামূহিক ভাবনার দ্বারা পরিচালিত হতে থাকবে৷

মুক্তিলাভের একমাত্র পথ ভক্তি

মানসিক রূপান্তরণের দ্বারাই জীব মুক্তির পথ প্রশস্ত করতে পারে, আর সেটা তখনই সম্ভব হয় যখন জীব পরমপুরুষকে নিজের একমাত্র আভোগ বা আরাধ্য হিসেবে স্বীকার করে নেয়৷ মানুষের তথা সাধকের স্বভাবই হচ্ছে পরমপুরুষরূপ মানস–আভোগ থেকে উৎসারিত তরঙ্গসমূহের সঙ্গে একাত্ম হয়ে তাঁর সমস্ত গুণকে আত্মসাৎ করে নেওয়া৷ তাই বলা হয়েছে ঃ–

‘‘অপিচেৎ সুদূরাচারো ভজতে মামনন্যভাক৷

সো অপি পাপবিনির্মুক্তো মুচ্যতে ভববন্ধনাৎ৷৷’’

সুদূরাচারী কাকে বলব? দূরাচারী কথাটার অর্থ হচ্ছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ধরনের পাপী৷ আর সুদূরাচারী মানে হ’ল দূরাচারীও তার পাপের জন্যে তাকে ঘৃণা করে৷

সদাশিবের আলোকে যোগ, রাজযোগ, অষ্টাঙ্গিক ও রাজাধিরাজ যোগ

পূর্ব প্রকাশিতের পর

কুসুমে সুরভি যে কেবল দেবতার কাম্য তা নয়৷ ভক্ত তার হৃদয়ের সুরভি দিয়ে মালা গাঁথে তার ইষ্টের জন্যে৷ কুসুমে সুরভি না থাকলে সে কুসুম ভক্তের কাছে কোন মূল্য বহন করে না৷ এখানে মনে রাখতে হবে, কুসুমের সুরভি আর ভক্তের হৃদয়ের কোমল মাধুরী দু’য়ে মিলে এক অনবদ্যতা এনে দেয়৷

সদাশিবের আলোকে যোগ, রাজযোগ, অষ্টাঙ্গিক ও রাজাধিরাজ যোগ

দর্শনশাস্ত্র প্রথম লিখলেন (তখন অক্ষর উদ্ভাবিত হয়েছে) মহর্ষি কপিল*৷  লোকে তাঁর পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হ’ল৷ প্রথম দর্শনের প্রবক্তা হিসেবে সমাজের সমস্ত পণ্ডিতেরাই এক বাক্যে ‘‘আদি বিদ্বান’’ বলে তাঁর মাথায় সম্মানের শিরোপা চড়িয়ে দিলেন৷ রাঢ়ের এই সারস্বত পুরুষ সৃষ্টিরহস্যের মূল কারণগুলো সংখ্যাক্ষদ্ধ করে বিদ্বৎসমাজে সাজিয়ে তুলে ধরলেন৷...

সদাশিবের আলোকে যোগ, রাজযোগ, অষ্টাঙ্গিক ও রাজাধিরাজ যোগ

আর্যরা ভারতে বসবাস করার  পরে অনার্য সমাজে জন্মেছিলেন এক বিরাট পুরুষ৷ মঙ্গোলীয়–আর্য মিশ্র কুলে জাত এই বিরাট পুরুষ ছিলেন উন্নতনাসা ও শুভ্রকান্তি৷ ইনি ছিলেন মহাতান্ত্রিক, মহাযোগী৷ অনার্য সমাজের এই মহাপুরুষ শিব নামে প্রসিদ্ধ ছিলেন৷ একাধারে এত গুণ মানুষের মধ্যে যে থাকতে পারে এ কথা লোকে ভাবতে পারে না, তাই তাঁকে বলা হ’ত গুণাতীত বা নির্গুণ পুরুষ৷ তন্ত্রসাধনার ফলে এই শিব অর্জন করেছিলেন অলোকসামান্য শক্তি৷ এই শক্তিকে তিনি লাগিয়ে গেছলেন জনকল্যাণের কাজে৷ তন্ত্রশাস্ত্রকে সুসংবদ্ধরূপ ইনিই দিয়েছিলেন৷ তাই তান্ত্রিকের বা যোগীর ইনি ছিলেন গুরু–ইনি ছিলেন পিতা৷ এই ব্রহ্মজ্ঞ মহাপুরুষের দৃষ্টিতে উচ্চ–নীচ ভেদ ছিল ন