মানুষের নূ্যনতম প্রয়োজন অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থান৷ এই পাঁচটি নাহলে মানুষের চলে না, সে যে দেশের, যে ভাষাভাষীর হোক না কেন৷ অন্ন শব্দের অর্থ ব্যাপক অর্থে খাদ্য৷ ভাতই যে চাই তা নয়৷ তাই চাল, গম ও এই জাতীয় খাদ্য হলেই চলবে৷ এর সঙ্গে যা অত্যন্ত দরকার তা হ’ল বিশুদ্ধ পানীয় জল৷ এখন পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের সমাজে যা আবশ্যিক তা হ’ল জ্বালানী৷ এই জ্বালানী মূলতঃ কাঠ, কয়লা, বিদ্যুৎ যা তাপ দান করে৷ আমাদের যিনি জীবনের উৎস সেই সূর্য্য তাপ দান করে চলেছেন অনবরত৷
অতি প্রাচীনকাল থেকে জ্বালানী হিসেবে মানুষ ব্যবহার করছে কাঠ৷ কাষ্ঠাহরণ অতি প্রাচীন কাল থেকে চলে আসছে৷ বনজঙ্গলে ঢ়াকা মানুষ বনের কাঠ সংগ্রহ করে গৃহে জমিয়ে রাখতো৷ আগুন জ্বালা যখন কঠিন ছিল তখন গৃহে সমিধ যে কাঠ সহজে জ্বলে তা ঋষি ও মুনিগণ বন থেকে সংগ্রহ করে জ্বালিয়ে রাখতেন৷ এই পবিত্র কাজ করতেন বাড়ীর জ্যেষ্ঠ পুত্র৷ তাই আজও পিতামাতার মৃত্যুর পর অগ্ণিদাতা হলেন জ্যেষ্ঠ পুত্র৷ তাই আগুন অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বস্তু মানব সমাজে৷ প্রচণ্ড শীতের হাত থেকে বাঁচতে কাঠ জ্বালিয়ে আগুন পোহানো হয়, আগুন রান্নার কাজে লাগে৷ সেই আগুন আজ অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে৷ সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে মাটির নীচের কয়লা যা বড় বড় গাছ মাটি চাপা পড়ে সৃষ্টি হয়েছিল৷ সেই কয়লার আবিষ্কার হওয়াতে মানুষ পরবর্ত্তীকালে রান্না, এমনকি কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ সৃষ্টি করে নানা প্রয়োজনে কাজে লাগায়৷ কিন্তু কয়লাতো আর নোতুন করে সৃষ্টি হবে না তাই মাটির নীচের টার্শিয়ারী ও মেসোজোসিয়ান যুগের কয়লা আমরা ব্যবহার করে সব ধ্বংস করছি যা আমাদের পরবর্ত্তী প্রজন্ম আর পাবে না৷ কয়লা থেকে নানা রং, গ্যাস এমনকি ন্যাফথলিন হয়ে থাকে৷ তার অভাব পড়বে৷ বিশেষ করে কয়লা ব্যাপকভাবে পুড়িয়ে ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছে৷ এখন ভাবতে হবে কয়লাকে কিভাবে সঞ্চয় করে রাখা যায় তা না হলে সভ্যতার সর্বনাশ হবে৷ আজ আমরা বিদ্যুতের যুগে৷ এই যুগে বিদ্যুৎ ছাড়া চলবে না৷ বিদ্যুৎ কিভাবে আমরা পেতে পারি তার ভাবনা–চিন্তা করা দরকার ও এটার সদ্ব্যবহারের দিকে নজর দিতে হবে৷
তাই সৌরশক্তিকে ব্যাপকভাবে কাজে লাগাতে হবে৷ এই কাজে সরকারী–বেসরকারী উদ্যোগকে জরুরী ভিত্তিতে কাজে নিয়োগ করতে হবে৷ তাতে অনেক বেকার অন্ন সংস্থানের সুযোগ পাবে ও অল্প খরচে প্রয়োজন মিটবে৷ এমনকি রান্নার কাজে সূর্য্যের আলোকে কাজে লাগানো চলে৷ মোদ্দা কথা হ’ল বহুবার চিন্তা করতে হবে যা কয়লা পুড়িয়ে ধ্বংস না করা হয় ও পরিবেশকে দূষণমুক্ত করতে ছাই সৃষ্টি বন্ধ করতে হবে৷
এর সাথে সাথে আমাদের স্মরণে রাখতে হবে জল থেকে যে বিদ্যুৎ হয় সেটার ওপর বেশী জোর দিতে হবে৷ ভারতে ছয় লক্ষের অধিক গ্রাম আছে, পশ্চিম বাঙলায় সাঁইতিরিশ হাজারের অধিক গ্রাম আছে৷ অদ্যাবধি কটা গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁচেছে বিদ্যুতের খুঁটি পোঁতা হয়েছে কিন্তু বিদ্যুৎ যায়নি৷ তাই বিদ্যুৎ উৎপাদন বিকেন্দ্রীতভাবে সৃষ্টির দিকে নজর দিতে হবে৷ নদী, জল, বড় বড় জলাশয়কে গভীর করে ছোট ছোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা করতে হবে যাতে প্রতিটি গ্রামবাসী বিদ্যুৎ অল্প দামে পায়৷ কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কেন্দ্র গড়ে অর্থ নষ্ট না করাই শ্রেয়৷ তাছাড়া কয়লা পোড়ানো ধীরে ধীরে বন্ধ করতেই হবে৷ সেবা ও কল্যাণের দিকে আন্তরিক নজর সরকারের থাকা উচিত৷ তাছাড়া বাতাসের সাহায্যে উইণ্ডমিল তৈরী করে নদীর ধারে ধারে ছোট ছোট গম ভাঙ্গানো, তেল তৈরীর কল গড়া যায়৷ সমুদ্রের ধারে লবণাক্ত জলের সাহায্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা করে আমরা মানুষের প্রয়োজন মেটাতে পারি৷ বড় বড় ধনী ব্যবসাদারদের সৃষ্ট বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানীগুলি চড়া দামে বিদ্যুৎ যোগান দিয়ে কাঁচামাল–কয়লা ধ্বংস করছে ও এতে দেশের কল্যাণ হচ্ছে না৷ ভারতের মত গরীব গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পরিকল্পনায় তেমন জনহিতের ভাবনা নেই৷ যে পরিমাণ বিদ্যুৎ দরকার তা অদ্যাবধি সষ্টি হচ্ছে না৷ কথায় কথায় বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রগুলি নানা কারণে অচল হয়ে পড়ছে৷ সারা দেশে বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে৷ অন্ধকারে সারা দেশ ডুবে যাচ্ছে৷ ছোট ছোট বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র গড়ে তোলা দরকার৷ জলবিদ্যুৎকে ও সৌরবিদ্যুৎকে সরকার অগ্রাধিকার দিক৷ বায়ুচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদনের কলগুলিকে উৎসাহিত করুক তাতে করে অনেক সাশ্রয় হবে আর্থিক দিক থেকে৷
তাছাড়া পেট্রোল, ডিজেলের খরচকেও নিয়ন্ত্রণ করা দরকার৷ তাতে পরিবেশ দূষিত কম হবে ও অর্থ নষ্ট হবে না৷ ছোট ছোট গাড়িগুলিকে দম দেওয়া স্প্রীং–এর সাহায্যে চালানোর ব্যবস্থা করা দরকার৷ হালকা যানবাহনগুলিতে ডিজেল , পেট্রোল ব্যবহার বন্ধ করতে হবে৷ পৃথিবীর অনেক দেশে এই ব্যবস্থা চালু আছে৷ মাটির নীচের সম্পদকে যথেচ্ছভাবে নষ্ট করার অধিকার বর্ত্তমান প্রজন্মের নেই৷ ধনতান্ত্রিক সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলি মধ্যপ্রাচ্যের তেল নিয়ে যে ভয়ংকর কারবার চালাচ্ছে ও ওই সব এলাকার আমীর, ধনী ব্যষ্টিরা সেই মাটির নীচের ডলারে যে সব বিশাল ও ধ্বংসাত্মক কাজ পৃথিবীব্যাপী করে চলেছে তার সীমা পরিসীমা নেই৷ যদি মাটির নীচের তেলের ব্যবহার অন্য উপায়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায় তাহলে ভারতের মতো গরীব দেশের তেল কিনতে যে অর্থ ব্যয় হয় তা বাঁচবে ও দেশের সার্বিক উন্নয়নে সেই অর্থ কাজে লাগবে৷
ভাবতে আশ্চর্য হতে হয় আজও দেশের শতকরা ৬০ শতাংশ মানুষ এক পেটা খায় ও যাদের মাথা গোঁজার খরটুকু নেই৷ কিন্তু ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার দরুণ এখানে ওখানে কিছু নগর ও শহর তৈরী হয়েছে যেখানে মুষ্ঠিমেয় বুদ্ধিজীবী ও ধনীরা সব কিছু লুটেপুটে খাচ্ছে৷ এই অন্যায় ও অবিচারের প্রতিকার হওয়া জরুরী৷ চিন্তাভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্ত্তন আবশ্যিক৷
পরিবেশে বলি, বিজ্ঞানকে অবশ্যই কাজে লাগাতে হবে৷ আজ অ্যাটমিক এনার্জি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে পৃথিবীর এখানে ওখনে কিন্তু তার মারাত্মক ফল ফলছে পদে পদে৷ চেরনাবিলে যা ঘটেছে তা মারাত্মক৷ সমস্যা সংকূল এই পশ্চিমবাঙলায় কোটি কোটি টাকা খরচ করে সমুদ্রের তীরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কারখানা গড়ার কথা হচ্ছে৷ এর দাম যা পড়বে তা কেনার মত শক্তি সাধারণের নেই৷ ওই সব গরীব দেশের পক্ষে গরীবের ঘরে ঘোড়া রোগ বিশেষ৷ অল্প খরচে যেখানে বিপদ কম সেই ধরনের শিল্প গড়ে মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করাটাই মঙ্গলজনক বলে মনে হয়৷
লোকালয় থেকে বহুদূরে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন করতে হয় কিন্তু সমুদ্রের সন্নিকটে এটা করা বা লোকালয়ের অদূরে করাটা মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়৷ অনেক সময় প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে ঢ়াকতে প্রচণ্ড ক্ষতির হিসাবে ছেড়ে দেওয়া হয়৷ এটা নিশ্চয়ই অন্যায় ও মিথ্যাচারিতা৷ তাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোন কাজ করার আগে হাজার বার ভাবতে হয় যেটা এদেশের হয় না৷ বাহবা পেতেই অধিকাংশ রাজনৈতিক দল বহুলাংশে অকল্যাণকর কাজ করে থাকে৷
- Log in to post comments