Skip to header Skip to main navigation Skip to main content Skip to footer
CAPTCHA
This question is for testing whether or not you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

User account menu

  • My Contents
  • Log in
নোতুন পৃথিবী
সর্বাত্মক শোষণমুক্ত সমুন্নত সমাজ রচনার পথপ্রদর্শক

প্রধান মেনু

  • প্রথম পাতা
  • আধ্যাত্মিক প্রসঙ্গ
  • প্রাউট প্রবক্তার ভাষায়
  • সংবাদ দর্পণ
  • দেশে দেশে আনন্দমার্গ
  • সম্পাদকীয়
  • প্রবন্ধ
  • খেলা
  • নারীর মর্যাদা
  • ভাষা
  • স্বাস্থ্য
  • প্রভাতী
  • ইতিকথা

প্রভাতী

দানও নিলেন, দক্ষিণাও নিলেন

শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

একটি প্রাচীন ৰাংলা গানে ‘কোদণ্ড’ শব্দটি কোদাল অর্থে ব্যবহূত হয়েছিল৷ গানটি রচনা করেছিলেন সুবিখ্যাত পাঁচালী গায়ক দাশরথি রায়–সংক্ষেপে দাশু রায়৷ ৰাংলার এই জন্মসিদ্ধ প্রতিভা দাশু রায় কবিতায় কথা বলতে পারতেন......পারতেন গানেও কথা বলতে৷ সংস্কৃত শাস্ত্রেও ছিল তাঁর প্রচণ্ড দখল......আর প্রচণ্ড দখল ছিল যেমন ৰাংলায় তেমনি সংস্কৃতেও৷ তার সঙ্গে তিনি ছিলেন মজলিশী মেজাজের মানুষ৷ লোককে হাসাতে পারতেন দারুণ৷

সেই যে গল্প আছে না! দাশু রায় একবার ৰর্দ্ধমান জেলার একটা প্রকাণ্ড মাঠ পার হচ্ছিলেন৷ সেকালে ৰর্দ্ধমান জেলার গ্রামগুলি ছিল খুব ৰড় ৰড় আর দূরে দূরে অবস্থিত৷ এখনও দেখবে, ৰাংলার ৰড় ৰড় গ্রামগুলির বেশীর ভাগই ৰর্দ্ধমান জেলায়৷ সেকালের সেই মাঠে রাত্তিরে তো বটেই, এমনকি দিনে দুপুরেও লেঠেলরা ওৎ পেতে বসে থাকত রাহাজানির উদ্দেশ্যে৷ একবার দাশু রায় ওই ধরনের একটা ৰড় মাঠ পার হচ্ছিলেন৷ সন্ধে তখন হৰ–হৰ৷ দাশু রায় যাচ্ছিলেন একটা ৰড় ৰট গাছের পাশ দিয়ে৷ হঠাৎ গাছের ওপর থেকে লাফিয়ে নেৰে পড়ল কয়েকজন লেঠেল৷ তারা দাশু রায়কে ৰললে–তোমার কাছে যা কিছু আছে সৰ দিয়ে দাও৷

দাশু রায় ৰললেন–আমি গরীব ৰ্রাহ্মণ......আমি দান–টান ৰুঝি না......আমি পরিগ্রহ ৰুঝি৷ তোমাদের সঙ্গে যা কিছু আছে তোমরাই সে সৰ আমাকে দাও৷

ডাকাতরা পড়ল মহা ফ্যাসাদে৷ ৰামুণ দান চাইছেন৷ না দিয়েই বা থাকে কি করে! আবার এদিকে না কাড়লে ডাকাত হিসেবেই বা মান বাঁচে কী করে৷ তারা তখন দাশু রায়কে ৰললে–তোমাকে চিনেছি ঠাকুরমশায়, তুমি তো দাশু রায়৷ তা’ তুমি আমাদের একটা মজার কথা শোনাও৷ আমরা তাতে সন্তুষ্ট হয়ে তোমাকে ছেড়ে দোব৷

দাশু রায় ৰললেন–এ অবস্থায় কার ঠোঁটেই বা মজার কথা আসে ৰল! তা গাছের নীচে তো দেখছি তোমরা তিনটি মূর্ত্তিমান দাঁড়িয়ে আছ৷ তোমাদের আত্মীয়–স্বজন জ্ঞাতি–কুটুম্ব আর ক’জন ওই গাছের ওপরে হুপ্ হুপ্ করছে ৰল তো!

ডাকাতরা ৰুঝলে, দাশু রায় তাদের ৰাঁদর ৰলে গালি দিলেন৷ কিন্তু ৰলবার কিছুই ছিল না৷

দাশু রায় ৰললেন–কথা বেচে খাওয়াই আমার জীবিকা৷ আমার যে প্রাপ্য পূরণ তা দিয়ে দাও৷ ডাকাতরা তাদের যথাসর্বস্ব দাশু রায়কে পেণ্ণামী হিসেৰে দিয়ে দিলে৷

* * *

সেই দাশু রায় একৰার চুঁচড়োয় এসেছেন ৰ্রাহ্মণ পণ্ডিতদের সভায় পাঁচালী গাইতে৷ চুঁচড়ো তখন সংস্কৃত পণ্ডিতদের কেন্দ্র হিসেবে প্রসিদ্ধি অর্জন করেছিল (আর যে সকল স্থান সেকালের রাঢ়ে প্রসিদ্ধি অর্জন করেছিল তারা হ’ল ভাণ্ডারহাটি, ত্রিবেণী, দশঘরা, বাঁশৰেড়ে, জনাই, পেঁড়ো–বসন্তপুর, মাকড়দা, বালী, তমলুক, কাঁথি, মেদিনীপুর, সবঙ্গ, চন্দ্রকোণা, বিষ্ণুপুর, ইন্দাশ (বাঁকুড়া), সিমলাপাল, সোণামুখী, ৰর্দ্ধমান, কালনা, পূর্বস্থলী, কাটোয়া, কেতুগ্রাম, ইন্দাশ (বীরভূম), শিউরী, মলুটী, সর্পলেহনা, কঙ্কালীতলা, কুন্তলা, করীধ্যা (বীরভূম) প্রভৃতি স্থান৷ সেখানে রাঢ়ের বিভিন্ন স্থান থেকে ৰড় ৰড় পণ্ডিতরা এসেছেন....হচ্ছে দাশু রায়ের পাঁচালী গান৷ তিনি তাঁর গানের এক জায়গায় কোদাল অর্থে ‘কোদণ্ড’ শব্দটি ব্যবহার করলেন (গানের প্রথম লাইনটি ছিল ‘দোষ কারোর নয় গো মা’)৷ পণ্ডিতেরা একে অন্যের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন৷

তাঁরা ৰললেন–এ কী কথা! দাশু রায়ের মত পণ্ডিত মানুষ ‘কোদণ্ড’ শব্দটি ভুল অর্থে ব্যবহার করলেন! পাঁচালী গান হওয়ার পরে পণ্ডিতদের সভা বসল৷

তাঁরা বললেন–যদিও ‘কোদণ্ড’ শব্দটি কোদাল অর্থে চলে না কিন্তু দাশু রায়ের মত প্রখ্যাত পণ্ডিত ও প্রতিভাধর মানুষের সম্মান রক্ষার জন্যে আমাদের উচিত কোদাল অর্থে ‘কোদণ্ড’ শব্দটিকে মেনে নেওয়া৷ সংস্কৃতে এমন আর্ষ প্রয়োগের ঘটনা অজস্র রয়েছে৷ সুতরাং আরেকটি আর্ষ প্রয়োগ ৰাড়লই বা! তাই তখন থেকে ‘কোদাল’ অর্থেও ‘কোদণ্ড’ শব্দটি চলে আসছে৷

এই লব্ধপ্রতিষ্ঠ দাশু রায় ছিলেন বর্ধমান জেলার পূর্বস্থলীর নিকটবর্ত্তী চুপী গ্রামের সন্তান৷ কবি সত্যেন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষেরাও এই চুপী গ্রামের অধিবাসী ছিলেন৷ এখন তোমরাই বিচার বিবেচনা করে আমাকে জানাও তোমরা চুঁচড়োর পণ্ডিত সমাজের এই বার্ত্তিক মানতে রাজী আছো কি না অর্থাৎ কোদাল অর্থে ‘কোদণ্ড’ শব্দটি ব্যবহার করবে কি না৷ কোদালের নিজস্ব সংস্কৃত হচ্ছে ‘কুদ্দালিক’৷

 

দেব শিল্পী বিশ্বকর্মা

প্রণবকান্তি দাশগুপ্ত

বিশ্বকর্মা দেব শিল্পী৷ প্রভাস নামক বায়ুর ঔরসে তৎ পত্নী যোগ সিদ্ধার গর্ভে বিশ্বকর্মার জন্ম৷ বিশ্বকর্মা অর্থাৎ বিশ্ব হয়েছে যার কর্ম৷

বিশ্বকর্মা কারিগরি যন্ত্র শিল্প ও সর্বপ্রকার শিল্পকর্মের দেবতা৷ বিশ্বকর্মার শিল্পকীর্তি অসংখ্য৷ বিশ্বকর্মা শুধু শিল্পী নন তিনি স্থপতি ও রামায়ণে উল্লেখ আছে বিশ্বকর্মার লঙ্কাপুরী নির্মাণ করেছিলেন৷ বিশ্বকর্মার বানর পুত্র নল দারোকা পুরী নির্মাণ করেছিলেন৷ পিতার শক্তিতে শক্তিমান হয়ে সমুদ্রের ওপর সেতুবন্ধন করেছিলেন৷ সসৈন্য ভারতের আপ্যায়নের জন্য ভরদ্বাজ মুনি বিশ্বকর্মাকে দিয়ে গৃহ নির্মাণ করিয়েছিলেন৷

 কূর্ম পুরাণ মতে, সূর্যের সপ্ত রশ্মির অন্যতম বিশ্বকর্মা৷ গ্রীষ্ম শেষে যে সূর্য মেঘ তৈরি করে বৃষ্টিপাত ঘটিয়ে কর্মসম্পন্ন করেন তিনি বিশ্বকর্মা৷ বিশ্বকর্মা পুজোয় ঘুড়ি ওড়ানোর প্রথা আছে৷ তার কারণ ঘুড়ি ওড়ানোর সূর্য পূজারই একটা পদ্ধতি ঘুড়ি উড়িয়ে সূর্যকে বন্দনা করা হয়৷ ঘুড়ি ওড়ানো নিছক খেলা নয়৷

বর্ষান্তে ভাদ্র সংক্রান্তিতে বিশ্বকর্মা পূজা অনুষ্ঠিত হয়৷ ইন্দ্রপূজাও ভাদ্র মাসে৷ ইন্দ্র বৃষ্টির দেবতা৷ বিশ্বকর্মাও বর্ষার দেবতা৷ ভাদ্রের শেষে কৃষিকাজ শেষ হওয়ার পর কর্ষকদের ফসলের জন্য অপেক্ষা করতে হয়৷ সেই অবসরে ভাদ্র সংক্রান্তিতে তারা বিশ্বকর্মার প্রতি কৃতজ্ঞতা বসতঃ পুজো করে থাকে৷ ইন্দ্রের মতো বিশ্বকর্মারও বাহন ঐরাবত৷ ঐরাবত আসলে ঐরাবত সদৃশ মেঘ৷ তাই বিশ্বকর্মা শুধু শ্রমিকদেরই দেবতা নন, চাষীদেরও দেবতা৷

বিদেশেও বিশ্বকর্মা আছেন৷ গ্রীকদের বিশ্বকর্মা নাম হেফায়েস্‌তাস৷ হেফায়েস্‌তাস্‌ হেরার পুত্র৷ কদাকার কুৎসিত বদমেজাজীও হলেও তাঁর দেহে অসাধারণ শক্তি৷ আর শিল্পকর্ম সবই নিখুঁত৷ তিনি তার শিল্পকর্মে সহায়তার জন্য কতগুলি সোনার যান্ত্রিক স্ত্রীলোক সৃষ্টি করেছিলেন৷ তাঁর কারখানায় সোনার চাকা লাগানো তিনপাওয়ালা কতগুলি টেবিল ছিল৷ প্রয়োজনীয় দ্রব্যসম্ভার নিয়ে টেবিলগুলো দেবতাদের সভায় দ্রুত যাতায়াত করত৷ প্রাচীন গ্রিক মিশে প্রিয় রোবটে বাস্তবায়িত হয়েছে৷ গ্রীস দেশের মতো রোমেরও বিশ্বকর্মা আছেন৷ তার নাম ভালকান৷ উত্তর ও মধ্য ইউরোপের বিশ্বকর্মা হলেন থর৷

 

  • Log in to post comments

বিপ্লবী বীর উন্নত শির

কৌশিক খাটুয়া

নিরস্ত্র যতীনের মল্ল যুদ্ধে 

রয়েল বেঙ্গল কুপোকাত, 

শোণিত ধারায় রণ হুঙ্কার 

ব্রিটিশ উচ্ছেদের সূত্রপাত!

দেশজোড়া নাম বাঘা যতীন 

চেয়েছিল দেশ করতে স্বাধীন,

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে

 তার সশস্ত্র বিপ্লব,

স্বদেশ মুক্তির শুভ সূচনা 

অস্ত্র আমদানীর পরিকল্পনা 

যুব সমাজের কণ্ঠে ধবনিত 

 একই কলরব!

জার্মান থেকে অস্ত্র জাহাজ 

 বুড়িবালামের তীরে,

জানতে পেরে ব্রিটিশ সেনা 

 এলাকা নিল ঘিরে৷

 শুরু হলো তুমুল লড়াই

যে কোনো মূল্যে স্বাধীনতা চাই, 

দেশ মুক্তির মহান ব্রতে 

 যুদ্ধে অবতীর্ণ, 

দুঃসাহসিক অভিযানে 

 শত্রুকে করে বিদীর্ণ! 

সহযোদ্ধা যারা ছিল গুটিকয়--

 নাই সংশয় মৃত্যুর ভয়,

দেশের স্বার্থে অতন্দ্র প্রহরী 

 উদ্দীপনায় নাচিছে লহরী

 না জানি কখন কি হয়,

 মাতৃ-মুক্তির কঠিন শপথে 

 উদ্বেলিত হৃদয়!

অসম লড়াইয়ে জখম আহত

ঘাত-প্রতিঘাত চলে অবিরত! 

জন্মভূমির মুক্তিলক্ষ্যে

 লড়াই আমরণ৷

প্রাণবন্ত বঙ্গ-যুবক

 হাসপাতালের শয্যায়,

হাসিমুখে তার অকাল প্রয়াণ 

 স্বাধীনতা মহাদায়!

জন্মভূমির দৈন্য ঘুচাতে 

 করিল মৃত্যু বরণ! 

আজ পুনরায় ভারাক্রান্ত মনে

 সবিনয়ে করে স্মরণ৷

 

  • Log in to post comments

সততার সাধক

প্রণবকান্তি দাশগুপ্ত

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নাম তোমরা সকলেই শুনেছ তাই না! তিনি একটি পত্রিকার সম্পাদনা করতেন৷ পত্রিকাটির নাম ‘নারায়ণ’৷ তাতে লিখতেন তৎকালীন বড় বড় নামজাদা লেখকরা৷ একদিন এক খ্যাতনামা উপন্যাসিক ও সেই পত্রিকায় কয়েকটি মূল্যবান প্রবন্ধ লিখলেন৷ প্রবন্ধ গুলোর বিষয়বস্তু ছিল রাজনৈতিক৷ যেমন শিক্ষার বিরোধ মহাত্মাজী ইত্যাদি৷

নারায়ণ পত্রিকায় যারা লিখতেন দেশবন্ধু তাদের প্রত্যেককেই টাকা দিতেন৷ কিন্তু উপন্যাসিককে টাকা দিতে গিয়ে তিনি মহা মুশকিলে পড়লেন৷ অত উঁচু ধরে একজন উপন্যাসিককে কতগুলো শক্তিশালী লেখার জন্য ঠিক কত টাকা দেওয়া উচিত তা তিনি ঠিক করতে পারলেন না৷ কিছুদিন ভেবেচিন্তে অবশেষে তিনি এক অদ্ভুত কাজ করে বসলেন৷ টাকার ঘরটা শূন্য রেখে গোটা চেকটাই পাঠিয়ে দিলেন উপন্যাসিকের কাছে৷ উপন্যাসিক এবার ইচ্ছেমতো টাকার অংক বসিয়ে নিতে পারেন৷

চেকখানি হাতে পেয়ে যৎপরোনাস্তি বিস্মিত হলেন উপন্যাসিক৷ কত সরল মনে মানুষের প্রতি কতখানি বিশ্বাস নিয়ে দেশবন্ধু এ কাজ করলেন তা ভেবে তিনি সত্যিই মুগ্দ হলেন৷ পরমুহুর্তে আবার ভাবলেন এটাই তো স্বাভাবিক মানুষ মানুষকে তো বিশ্বাস করবেই৷

 যাইহোক, নির্দিষ্ট দিনে থেকে টাকার ঘরে ন্যায্য সংখ্যা বসিয়ে ব্যাঙ্কে গেলেন৷ চেক ভাঙানোর সময় দেখা হল এক বন্ধুর সঙ্গে৷ বন্ধু সবসময় জিজ্ঞেস করলেন তা যে কে তুমি কত টাকা লিখেছ?

উপন্যাসিক বলেন ১০০ টাকা৷

মাত্র৷ মুখ বেঁকিয়ে বন্ধুটি বললেন তুমি দেখছি নিতান্তই বেকুব৷ আরে দেশ বন্ধুর কি টাকার অভাব৷ কম করে ৫০০ টাকা লেখা উচিত ছিল৷

 উপন্যাসিক এবার একটু গম্ভীর হয়ে গেলেন৷ বললেন দেখো ৫০০ লিখলে চিত্তবাবুর থলির ওয়েট বিশেষ কিছুই কম তো না জানি, আর তাঁর চিত্তে এতোটুকুনি আঁচর পড়তো না৷ কিন্তু তাতে করে আমার চিত্তে যে কালি পড়তো তা মুঝবার উপায় তুমি আমায় বাৎলে দিতে পারো?

 বন্ধুটি নীরব৷ লজ্জায় মাথা হেঁট৷ কিছুক্ষণ পরে আমতা আমতা করে অন্য প্রসঙ্গ তুলে পালিয়ে গেলেন৷

 বলতো কে এই উপন্যাসিক? এই উপন্যাস কি হলেন আমাদের শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়৷ তোমরা কি পারবে না তাঁর মত এরকম সততার পরিচয় দিতে?

 

  • Log in to post comments

শ্রদ্ধেয় শিক্ষক

কৌশিক খাটুয়া

অঙ্কের শিক্ষক-----

করতেন বকবক,

না বুঝেই করতাম 

 বুঝবার ভান, 

ভুলে গেছি পাটিগণিত,

ভুলে গেছি ফর্মুলা,

গণিতে ব্যর্থ তাই

 চাপা অভিমান!

 নাম কেশব চন্দ্র নাগ,

তিন পুরুষের গণিত শিক্ষক 

ছিলনা কো কোনো রাগ,

ছাত্র-দরদী বলে স্কুলে পরিচিত,

অমায়িক বিনীত ভাব

মিতব্যয়ী সৎ স্বভাব৷ 

বুদ্ধিজীবি নামে সমাজে সুবিদিত!

 পাঞ্জাবি ধূতি পরণে,

 খড়ম চটি চরণে 

জীবন যাত্রা ছিল 

 সহজ সরল,

দায়বদ্ধ শিক্ষা দানে

 সাহস যোগাতেন মনে 

ছাত্রছাত্রীরা পায় তার 

 কাঙ্খিত ফল!

আজ তিনি কাছে নাই

 তবু তাঁর আছে ঠাঁই 

মনের মণিকোঠায় পরম শ্রদ্ধায়,

 আজীবন স্মরণীয় চিরকাল বরণীয় 

অসামান্য অবদান জীবনে প্রতিষ্ঠায়!

নানা কাজে ব্যস্ততায়----------

দিনটির গুরুত্ব বুঝে 

 আছে কিছু দায়

কৃতজ্ঞতায় ছাত্ররা শ্রদ্ধা জানাতে,

শিক্ষক দিবস আসে 

 একদিন বারো মাসে

তবু স্মরণীয় তিনি নিত্য প্রভাতে!

 

  • Log in to post comments

বিনা টিকিটে গঙ্গাস্নান

শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

প্রাচীনকালের মানুষ যাঁদের গঙ্গা–যমুনার উপর খুব শ্রদ্ধা–ভক্তি ছিল তাঁরা ভাবতেন ঈশ্বরের করুণাই অবস্থান্তর প্রাপ্ত হয়ে গঙ্গাধারার রূপ পরিগ্রহ করে থাকে! কারো গঙ্গাস্নানের আকর্ষণ কর্ত্তব্যের প্রেরণায়, কারো বা ধর্মোন্মাদনার প্রেষণায় কেউ বা গঙ্গাস্নান করেন ডগমা বা ভাবজড়তার বশবর্ত্তী হয়ে, আর কেউ বা পুরাণের কাহিনীকে গুরুত্ব দেন ৰলে৷ সত্যিই গঙ্গা ‘‘পতিত পাবনী’’! এ কথা ঠিকই যে গঙ্গা সুবিশাল আর্যাবর্ত্তের স্তন্যদাত্রী জননী৷ এও ঠিক যে নদীর বহমান ধারায় স্নান করলে তা শরীর মনকে স্নিগ্ধ করে৷ তবে গঙ্গাস্নানে কোন বিশেষ গুণ আছে কি না তা পণ্ডিতেরা বিচার করে দেখতে পারেন৷ তবে আপাতঃদৃষ্টিতে তেমন গুণ আছে ৰলে মনে হয় না কারণ মীন ও অজস্র জীবজন্তু গঙ্গায় স্নান করে থাকে, তাদের মল–মূত্র নিত্য গঙ্গায় পতিত হয়৷ তারা গঙ্গা স্নান করে কতটা বৈকুণ্ঠের কাছে পৌঁছোয় তা কেউই হলফ করে ৰলতে পারৰে না৷ তবে একথা ৰলৰ যে গঙ্গাস্নান হিসাবে মন্দ নয় যদি সেখানে জলৰিদূষণ না হয়ে থেকে থাকে৷ পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী বৈকুণ্ঠে নারায়ণের চরণোদক থেকে গঙ্গার উৎপত্তি৷ ৰাঙলার রাজা ভগীরথ তাঁর তপস্যার ৰলে গঙ্গাকে মর্ত্ত্যে আনয়ন করেন৷ আকাশ থেকে নীচে নাৰবার সময় গঙ্গার তোড়ে বসুন্ধরা যাতে বিদীর্ণা না হন তাই শিব তাঁকে জটায় আশ্রয় দিয়ে তাঁর গতিবেগ বা তোড় কমিয়ে দেন৷ কাহিনী অনুযায়ী গঙ্গা চতুর্ধারায় বিভক্ত হয়েছিল৷ তার একটি ধারা মর্ত্ত্যে চলে আসে ঃ

‘‘স্বর্গেতে অলকানন্দা মর্ত্ত্যে ভাগীরথী 

দেৰলোকেমন্দাকিনী পাতালে ভোগবতী৷’’

সুতরাং গঙ্গাস্নান মানে বিষ্ণুর চরণো দকে স্নান৷ এই ভেবে ভক্ত পুণ্যার্থী গঙ্গাস্নানে আকৃষ্ট হৰেন ৰৈ কি! তাঁরা গঙ্গাকে বিষ্ণুর করুণার বিগলিত রূপ হিসেবে ভাবৰেন ৰৈ কি! 

অন্য কাহিনী অনুযায়ী গঙ্গা শিবের পত্নী৷ শিবজায়া গঙ্গার জলবিধৌত হতে কোন্ শৈব, কোন্ শাক্ত না চাইৰেন! তাই গঙ্গা যে কেবল বৈকুণ্ঠনিবাসী নারায়ণের পাদোদক তাই নয় শাক্ত শৈবের কাছে গা পুণ্যতোয়া৷ 

‘‘হরিপাদপদ্মবিহারিণ্ 

গঙ্গে হিমবিধুমুক্তাধবলত্৷ 

      * * 

তব তটনিকটে যস্য নিবাসঃ 

খলু বৈকুণ্ঠে তস্য নিবাসমঃ৷ 

      * * 

ভাগীরথি সুখদায়িনি মাতস্তব 

জলমহিমা নিগমে খ্যাতঃ৷ 

      * * 

‘‘দেবি সুরেশ্বরি ভগবতি 

গঙ্গে ত্রিভুবনতারিণি তরলতরঙ্গে৷ 

শঙ্করমৌলিনিবাসিনি বিমলে, 

মম মতিরাস্তাং তব পদকমলে৷৷’’

      * * 

নাহং জানে তব মহিমানং, 

ত্রাহি কৃপাময়ি মামজ্ঞানম্৷’’

      * * 

সুতরাং সাধারণ মানুষই নয়, জ্ঞানী–গুণীরাও গঙ্গাকে ৰিগলিত করুণা হিসেৰে দেখেছিলেন৷ তাই গঙ্গা–মহিমাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া যায় না৷ অন্য নদীর সঙ্গে গঙ্গার গুণগত পার্থক্য খুব কম৷ বরং গঙ্গার তীরবর্ত্তী শিল্পকেন্দ্রগুলি যে পরিমাণ আবর্জনা গঙ্গাজলে নিক্ষেপ করে তাতে গঙ্গাস্নানে রোগ ৰৃদ্ধিও অৰশ্যই ঘটতে পারে৷ 

‘‘এক ডুৰ কাক ডুৰ দুই ডুৰ ৰ্যাঙ 

তিন ডুৰে শরীর টান চার ডুৰে 

গঙ্গা স্নান৷’’

‘‘জাহ্ণবী–যমুনা বিগলিত করুণা’’

ৰর্দ্ধমান জেলার ৰেশীর ভাগ অংশই অ–গঙ্গার দেশ, তাই দেখেছি গ্রামাঞ্চলের সাদামাঠা অনেক মানুষই ৰলে থাকেন মরণান্তে তাকে যেন তিরপুণী (ৰর্দ্ধমানের গ্রাম্য মানুষ ত্রিবেণীকে ‘তিরপুণী’ ৰলে৷ ৰর্দ্ধমানের গ্রাম্য ছড়ায় আছেঃ

‘‘চালভাজা খেতে খেতে গলা হয় কাঠ

হেথা কোথা জল পাৰ সেই তিরপুণির ঘাট

তিরপুণির ঘাটাতে বালি ঝুরঝুর করে

সোনার গায় রোদ লেগেছে ডালিম ফেটে পড়ে৷’’) 

ঘাটে দাহ করা হয়, 

ছাইগুলো যেন গঙ্গাজলেই শেষ আশ্রয় পায়৷ 

মনে পড়ে গেল আমার ছোট বয়সের পাড়াতুত এক ঠাকুমার কথা৷ ঠাকুমা রোজ ট্রেনে করে ছয় মাইল দূরবর্ত্তী গঙ্গায় ডুৰ দিয়ে আসতেন৷ অতি ভোরে বেরুতেন, ফেরবার সময় হাতে ছাপ, কপালে ছাপ, বুকে তিলক, নাকে রসকলি লাগিয়ে ফিরতেন৷ সবই করতেন.... কেবল করতেন না টিকিট৷ ইষ্টিশানে চেকারৰাৰু যখন হাত পেতে শুধোতেন –মা, আপনার টিকিটটা কোলকুঁজো ঠাকুমা বাঁ হাতটা উপরের দিকে কেৎরে দিয়ে ৰলতেন–আ মরণ মিনসের! ছেলে পেছনে রয়েছে দেখছ না! টিকিটটা তার হাতেই রয়েছে৷ 

চেকারৰাৰু কোন কোন দিন শুধু হাসতেন, কেবল ৰলতেন–মা, রোজই তো ৰলেন ছেলে পেছনে আসছে৷ কই, এক দিনও তো আপনার ছেলের টিকি দেখতে পাই না৷ 

ঠাকুমা একটু ঝাঁঝালো ভাষায় ৰলতেন–আমার ছেলে কি ভিনদেশী নাকি যে মাথায় টিকি রাখৰে! ৰাঙালী পোলা মাথায় টিকি রাখে না! মরণ....মিনসের মরণ! 

একদিন আমি ৰুকে ৰল নিয়ে সাহসে ভর দিয়ে শুধোলুম–হ্যাঁ গো ঠাকুমা, তুমি যে গঙ্গাস্নান করো, কষ্ট করো, তিলক–ছাপ, চন্দন–ছাপ, তিলক–মাটি লাগাও, সেই যে নাকে রসগোল্লা না কী একটা লাগাও এ তো পুণ্যি করা ঠিক, কিন্তু বিনা টিকিটে ট্রেন ভ্রমণ করায় সব পুণ্যি তো বরৰাদ হয়ে যাৰে....এ যেন সেই এক ভাঁড় গোদুগ্ধে এক ফোঁটা গোরোচনা৷

ঠাকুমা ৰললেন–খোকন, ওইখানেই তো ভুল করলি৷ বিনা টিকিটে ভ্রমণের পাপটার দিকে তাকিয়ে দেখলি কিন্তু গঙ্গাস্নানের পুণ্যিটার দিকে ভাল করে তাকালি না ৷ গঙ্গাস্নানে যে পরিমাণ পুণ্যি হয় বিনা টিকিটে ভ্রমণে সে তুলনায় পাপ একেবারেই অকিঞ্চিৎকর৷ তাই দু’য়ে যে গায়ে গায়ে শোধ হৰে তার জো নেই৷

‘‘একবার গঙ্গাস্নানে যত পাপ হৰে, 

পাপীদের সাধ্য নাই তত পাপ করে৷’’

(শব্দ চয়নিকা)

 

 

শিল্পীগুরু

প্রণবকান্তি দাশগুপ্ত

গুরু বাড়িতে এসেছে শিষ্য৷ হাতে এক খানা ছবি৷ সাগ্রহে গুরু হাত বাড়িয়ে বললেন, দেখি কেমন এঁকেছো?

শিষ্যগুরুর হাতে অসঙ্কোচে ছবিখানা তুলে দিল৷ গুরু ছবিখানা কিছুক্ষণ দেখেই নাক কুঁচকিয়ে বললেন, ব্যাক গ্রাউণ্ডের রঙ তো ঠিক হয়নি৷

কেমন হবে? সবিনয়ে জিজ্ঞেস করলো শিষ্য৷ ছবির ওপর দৃষ্টি রেখেই গুরু বললেন, একটু লালচে হলেই ভাল হতো৷

বেশ, তাই দেব৷ বলে বিদায় নিল শিষ্য৷ রাত হয়েছে অনেক৷ গুরু শুয়ে পড়লেন৷ কিন্তু চোখে ঘুম নেই৷ শিষ্যের আঁকা ছবিটা বার বার ভেসে ওঠে ন্যায্য বিচারের দাবি নিয়ে৷ ভাবতে থাকেন ছবিটা সম্পর্কে৷ ভাবতে ভাবতে বুঝতে পারলেন হঠাৎ শিষ্যের রঙটাই ঠিক হয়েছে৷ তিনি নিজেই ভুল নির্দেশ দিয়েছেন৷ তাহলে এখন উপায়? শিষ্য যদি তাঁর কথা মতো ছবির রঙ পাল্টে ফেলে, ছবিটা নষ্ট হয়ে যাবে৷ দুর্ভাবনায় ঘুম আসে না গুরুর৷

তখন অন্ধকার৷ সূর্য ওঠেনি৷ ভোর হয় হয়৷ গুরু হন হন করে ছুটলেন শিষ্যের বাড়ি৷ বাড়ি ঠিক নয়---মেসে৷ চার মাইল হেঁটে শিষ্যের মেসের দরজায় টোকা মারলেন৷

আচমকা ঘুম ভেঙে গেলো শিষ্যের৷ চেঁচিয়ে উঠলো কে? আমি৷

গুরুর উত্তেজিত কন্ঠস্বর শুণে তাড়াতাড়ি দরজা খুললো শিষ্য৷

হাঁপাতে হাঁপাতে গুরু জিজ্ঞেস করলেন, তোমার সেই ছবির ব্যাক গ্রাউণ্ডের রঙটা পাল্টে ফেলেছো?

না, কাল রাতে সময় পাইনি৷ আজ পাল্টে দেব৷ বলে ঘাড় নুইয়ে গুরুকে ভেতরে আহ্বান করলো শিষ্য৷

যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন গুরু৷ বললেন, যাক, আর পাল্টাতে হবে না৷ তোমার রঙটাই ঠিক হয়েছে৷ রঙটা ওরকমই হওয়া উচিত৷

শিস্যতো বিস্ময়ে হতবাক৷ এই না হলে গুরু৷ শিষ্যের মাথা লুটিয়ে পড়তে চাইল গুরুর পায়ে৷ শ্রদ্ধায় গদগদ স্বরে বললেন, এই বলার জন্যেই রাত না পোহাতে পাক্কা চার মাইল হেঁটে এসেছেন?

বলতো কে এই গুরুই হলেন ভারতের একনিষ্ঠ শিল্প-সাধক অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর৷ শিষ্যকেও তোমরা সবাই চেনো৷ শিষ্য হচ্ছেন নন্দলাল বসু৷ 

এবার এঁদের সম্পর্কে শ্রীপ্রভাতরঞ্জন সরকার কি বলেছেন শোণা যাক৷ তিনি বলেছেন---...রাঢ়ের পটুয়ারা পটশিল্পে তো প্রসিদ্ধিত অর্জন করেই ছিলেন তাঁদের অনেকে এই শিল্পটিকে লোকায়তের পরিভূ থেকে লোকোত্তরে ও উন্নীত করেছিলেন৷ তাঁদের ভাবনায় ও তাঁদের অঙ্গুলির সংযুক্ত মুন্সিয়ানায় গড়ে উঠেছিল রাঢ়ের ধ্রপদী চিত্রশিল্প৷ গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (অবণ ঠাকুর ছবি লেখেন), নন্দলাল বসু, সুরেন্দ্রনাথ কর--- এঁরা সবাই জন্মসূত্রে বা বংশধারা সূত্রে রাঢ়ী৷’’ (বাংলা ও বাঙালী)৷

 

 

  • Log in to post comments

ফুটপাত তুমি কার

কৌশিক খাটুয়া

পূর্বপ্রকাশিতের পর,

পথচারী ভবঘুরে -----------

তোমার ভাবনা ভাবার সময় 

 এখনও অনেক দূরে,

নির্বাচনের বিধির আওতা থেকে 

 তুমি গেছ কবে সরে!

জন্মসূত্রে দেশী ভবঘুরে, 

 এই তব পরিচয়,

কাজের স্বার্থে যখন তখন 

 ঠিকানা বদল হয়৷

কপাল লিখন মন্দ না হলে 

 নির্বাচনের পরে,

পুরপিতা-মাতা ত্যাজ্য সন্তানে

 যদি সে আপন করে!

 

ফুটপাতে জীবন ফুটপাতবাসী

স্টোনম্যান রাজা, পাগলের হাসি,

 দেবীপুত্রের বেদীর রচনা 

পীরের দরগায় আল্লা- ভজনা 

ফুটপাত ঘিরে চলে অর্চনা

 সাবাস বঙ্গবাসী!

 

রাজনৈতিক ধবজার দখলে ------

দলীয় কার্যালয়ে,

 নেতা নেত্রীরা ভাগ্য ফেরাতে 

 ছুটে আসে দলে দলে,

শীততাপ ঘরে নেতা নেত্রীর 

 কপট অশ্রু জলে,

ফুটপাতে মোরা রয়েছি সকলে 

 আপন ভাগ্য ফলে!

ঝুপড়িবাসীর অগগতি,

 সান্ত্বনা মনোবলে!

 

তবু জন-মানসের সতত প্রশ্ণ -----

 ফুটপাত তুমি কার?

চাপা কান্নার ইতিহাস হয়ে 

 রয়েছে নির্বিকার!

 

 

  • Log in to post comments

আফিমের মৌতাত

শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

‘ধস’ ধাতুর অর্থ হচ্ছে হত্যা করা, আঘাত করা, জখম করা, ঝরিয়ে দেওয়া৷ যে বস্তুটি আঘাত করে জখম করে তাকে ‘খস’ (খস্‌ + অচ্‌) বলা হয়৷

 কেউ যদি অত্যধিক পরিমাণে মদ গেলে তাহলে তার যকৃৎ জখম হয়ে যায়৷ তেমনি কিছু কিছু এমন বস্তুও আছে যারা স্নায়ুকোষকে ঝিমিয়ে দেয় ও দীর্ঘকাল ধরে এই ঝিমুনির জের চলতে চলতে শেষে স্নায়ুকোষ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে৷ স্নায়ু (নার্ভ সেল) আর কাজ করে না....বিহ্বল দৃষ্টিতে তখন ফ্যালফ্যাল করে চাইতে থাকে৷ চিন্তার প্রাখর্য তো থাকেই না, চিন্তার সামর্থ্যও শেষ হয়ে যায়৷ এই ধরণের ঘটনাটি ঘটে দীর্ঘ দিন ধরে অতিরিক্ত পরিমাণে সিদ্ধি, গাঁজা, চণ্ডু, চরস ও আফিং খেলে৷ মর্ফিন (মর্ফিয়া) ঘটিত বস্তুতে এই জঘন্য গুণ রয়েছে৷ স্নায়ুকোষ যাতে রোগগ্রস্ত না হয় সেইজন্যে গাঁজাখোর, আফিংখোররা বেশী মাত্রায় দুগ্ধ পান করে থাকে৷ তাতেও ঠ্যালা সামলানো দায় হয়৷ শেষ পর্যন্ত মানুষ জড় হয়ে যায়৷ মদ্যপানে মানুষ জড় হয় না–অতিরিক্ত উত্তেজনা জাগে৷ 

     মদ্য একটি অতি উত্তেজক বস্তু৷ উত্তেজক হলেও কফি কোকো–চা অল্পমাত্রায় উত্তেজক৷ তাই তারা বড় রকমের ক্ষতি করতে পারে না৷ তবে স্নায়ুর সাময়িক উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ায় ওই বস্তুগুলি পান বা গ্রহণ করলে ক্ষুধামান্দ্য দেখা দেয়৷ আর আফিং, গাঁজা, চণ্ডু, চরস এরা ঘটায় উল্টোটা৷ উত্তেজনার বদলে আনে অবসন্নতা৷ এই অবসন্নতা শেষ পর্যন্ত মানুষকে জড়ত্বে পর্যবসিত করে৷ একটা ভুল ধারণা আছে যে আফিম খেলে বুঝি পেটের রোগ সারে৷ কথাটা ডাহা মিথ্যা৷ আফিংখোর নেশার ঘোরে ভাবে এতে বুুঝি তার পেটের রোগ সারছে৷ একবার একটা ঘটনা হয়েছিল৷ এক ট্রেনে এক সাধুবাবা যাচ্ছেন.... যাচ্ছেন হিমালয় থেকে কন্যাকুমারী৷ ট্রেনের অন্যান্য সহযাত্রীদের সঙ্গে বেশ ভাল ভাল কথা বলতে বলতে যাচ্ছেন৷ হঠাৎ সন্ধ্যের দিকে সাধুবাবা ছটফট করে উঠলেন৷ সবাই শুধোলেন, ‘‘ক্যা হুয়া, ক্যা হুয়া, সাধুবাবা৷ 

সাধুবাবা বললেন–‘‘মাথা ঘুরছে’’৷

সবাই শুধোলে–‘‘ক্যা হুয়া, ক্যা হুয়া, ক্যা হুয়া–হুক্কা হুয়া, হুক্কা হুয়া, হুক্কা হুয়া৷

সাধুবাবা জানালেন, তিনি সঙ্গে আফিমের ডিবেটি আনতে ভুলে গেছেন৷ এই সময় তিনি একটু আফিং সেবন করেন৷ সহযাত্রী ছিলেন জনৈক কলকাতার বাবু৷ তিনি বললেন ‘‘একটু অপেক্ষা করুন সাধুবাবা৷ হয়তো বা আমি একটু আফিং যোগাড় করতে পারব’ খন’’৷ 

বাবুটি পরের ইষ্টিশনে নেবে গেলেন৷ প্লাটফর্মের নীচের দিক থেকে একটু আফিং রঙের ভিজে মাটি তুলে এনে গুলি পাকিয়ে সাধুবাবাকে হাঁ করতে বললেন৷ বাবুটি সেই গুলি সাধুবাবার মুখে ছুঁড়ে ঢুকিয়ে দিলেন৷ খানিক বাদে সাধুবাবা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলেন৷ তাঁর মাথা ঘোরাও বন্ধ হয়ে গেল৷ তিনি আবার গল্পগুজৰ জুড়ে দিলেন৷ 

কথা প্রসঙ্গে এও বললেন–দেখলেন তো আফিংয়ের গুণ৷ সামান্য একটু খেলুম৷ তাতেই মাথা ধরা সেরে গেল৷ 

সাধুবাবা খানিকক্ষণের জন্যে গাড়ীর বাথরুমে গেলে কলকাতার বাবুটি অন্যান্য সহযাত্রীদের বললেন–আমি প্ল্যাটফর্মের নীচের থেকে ভিজে মাটির গুলি পাকিয়ে সাধুবাবার মুখে ছুঁড়ে দিলুম৷ তাতেই তাঁর রোগ সেরে গেল৷ আফিংয়ে রোগ সারে সেটা কেবল একটা মানসিক কল্পনা মাত্র৷ আফিং অবসাদ আনে৷ সেই অবসাদের আসা বা অবসন্নতায় যাওয়াটা নেশাগ্রস্ততা ছাড়া কিছুই নয়৷ আমি আরও লক্ষ্য করেছি, ওই যে গুলিটা আমি সাধুবাবার মুখে ছুঁড়ে ঢুকিয়ে দিলুম সেটা মুখের ভেতরও যায়নি৷ সাধুবাবার দাড়িতেই আটকে গেছে৷ অর্থাৎ আফিংয়ের নেশার চেয়ে অবসন্ন হতে চাওয়াটাই নেশা৷ এককালে এই আফিং–গ্রস্ত হয়ে চীন ধবংস হতে বসেছিল....এককালে আফিমের নেশায় অসমও ধবংস হয়ে যেতে বসেছিল৷ তাই আফিংয়ের নেশা থেকে সাবধান৷

শুণেছি ভারতের কোন একটি তীর্থে–তীর্থটিকে পক্ষীতীর্থ বলা হয়–সেই তীর্থের পুরোহিত একটি নির্দিষ্ট সময়ে পাহাড়ের ওপর দেবতার প্রসাদ এক থালা রেখে দিয়ে আসেন৷ আর শকুনি জাতীয় কয়েকটি পক্ষী সেই নির্দিষ্ট সময়ে সেই প্রসাদ ভক্ষণ করতে আসে ৷ এই অপরূপ অলৌকিক দৃশ্য দেখবার জন্যে তীর্থে অনেক যাত্রী–সমাগম হয়ে থাকে৷ আমি মনে করি, আসল ব্যাপারটি হচ্ছে ওই তথাকথিত প্রসাদের সঙ্গে কিছুটা আফিং মেশানো হয়৷ ওই আফিংমের নেশায় গ্রস্ত হয়ে পাখীরা নির্দিষ্ট সময়ে এসে ওই আফিং–মেশানো প্রসাদ খেয়ে অবসন্নতাকেই ডেকে আনতে চায়৷ 

একবার শোণা গেছিল যে কোন একটি হোটেলে বা রেস্তরাঁয় চা খাবার জন্যে কলেজের ছেলেদের ভীড় লেগে যেত৷ খোঁজ নিয়ে হয়তো দেখা যেত যে সেখানেও হয়তো এই পক্ষীতীর্থের মত ঘটনাই অলক্ষ্যে ঘটে চলেছে৷ 

আফিংয়ের বিষ সাপের ফেনার মতই হানিকারক৷ সাপের বিষ থেকে এ্যালোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি ও আয়ুর্বেদের ঔষধ তৈরী হয় ঠিকই, তেমনি আফিং থেকে মর্ফিন/মর্ফিয়া ইন্জেকশনও তৈরি হয়৷ তবে ঔষধ তৈরি হয় বলেই স্বাভাবিকভাবে নেশার ঝোঁকে যাবার আশায় মর্ফিয়া ইনজেক্শান নেবে এটা তো সমর্থন করা যায় না৷ ‘অহিফেন’ শব্দের অর্থ সাপের ফেনা৷ মনে রেখো, ফেন বা ফেনা বানানে ‘ন’ ও ‘ণ’ দুই–ই চলবে৷ অহিফেন থেকে ‘অহিফাম’–শব্দ এসেছে আর ‘অহিফাম’ থেকে এসেছে ইংরাজী ‘ওপিয়াম’ (Opium) শব্দটি৷  

 

 

ঝুলন যাত্রা

প্রণবকান্তি দাশগুপ্ত

 প্রাচীন বাংলায় হোলি উৎসব যেভাবে হত তার অনেক বিবর্তন ঘটেছে৷ হোলি কৃষি সমাজের পুজো৷ শস্য উৎপাদনের কামনায় ছিল হোলি উৎসবের লক্ষ্য৷ দ্বাদশ শতকের আগে বাঙলা থেকে এই উৎসবে নরবলি দেয়া হতো৷ পরে নরবলি বন্ধ হয়ে পশুবলি ও হোম যজ্ঞ প্রচলিত হয়৷ এই হোলির সঙ্গে রাধা কৃষ্ণ ঝুলন ও আবীর কুমকুম এর খেলা ও একসময় অনুষ্ঠিত হতো৷ প্রথম ঝুলন উৎসবের কথা শোনা যায় খ্রীষ্টপূর্ব দ্বিতীয় তৃতীয় শতকে রামগড় গুহার লিপির মাধ্যমে৷ কিন্তু সেই ঝুলন রাধাকৃষ্ণের ছিল না, ছিল মানুষের৷ সেই ঝুলনে নর নারী উভয়ই দোলা খেত৷ অবশ্য শিশুরাই বেশিক্ষণ সেই দোলনা অধিকার করে রাখতো৷ কালক্রমে মানব শিশুর জায়গায় স্থান পেল বাল গোপাল৷ বালগোপাল কে দোলা দিত মা যশোদা৷ পরবর্তী পর্বে বালগোপাল উত্তীর্ণ হল ভগবান শ্রীকৃষ্ণ৷ সেই থেকে পরমপুর শ্রীকৃষ্ণ আর রাধার ঝুলন লীলা আজও বাঙলা তথা সারা ভারতে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে৷ আজকাল অবশ্য আমরা রাধাকৃষ্ণের সাথে আরো নানারকম পুতুল ও সাজসজ্জার মাধ্যমে ঝুলনকে আকর্ষণীয় করার চেষ্টা করি৷

কৃষ্ণলীলা কে কেন্দ্র করে যে দুটি উৎসব প্রচলিত আছে তা হলো দোলযাত্রা ও ঝুলন যাত্রা৷ ভারতের বহু উৎসবের মতো এই উৎসব দুটিতেও সূর্যলীলার প্রকাশ ঘটেছে৷ সূর্যের গতিবিধির প্রতি লক্ষ্য রেখেই দোল আর ঝুলনকে উৎসব না বলে যাত্রা বলা হয়েছে৷ যাত্রা মানে গমন, সূর্যের উত্তরায়নের শুরুতে হয় দোলযাত্রা৷ আর শ্রাবণী পূর্ণিমার সূর্যের দক্ষিণায়ন৷ সেদিন শ্রীকৃষ্ণের ঝুলন অর্থাৎ দোলন৷ ঝুলন দোলযাত্রার অঙ্গ৷ শ্রী যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধির মতে দোলযাত্রা একটি নয়, বছরে দুটি, একটি নাম দোল, অপরটির নাম ঝুলন৷ সূর্যরূপ বিষ্ণু বৎসরে দুইবার দোলনায় আরোহন করেন৷

 

 

  • Log in to post comments
Powered by Drupal

নোতুন পৃথিবী সোসাইটির পক্ষ থেকে আচার্য প্রসূনানন্দ অবধূত কর্তৃক প্রকাশিত।

সম্পাদকঃ - আচার্য প্রসূনানন্দ অবধূত

Copyright © 2026 NATUN PRITHIVII SOCIETY - All rights reserved