গাজনে মড়া খেলা
‘গাজন’ শব্দের উৎপত্তি প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীআনন্দমূর্ত্তি বলেছেন---‘সারা বছর ধরে নানান জনের সঙ্গে নানান্ কথাই তো বলছি---জাগতিক কাজ করছি, ধান-চালের কথা বলছি পটোলের দর, বেগুনের দর নিয়ে চর্চা করছি৷ অন্ততঃ একদিন প্রাণভরে চীৎকার করে শিবের নামে গর্জন করি, ‘শিব হে’ বলে মানুষকে আহ্বানকারী গর্জন প্রাকৃতে ‘গজ্জন’ বর্তমান বাংলায় ‘গাজন’৷
এককালে চৈত্রমাসের গাজন ছিল বাংলার একটি জনপ্রিয় উৎসব৷ গাজনের নায়ক হচ্ছেন শিব৷ ভূত প্রেত নিয়ে শিব শ্মশানে থাকেন৷ তাই তাঁর উৎসবে একটু ভৌতিক ব্যাপার স্যাপার থাকবে---এ আর আশ্চর্য কি৷ এমনি ধারণা লোকের৷
এখন গাজন উৎসব অনেক পরিচ্ছন্ন হয়েছে৷ সেকালের মতো গাজনে মড়া খেলার অনুষ্ঠান আর হয় না৷ গাজনের সন্ন্যাসীরা আচার-আচরণের দিক দিয়ে নানা শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল৷ কেউ পিশাচের বেশে মৃত নরদেহ নিয়ে নৃত্য করতো৷ এই অনুষ্ঠানটিকে বলা হতো মড়া খেলা৷ কেউ বা আবার ডাকিনী সাজতো৷ পরণে লাল কাপড়, গলায় ফুলের মালা, গায়ে রূপোর গয়না, মাথায় লম্বা লম্বা চুল, মুখে আবিরের প্রলেপ আর হাতে বেত নিয়ে বিকট চিৎকার করে নেচে নেচে বেড়াতো৷ অনেকে আবার আবীরের বদলে মুখোশ পরে নাচতো৷
মড়া খেলা হতো উৎসবের দিন শেষ রাতে৷ অবিরাম ঢাকের আওয়াজ, ধূপের ধোঁয়া আর ভক্তদের ভৌতিক গর্জনে গা ছমছমানি ভাব৷ হঠাৎ আস্ত মড়া কাঁধে নিয়ে ভক্তরা নাচতে শুরু করতো৷ অনেকে গলিত শব নিয়েও নাচতো৷ যে যত বেশী শব সংগ্রহ করতে পারতো তার তত কৃতিত্ব৷ অন্যথায় মড়ার মাথা নিয়েই নাচ শুরু করতো৷ বর্দ্ধমানের কুড়মুনের গাজনেও সন্ন্যাসীরা নরমুণ্ড নিয়ে নাচতো৷ না শেষ হলে ভক্তরা শবের গায়ে আবির মাখাতো, শবকে আদর করতো৷ তারপর ঢাক বেজে উঠলেই ভক্তরা শবের চারদিক ঘিরে নেচে নেচে মন্ত্র পড়ত আর গান করতো---
শ্মশানে গিয়েছিলাম মশানে গিয়েছিলাম
সঙ্গে গিয়েছিল কে?
কার্ত্তিক গণেশ দুই ভাই
সঙ্গে সেজেছে৷৷
১২৮৮ সনে স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য সরকারী আদেশে শব আর নরমুণ্ডসহ নাচ বন্ধ হয়ে যায়৷ ইদানিং নরমুণ্ডের বদলে নারকেল নিয়ে নাচ হতে দেখা যায়৷
বাংলার গাজনে এই মড়া খেলার সূচনা কিভাবে হল? তিববতে লামাদের মধ্যে এধরণের মড়াখেলার প্রচলন আছে৷ ওয়াডেল সাহেবের বিবরণ অনুযায়ী তিববত, নেপাল ও ভুটান প্রভৃতি অঞ্চল থেকে এই মড়া খেলা অনুষ্ঠানের প্রেরণা আসতে পারে৷ আবার অনেক পণ্ডিতের মতে না, এই অনুষ্ঠান তিববত থেকে আমদানি হয়নি৷ তাঁদের মতে, ইন্দো-মঙ্গোল সংস্কৃতির মিশ্রণ বাংলার সংস্কৃতির ওপর যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছে৷ এরকম কোন মিশ্রণের ফল হতে পারে এই ‘মড়া খেলা’ অনুষ্ঠান৷ আবার এমনও ভান হয়, বাঙলার একেবারে নিজস্ব সাংস্কৃতিক জমিতেই এই ‘মড়া খেলা’ অনুষ্ঠানের জন্ম৷
- Log in to post comments