আজ বিকেলটা কেমন যেন
শুধু আসন পাতা হল আমার
সারাটি দিন ধ’রে-
ঘরে হয় নি প্রদীপ জ্বালা,
তাঁরে ডাকব কেমন ক’রে৷
আছি পাবার আশা নিয়ে,
তাঁরে হয় নি আমারা পাওয়া৷
আমার বাড়ির সামনের মানালির পাহাড়গুলো সবুজ আর আকাশচুম্বী৷ দূর শৈলশিরার হিমালোক চূড়ায় দিনের শেষ আলোকমায়া ধীরে ধীরে দ্রবীভূত হয়ে আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছে৷ দেবদারুর নিশ্বাস আর পাইনবনের গূঢ় সুবাস পবন-দোলায় দুলতে দুলতে আত্মাকে ছুঁয়ে যায়৷ সে বনের বুকের গভীর থেকে এক অদৃশ্য অতীন্দ্রিয় ধূপগন্ধ উঠে আসে৷ অরণ্যের হিরন্ময় বুক হতে ঊর্ধগামী হয় এক প্রাচীন ঋষির অর্ঘ্য-ধূপ৷
বিকেলের ঠান্ডা রোদ্দুর শরীরে পড়ে হালকা উত্তাপ এনে দেয়৷ সেই নিভে আসা আলোতে একটা নিঃশব্দ ডাক থাকে৷ মনে হয় এই দিগন্ত বিস্তৃত শৈলরাশি তার শত সহস্র বছরের নীরবতা সত্ত্বেও আমার সত্তাকে চিনে নিচ্ছে৷
এই গ্রামের মানুষগুলো আদিম যুগের মতো সরল৷ সকালের দিকে তারা কাজে যায় সামনের পাকদণ্ডির রাস্তা ধরে বিপাশার দিকে৷ বিপাশা নদীটা পাহাড়ের নানা শৈলমালার উজান বেয়ে নেমে আসে এক অস্থির সুরে, আর তাতে আমার বাড়ির পিছনের যোগিনী ঝর্ণার জলরাশি গিয়ে যোগ দেয় তীব্র আর্তনাদ করতে করতে৷ ঝর্ণার জল উপর থেকে ভীষণ শব্দে নেমে এসে পাথরের গায়ে পড়ে উচ্ছ্বাস তোলে৷ দূর থেকে মনে হয় কোনো তাপস মন্দ্রস্বরে মন্ত্রচ্চারণ করে চলেছে অবিরত৷
বাড়ির চারপাশে আপেলের বাগান৷ এখানে গ্রামের লোকেরা আপেল তোলার সময় কিছু আপেল রেখে দেয় গাছ গুলিতে পাখিদের জন্য৷ তাই পাহাড়ে সবসময় কিছু শব্দ থেকে যায়৷ কিছু আলোও৷ সেই ক্ষেতে কখনও কখনও কোনো গরুর গলায় ঝোলানো ঘণ্টা বাজে টুনটুন করে সাথে ভেড়ার খুড় পাকদন্ডির পথের পাথরে ঠেকলে দুইয়ে মিলে এক অচেনা মন্ত্রের শব্দছন্দ তৈরি হয়৷
মানালির স্থানীয় মানুষের জীবনে উৎসব ছাড়া বাড়তি সাজ নেই৷ শিশুরা সকালের কুয়াশার ভেতর দৌড়োয় বিদ্যালয়ের দিকে৷ মেয়েরা বিকেলে কাঠ বা পাহাড়ি ঘাস কেটে কাঁধে নিয়ে ঘরের দিকে ফেরে হেলে-দুলে৷ দূরে বরফ-ঢাকা পাহাড়ের ঢালগুলোতে মাঝেমধ্যে বুনো ঘাসের আগুন লাগে, নাকি কেউ লাগিয়ে দেয় কে জানে৷ সন্ধ্যে নামলে সেই আগুন দেখলে মনে হয় কোনো ঋষি জ্বেলেছে তার যজ্ঞাকুন্ড৷
সেই বিকেলগুলোয় পাহাড়তলা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমার পুরনো শৈশবের দিনগুলো ফিরে আসে৷ সেখানে শীতের সন্ধ্যায় আদিবাসী রমনীদের দলবেঁধে অতি প্রাকৃত সুরে সমবেত সঙ্গীতে পথ চলা৷ পশ্চিম রাঢ়ের সেই গ্রামের বাড়ির কাছের জোড়ে অবিরত জল বয়ে যাওয়ার শব্দ, দিগন্তে সূর্য ডোবার আলো, সেগুলো আর ফিরবে না৷
মানালির বাতাস এমনই৷ স্মৃতিকে নিঃশব্দে ছুঁয়ে দেয়৷ কখনো মনে হয় এই হাওয়া কোনো মৃত পরিজনের শ্বাস নিয়ে আসে৷ কখনো কোনো দূরে-হারানো প্রিয় মানুষের গোপন কান্নার শব্দ৷ আবার কখনো মনে হয় পূর্বপুরুষের কণ্ঠ ভেসে আসে পাহাড়ি পথে৷ যেন বলে, এখনও তোর সাথে আছি, নির্ভয়ে থাক৷ আচ্ছা তাদের কি দায় আমায় পথ শান্তিময় করে তোলার?
মানালির আকাশ মাথার ওপর এমনভাবে দাঁড়িয়ে থাকে, যা মানুষকে খুব বিশাল করে দেয়৷ নিজের জেতা-হারা, পরিচয়ের বাড়াবাড়ি, অহংকার সবই মুছে যায়৷ পাহাড়ের গায়ে দাঁড়ালে মানুষরা যেন নরম হয়ে যায়৷ দূরে কোনো মন্দিরের ঘণ্টা বাজে মৃদু সুরে৷ মনে হয় সৃষ্টির প্রথম সন্ন্যাসী কি এখানেই দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রার্থনা করেছিল? কি বলেছিল সে সেই প্রার্থনায়? সেই প্রার্থনার সঙ্গে কি সাদা মেঘ আর স্রোতস্বিনী নদীর শব্দ একসঙ্গে ভেসে গেছে৷
রবি ঠাকুরের সেই গানের ওপারের, যা মনে করিয়ে দেয় আমি একা নই সেও আছে ওই হৃদয় মাঝারে যিনি কোলে তুলে নেন দিনশেষে৷ এখানে দাঁড়ালে মনে হয় জীবনদেবতা আছেন, খুব কাছে৷ কিন্তু সহজে ধরা দেন না৷ তাঁর দিকে যেতে হলে নিজের অহং-এর শিখা নির্বাপিত হয় ধূলির নম্রতায়৷৷ আজ মনে হচ্ছে তিনি কোথাও নদীর উজানে দাঁড়িয়ে আমাকে খুঁজছেন৷ কিন্তু তার মুখ দেখা যায় না৷
এখন গোধূলি৷ পাহাড়ের ছায়া নেমে এসে উপত্যকাকে ঢেকে দিচ্ছে৷ বিপাশার জল আলো নিবে আসলেও ঝিলমিল করে৷ দূরে কোথাও পাখির ঘরে ফেরার আনন্দ কলতান শোনা যায়৷ আর যেন পাহাড়ের কোনো গুহার ভিতর থেকে অসীমের সাথে অন্তরের মিলনের সুর ভেসে আসে৷ সে কি আমারই তরে?
হঠাৎ থেমে দাঁড়াই নদীপাড়ে৷ মাথা নত হয়ে আসে এক অচেনা অজানা পথিকের প্রতি৷ কিছু স্মৃতি বেঁচে থাকে নতুন দিনের আশায়৷
নদীর তানে, বাতাসের গানে, আমার নিজের ভেতরের বাঁশি সব এক হয়ে যায়৷ আর সেই গানের ওপারে দাঁড়িয়ে আছেন আমার সেই জীবনদেবতা৷ মোর হৃদয় মাঝারে৷ আর বেঁধে রেখোনা তরী৷
আত্মার নিভৃত কোণ থেকে উৎসারিত ধবনি জেগে উঠছে :-
’কবে নিয়ে আমার বাঁশি বাজাবে গো আপনি আসি
আনন্দময় নীরব রাতের নিবিড় আঁধারে ’
- Log in to post comments