পত্নী/জায়া/ভার্যা/কলত্র

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

(মহান দার্শনিক শ্রীপ্রভাতরঞ্জন সরকার তাঁর শব্দ চয়নিকা–২৬ খণ্ড গ্রন্থের বিভিন্ন স্থানে ‘নারীর মর্যাদা’ বিষয়ক অনেক কিছুই বলেছেন৷ ওই গ্রন্থ থেকে কিছু অংশ সংকলিত করে প্রকাশ করা হচ্ছে৷                 –সম্পাদক)

সেকালে মানুষ বাস করত মুখ্যতঃ বনভূমিতে উচ্চবৃক্ষের শীর্ষে – পাখীর বাসার মত বাসা তৈরী করে অথবা পর্বত দেহের গুহায়৷ পর্বত ও অরণ্যানী – দুয়েরই বৈদিক ভাষায় অন্যতম নাম গোত্র৷ গোড়ার দিকে এক–একটি গোত্রের প্রধান হতেন এক–একজন নারী – গোত্রমাতা৷ পরবর্ত্তীকালে এল পুরুষ–প্রাধান্যের যুগ৷ গোত্রপ্রধান হতে লাগলেন এক–একজন ঋষি (পুরুষ)৷ যে ঋষির কাছে অগ্ণি* থাকত সেই ঋষির গোত্রীয় মানুষেরা সেজন্যে বিশেষ গৌরববোধ করতেন৷ অগ্ণি–রক্ষাকারী ঋষিকে সাগ্ণিক বা অগ্ণিহোত্রী বলা হ’ত৷ অগ্ণিকে তারা দেবতা জ্ঞানে পূজা করত৷ তাই অগ্ণির সন্তুষ্টি  বিধানের জন্যে উত্তম মানের আহার্য অগ্ণিকে আহুতি দিতেন৷ এই কাজকে তাঁরা ‘হবন’ বলতেন৷ এই হবন–ক্রিয়ার সাধারণ নাম ছিল ‘যজ্ঞ’৷ ‘যজ্ঞ’ (যজ্  ন) শব্দের অর্থ হচ্ছে কর্ম... বিশেষ কর্ম... সৎ কর্ম৷ ‘যজ’ ধাতুর অর্থ কাজ করা৷ যজ্  ঘঞ্ ঞ্চ  যাগ৷ সাগ্ণিক ঋষির অসুস্থতায় বা অনুপস্থিতিতে তাঁর পত্নী বা পুত্র সমিধ সম্প্রদানে অগ্ণিকে রক্ষা করতেন৷ এখানে ‘পত্নী’ শব্দটির প্রাচীন অর্থ নিয়ে কিছুটা আলোচনা করা যেতে পারে৷

শিবের সময়ের পূর্বে মানুষ জাতিতে বিবাহের ব্যবস্থা ছিল না৷ পিতা–মাতার দায়িত্ব বন্ধনে বদ্ধ না থাকায় নিরীহ সন্তানেরা ক্লেশ ভোগ করত অথবা সন্তান প্রতিপালনের ষোল আনা দায়িত্ব মাতার স্কন্ধে এসে পড়ায় নারী জাতির ওপর অত্যধিক চাপ পড়তে থাকে যার ফলে জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে তাদের অগ্রগতি  বাধাপ্রাপ্ত হতে থাকে৷ তাই শিব যুক্তি ও শক্তি প্রয়োগে এই অবদ্ধ স্বামী–স্ত্রীদের সমাজ–বন্ধনে আসতে বাধ্য করলেন৷ সেইটিই হ’ল বিশ্বের প্রথম বিবাহ ব্যবস্থা৷ শিব যে ব্যবস্থা দিয়ে গেলেন তা–ই নানান খাতে প্রবাহিত হয়ে বিভিন্নভাবে অবস্থাভেদে বর্ত্তমানে মানুষ আজকের যুগে এসে পৌঁছেছে৷ শিবের সময়ের পরে সুবিধাবাদী মানুষ স্ত্রীর সামাজিক স্তরকে বিভিন্ন ভাগে বিভাজন করে দেয়৷ মোটামুটি বিচারে তারা ছিল নিম্নলিখিত ক’টি প্রকারের ঃ

১৷ পত্নী ঃ পত্নী তাঁকেই বলা হ’ত যিনি তাঁর স্বামীর সঙ্গে সমান ধর্মীয় অধিকার ও সামাজিক অধিকার পেতেন ও তাঁর সন্তানেরা পিতার সর্বপ্রকার ধর্মীয় ও সামাজিক অধিকার উত্তরাধিকার সূত্রে পেত৷

২৷ জায়া ঃ জায়া তাঁকেই বলা হত যিনি স্বামীর ধর্মীয় অধিকার পেতেন না, তবে সামাজিক অধিকার পেতেন ও সন্তানেরা ধর্মীয় ও সামাজিক অধিকার পেত৷

৩৷ ভার্যা ঃ ভার্যা তাঁকেই বলা হত যে নারী স্বামীর ধর্মীয় ও সামাজিক কোন অধিকারই পেতেন না, তবে বিবাহটি স্বীকৃত থাকায় তাঁর সন্তানেরা ধর্মীয় ও সামাজিক অধিকার পেত৷ কেবল বংশধারাকে অবলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাবার জন্যে ভার্যাকে বিবাহ করা হ’ত, তাঁকে কোন মর্যাদা দেবার জন্যে নয়৷ তাই বলা হ’ত – ‘পুল্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা’৷

৪৷ কলত্র ঃ বৌদ্ধযুগের কিছু প্রাক্কালে কলত্র–ব্যবস্থা প্রবর্ত্তিত হয়৷ এই ব্যবস্থা বৌদ্ধযুগে উৎসাহপ্রাপ্ত হয় নি – কিছুটা প্রচ্ছন্নভাবেই থেকে গেছল৷ বৌদ্ধোত্তর যুগে আবার মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে৷ এই কলত্র–ব্যবস্থায় স্ত্রী স্বামীর ধর্মীয় ও সামাজিক অধিকার তো পেতই না, তার পুল্রেরাও ধর্মীয় ও সামাজিক অধিকার পেত না৷ তবে তারা মাতার গোত্র, বর্ণ ও সামাজিক অধিকার পেত, যদি সেই বিবাহ অনুলোম বিধি অনুযায়ী সংঘটিত হ’ত৷ যেমন পিতা বিপ্র (নুব্ধন্দ্বপ্তপ্তন্দ্বন্), মাতা শূদ্রা  সন্তান পিতার বর্ণ পেত না অর্থাৎ বিপ্র রূপে পরিচিত হ’ত না৷ ধরো পিতার গোত্র ভরদ্বাজ, সন্তান ভরদ্বাজ–গোত্রীয় বলে বিবেচিত হ’ত না, কিন্তু মাতার বর্ণ পেত অর্থাৎ তাকে শূদ্র বলে মনে করা হ’ত ও ধরো মাতার গোত্র ছিল কাশ্যপ, সন্তানও কাশ্যপ গোত্রীয় বলে গণ্য করা হ’ত৷ এই বিবাহ যদি সমাজস্বীকৃত ভাবে না হ’ত তাহলে সন্তান মাতার গোত্র–বর্ণও পেত না৷ সে ব্রাত্য রূপে গণ্য হ’ত৷

‘কলত্র’ শব্দটির অর্থ যদিও স্ত্রী কিন্তু এটি ক্লীবলিঙ্গ, ‘কলত্রঃ’ বা ‘কলত্রা’ না হয়ে হবে ‘কলত্রম’ – ‘‘যদ্ ভর্ত্তুরের হিতমিচ্ছতি তদ্ কলত্রম্’’৷ অনুরূপ ভাবে ‘দার’ শব্দের অর্থ স্ত্রী কিন্তু শব্দটি পুংলিঙ্গ ও বহুবচনাত্মক – তাই রূপ হবে ‘নর’ শব্দের বহুবচনের মত৷ তাই ব্যাবহারের সময় ‘দার’ না বলে ‘দারা’ বলতে হবে৷ তবে যেহেতু মূল শব্দটি ‘দার’ তাই বিবাহ করা অর্থে ‘দারা পরিগ্রহ’ না বলে ‘দার–পরিগ্রহ’ বলতে হবে৷ যার স্ত্রীর মৃত্যু হয়েছে তাকে ‘মৃতদারা’ না বলে বলতে হবে ‘মৃতদার’  যে বিবাহ করেনি তাকে ‘অকৃতদারা’ না বলে বলতে হবে ‘অকৃতদার’৷ বলা বাহুল্য মাত্র, কলত্রের সন্তানেরা পিতার সামাজিক ও ধর্মীয় অধিকার পেত না বলে অগ্ণি রক্ষার অধিকারও তাদের থাকত না৷ কলত্র ব্যবস্থায় যদি সমাজ–স্বীকৃতরূপে বিবাহ হ’ত সেক্ষেত্রে মাতৃকুলের সামাজিক ও ধর্মীয় অধিকার সন্তান পেত৷ মাতৃকুল যদি সাগ্ণিক হ’ত তবে সন্তানেরও অগ্ণি রক্ষা করার অধিকার থাকত৷

ণ্ড্র যাঁরা জাগতিক ক্ষেত্রে, মানসিক ক্ষেত্রে বা আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে নতুন কিছু আবিষ্কার করতেন প্রাচীনকালে তাঁদের বলা হ’ত ঋষি৷ সমাজের কাছে তাঁরা ছিলেন নমস্য৷ যিনি প্রথম আগুন আবিষ্কার করেছিলেন তিনিও ঋষি৷ ধীরে ধীরে মানুষ  অগ্ণির ব্যাপক ব্যাবহার শিখল৷ সবসময়ই মানুষ আগুনের প্রয়োজন বোধ করল, কিন্তু সবসময় ঘর্ষণ প্রক্রিয়ায় আগুন তৈরী করা সহজ কাজ নয়৷ তাই প্রতিটি জনগোষ্ঠীর যিনি প্রধান তিনি সবসময় অগ্ণি সংরক্ষণ করতেন, তাঁকে সবাই শ্রদ্ধা করত৷