দেশের স্বাধীনতা বাঙালিকে চির বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে

লেখক
দুলাল ঘোষ

ভারতের স্বাধীনতা বাঙালিদের জীবনে এক অভিশাপ হিসেবে জন্ম নিয়েছে৷ স্বাধীনতার ৭ দশক পরেও স্বাধীনচেতা প্রতিটি বাঙালি এক অজানা অশনি সংকেত-এর মেঘ দেখছে৷ বাঙালি জানেন না তার প্রকৃত বাসস্থান কোথায়? অথচ পরাধীন ভারতে এই দেশকে ব্রিটিশ মুক্ত করার জন্য সবচেয়ে বেশি আত্মবলিদান দিল এই বাঙালি জাতি৷ বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাঙালিরাই৷ আজকের যুগের লোকেরা আমেরিকাকে দেখলে তো ভাবে বিশ্বকে দেখেছে তেমনি ৫০০ বছর আগে এই বঙ্গদেশ কে দেখার জন্য দূর-দূরান্তের দেশ থেকে বহু পর্যটক ও ব্যবসায়ী আসতো বাংলার সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য করার জন্য৷ আজ থেকে ৫০০ বছর আগে বাঙলা এত উন্নত ছিল বিশ্বে যা পাওয়া যেত না বাঙলায় যেত৷ তৎকালীন সময়ে বঙ্গদেশ থেকে দিল্লির বাদশা শাহজাহানের রাজকোষে বাঙলা থেকে ৫৫ লক্ষ টাকা খাজনা যেত৷ এই যে দিল্লির বড় বড় অট্টালিকা ও আগ্রার তাজমহল সব বাঙলার অর্থে হয়েছে৷ বাঙলা ছিল শস্য শ্যামলা দেশ৷ প্রতিটি বাড়িতে ছিল গোলা ভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ, মাঠ ভরা শস্য ক্ষেত৷ তাই কবি বলেছেন ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’৷ এ বাঙলা জগৎ শেঠ মীরজাফরদের বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দীর্ঘ অত্যাচারও শাসনে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে৷ ধীরে ধীরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সারা ভারত জুড়ে তাদের সাম্রাজ্য বিস্তার করে৷ ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের মাধ্যমে কোম্পানির বিরুদ্ধে ভারতীয়রা বিদ্রোহ দেখায়৷ এরপরেই ভারতের শাসনভার কোম্পানি থেকে রানীর হেফাজতে চলে যায়৷ আর তখন থেকেই ইংরেজদের বিরুদ্ধে বাঙলার ভিতরে ইংরেজ বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়৷ শেষ পর্যন্ত বাঙলা থেকে জন্ম নেওয়া ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে৷ আর যেহেতু এই আন্দোলনের সৃষ্টিকর্তা বাঙলা৷ তাই বাঙলার ঐক্যবদ্ধ শক্তিকে বিনষ্ট করার জন্য ১৯০৫ সালে ব্রিটিশরা বাঙলাকে দ্বিখণ্ডিত করেন৷ শেষ পর্যন্ত হিন্দু মুসলিমের তীব্র বিরোধিতায় ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ রদ করলেও ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে নিয়ে যায়৷ আসলে বাঙলার  সচেতনতাশীলতা বুদ্ধিজীবীরা যেভাবে সারা ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী  আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছিল ও তাদের আহ্বানে বাঙলার  দামাল ছেলেমেয়েরা হাসিমুখে দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন দিতে শুরু করে ইংরেজদের রাতের ঘুম কেড়ে নেয়৷ আর তখন বাঙলার বুকে রবীন্দ্রনাথ নজরুল বিবেকানন্দ থেকে শুরু করে বিজ্ঞানী অর্থনীতিবিদ আইনবিদ রাজনীতিবিদ সবাই আবির্ভূত হন৷ সুভাষচন্দ্র বসুর মতো রাজনীতিবিদ যখন ভারতের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন তখন ব্রিটিশ রাজশক্তি কেঁপে ওঠে৷ তখন কংগ্রেসের দায়িত্বভার ছিল গান্ধীজীর হাতে৷ কিন্তু গান্ধী অনুগ্গামীরা ছিল স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে৷ আর সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন পূর্ণ স্বরাজের পক্ষে৷ তাই ব্রিটিশরা তাকে বন্দী করে বিদেশে চলে যেতে বললে নেতাজি ইউরোপ চলে গিয়েও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নানাভাবে উৎসাহিত করতে থাকে৷ কিন্তু ততক্ষণে কংগ্রেস  ভরে পুরোপুরিভাবে গান্ধী তথা হিন্দি বলয়ের লোকদের সংখ্যাধিক্যে  শেষ পর্যন্ত প্রবল জনমতের চাপে ব্রিটিশ নেতাজিকে ভারতে আসার অনুমতি দেয়৷ গান্ধীজী নেতাজীকে কংগ্রেসের  সভাপতি পদে নির্বাচিত করেন৷ নেতাজী কংগ্রেসের সভাপতির ভাষণে তুলে ধরেন ভবিষ্যৎ ভারতের  রূপরেখা৷ পরাধীন ভারতবাসীকে স্বাধীনতার স্বাদ তুলে দেওয়ার জন্য তিনি নানা পরিকল্পনার কথা ঘোষণা দেন৷ তিনি বলেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও দিতে হবে প্রতিটি মানুষকে৷ কৃষি শিল্প বাণিজ্য শিক্ষা প্রতিটি ব্যবস্থার চেয়েছিলেন আমূল পরিবর্তন৷ আর যা গান্ধীজী ও তাঁর অনুগামীদের পছন্দ হয়নি৷ শেষ পর্যন্ত গান্ধীজীর প্রচণ্ড চাপে নেতাজিকে কংগ্রেস থেকে ইস্তফা দিতে হলো৷ যদিও শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠলে সুভাষ এই সুযোগকে কাজে লাগাবে ভেবে ব্রিটিশরা সুভাষকে গৃহবন্দী করে রাখে৷ সুভাষ কিন্তু গান্ধীজীকে বারবার অনুরোধ করেন৷ তিনি এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দেশকে স্বাধীন করতে চেয়েছিলেন৷ কিন্তু গান্ধীজী  সুভাষের এই আহ্বানে সাড়া দেননি বরং গান্ধীজী অপেক্ষায় ছিলেন সুভাষকে বন্দী করার জন্য৷ তবুও সুভাষ দেশের স্বাধীনতার জন্য বিদেশে পাড়ি দেয়৷ গান্ধীজী আবারো প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ন্যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইংরেজদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন৷ এই সহযোগিতার ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট, হিন্দু মহাসভা, মুসলিম লীগ পরোক্ষভাবে ব্রিটিশদের সহযোগিতা করে৷ শেষ পর্যন্ত দেখা যায় নেতাজি আজাদ হিন্দ ফৌজ নিয়ে মনিপুর পর্যন্ত এগিয়ে এলেও দেশের তৎকালীন নেতা নেহেরু থেকে শুরু করে কমিউনিস্টরা পর্যন্ত চরম বিরোধিতা করে৷ অথচ তখন নেতাজিকে সহযোগিতা করলে দেশ ভাগ হতো না৷ আসলে  তৎকালীন নেতারা চেয়েছিলেন বিশেষ করে হিন্দি বলয়ের নেতারা চেতনা সম্পন্ন বাঙালি জাতিকে টুকরো করে দেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কে তাদের হাতে কুক্ষিগত করতে চেয়েছিলেন৷ আর তাই ইংরেজদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে তৎকালীন নেতারা দেশভাগকে মেনে নেন৷ আর এই দেশভাগের ফলে ভারতবর্ষ তিনটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে৷ দুই দিকে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্ম নেয় আর মাঝখানে ভারত থেকে যায়৷ দেশভাগের ফলে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত শরণার্থীদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করলেও পূর্ব পাকিস্তান থেকে আগত হিন্দু বাঙালিদের পূণর্বাসনের ব্যাপারে তৎকালীন নেহেরু সরকার তেমন আগ্রহ দেখান নি৷ অথচ ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ হলো, স্বাভাবিকভাবে হিন্দু বাঙালিরা নিজের ধর্মকে ঠিক রাখার জন্য পূর্ব পাকিস্তান থেকে শত শত বছরের পিতৃপুরুষদের ভিটেমাটি ছেড়ে সহায় সম্বলহীন হয়ে ভারতের দিকে ছুটে আসে৷ সেখানেও পূর্ব বাংলার বাঙালিদের পুনর্বাসনের নামে কালাপানি, দণ্ডকারণ্য বিহার ও উড়িষ্যার গভীর অঞ্চলে সুন্দরবনে নির্বাসনে পাঠায়৷ কালাপানিতে জরোয়াদের সাথে চলে দীর্ঘ লড়াই৷ আর দণ্ডকারণ্য ও সুন্দরবনের প্রকাশ্যে বাঘ ভাল্লুকে মানুষ খেয়ে ফেলে এমন জায়গায় নির্বাসন দেয়৷ আর ত্রিপুরার ক্ষেত্রে সমতল ত্রিপুরার বাঙালি প্রজারা স্থান পরিবর্তন করে চলে আসে পার্বত্য ত্রিপুরায়৷ আর সিলেটের লোকেরা অনেকে চলে আসে কাছাড় গোয়ালপাড়ার নোয়াগাঁও প্রভৃতি বাংলার অঞ্চলে৷ উত্তর পূর্বাঞ্চলে বাংলার অঞ্চল অসমের সঙ্গে রয়ে যায়৷ কংগ্রেস শাসিত অসম সরকার অসম অসমীয়াদের জন্য বললে ও অসমে  সরকারি ভাষা অসমীয়া করতে চাইলে ১৯৬১ এর উনিশে মে বরাক উপত্যকার বাঙলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার্থে ১১ জন বাঙালী শহীদ হয়৷ আর অন্যান্য জনগোষ্ঠীরা অসম সরকারের সঙ্গে দীর্ঘদিন আন্দোলন করে মেঘালয় মিজোরাম নাগাল্যাণ্ড অরুণাচল আদায় করে নেয়৷ আর দেড় কোটি বাংলাভাষী লোক হিন্দু-মুসলিমের খেলা খেলতে কংগ্রেস বিজেপি আশ্রয়ের থাকতে গিয়ে স্বাধীনতা ৭০ বছর  পরে  স্থান পাচ্ছে ডিটেনশন ক্যাম্পে৷ এছাড়া উত্তর-পূর্ব ভারতজুড়ে এমনকি পশ্চিমবঙ্গে ও বর্তমান সরকার ৮২ তকমা দিয়ে এন.আর.সিও সিএএ এনএ মাধ্যমে বাঙালিদের পায়ে আবার শিকল পরাতে চাইছে৷ আর ত্রিপুরার সমতল অঞ্চলের প্রজারা যারা দীর্ঘদিন ত্রিপুরার রাজ পরিবারের অর্থের যোগান দিয়ে এসেছে তৎকালীন রাজ পরিবারের দুর্বলতায় চাকলা রোশিনি বাদ হাতছাড়া হলে সেখানকার বাঙালি প্রজারা পার্বত্য ত্রিপুরায়  চলে এসে পাহাড়ি ত্রিপুরাকে আধুনিক ত্রিপুরায় রূপান্তরিত করে৷ বিগত দিনে যে কমিউনিস্টদের নেতা নৃপেন চক্রবর্তী দশরথ দেবের সাথে বাঙ্গাল খেদা আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন তারা ১৯৭৮ সালে ত্রিপুরায় ক্ষমতা দখল করায় বাঙালিদের জীবনে নেমে আসে এক অন্ধকার যুগ যা আজও চলছে৷ বাম আমলের  ত্রিপুরায় এডিসি হওয়ার পর থেকে এডিসি কে বাঙালি মুক্ত করার জন্য উপজাতিদের একটা অংশ আশির দাঙ্গা করে৷ এরপর থেকে কয়েকবার বাঙালির জীবনে নেমে আসে ধবংসলীলা৷ যার ফলস্বরূপ জম্পুইজলা, টাকারজলা, গাবর্দি রামচন্দ্রঘাট লক্ষীবীল এমনকি আরও মিশ্র বসতি অঞ্চল থেকে বাঙালিদের কে চলে আসতে হল৷ অনেকে চাকরি পেয়ে এই হত্যালীলার কথা ভুলে গেছে৷ শত শত মানুষ মুক্তিপণ দিয়েও ফিরে আসতে পারেনি৷ এরপর মিজোরাম থেকে আশা রিয়াং শরণার্থীরা ও কয়েকবার বাঙালিদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়ে ভিটেমাটি ছাড়া করেছে৷ কিন্তু আইনের ক্ষেত্রে সবাই সমান হলেও একমাত্র ব্যতিক্রম বাঙালিদের ক্ষেত্রে পুরো উত্তর পূর্বাঞ্চল জুড়ে বার বার বাঙালিদের উপর আক্রমণ আসলেও কোনও রাজনৈতিক দল বাঙালিদের স্বার্থে কথা বলেন নি৷ এমনকি বাঙালী এম.এল.এ, এম.পি বা মন্ত্রীবর্গ একবারও  বাঙালি জাতির  অস্তিত্ব রক্ষার জন্য এগিয়ে আসেনি৷ অথচ যারা আক্রমণকারী তাদের জন্য পুরস্কার দেয় রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকার৷ কংগ্রেস বিজেপি ও সিপিএমের আমলে একই চিত্র ফুটে উঠেছে৷  কিছুদিন পর পর পুরো উত্তর পূর্বাঞ্চলে বাঙালিদের উপর আক্রমণ আসছে এমনকি এই  লকডাউনেও অসম থেকে দুই থেকে তিনবার বাঙালিদের উপর আক্রমণ হয়েছে৷ লকডাউনেও অসম সরকার  ভোটারদের নোটিশ পাঠাচ্ছে ডিটেনশন ক্যাম্পে, বিদেশি তকমা দিয়ে তাদের বন্দি করে রেখেছে৷ পশ্চিমবঙ্গেও হিন্দু মুসলিমদের খেলা খেলে মারোয়াড়ি বিহারীরা বাংলার ব্যবসা-বাণিজ্য ভাষার অধিকার কেড়ে নিচ্ছে৷ ঝাড়খণ্ড ছত্রিশগড় আন্দামানেও বাঙালিদের উপর নানাভাবে আঘাত আসছে৷ সমস্ত জাতি যে দলই করুক না কেন আগে তার জাতির কথা ভাবে৷ আর বাঙালি জাতি আর কতদিন উদারতা দেখিয়ে মার খাবে৷ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত করতে গেলে ঐক্যবদ্ধ না হলে ইহুদি জাতি বাঙালী পরিণত হতে আর বেশি দিন সময় লাগবে না৷ কারণ আপনার জন্য এন.আর.সি অপেক্ষা করছে৷