পরমপুরুষ সবার মধ্যে রয়েছেন
প্রতিটি কাজেই তোমাদের জানা উচিত কোন্টা কী ও কীজন্যে, কেন কেন এটা করছ, কেন ওটা করছ না৷ অতীতে আমি অনেকবারই বলেছি যে মানবসমাজ একটা একক সত্তা৷ এটা অবিভাজ্য, এটাকে নানান টুকরোয় বা অংশে ভাগ করা যায় না, কারণ মূলতঃ মানবতা এক৷
প্রতিটি কাজেই তোমাদের জানা উচিত কোন্টা কী ও কীজন্যে, কেন কেন এটা করছ, কেন ওটা করছ না৷ অতীতে আমি অনেকবারই বলেছি যে মানবসমাজ একটা একক সত্তা৷ এটা অবিভাজ্য, এটাকে নানান টুকরোয় বা অংশে ভাগ করা যায় না, কারণ মূলতঃ মানবতা এক৷
সংস্কৃত ‘নার’ শব্দের কয়েকটিই মানে হয়৷ একটা মানে হ’ল ‘জল’ আরেকটা মানে হ’ল ‘পরমাপ্রকৃতি’–সৃষ্টির আদি মাতৃকা অপর অর্থ হ’ল ‘ভক্তি’৷
সাধক মাত্রেরই মুখ্য তথা চরম লক্ষ্য থাকে এই যে, সে নিজেই যে ভক্তিসুধা পান করবে তা নয়, বরং অন্যেও যাতে সেই ভক্তিরসামৃতের অংশ পায় সে দিকেও তাঁর বেশী আগ্রহ থাকে৷ সাধক নিজে যে আনন্দ উপভোগ করছে সেটা সে অন্যের সঙ্গেও ভাগ–বাঁটোয়ারা করতে চায়৷
গড়পড়তা ৰৌদ্ধিক মাপের একজন মানুষের কাছে জল ও বরফ দু’টি পৃথক সত্তা কিন্তু যারা সত্য সম্পর্কে অল্পকিছু জানে তারা ৰোঝে জলের ঘনীভূত রূপই বরফ৷ একইভাবে সাধারণ মানের মানুষ যখন একটা পাত্র ও কুম্ভকারের ঙ্মযে পাত্রটি তৈরী করেছেৰ মধ্যে একটা বিরাট পার্থক্য দেখে, ব্রহ্মজ্ঞানী সেখানে দুই–কে একইভাবে দেখে৷ এই যে জগত আর ব্রহ্ম–এ দু’টো কি পৃথক সত্তা না তারা অবিভাজ্য, একটা সত্য আর অন্যটা কি মিথ্যা এ দু’টো সত্তার মধ্যে যে পার্থক্য চোখে পড়ে তা কি সত্য না মায়া–এ ধরনের প্রশ্ণ বা চিন্তা–ভাবনা ব্রহ্মজ্ঞদ
‘‘চৈতন্য রহিতাঃ মন্ত্রাঃ প্রোক্তা বর্ণাস্তু কেবলম্৷ ফলং নৈব প্রযচ্ছন্তি লক্ষ কোটি জপৈরপি৷৷’’
অর্থাৎ মন্ত্রচৈতন্য যদি না হয়, তান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসারে যদি সাধনা করা না হয়, এ অবস্থায় লক্ষ বার বা কোটি বার মন্ত্র জপ করলেও কিছুই হবে না৷ যখন কুলকুণ্ডলিনীর ঘুম ভেঙ্গে যায়, তখন সাধক দীপনী ও মন্ত্রচৈন্যের দ্বারা কুলকুণ্ডলিনীকে ওপরে ওঠানোর প্রয়াস করেন এটাই হচ্ছে সাধনার প্রথম স্তর, যাকে মনোবৈজ্ঞানিক দিক থেকে বলা হয় ‘যতমান’ স্তর৷
প্রত্যেক বস্তুর নিজের নিজের ধর্ম আছে, নিজস্ব স্বাভাবিক লক্ষণ আছে৷ সেই লক্ষণ দেখেই মানুষ সংশ্লিষ্ট বস্তুর সঙ্গে পরিচিত হয়, তার নামকরণ করে৷ প্রত্যেক সত্তার, প্রত্যেক জীবের নিজের নিজের ধর্মে অটুট থাকা শ্রেয়স্কর৷
সোণা ও লোহার নিজেদের পৃথক পৃথক ধর্ম আছে৷ ঠিক তেমনি মানুষেরও নিজের ধর্ম আছে৷ মানুষ যদি নিজের ধর্ম থেকে, মানব ধর্ম থেকে দূরে সরে যায় তবে তাকে মানুষ বলব না৷ মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব তার নিজের ধর্মেই নিহিত৷ তাই তার পক্ষে স্বধর্মে সুদৃঢ় থাকাই বাঞ্ছনীয়৷
দ্বিতীয় গুণটা হ’ল প্রতাপ (administration) অর্থাৎ শাসন আছে৷ সবাই ভালবেসে হোক, ভয়েই হোক, তাঁকে মানবে৷ শাস্ত্রে বলা হয়েছে, বিশ্বৰ্রহ্মান্ডের সবাই পরমপুরুষকে মানছে৷ কেন মানছে – না, না মেনে উপায় নেই৷ তার ভয়ে বায়ু বয়ে চলেছে৷ ভয় না থাকলে হাওয়া হয়তো বলত, খানিকক্ষণ বসে জিরিয়ে নিই৷ সংস্কৃতে হাওয়ার অপর নাম ‘অনিল’৷ সংস্কৃত ‘নিল’ মানে স্থির, স্থাণু, একটা জায়গায় যা স্থির হয়ে বসে আছে আর ‘অনিল’ মানে যা এক জায়গায় স্থির হয়ে বসে নেই৷ পরমপুরুষের প্রতাপ আছে, ঐশ্বর্য আছে – দু’টো গুণ হ’ল৷ ‘‘ভীষাস্মাদ্ বায়ুঃ পবতে’’ অর্থাৎ তাঁর ভয়ে হাওয়া ছুটে বেড়াচ্ছে৷ ভাবছে, দু’টো চোখ আমার পিছনে রয়েছে৷ ‘‘ভীষোদেতি সূর্যঃ’’ অর্থাৎ ত
সাধনায় কুলকুণ্ডলিনীকে ঊর্ধ্বগতি করতে না পারলে মন্ত্র জপ একেবারেই অর্থহীন হয়ে পড়ে৷ কুলকুণ্ডলিনীকে ঊধের্ব নিয়ে যাবার প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘পুরশ্চরণ প্রক্রিয়া’, আর মন্ত্রচৈতন্য বলতে অবশ্য আসলে ৰোঝায় সঠিকভাবে মন্ত্রের ভাব গ্রহণ করা৷ অর্থ ৰুঝে মন্ত্র জপ করলে মন্ত্রচৈতন্য বিধি সহজে নিষ্পন্ন হতে পারে৷ অর্থ না ৰুঝে জপক্রিয়া করা মানে সময়ের অপব্যবহার ছাড়া আর কিছুই নয়৷
উচ্চৈঃস্বরে পরমপুরুষের গুণগান করাকে কীর্তন ৰলা হয়৷ সংস্কৃতে ‘কীর্ত’ ধাতুটার মানে হল জোরে উচ্চারণ করা যাতে ধবনিটা অন্যের কর্ণে প্রবেশ করে৷ এইভাবে পরমপুরুষের গুণগান করাকে কীর্তন ৰলা হয়৷
এখন প্রশ্ণ হচ্ছে পরমপুরুষ তো কারও কীর্তনের অপেক্ষায় বসে থাকেন না৷ পরমপুরুষ তো কাউকে বলেন না কীর্তন কর৷ তাহলে কীর্তন মানুষ করে কেন, করবেই বা কেন? এর পেছনে যে বিজ্ঞানটা রয়েছে সেটা হচ্ছে এই মানুষ স্থূল থেকে সূক্ষ্মের দিকে যেতে চায়৷ জীবনের সর্বক্ষেত্রেই মানুষ স্থূলের মধ্যে সূক্ষ্মকে খোঁজে৷ আবার যে সূক্ষ্মটাকে পায় তার ভেতর থেকে সূক্ষ্মতরকে খোঁজে৷ এইভাবে এগিয়ে যায়৷
শিবের সময় উত্তর-পশ্চিম কোণ দিয়ে ভারতে আর্যদের আগমন শুরু হয়ে গেছল৷ অনেকেই এসেছিলেন, অনেকে আসছিলেন, অনেকে আবার আসবার জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন৷ যাঁরা এসেছিলেন তাঁদের সেই বৈদিক ভাষার প্রভাব তৎকালীন ভারতের ভূমিসন্তান ‘কশ, ‘সিথিয়ান’, ‘ইউ-চি’, ‘দক্ষিণ কুষাণ’’ প্রভৃতিদের কথ্য ভাষার ওপর ব্যাপকভাবে পড়েছিল৷ ভারতের তৎকালীন জনভাষা সংস্কৃতের ওপর বৈদিক ভাষার প্রভাবও অবশ্যই পড়েছিল৷ তবে সে প্রভাবটা একতরফা নয় অর্থাৎ সংস্কৃত ভাষার প্রভাবও বৈদিকে পড়েছিল৷
সূক্ষ্ম নন্দনতত্ত্বের ওপর আধারিত নান্দনিক অভীপ্সা যখন একটা নির্দিষ্ট উচ্চ মানে পৌঁছে যায় তাকে বলে মিষ্টিসিজম্৷ আর এই মিষ্টিসিজম্ যখন মানবীয় গরিমা মহিমার শীর্ষে বা শ্রেষ্ঠত্বের পর্যায়ে চলে আসে তাকে বলে আধ্যাত্মিকতা (spirituality) ৷ এখন মিষ্টিসিজম্ কী মিষ্টিসিজম্ হ’ল সীমার সঙ্গে অসীমের, ক্ষুদ্র ‘আমি’র সঙ্গে ৰৃহৎ ‘আমি’র বা আত্মার সঙ্গে পরমাত্মার সম্পর্ক নির্ণয়ের এক নিরন্তর প্রয়াস৷
নোতুন পৃথিবী সোসাইটির পক্ষ থেকে আচার্য মন্ত্রসিদ্ধানন্দ অবধূত কর্তৃক প্রকাশিত।
সম্পাদকঃ - আচার্য মন্ত্রসিদ্ধানন্দ অবধূত
Copyright © 2026 NATUN PRITHIVII SOCIETY - All rights reserved