নাগরিক পঞ্জি ঃ কিছু কথা

লেখক
সুকুমার সরকার

শাসক আর শোষকের কোনো জাত থাকে না৷ ধর্মমত, বর্ণ নির্বিশেষে সবকালে, সবদেশে তাদের একটিই পরিচয়, তা হলো, তারা শাসক ও শোষক! বর্তমান ভারতবর্ষে বিজেপি শাসিত কেন্দ্র সরকার তা আরেকবার ভালো করে প্রমান করে দিল উত্তর-পূর্ব ভারতে নাগরিক পঞ্জি তৈরীর নামে বাঙালী বিতাড়নের মধ্য দিয়ে৷

উত্তর-পূর্ব ভারতের অসম, মনিপুর, মেঘালয়, ত্রিপুরা প্রভৃতি রাজ্যগুলিতে বহু বাঙালির বাস৷ তার মধ্যে আবার ওই রাজ্যগুলির বাঙালি অধ্যুষিত বহু এলাকা ভৌগোলিক ভাবে বাঙালিস্তানেরই অংশ ছিল যা কোনো এক সময় অন্যায় ভাবে ওইসব রাজ্যের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে৷

আবার পূর্ব-পাকিস্তান তথা বাংলাদেশ থেকেও বহু বাঙালি ওইসব রাজ্যে এসে ঠাঁই নিয়েছে৷ তাদের মধ্যে দেশভাগের ক্ষত নিয়ে আসা হিন্দু বাঙালি যেমন আছে, তেমনি লেবেলশ্রম-এর (জনসংখ্যার ঘনত্ব অনুযায়ী আবাস যোগ্য ভূমি চাই) দাবি নিয়ে আসা বহু মুসলমান বাঙালিও আছে৷

মুসলমানেরা সাতচল্লিশ সালে আলাদা মুসলিম ভূখণ্ডের জন্যে দেশভাগ করে পাকিস্তান বানিয়ে নিয়েছিল৷ প্রশ্ণ তারপরেও মুসলমানেরা কেন অবশিষ্ট ভারতে আসবে? যুক্তিটা গ্রাহ্য হলেও হতে পারে৷ কিন্তু আগত হিন্দুদের কি হবে? এই নিয়ে হিন্দু মুসলিম উভয় বাঙালিরা সাতচল্লিশ সাল থেকেই অসম, মণিপুর, মেঘালয়ে নানানভাবে নানান সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে৷ আজও হচ্ছে৷

বিজেপি ক্ষমতায় আসার আগে হিন্দুদের সুড়সুড়ি দিয়ে বলেছিল, পাকিস্তান বা বাংলাদেশ থেকে আগত সকল উদ্বাস্তু হিন্দুদের ভারতে নাগরিকত্ব দেওয়া হবে৷ অসমে বহুকাল থেকে নাগরিকত্ব সমস্যায় জর্জরিত বাঙালি হিন্দুরা সমাধানের আশায় গত বিধানসভা ভোটে বিজেপিকে ভোট দিল৷ কিন্তু বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসে নাগরিক পঞ্জি তৈরিতে উদ্বাস্তু হিন্দুদের কথা আলাদা করে বললেন না৷ আসলে ভারতের সংবিধান অনুযায়ী হিন্দু মুসলিম আলাদা নাগরিক পঞ্জি তৈরী করা যায় না৷ কিন্তু প্রশ্ণ, যেখানে পাকিস্তান বা বাংলাদেশ থেকে উদ্বাস্তু হয়ে আশা মানুষদের জন্যে সেখানে তো আলাদা করে উদ্বাস্তু হিন্দুদের চিহ্ণিত করা যেতেই পারে৷ হিন্দুরা এসেছে উদ্বাস্তু হয়ে  মুসলমানেরা এসেছে ‘লেবেলস্রম এর মতলব নিয়ে৷ দুইকে গুলিয়ে দিয়ে সকলকেই বিদেশি তকমা দেওয়ার অপচেষ্টা আসলে বিজেপির সেই শাসক-শোষক সুলভ মানসিকতার-ই বহিঃপ্রকাশ৷ আসলে ক্ষমতায় আসার জন্যে নির্যাতিত হিন্দুদের ব্যবহার করছে বিজেপি৷ এখন নাগরিক পঞ্জি তৈরির বেলায় সে কথা ভুলে আছে৷

শুধুমাত্র উদ্বাস্তু হিন্দুদের নাগরিক পঞ্জি দেবার ক্ষেত্রে সাংবিধানিক যে বাধা আছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ বিজেপি সরকার সেই বাধা দূর করছে না কেন? আসলে হিন্দু-প্রীতি বা মুসলিম-বিদ্বেষ বলে কোনো কথা না কথা হলো ক্ষমতায় আসতে যখন যেখানে যে তাস খেলতে হয় তাই খেলে পুঁজিপতি বা পুঁজিপতিদের মনোনীত শাসক-শোষকেরা৷ এটাই শাসক ও শোষকের চিরকালীন চরিত্র৷

বিজেপি দলটি মূলতঃ দেশীয় পুঁজিবাদীদের দল৷ আর পুঁজিবাদীরা চিরকালই শোষক হয়৷ শোষণ করে পুঁজির পাহাড় গড়াই তাদের লক্ষ্য৷ বাঙালি হিন্দুরা সেটা বুঝতে পারেনি৷ আর বুঝতে পারেনি বলেই তাদের এই দুর্র্ভেগ৷

একই অবস্থা পশ্চিমবঙ্গের উদ্বাস্তু হিন্দুদের যে হবে না, সেটাও বলা মুশকিল ! পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় এলে নাগরিক পঞ্জি তৈরির নামে উদ্বাস্তু হিন্দুদেরকেও যে মুসলমানদের সঙ্গে বিদেশি তকমা দেওয়া হবে না তার গ্যারান্টি কোথায়? কেননা বিদেশি তকমা দেবার ক্ষেত্রে তো হিন্দু মুসলমান আলাদা আইন নেই! এখন ক্ষমতায় আসার জন্যে হিন্দু বাঙালির মন পেতে অনেক কিছুই বলা হচ্ছে৷ কিন্তু কার্যত সে সবের কিছুই তো কেন্দ্রের বিজেপি সরকার করছে না৷ আসলে বিজেপি ক্ষমতায় আসার জন্যে হিন্দুদের তাস খেলছে ৷ ক্ষমতায় আসার পর সে সব বেমালুম ভুলে যাবে৷ যেমন অসমে ভুলে গেছে৷ আর খেসারত দিচ্ছে হাজার হাজার উদ্বাস্তু হিন্দু বাঙালি৷ অতএব বাঙালিরা সাবধান৷

পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘ বামফ্রন্টের অপশাসনের হাত থেকে মুক্তি পেতে মানুষ তৃণমূলকে ক্ষমতায় এনেছে৷ কিন্তু সেই তৃণমূল বামফ্রন্টের চেয়েও কয়েককাটি ওপরে৷ সাধারণ মানুষের আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তা তলানিতে৷ পশ্চিমবঙ্গের মানুষ আবারও মুক্তির পথ খঁুজছে৷ কিন্তু মুক্তির পথ যে বিজেপি বা কংগ্রেস বা অন্য কোনো পুঁজিবাদ সমর্থিত দল নয় সেটা ভালো করে বুঝতে হবে৷ নইলে আবারও একই হা হুতাশ করতে হবে৷

আসলে সমস্যাটা বাঙালি বা অসমীয়া নয় সমস্যাটা শাসন শোষণ নিয়ে৷ এটা আগে পরিষ্কার বুঝতে হবে৷ নইলে ভোটের বাক্সে ভুল বোতাম টেপা হবে৷  আর ভুল বোতাম টেপার খেসারতের কারনে বঙ্গ-অবঙ্গ হবে৷

পুঁজিবাদীদের মনোনীত সরকার ক্ষমতায়৷ জাত-পাত, ভাষা, সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে মানুষকে বিভাজন করবে৷ পুঁজিপতিদের স্বার্থ দেখতে গিয়ে কর্ষকদের অবহেলা করবে৷ ঋণের দায়ে কর্ষক আত্মহত্যা করবে৷ চাকরি না পেয়ে বেকার যুবক যুবতীরা নেশার পথ বেছে নেবে৷

--- তা হলে উপায়?

--- উপায় আছে৷

আসলে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাগুলি থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে৷ বুঝতে হবে নাগরিক সমস্যার একুশ শতকীয় সমাধান কী! একুশ শতকে নাগরিক সমস্যাদীর্ণ বিশ্বে সমাধানের পথ, কোনো মানুষ বিশ্বের যে কোনো ভূখণ্ডে বসবাস করতে পারে৷ শুধু সেই মানুষটিকে বসবাসকৃত ভূখন্ডটিকে আপন ভাবতে হবে৷ সেই ভূখণ্ডের আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক উন্নয়নের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করে দিতে হবে৷ এটাই একুশ শতকের নোতুন সমাজ-দর্শন, রাষ্ট্র-দর্শন৷ আর এই দর্শনের নাম প্রাউট৷ প্রগতিশীল উপযোগ তত্ত্ব৷ যে দর্শনের লক্ষ্য পুঁজিবাজী শাসন শোষণ নয় লক্ষ্য মানবতার মুক্তি৷