রাজনীতি শব্দের আক্ষরিক অর্থ রাজার নীতি বা বিভিন্ন শাসন ব্যবস্থায় সরকারের নীতি, যে নীতির মূল লক্ষ্য নগর বা রাষ্ট্রের নাগরিকদের কল্যাণ করা৷ সেই অর্থে রাজনীতির অর্থনীতির রাজা বা শ্রেষ্ঠ নীতি৷ কারণ মানব সেবাই মানব জীবনের আদর্শ৷ যারা আধ্যাত্মিক জগতের সাধক, যাদের জীবনের মূল লক্ষ্য মোক্ষ প্রাপ্তি বা জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মহামিলন--- তাঁদের জীবন আদর্শ--- ‘আত্মমোক্ষার্থং জগদ্ধিতায় চ’৷ সারকথা মোক্ষত্ব অর্জন যাদের জীবনের লক্ষ্য তাদেরও শুধু সাধন ভজনে লক্ষ্য প্রাপ্তি হবে না--- মানবকল্যাণের পথেও চলতে হবে৷ রাজনীতিরও মূল লক্ষ্য রাষ্ট্রের তথা রাষ্ট্রের নাগরিকদের কল্যাণ সাধন৷
পরাধীন ভারতে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত মানুষকে জনগণ দেশপ্রেমিক আখ্যা দিত৷ তাঁদের জীবনের মূল লক্ষ্য ছিল দেশকে পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্ত করা৷ তার জন্যে তারা অক্লেশে জীবন ত্যাগ করত৷ কিন্তু আজ রাজনীতির মানুষ-জনকে জনগণ রাজনীতির কারবারি বলে থাকে৷ সহজ কথায় রাজনীতির ব্যবসাদার৷ কেউ কেউ বলে থাকেন রাজনীতি বিনা মূলধনের ব্যবসা৷ তবে এ কথাটা সর্বাংশে সত্য নয়৷ আর্থিক ধনসম্পদ বিনিয়োগ না করতে হলেও বুদ্ধির বিনিয়োগ অবশ্যই করতে হয়৷ কারণ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনীতির বিষয় অচেতন মানুষকেই এরা রাজনীতির ব্যবসায় মূলধন বানায়৷ তার জন্যে যথেষ্ট বুদ্ধি বিনিয়োগ করতে হয়৷
নির্লজ্জ রাজনীতি নিয়ে বলতে গিয়ে এত ধানাই পানাই করার কারণ রাজনীতি আজ আর রাজনীতি নেই৷ অসৎ দুর্নীতিবাজদের রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের রণনীতি যেখানে কোন নিয়ম ও আদর্শ নেই৷ সদ্য সমাপ্ত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে শাসক তৃণমূলের পরাজয়ের পর ২০ জন সাংসদের বোধোদয় হল দিদির ভাইপো প্রীতির জন্য এই দলটা আর করা যায় না৷ তাই নির্বাচনের প্রচারে দিল্লির শাসক দলের সাম্প্রদায়িক চরিত্র নিয়ে যারা তুলোধনা করেছে তারাই সেই দলের চরণে আশ্রয় নিল এনসিপিআই এর ঘোমটা মাথায় দিয়ে৷ বাঙলায় একটা চলতি প্রবাদ আছে ‘ঘোমটা মাথায় খেমটা নাচন’৷ যার অর্থ খ্যামটা নাচ নাচতেও ইচ্ছা করে আবার লজ্জাও লাগে৷ দুইয়ের দ্বন্দ্বে ইচ্ছা জয়ী হয়৷ তবে লজ্জা নিবারণে ঘোমটা মাথায় দিয়ে আসরে নেমে পড়ে৷ এক্ষেত্রে অবশ্য লজ্জার বালাই নেই৷ কিছুটা আইনি বাধ্যবাধকতা, কিছুটা শাসকদলের আভ্যন্তরীণ অন্তরায়৷ তাই তিন মাস আগে বিধানসভা নির্বাচনেও যে দলের নাম শোনা যায়নি, এরকম একটি দলের অস্তিত্ব রাজ্যে আছে বলে কেউই জানতো না, সেই দলের ঘোমটা মাথায় দিয়ে এনডিএ তে সামিল৷ রাজনৈতিক আদর্শের সম্পূর্ণ ভিন্ন পথের একটি দল, নির্বাচনে যে প্রধানমন্ত্রীকে তীব্র সমালোচনায় বিদ্ধ করেছে, সেই দলে সামিল হয়ে সেই প্রধানমন্ত্রীর প্রাতরাশের এক কনা প্রসাদ পেয়ে ভাবে গদগদ আবেগে উচ্ছ্বসিত৷ কি নির্লজ্জ বেহায়া! নির্বাচনে জিতে বিজেপি কি চরিত্র বদল করল নাকি তৃণমূলের সাংসদরা দলের পরাজয়ের পর চরিত্র বদল করল! আসল কথা এই রাজনীতির কারবারিদের চরিত্র বলে কিছু নেই, আদর্শ বলে কিছু নেই, যার দু-কানকাটা তার আবার লজ্জা কিসের! সে তো রাস্তার মাঝখান দিয়েই যায়৷
দেশের প্রধানমন্ত্রীর কথাই যদি ধরি৷ যাঁর দুটি জনপ্রিয় বাক্য প্রবাদে পরিণত হয়েছে৷ না খাউঙ্গা, না খানে দুঙ্গা, আচ্ছে দিন আগিয়া, আচ্ছে দিন কেমন এসেছে তা ১২ বছরে দেশের মানুষ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে৷ দুর্নীতিমুক্ত দল ও প্রশাসন সম্পর্কেও একথা প্রযোজ্য৷ দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই৷ ইচ্ছামত সংবিধান পরিবর্তন করার মতো সাংসদও জোটের হাতে নেই৷ তাই জনপ্রতিনিধি কেনাবেচার কদর্য রাজনীতির খেলাটা তো খেলছেনই, দুর্নীতিমুক্ত ভারত গঠনেও পিছিয়ে নেই৷ ক্যাগের রিপোর্টে সেই স্বচ্ছ ভারতের ছবিটি স্পষ্ট৷ তিন বছর আগে মোদি সরকারের বিরুদ্ধে ক্যাগ অন্তত আটটি ক্ষেত্রে গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছিল৷ কিন্তু মোদি সরকারের তা নিয়ে কোন হেলদোল ছিল না৷ সাম্প্রতিক ক্যাগ জানিয়েছে সরকারের ১৫টি দপ্তর ২০২৫ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত ৩৪ হাজার প্রকল্পের কাজের শেষে কোন শংসাপত্র দেয়নি৷ প্রকল্প গুলোর মোট খরচ ৫৪ হাজার ২৮২ কোটি টাকা৷ ক্যাগের প্রতিবেদনে ও দুর্নীতির লক্ষণ স্পষ্ট৷ তবুও নির্লজ্জ শাসক নির্বিকার৷ তাই মোদির স্বচ্ছ দুর্নীতিমুক্ত ভারতের আশ্বাসও বেহায়ার বচনে পরিণত হয়েছে৷ এই নীতিহীন নির্লজ্জ রাজনীতি দেশকে ধবংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে৷ তাই আজ দেশের জন্যে প্রয়োজন কিছু সৎ আদর্শনিষ্ঠ নীতিবাদী মানুষের যারা রাষ্ট্রের নাগরিকদের কল্যাণের জন্য রাজনীতির হাল ধরবেন৷
- Log in to post comments