চাই বলিষ্ঠ অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও অর্ন্তমুখী জীবনের অনুশীলন

লেখক
আচার্য মন্ত্রসিদ্ধানন্দ অবধূত

একথা রূঢ় বাস্তব---ভারতবর্ষের অভ্যন্তরেই আজ বিচ্ছিন্নতার সুর৷ তাই রাষ্ট্রের কর্ণধারদের সংহতির কথা চিন্তা করতেই হবে৷ ঐক্যের পথ খুঁজে বের করতেই হবে৷ কিন্তু শুধু রোগ জানলেই হবে না৷রোগের কারণও জানতে হবে৷ নতুবা ভুল ঔষধ প্রয়োগে হিতে বিপরীত হবে৷

ভারতবর্ষ একটি যুক্তরাষ্ট্র৷ এই যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় নানা ভাষাভাষীর জনগোষ্ঠী আছে৷ তাদের আচার-আচরণ, পোষাক-আষাক, চাল-চলনে অনেক পার্থক্য আছে৷ এই পার্থক্যই ভারতবর্ষকে এক নতুন বৈশিষ্ট্য দিয়েছে৷ তাই বলা হয়ে থাকে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য৷ তাই রাষ্ট্র নেতাদের এই বৈচিত্র্যের পৃথক বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেই ঐক্যের পথ খুঁজতে হবে৷ পৃথক বৈশিষ্ট্যের বিনাশ ঘটিয়ে নয়৷

শুধুমাত্র ভাষাভিত্তিক রাজ্য ঘটন করতে গিয়ে (অবশ্য বাংলাকে অবহেলা করে) স্বাধীনতার ঊষালগ্ণে যে ভুল রাষ্ট্রনেতারা করেছে তার মাশুল আজও দেশবাসীকে দিতে হচ্ছে, ভবিষ্যতেও দিতে হবে৷ এই সংকট থেকে পরিত্রাণের একটাই পথ---রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ঘটিত রাজ্যের বিলোপ ঘটিয়ে ভাষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ভৌগোলিক অবস্থান, নৃতাত্তিক পরিচয় ও অর্থনৈতিক সমস্যা ও সম্ভাবনা খতিয়ে দেখে জনগোষ্ঠীগত বিচারে সামাজিক-অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘটন৷

ভারতবর্ষের বর্তমান যে সামাজিক অবক্ষয় ও বিচ্ছিন্নতার সুর শোনা যাচ্ছে তার কারণ কিন্তু কোনও ভাষা নয়৷ একদিকে অর্থনৈতিক বৈষম্য আশমান-জমিন তফাৎ, অপরদিকে অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ধর্মমত মানুষকে সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি, রাজনীতি সম্পর্কে অজ্ঞ অচেতন করে রেখেছে৷ শোষক ও বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি এর পূর্ণ সুযোগ নিয়ে মানুষকে বিশেষ করে যুবসমাজকে বিপথগামী করছে৷ এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র নেতাদের বক্তব্য  ও চিন্তাধারায় অনেক বেশী স্বচ্ছতার প্রয়োজন৷ নতুবা আগুনে ঘি ঢালার সামিল হবে৷

রাষ্ট্রনেতাদের মনে রাখতে হবে ভারতবর্ষ শুধু একটি দেশ নয়, ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি ও নৃতাত্ত্বিক বিচারে ভাতবর্ষ বহু জনগোষ্ঠীর মিলনস্থল৷ আবার শাসনবিধি অনুযায়ী ভারতবর্ষ বহু দলীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র৷ কবির কথায়---‘নানা ভাষা, নানা মত নানা পরিধান/বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান৷’ মহান ভারতবর্ষের ঐতিহ্য এটাই৷ মহামিলনের এই তীর্থক্ষেত্রের মহত্ব কোন একটি ভাষা বা কোনও একটি ধর্মমতের জন্যে নয়৷ দেশের কর্ণধারদের এই সহজ সত্যটা বুঝতে হবে৷

পারিপার্শ্বিক ঘটনাবলী ও ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায় কোন একটি ভাষা, কোন একটি দল বা কোন ধর্মমত ঐক্যের নয়, বিভেদের বীজ বহন করে৷ পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাদেশ রূপান্তর, সোভিয়েত ইয়ূনিয়নের অবলুপ্তি তার দৃষ্টান্ত৷ জোর পূর্বক কোনও ভাষা বা মতবাদ চাপানোর পরিণতির ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত চোখের সামনে থাকা সত্ত্বেও ভারতের রাষ্ট্রনেতারা সেই পথেই হাঁটে৷ আবার একদলীয় শাসন ব্যবস্থা স্বৈরাচারী একনায়কতন্ত্রের জন্ম দেবে৷

ভারতবর্ষের বর্তমান সমাস্যার সমাধান করে সমগ্র ভারতবাসীকে এক সুরে বাঁধতে কোনও একটি ভাষা, কোন একটি দলের সাহায্যের প্রয়োজন নেই৷ প্রয়োজন একটি বলিষ্ঠ অর্থনৈতিক পরিকল্পনা যা মানুষকে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার নূন্যতম প্রয়োজনগুলো যোগাবে৷ এও মনে রাখতে হবে প্রাউটের দৃষ্টিতে ভারতবর্ষ ৪৪টি জনগোষ্ঠীর একটি দেশ৷ বাঙালী, অঙ্গিকা মৈথিলী, ভোজপুরী, বুন্দেলী, বাঘেলী, অসি পাঞ্জাবী, তামিল, তেলেগু, মালয়ালাম প্রভৃতি৷ এই ৪৪টি জনগোষ্ঠীকে কোন একটি ভাষা বা ধর্মমত দিয়ে এক সূত্রে বেঁধে রাখা যাবে না৷ প্রতিটি জনগোষ্ঠীর ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতির বিকাশ লাভের পূর্ণ সুযোগ দিতে হবে ও অর্থনৈতিকভাবে প্রতিটি জনগোষ্ঠীকে স্বনির্ভর করে গড়ে তুলতে হবে৷ কিন্তু এটাই শেষ নয়৷

নানা ভাষাভাষীর ভারতবাসীকে এক সূত্রে বেঁধে রেখেছে তার অন্তর্মুখী জীবনধারা৷ প্রতিটি মানুষের জীবনের পরম লক্ষ্য এক শাশ্বত অনন্ত সত্তায় লীন হয়ে যাওয়া৷ প্রাচীন কাল থেকেই ভারতবাসী সেই লক্ষ্যেই এগিয়ে চলে৷ সেই পরম সত্তায় লীন হওয়াই তার জীবনের পরম লক্ষ্য, তার সাধনা, তার প্রাণধর্ম৷ যখনই সে এই জীবনধারা থেকে সরে আসে তখনই তার সমাজ জীবনে বিপর্যয় নেমে আসে৷

বর্তমান ভারতবর্ষের দুর্গতির মূল কারণ এটাই৷ নাম-যশ-খ্যাতি-ক্ষমতা-ধন-সম্পদ--- বহিপ্রকৃতির বিপুল ঐশ্বর্যের পেছনে ছুটতে গিয়ে মানুষ তার অন্তর্মুখী জীবনধারা থেকে, জীবনের পরম লক্ষ্য থেকে দূরে সরে গেছে৷ হিংসা, বিদ্বেষ, স্বার্থলোভ, দল, গোষ্ঠী, সম্প্রদায় সংঘাতের পরিবেশ তৈরী করছে৷ রাজ্যে রাজ্যে বিচ্ছিন্নতার সুর তুলছে৷ এই পরিস্থিতিতে দেশের কর্ণধারদের ভেবেচিন্তে কথা বলা উচিত৷

তাই কোন ভাষা বা ধর্মমত নয়, ভারতাসীকে এক সূত্রে বাঁধতে প্রয়োজন একটি বলিষ্ঠ অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও তার অন্তর্মুখী জীবনের অনুশীলন৷ তখন শুধু ভারতবর্ষ নয়, বিশ্বের সকল মানুষই এক সূত্রে বাঁধা পড়বে৷