২০২৬ সালে কলকাতা ও তার পার্শবর্তী এলাকাগুলি যাদবপুর, দমদম, ডানকুনি, হাওড়া প্রভৃতি হকার উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে৷ রেল ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবৈধ দখলমুক্ত করার উদ্যোগ এবং অন্যদিকে হাজার হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জীবিকা রক্ষার দাবির মধ্যে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করে৷
কলকাতা হাইকোর্টও পর্যবেক্ষণ করে যে, জমির সুনির্দিষ্ট চিহ্ণিতকরণ এবং বিকল্প পুনর্বাসনের প্রশ্ণ বিবেচনা না করে উচ্ছেদ অভিযান চালানো উচিত নয়৷ এর ফলে বিষয়টি শুধুমাত্র আইন-শৃঙ্খলা বা জায়গা দখলের প্রশ্ণে সীমাবদ্ধ না থেকে সামাজিক ন্যায়বিচার ও জীবিকার অধিকারের প্রশ্ণে পরিণত হয়েছে৷
বর্তমান সরকার ও রেলর যুক্তি: স্টেশন ও রেলপথের পাশে অবৈধ দখল নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করে৷ যাত্রী চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়৷
সরকারি সম্পত্তি অবৈধভাবে ব্যবহৃত করা বেআইনি৷ অপরদিকে, হকারদের যুক্তি: অনেকেই ২০-৩০ বছর ধরে ওই এলাকায় ব্যবসা করছেন৷ তাদের আয়ের উপর পুরো পরিবার নির্ভরশীল৷ বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া উচ্ছেদ মানে তাৎক্ষণিক বেকারত্ব ও দারিদ্র্য৷ প্রকৃতপক্ষে, দুই পক্ষেরই কিছু যুক্তি রয়েছে৷ প্রশ্ণ হলো সমাধান কী?
প্রাউট কী বলবে?
শ্রী প্রভাত রঞ্জন সরকারের প্রবর্তিত (PROUT Progressive Utilization Theory)-এর মূলনীতি হলো: মানুষের মৌলিক প্রয়োজন এবং সমাজের সামগ্রিক স্বার্থদুটির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে৷
উন্নয়ন প্রয়োজন, কিন্তু উন্নয়নের জন্য কয়েকশো পরিবারের জীবিকা বলি দেওয়া যাবে না৷ আগে মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে৷
প্রাউট সাধারণত দুটি চরম অবস্থানকেই সমর্থন করে না: ১. যে কেউ যেখানে খুশি জমি দখল করে বসে থাকবে৷ ২. জীবিকার বিকল্প না দিয়ে বুলডোজার চালিয়ে সব ভেঙে দেওয়া হবে৷ প্রাউটের মতে, উভয় অবস্থানই সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি করে৷
প্রাউটের সমাধান ১. ’পুনর্বাসন আগে, উচ্ছেদ পরে’ প্রাউট এর মতে, যদি কোনো হকারকে সরানো প্রয়োজন হয়, তাহলে প্রথমে বিকল্প ব্যবসার স্থান নিশ্চিত করতে হবে৷
এখানে পুনর্বাসন শুধু ’একটা জায়গা দেওয়া’ নয়, জীবিকা (livelihood) বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ৷ অর্থাৎ এমন জায়গা দিতে হবে যেখানে ব্যবসা চালানোর বাস্তব সুযোগ সমান বা প্রায় সমান থাকে৷
যদি কাউকে স্টেশনের বদলে এমন জায়গায় দোকান দেওয়া হয় যেখানে ক্রেতাই আসে না, তাহলে ঞ্ঝট্টঞ্জড্ডট এর দৃষ্টিতে এটি প্রকৃত পুনর্বাসন নয়, কারণ দোকান আছে কিন্তু জীবিকা নেই৷
তাই, স্টেশনের কাছে নির্দিষ্ট হকার জোন তৈরি কম খরচের মার্কেট কমপ্লেক্স লাইসেন্সপ্রাপ্ত স্টল এবং নতুন জায়গা চালু হওয়ার পর ধাপে ধাপে পুরোনো জায়গা খালি করা যেতে পারে৷ ২. সমবায়ভিত্তিক বাজার যদি ২০০-৩০০ হকার একত্রে সমবায় গঠন করেন, কম ভাড়ায় জায়গা পরিচালনা করা সম্ভব পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা বজায় রাখা সহজ হবে মধ্যস্বত্বভোগীর উপর নির্ভরতা কমবে ৩. স্থানীয় অংশগ্রহণ কোন এলাকায় কতজন হকার থাকবে, তা শুধুমাত্র প্রশাসন নয়, বরং স্থানীয় বাসিন্দা হকার সংগঠন রেল পৌরসভা সব পক্ষের প্রতিনিধিদের নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত৷ এছাড়াও - লাইসেন্স এবং নিবন্ধন (registration) পরিচয়পত্র নির্দিষ্ট সময় নির্দিষ্ট এলাকা নির্ধারণ করা যেতে পারে৷ এতে জনস্বার্থও রক্ষা হবে, আবার জীবিকাও বজায় থাকবে৷
হকার সমস্যা কেবল ‘অবৈধ দখল’ বনাম ‘আইন প্রয়োগ’-এর প্রশ্ণ নয়৷ এটি নগর পরিকল্পনা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ণ৷ প্রাউটের দৃষ্টিতে সমাধান হলো উচ্ছেদ নয়, নিয়ন্ত্রিত বৈধতা দখল নয়, পরিকল্পিত ব্যবহার এবং সর্র্বেপরি, পুনর্বাসন আগে, উচ্ছেদ পরে৷ একটি সভ্য সমাজের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু রাস্তা বা স্টেশন খালি করা নয়, বরং এমন সমাধান খুঁজে বের করা যাতে জনস্বার্থ এবং মানুষের জীবিকা দুটিই একসঙ্গে রক্ষা পায়৷
- Log in to post comments