‘আনন্দমার্গ যোগ’-এর মৌলিকত্ব ও অভিনবত্ব

লেখক
প্রফুল্ল কুমার মাহাতো

বর্ত্তমান কর্মব্যস্ততা ও উন্মার্গগামিতার যুগে যোগের প্রয়োজনীয়তা,উপযোগিতা ও উপকারিতার কথা বিবেচনা করে সম্প্রতি ২১ শে জুন তারিখটি আন্তর্জাতিক যোগদিবসরূপে ঘোষণা করা হয়েছে ও গুরুত্ব সহকারে এই দিনটি যোগাসন অভ্যাসের মাধ্যমে উদ্যাপন করার ব্যাপক প্রয়াস ও প্রচেষ্টা চালানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে৷  ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্রমোদী মহোদয়ও এর গুরুত্ব অনুধাবন  করে দেশব্যাপী যোগাভ্যাসের ব্যবস্থা করার নির্দ্দেশ দিয়েছেন৷ এমনও গুঞ্জনে শোণা যাচ্ছে যোগবিষয়টি ছাত্রছাত্রাদের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়াস চালানো হচ্ছে৷ এহেন  উদ্যোগ নি:সন্দেহে প্রশংসনীয়৷

যাইহোক, যোগের সার্বিক ইতিবৃত্ত আমাদের জানা অত্যন্ত প্রয়োজন৷ স্মরণাতীত  কাল থেকে ভারতের মুনি ঋষিগণ তাঁদের ধ্যানলদ্ধ অভিজ্ঞান, গবেষণা ও পরীক্ষা নিরীক্ষার দ্বারা অসংখ্য যোগাসন, প্রাণায়াম ও মুদ্রার আবিস্কার করেছেন৷ সেদিক  থেকে বিবেচনা করলে অন্যান্য সব কিছুর  মত ভারতের পূণ্যভূমিই হচ্ছে যোগ সাধনার পীঠস্থান৷ তাঁরা  বিভিন্ন প্রাণী অর্র্থৎ জীবজন্তুর দেহগঠন ও অঙ্গভঙ্গির সঙ্গে সাযুয্য অনুযায়ী প্রতিটি আসনের নামকরণ করে দিয়েছেন৷ তাঁদের  এসবের  উদ্দেশ্যে  হচ্ছে---আত্মমোক্ষার্থং জগদ্ধিতায় চ’ --- যা আনন্দমার্গের মহান  প্রবর্তক শ্রীশ্রী আনন্দমূর্ত্তিজী তাঁর বিশ্বব্যাপী মিশনের মর্মবাণী রূপে গ্রহণ করেছেন ও ব্যাপকভাবে প্রচার ও প্রচারের ব্যবস্থা করেছেন৷

যাইহোক, বর্ত্তমানকালে বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠন যোগের  পসরা  নিয়ে মানব সমাজের হিতসাধনের প্রয়াস চালিয়ে  যাচ্ছে৷ এদের  এহেন প্রয়াসকে প্রসংশা করা দরকার ও সাধুবাদ জানানো প্রয়োজন৷ কিন্তু শ্রীশ্রী আনন্দমূর্ত্তিজী প্রর্বতিত আনন্দমার্গের যোগশিক্ষার‘‘যোগের সঙ্গে অন্যান্য সংস্থা ও সংগঠনের যোগশিক্ষার মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে৷ বিশেষত্ব ও মৌলকত্ব-এর দিক  থেকে আনন্দমার্গের ‘‘যোগ’’ অভিনব অনন্য, ও সুগভীর৷ বর্ত্তমানে, এই  প্রবন্ধে এ অভিনবত্ব তুলে ধরার চেষ্টা করেছি৷

মানবজীবন মূলতঃ ত্রি-স্তরীয় ৷ শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক উপকরণ ও উপাদান নিয়েই মানুষের  জীবন৷ এখানেই মানুষের মহত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব৷ মনুষ্যেতর জীব-জন্তুর থেকে মানবজীবনের এখানেই পার্থক্য৷ শ্রীশ্রী আনন্দমূর্ত্তিজীর নির্র্বচিত ৪২টি আসনের মাধ্যমে মানুষের  ত্রি-স্তরীয় সার্বিক বিকাশ ও উধর্বগতির পক্ষে যথেষ্ট৷ তবে প্রসঙ্গত স্মরণীয় একজন মানুষের সুস্থ থাকার জন্যে ও সার্বিক বিকাশের জন্য ৪২ টি আসনের সবগুলি  অভ্যাস করার  কোন প্রয়োজন নেই৷  ব্যষ্টি বিশেষের  ক্ষেত্রে  তার শারীরিক, মানসিক  প্রয়োজন অনুযায়ী ৪-৫টি যোগাসন  প্রতিদিন নির্দ্দিষ্ট সময়ে  অভ্যাস করলে সর্র্বঙ্গীন সুফল পাওয়া যায়৷ এই ৪-৫টি আসন কার জন্য কোনটি কোনটি হবে তা নির্র্ধরণ করবেন আনন্দমার্গের  যোগাচার্য অবধূতগণ বা যোগাচার্র্য অবধূতিকাগণ৷ হোমিওপ্যাথিক, এলোপ্যাথিক, আয়ূর্বেদিক ডাক্তারগণ যেমন রোগীর রোগের  লক্ষণ ও রোগীর প্রয়োজন মত ওষুধ নির্র্বচন করে দেন৷ ওষুধের দোকানের সব ওষুধ প্রেসক্রাইব করেন না৷ তেমনি যোগাচার্যগণ ব্যষ্টির প্রয়োজন মত আসন, প্রাণায়াম নির্র্ধরণ করে দেন৷ প্রসঙ্গত স্মরণ রাখতে হবে আচার্যদের পরামর্শ ছাড়া, শুধু বই পড়ে বা অন্যের অনুকরণ করে কখনই আসন অভ্যাস করা উচিত নয়৷ কারণ তাতে ক্ষতির সম্ভাবনাই  বেশী থাকে৷

যোগাসন সবসময় সহজ, সরল বা  সহজসাধ্য হওয়া দরকার৷ এখানে যোগ, প্রাণায়াম, মুদ্রার সঙ্গে কষ্ট সাপেক্ষ ব্যায়ামের পার্থক্য৷ প্রসঙ্গত স্মরণীয় যে, যোগাসন করার সময় চিন্তানক্রিয়ার অর্র্থৎ মনন ক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে৷  যখন যে আসনটি  করা হবে , তখন সেই  আসনের উপকারিতার  কথা মনে রাখতে হবে৷  উচাটন বা উদ্বিগ্ণ  মন নিয়ে আসন করা অনুচিত৷ কারণ মনের চিন্তার রেশ শরীরের বিভিন্ন স্নায়ুগ্রন্থি থেকে অনুরূপ গ্রন্থিরস বা হরমোন নিসৃত করে৷ আনন্দমার্গ তার জন্ম লগ্ণ থেকেই এইসব কথা চিন্তা-ভাবনা করে আসন প্রাণায়ামের সঙ্গে ধ্যান-ধারণার করা   হচ্ছে৷ আনন্দমার্গের প্রবর্তক আনন্দমূর্ত্তিজী কর্ত্তৃক রচিত চর্যাচর্যের  তৃতীয় খন্ডে এ ব্যাপারে বিস্তৃত বিবরণ দেওয়া আছে৷ তাছাড়া মানবজাতীর  কল্যাণের জন্য মহান দার্শনিক শ্রীশ্রী আনন্দমূর্ত্তিজী ‘‘যোগবলে রোগারোগ্য’’গ্রন্থ লিখেছেন৷ অন্যন্যসাধারণ  সুমহান যোগাচার্য  শ্রীশ্রী আনন্দমূর্ত্তিজী বলেছেন যোগ  মানে কখনই সংযোগ বা গণিতের এ্যডিশান নয়, যোগ হচ্ছে--- বিশেষরূপে সংমিশ্রন অর্র্থৎ ইউনিফিকেশন৷  যেমন চিনির সঙ্গে লবণের মিশ্রন হচ্ছে গাণিতিক অর্থে যোগ৷  কিন্তু চিনির সঙ্গে জলের মিশ্রন হচ্ছে বিশেষ যোগ৷ দুটি বস্তু এখানে মিশে একাকার হয়ে যায়৷ আনন্দমার্গ যোগ বলতে শুধু, ইউনিফিকেশন-এর কথাই বুঝায়৷ আনন্দমার্গ যোগসাধনা বা যোগাভ্যাসের মাধ্যমে মানুষের অনুমন বা অনুচৈতন্য  ও ভূমামন বা ভূমাচৈতন্যের  মহামিলনের কথা প্রচার করে আসছে৷ অর্র্থৎ জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলন ঘটানোই হচ্ছে আনন্দমার্গের যোগ’-এর বিশেষত্ব৷ যা অন্য কোন সংস্থা বা সংঘটনের মধ্যে পরিলক্ষিত হয় না৷  মহামিলনের এই ‘‘যোগ’’ই হচ্ছে মানবজীবনের চরম লক্ষ্য ও পরম সার্থকতা৷ তাই আনন্দমার্গ যোগ হল শ্রীশ্রী আনন্দমূর্ত্তিজী প্রবর্তিত  একটি স্বাস্থ্যকর, আনন্দপূর্ণ জীবন, উজ্বল স্বাস্থ্য, অন্তর্লোকের  সমম্বয় আর সত্যিকারের  সুখ ও অনাবিল অফুরন্ত আনন্দ লাভের একটি সম্পূর্ণ মৌলিক পথ৷ এই যোগাসন আমাদের শরীরের  ভেতরের এন্ডোক্রিন গ্রন্থি থেকে হরমোন ক্ষরণের মাত্রা বাড়ায়৷  এই ভাবে আসনগুলি আমাদের অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করে, শরীরের বৃদ্ধি ঘটায় ও  মনের  অস্বাস্থ্যকর আবেগ গুলিকে নিয়ন্ত্রণ করে৷ এইভাবে আনন্দমার্গের যোগ দৈহিক স্বাস্থ্য, মানসিক ভারসাম্য ও আত্মার অন্তর্লোকের আনন্দলাভ করার স্বাভাবিক ও প্রাচীন পথ৷

যুগাবতার শ্রীশ্রী আনন্দমূর্ত্তিজী সর্বরোগের ৷ এই যোগাভ্যাসের নিয়মগুলিরও সুষ্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন৷ যেমন আসন করার আগে ব্যাপক শৌচ করতে হবে৷ মনকেস্থির ও শান্ত রাখতে হবে৷ খোলা জায়গায় বা ধোঁয়াপূর্ণ স্থানে আসন করা অনুচিত৷ পুরুষেরা আসনের সময় কৌপিন পরে রবে৷ কম্বল বা মাদুরের উপর আসন করতে হবে৷ বাম নাসারন্ধে  শ্বাস-চলা কালীন আসন করতে হবে৷ আসন করার পর বিধিসম্মত মালিশ করতে হবে৷ খালি পেটে দুবেলা আসন করতে হবে৷  আসন করার অব্যবহিত পরে জল স্পর্শ করা চলবে না৷ আসনের ঠিক পরে পরেই প্রাণায়াম করা উচিত নয়৷ আর আসন অভ্যাসকারীকে সাত্ত্বিক আহার করতে হবে৷ শ্বাস প্রশ্বাসের সময় অনুকূল মননক্রিয়া করতে হবে৷

বর্ত্তমান সমাজে বেশীরভাগ মানুষ যোগাসনের মাধ্যমে আত্মবিকাশের  চেষ্টা না করার ফলে তাদের জীবন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হচ্ছে৷ অনেকের সম্ভাবনায়  প্রতিভার ষ্ফুরণ না হওয়ার জন্য তাদের প্রতিভার  ষ্ফুটনোন্মুখ ফুলের কঁুড়ি অকালে ঝরে পড়ছে৷ অনেকে এজন্য মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে আত্মহত্যা করছে৷ আবার অনেকে মানসিক ষ্ট্রেসের কারণে আত্মহত্যা করছে৷ এক কথায় নিয়মমত অত্যাবশকীয় আসন অভ্যাস না করার জন্য সমাজের মানুষ তার মহা মূল্যবান মানবজীবনকে ব্যর্থতার করাল গ্রাসে নিমজ্জিত করে দিচ্ছে৷

তাই  পরিশেষে বলি আনন্দমার্গের যোগাসন ও যোগসাধনার  উপকারিতা, উপযোগিতা অপরিসীম৷ আনন্দমার্গের  যোগাভ্যাসে শরীর  ও মন সুন্দর, সুস্থ, প্রাণরসে পরিপূর্ণ হয়ে উঠে৷  এরফলে সুস্থ, সবল, কর্মক্ষম নাগরিকদের নিয়ে  পরিবার  ও সমাজও সুস্থ, শান্তিপূর্ণ ও আনন্দময় হয়ে উঠে৷ আনন্দমার্গের যোগের ফলে মানুষের মধ্যে সাধনা ও সেবার মনোভাব গড়ে ওঠে৷  জগদগুরু শ্রীশ্রী আনন্দমূর্ত্তিজী উদাত্ত কন্ঠে সকলকে আহ্বান জানিয়ে সকল মানুষকে বলেছেন, ‘‘সাধনার দ্বারা, সেবার দ্বারা ও ত্যাগের দ্বারা মহান হও৷