প্রভাতী

প্রাণের দেবতা

লেখক
সুকুমার রায়

ধন্য প্রভু তোমার অনন্তলীলা

ভূবনজুড়ে দিয়েছ প্রাণে দোলা,

মোহনভাবে এলে তুমি ধরা মাঝে

অমৃতধারা নিয়ে নন্দন সাজে,

দাওনি ধরা আছ বিশ্ব-চরাচরে

প্রাণের দেবতা ওগো সবার তরে৷

জানিনা আর আসিবে কবে

এদিন আর দেখিব না ভবে

চলে গেলে ত্বরায় কোন ভূূবনে

বসিয়া বিজনে খুঁজি মননে,

কত আশা-ভরা আছে হৃদয়ে

চরণ ধরিতে  তোমার পথ চেয়ে৷

 

তুমি অনাদিকালের ধ্রুবতারা

এসেছ নিয়ে আলোর ঝর্ণাধারা৷

ঢেলেছ শূন্য হৃদয়ে অমৃতধারা

তোমার পরশে হ’ল নন্দিত সারা৷

অনন্ত গুণের মহিমা যে শুণি

তুমি এ জগতের সার শিরমণি৷

 

একগুচ্ছ কবিতা

লেখক
কৌশিক খাটুয়া

নারী

আমরা সহনশীলতার মূর্ত প্রতীক

পারি সকল বিঘ্ন যুঝিতে,

জননী, ভগিনী নন্দিনী রূপে

আসি শান্তির পথ খুঁজিতে৷

পূর্ণিমা-চাঁদ

পূর্ণিমা চাঁদের স্নিগ্দ-মুগ্দ হাসি

স্বচ্ছ জলে প্রতিবিম্ব স্পষ্ট,

মনের মাঝে বাজে মোহন বাঁশি

হারিয়ে যায় জাগতিক যত কষ্ট৷

 

সন্ধ্যা

ঝিঁঝির ডাকে নিস্তব্ধতার প্রকাশ

জ্যোৎস্নালোকে ভরে গেছে ধরা,

দখিন হাওয়ায় চাঁপা ফুলের সুবাস

তাঁর করুণায় স্বর্গ যেন গড়া৷

 

সকাল

মাঝ বয়সী ধানের চারা

নিত্য দেখে সূর্য,তারা,

কিন্তু চারা ভালোবাসে

চন্দ্রানি রাত,

শিশির মাথায় বরণ করে

সোনা ঝরা প্রভাত৷

 

আশা

জ্যোৎস্না উতল হাওয়ায়

ঢেউ খেলে যায় ধানের চারায়

কৃষকের হাসি সবার আগে

সম্বৎসরের আশা জাগে৷

 

উপস্থিত ৰুদ্ধি

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

‘তন্’ ধাতুর অর্থ হ’ল ৰেড়ে যাওয়া, অভিব্যক্ত হওয়া৷ যে মানুষ তার ভাবধারাকে নাচে–গানে অভিনয়ে–আবৃত্তিতে অভিব্যক্ত করতে পারে তার জন্যে ‘তন্’ ধাতুূড প্রত্যয় করে ‘ত’ শব্দ ব্যবহূত হয়৷ তাই এক্ষেত্রে ‘ত’–শব্দের একটি অর্থ হ’ল ণট বা অভিনেতা৷

অভিনেতার মধ্যেও অনেক সময় অদ্ভুত রকমের উপস্থিত ৰুদ্ধি দেখা যায়৷ সে বিচারে তিনি দু’দিক দিয়েই ‘ত’৷ অভিনয় জগতের ‘ত’–এদের উপস্থিত–ৰুদ্ধি সম্ৰন্ধে বা উপস্থিত ৰুদ্ধির স্বভাব সম্ৰন্ধে অনেক গল্প প্রচলিত আছে৷ দু’একটি গল্প তোমাদের শোনাচ্ছি ঃ

 সেটা তখন ইংরেজ আমল৷ আমি তখন দিনাজপুরে৷ উত্তর ৰাঙলার অন্যান্য শহরের মত দিনাজপুরও একটি মাঝারি রকমের ছিমছাম শহর ছিল৷ শহরটি ছিল আমার খুব প্রিয়৷ দিনাজপুর–বাসীর স্বভাবের একটি বৈশিষ্ট্য আমার খুবই ভাল লাগত৷ ওঁরা*(*ওনারা, যেনারা, তেনারা শব্দগুলি গ্রাম্য দোষে দুষ্ট৷ ওঁরা, যাঁরা, তাঁরা–ই শুদ্ধ ওনারা, যেনারা, তেনারা না লেখাই ভাল৷) ছিলেন খুবই নাচ–গান–ভিনয় প্রিয়৷ সেকালে স্থায়ী অভিনয়মঞ্চ কোলকাতার বাইরে আর কোনো শহরেই ৰড় একটা ছিল না৷ কিন্তু দিনাজপুরে তা–ও ছিল৷ কয়েকজন স্থানীয় অভিনেতা তখন রীতিমত প্রথিতযশা হয়ে পড়েছেন৷ কেবল শহরেই নয়, গ্রামাঞ্চলের দিকেও থিয়েটারের রমরমা৷ সেই সময়টায় ওই দিকটায় ‘সীতা’ নাটকটি জনপ্রিয়তার তুঙ্গে৷ সীতার ভূমিকায় অভিনয় করে যিনি দু’হাতে যশ কুড়িয়েছিলেন, তাঁর নাম ছিল সম্ভবতঃ আব্দুল লতিফ৷

সীতা নাটকের অভিনয় চলছে৷ শহরে হাজার হাজার গোরুর গাড়ীর ভীড়৷ গ্রামের লোক ঝেঁটিয়ে এসেছে অভিনয় দেখতে৷ হাতে পাট বেচার তাজা টাকা৷ দরকার পড়লে অভিনয়ের জন্যে ৰেশ কিছু খরচ করতেও তৈরী৷

অভিনয় চলছে৷ নাটক তার চরম স্তরে ন্তুপ্তন্প্প্ত্রপ্রগ্গ এসে পৌঁছেছে৷ এবার সীতার পাতাল প্রবেশ৷ ধরিত্রী মাতাকে সম্বোধন করে সীতাকে যা বলতে হবে তার মোদ্দা কথা হচ্ছে–‘‘মাতঃ বসুন্ধরে, দ্বিধা হও, আমি তোমার  স্নেহময় অঙ্গে স্থানলাভ করি’’৷ আব্দুল লতিফে.র নাটকের ভাব ষোল আনাই জানা, ভাষাও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঠোঁটস্থ৷ এই বিশেষ স্থানটিতে সীতা ধরিত্রী মাতাকে সম্ৰোধন করে যা বলবেন তার ভাবটিও তাঁর জানা আছে৷ কিন্তু ভাষা একটু গোলমেলে হয়ে গেছে৷ সেই মাহেন্দ্রক্ষণে ‘‘মাতঃ বসুন্ধরে’’ বলার পরই স্মারকের হ্মব্জপ্সপ্পহ্মব্ধন্দ্ এসে গেল দারুণ কাশি৷ সে কাশির চোটে আর কথা বলতে পারছে না অথচ সীতা তো আর তার প্রত্যাশায় মুখ ৰন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না৷ সে তখন উপস্থিত ৰুদ্ধি প্রয়োগ করে বললে–‘‘মাতঃ বসুন্ধরে, তুই ফাঁক হ, মুই ভিতরত্ ঢুকিম্’’৷

দেখলুম, এ জিনিসটা শ্রোতারা সহজেই গ্রহণ করলেন৷ নাটকের কিছুমাত্র রসভঙ্গ হ’ল না৷

বিয়ের ঝামেলা

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

একজন কর্ষক ছিল৷ সে ছিল দারুণ ঔদরিক ৷ কিন্তু তার দু’পায়ে ছিল গোদ৷ তা সে যাই হোক, সেই কর্ষক গেছল বিয়ে করতে৷ গোদ দেখাদেখি জানাজানি হলে বিয়ে কেঁচে যাবে যে তাই ঔদরিকতার কথা ভেবে তাকে তখন সবসময় ধুতি দিয়ে গোদ ঢ়েকে রাখতে হয়েছে৷ সে কী ৰিড়ম্বনা

কনের অবস্থাও শোচনীয়, কারণ তিনি কানা৷ তাঁকে সব সময় চোখ ঢ়েকে রাখতে হচ্ছে৷ নইলে জানাজানি হয়ে গেলে বিয়ে ভেস্তে যাবে৷ তিনি বিয়ের আগের মুহূর্ত পর্যন্ত বাংলা পান দিয়ে মুখ ঢ়েকে রাখছিলেন৷ বিয়ের পর তো আরো সুবিধে৷ ঘোমটা দিয়ে মুখ ঢ়েকে রাখার সুযোগ পাওয়া গেছল৷ ঔদরিক ৰড় উস্খুস করছেন, কারণ তার সমস্ত সংবেদনা আজ ঔদরিকতার ভাবনায় প্রেষিত৷

ভালয় ভালয় যখন শুভ কার্য সমাধা হয়ে গেল ৰর তার ইনটেলিজেন্সের মাধ্যমে খোঁজখবর নিলে বিয়ের আর কোনো আনুষ্ঠানিক অঙ্গ বাকী আছে কিনা৷ ইনটেলিজেন্স যখন সবুজ সংকেত দিলেন যে না, আর কোনো ৰাধা–বাগড়া আসবার সম্ভাবনা নেই, ফাঁড়া কেটে গেছে ৰর তখন আশ্বস্ত হলেন৷ খোঁজ নিয়ে জানলেন এইবার প্রচলিত দেশাচার  অনুযায়ী ক্ষীর ভোজনে বসতে হবে৷ ৰর তো মহা খুশী৷ এইবার তার ঔদরিকতা পূর্ণ চরিতার্থতার পানে ছুটে চলেছে৷ ৰর এবার ধুতি হাঁটুর ওপর তুলে ক্ষীর ভোজনে সমস্ত মানসিকতাকে চালিয়ে দিয়ে বললেন–

‘‘আর কি বিয়ের ভয়?

হাঁটুর কাপড় তুলে

এখন ক্ষীর ভোজনে রয়৷’’

কনে বসেছিলেন একটু দূরে ৰর কী বলছেন শোনার  জন্যে উৎকর্ণ হয়ে৷ তিনিও কিছু কম দাঁও মারেননি৷ বিবাহ–বৈতরণী পার হওয়ার জন্যে তাঁকে অনেকক্ষণ ধরে কষ্ট করে পান–ঘোমটায় মুখ ঢ়েকে থাকতে হয়েছিল৷ তিনি এবার মুখের কাপড় সরিয়ে দিয়ে সমবেত জনতাকে উদ্দেশ্য করে বললেন–

‘‘আর কি বিয়ের মানা

মুখের কাপড় খুলে দেখ কনের দু’চোখ কানা’’৷

যাই হোক ‘ঔদরিক’ কাকে বলে ৰুঝে গেলে তো ঔদরিকতাকে কোনো মতেই প্রশ্রয় দিও না৷

শিব বলেছেন.....

‘‘অতিভোজনম্ রোগমূলমায়ূঃক্ষয়ক৷

তস্মাদতিভোজনং সর্বথা পরিহরেৎ৷’’

এই ঔদরিকতায় কারো কোনো লাভ নেই, আছে কেবল ক্ষতির পাহাড়৷ যারাই ঔদরিক তারাই একটু ৰেশী বয়সে নানান ধরনের উদর ব্যাধিতে ভুগে থাকেন৷

প্যাঁজ ফুলুড়ি

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

কারও পয়সা থাকলেই তার জেল্লা থাকে না, পয়সা থাকলেই তা’ সম্পত্তি পদবাচ্য হয় না৷ এই তো আমাদের চুঁচড়ো-চরকডাঙ্গার শ্রীযুক্ত ৰাৰু চাওয়া - চাটা চাটুজ্জেকে তোমরা অনেকেই  জানো! তার কত টাকা আছে কেউ জানে না৷ লোকে বলে, কুবের নাকি একবার তার টাকা গুণতে এসে অতি পরিশ্রমে অজ্ঞান হয়ে গেছলেন কিন্তু সেই চাওয়া-চাটা চাটুজ্জের  সম্পত্তি কি জেল্লাদার সম্পত্তি? তা কি ‘ভ’ পদবাচ্য? না, তা নয়৷ একটা ছোট্ট গল্প বলি, শোন ঃ

চাওয়া-চাটা-চাটুজ্জের বাড়ীই ছিল চউষট্টিটা--- চুঁচড়ো, চন্নগর আর চাতরায়৷ চাওয়া-চাটা বেশ মেপেজুকে কথা বলত৷ ভারী গলায় কথা বলে তার মনের ভেতরকার  ফাঁপা অবস্থাটা চাপা দেওয়ার চেষ্টা করত৷ ভারী গলায় কথা তো বলৰেই, কারণ যার আছে বাড়ী তার কথা ভারী ভারী, যার আছে ধান  তার কথা টান টান, আর যার আছে টাকা তার কথা ৰাঁকাৰাঁকা৷ ধান হাতে থাকে গ্রামের মানুষের৷ তাদের কথায় একটা টান থাকে৷ টাকা যার থাকে সে সোজা কথা বলে না--- ৰাঁকা কথা বলে৷

তা সে যাই হোক, আমাদের চাওয়া-চাটা চাটুজ্জে বাড়ীর পর বাড়ী কিনে গেছে৷ অথচ তাঁর সম্পত্তি ভোগ করবার দ্বিতীয় কোন উত্তরাধিকারী ছিল না৷ তার বংশে সে-ই ছিল একমাত্র বংশধর৷ সে ভাবারূঢ়ার্থেও অর্র্থৎ কিনা সব সময়ই তার হাতে একটা বাঁশের লাঠি থাকত৷ টাকা থাকলেই যে লোকে বাড়ী কিনবে এমন কথা নেই৷ তবে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীতে বিভিন্নধরনের রুচি থাকে বই কি৷ তাই না বলা হয়ে থাকে , হাতে কিছু টাকা এলে কে কী করে!

‘‘বাঙ্গালীর বাড়ী, সাহেবের গাড়ী’’

মিঞাসাহেবের হাঁড়ি, মেয়েমানুষের শাড়ী’’৷

বাঙ্গালীর হাতে দু’পয়সা এলেই একটা বাড়ী করে ফেলে৷ আর সাহেবরা দু’চার টাকার মুখ দেখলেই আলট্রামর্র্ডণ মডেলের নাই হোক, একটা হাত-ফেরতা (সেকেন্ড হ্যাণ্ড) গাড়ী কিনে ফেলে৷  আর মিঞাসাহেবের তকদির খুলে গেলে তিনি তখন কোর্র্ম- কাৰাৰ- কোপ্তা-শিক-কাৰাৰ-মিঠা পোলাউ-নমকিন পোলাউ-মুর্গমসল্লম্‌-ৰকরেকা পশীন্দা-বিরিয়ানী ইত্যাদি......ইত্যাদি খেয়ে কিছুদিন আনন্দ করে নেন অর্র্থৎ সৰ টাকা-পয়সা হাঁড়িতেই ঢালেন৷ আর মেয়েমানুষের শাড়ী সম্বন্ধে বেশী বলা অবাঞ্ছনীয় তো বটেই, বরং তাতে ঝুঁকিও(risk) রয়েছে....শাড়ী সম্বন্ধে বেশী কথা বললে ঘরে শান্তি ভঙ্গের সম্ভাবনা৷

তা সে যাই হোক, আমাদের চাওয়া- চাটাচাটুজ্জেরজীবনের্-জ্ঞান- আরাধনা- উপাসনা সৰ কিছুই ছিল ওই টাকা৷ সে বলত, অন্য চিন্তা করৰার সময় কোথায়! সুদের হিসাব মেলাতেই তো ২৪ ঘন্টা কেটে যায়৷ ভাল করে ঘুমোবার জন্যে একঘন্টা সময়ও হাতে পাই না৷

একদিন সৌরকরোজ্জ্বল সুপ্রভাতে চাওয়া-চাটা--চাটুজ্জের শ্মশান বৈরাগ্য এল৷ সে ভাবলে--- এতটাকা কিসের জন্যে? আজ অন্ততঃ ভালোমন্দ কিছু খাই৷ জন্মের শোধ খেয়ে নিই৷ সে তখন কম্বাইণ্ড হ্যাণ্ড ভোলাকে ডাকলো৷

চাওয়া--চাটা-চাটুজ্জে খেত পুঁইশাকের চ্চচড়ি আর ভাত৷ পুঁইশাক বাজার থেকে কিনতে যাবে কোন দুঃখে! বাড়ীর উঠোনেই ভোলাকে দিয়ে চাষ করাত৷ ভোলা বাসন মাজত, রান্না করত. ঘরদোর পরিষ্কার করত, বাজারে যেত শপিং করতে  আর পুঁইশাকের মার্কেটিং করতে কারণ তার বাড়ীর উঠোনে যে পরিমাণ পুঁইশাক হত, তা একজনের প্রয়োজনের তুলনায় কিছুটা বেশী৷ ভোলা যাতে বেশী দরে পুঁইশাক বাজারে ৰেচে আসে  তাই ভোলাকে ৰলেছিল---এই পুঁই ৰেচার টাকা থেকেই তোর মাইনে দেব৷

তা সে যাই হোক শ্মশান বৈরাগ্যের দিন  সে ভোলাকে ডেকে বললে---‘দেখ ভোলা, আজ একটু ভালমন্দ খাওয়ার স্বাদ হয়েছে৷  আজ নিয়ে আয় একসের ছানার পোলাও’ ৷

ভোলা আনন্দে আটখানা হয়ে বললে--- ‘এই আনছি কর্ত্তা, এক্ষুনি আনছি! এই গেলুম আর এলুম৷ টাকাটা দিন৷ ’

চাওয়া-চাটা  একটু থেমে বললে--- ‘আচ্ছা দেখ , ছানার পোলাও কেন, আজ ছানার পায়েস খাওয়া যাক৷ এখানে পাওয়া যাবে,  না চন্নগরে যেতে হবে’?

ভোলা বললে--- ‘হ্যাঁ কর্র্ত্ত, এখানেই পাওয়া যাবে৷  খড়োবাজারের একটা দোকানে পাওয়া যাবে’৷

চাওয়া-চাটা বললে--- ‘খড়োবাজার তো এখান থেকে অনেকটা ৷ তবে এক কাজ কর, আজ এক সের ক্ষীরের মালপো নিয়ে আয়৷’

ভোলা বললে---‘এই এক্ষুনি আনছি কর্ত্তা৷ টাকাটা দ্যান৷ আমি দৌড়ুতে দৌড়ুতে  গিয়ে দৌড়ুতে দৌড়ুতে এনে দিচ্ছি’৷

চাওয়া-চাটা বললে--- ‘দেখ সবই তো হ’ল৷ কাগজে বিজ্ঞাপন দেখছিলুম, একটা নোতুন ধরণের মিষ্টি উঠেছে---নাম ‘রসমাধুরী’৷ সে কি আমাদের  চুচড়োর  বাজারে পাওয়া যাবে? ভোলা বললে--- ‘খোঁজ নিয়ে দেখবো,  চুচড়োয় যদি না পাওয়া যায় চন্নগরে তো পাওয়া যাবেই’৷

চাওয়া-চাটা ডান-গালে হাত দিয়ে খানিকক্ষণ ভাবলে.....বাঁ গালে হাত দিতে খানিকক্ষণ কাশল৷ তারপর বললে--- ‘দেখ,  আজ ওসব থাক৷ আজ এক পয়সার প্যাঁজ-ফুলুড়ি নিয়ে আয়৷ পেঁয়াজী আর প্যাঁজ ফুলুড়ির  তফাৎ বুঝিস তো’৷

ভোলা বললে---‘আজ্ঞে না কর্ত্তা’৷

চাওয়া-চাটা বললে --- ‘পেঁয়াজের চেয়ে বেসন একটু বেশী থাকলে  তাকে বলা হয় প্যাঁজ ফুলুড়ি, আর তা ভাজা হয় ছাঁকা তেলে ছানচা দিয়ে৷ আর পেঁয়াজীতে বেশন থাকে নামে মাত্র ভাজা হয় চাটুতে তেল ছিটিয়ে৷ তেলেভাজাওলারা বেশী লাভ করতে গিয়ে অনেক সময় প্যাঁজ-ফুলুড়ির বদলে পেঁয়াজীকেই চালিয়ে দেয়৷  ঠিক দেখে শুনে  আনিস যেন প্রত্যেকটি প্যাঁজফুলুড়িই হয়৷

ভোলা বললে--- ‘আজ্ঞে কত্তা , আপনি লিশ্চিন্ত থাকুন৷ আমি সব দেখে শুনে আনবো’৷

চাওয়া-চাটা বললে--- ‘‘হ্যাঁ, দেখেশুণে আনবি৷ এক পয়সার প্যাঁজ-ফুলুড়িতে আমার                      দু দিনের চারবার জলখাবার হয়ে যায়৷

ভোলা বললে---‘এই যাই কত্তা৷ পয়সাটা দ্যান’৷

চাওয়া-চাটা বললে --- ‘পয়সা! পয়সা দিলে তো সবাই আনতে পারে!  একটা দিন বিনা পয়সায় আনতে পারিস না ?  সবাই চেনা জানা লোক৷ চেয়েচিন্তে এক পয়সার প্যাঁজ-ফুলুড়ি আনতে পারবি না৷’

খানিকবাদে একটা শালপাতা হাতে নিয়ে ভোলা সশরীরে চাওয়া-চাটার সামনে এসে দাড়াল৷ চাওয়া-চাটা শুধোলে---‘‘ কি ব্যাপার ! কি এনেছিস?--- পেঁয়াজী না প্যাঁজ-ফুলুড়ি’’?

ভোলা বললে ‘দোকানদার আমায় বললে, শালপাতায় পেঁয়াজী থাকলে সবাই খায়, কিন্তু পেঁয়াজীর এই শালপাতাটা তোর কত্তাকে খেতে দিগে যা’৷

 

পূজো আসছে

লেখক
আশীষ দত্ত রায়

-এই যে গাইড৷

-কী ব্যাপার সন্ধ্যে রাতে...৷ মনটন খারাপ নাকি?

- আরে শুধু কি মনখারাপ, সঙ্গে বুকের ভিতরটা হু...হু৷

- ও’টা বোধ হয় বাঙলার বাইরে থাকার এফেক্ট৷

- সে’টা ডিনাই করছি না, তবে এ মনখারাপ সে জন্যে  নয় গো৷

-নতুন করে স্মৃতিবেদনা চক্করে পড়োনি তো? শেষ বয়সে এসে অমন একটু আধটু হতেই পারে৷

- তাইই মনে হচ্ছে৷ এ বয়সে নতুন ঐটাই তো অবলম্বন৷ কিছু ওই গৃহপালিত এক্সার সাইজগুলো এন্টারটেনিং হয় বটে৷ এই যেমন ধরো গিন্নী প্রাতরাশের ফল ছুলে দিতে বললে৷ তা দিলাম৷ প্রভাতী চা টা তো করেই থাকি৷ মশারির খোলা ও ভাজ করা৷ পার্ফেক্ট রিদমে৷ সব ক’টা কাজ আমার দৃষ্টিতে নিখুঁত, কিন্তু তার দৃষ্টিতে গোলমেলে৷ কাজের কোনও ছিরি ছাদ নেই৷ তবে নতুন প্রেমের ‘ওগো-হ্যাঁগো-তোমায় ছাড়া দুনিয়া অন্ধকার -গো...ও সব আর এই বয়সে সইবে কেন বলো৷

- তা হলে শাগরেদ, কেন তব এ দুর্মতী?

- জীবনের হাহাকারটা স্পষ্ট হয়ে উঠছে গাইড৷ সে জন্যেই এই কান্দণ

-কী রকম?

- এই যে ধরো পূজো আসছে৷ ছেলেবেলার এক্সাইটমেন্টটা ভাবতে চাইছি কিন্তু কিছুতেই হচ্ছে না৷  ভাবছি এন্তার ঘোরাফেরা, খাওয়াদাওয়া করব৷ লুচি তে সাঁতার কাটব, চপ-ঘুগনিতে বুঁদ হয়ে যাব৷ আর গ্রামে গিয়ে মায়ের হাতের খিচুড়ি লাবড়া.....

ভেবে যেমন আনন্দ হচ্ছে, তেমনি বুক শুকিয়ে যাচ্ছে রিয়েলিটির কথা ভেবে আজকাল সল্টেড বাদাম চিবুলেও বুকজ্বালা৷ কোথায় লুচি ঘুগনি, কীসের চপ? সেই ট্যালট্যালে ডাল আর মিক্সড ভেজিটেবেলই স্বস্তি৷ বড় জোর শেষ পাতে  চাটনি৷ তারপর  ধরো কলকাতার প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরে রাতকাবার করাটা একসময় মনে হত মার দিয়া কেল্লা৷ এখন ভীড় ভাবলেই বুক কেঁপে উঠছে৷ পুজো সংখ্যা হাতে আর পাইনা তাই স্যোশাল মিডিয়াই ভরসা৷ আচ্ছা গাইড, সবই কি ক্লিশে? ও সব কি আর কোনওদিনই ফিরে পাবো না?  আর ভয়ের কথা বুড়িয়ে গেলাম নাকি?

- ক্লিশে উড়িয়ে দেবে বিদগ্দ মানুষজন৷ তোমার আমার সে দায় নেই হে৷ চেনা পরিচিত ভালোলাগাগুলোকে জড়িয়ে ধরব, বুক বাজিয়ে ডিফেণ্ড করব৷ মনের সুখে সে সব ভাবনাগুলোকে আগলে রাখব৷ অতভেবে অফিসের ডেটাবেস সাজিও, বৃষ্টি নামলে মুড়ি আর ভাজাভুজি খোঁজ করাতেই আমাদের মুক্তি৷

তবে ‘পুজো আসছে পুজো আসছে’ করে লাফিয়ে উঠতে পারছি না কেন? কেউ কানের কাছে পুজো-পুজো ঘ্যানঘ্যান করলেই রাগ হচ্ছে কেন? তার ঝুঁটিটা ধরে নাড়িয়ে দিতেই বা ইচ্ছে যাচ্ছে কেন?

- সে’টা ক্লিশে নয় হে৷ বড়জোর আক্ষেপ বলতে পারো৷

- ব্যাখ্যা ? কিন্তু বাংলায়৷

- কিশোর বেলায় পুজোটা তুমি গ্রামের বাড়িতে কাটাতে, তাই না?

-প্রতি বছর৷ উইদাউট ফেল৷ যখন থেকে একা যাতায়াত করতে শিখেছি৷ আহা,  সে কথা মনে পড়ায় ‘পেটে, বুকে  হুহু, চোখে জল সিচুয়েশন হয়ে গেল৷ আর ৰাৰা৷ আর মা ৷ আর খোলা মাঠ মিষ্টি হাওয়া, কুয়োর জল, পাড়ার সে আটপৌরে পুজো৷ আর সেই মানুষগুলো৷ আর সে খিচুড়ি খাওয়া৷ আর ৰাৰা৷ আর মা৷ আর সে দূর থেকে পূজোর অঞ্জলি শুরু ঘোষণা৷ সন্ধ্যের থিয়েটারের আওয়াজ৷ আর কচিকাঁচাদের  মাইকে গিয়ে নিজের কন্ঠস্বর শোনার....৷ আর ইয়ে, দশমীর নারকেলের নাড়ু আর ঘুগনি৷ আর ৰাৰা৷ আর মা৷

-ওয়াটার ওয়াটার এভ্রিহোয়্যার নট আ ড্রপ টু ড্রিঙ্ক৷ চারিদিকে পুজো পুজো ভাব শাগরেদ, অথচ তুমি তোমার পুজোয় ফিরতে পারছ না৷

- ৰাৰা, মা সে পুজো বগলদাবা করে চলে গেল যে৷

- একটা কথা বলি শাগরেদ?

- নিশ্চয়ই গাইড৷

- তোমার ৰাৰা, মা তোমার ভালোবাসার পুজোর স্মৃতি তৈরি করে গেছেন, যে স্মৃতি নেড়েচেড়ে আজও তুমি চাঙ্গা হয়ে ওঠে৷ তাই না? তেমনই, নিজের বুড়োটেপনায় আটকে  না থেকে, অন্য কচিকাঁচাদের হয়ে ভালোবাসার পুজো তৈরির দায়ও তো তোমার ওপর খানিকটা বর্তায়, তাই নয় কি?

- দায়? আছে, তাই না?

- আলবাত৷ আর সে’ টা দায়ভার নয়৷ আমার ধারণা সে’ টাও বেশ তৃপ্তির৷

- গাইড, পুজো সত্যিই চলে এলো৷ তাই না?

- একদম্‌ একদম্‌!

প্রভাত সঙ্গীত প্রসঙ্গে

লেখক
কৌশিক খাটুয়া

জীবজগতের মঙ্গলার্থে

যে গান হয়েছে রচিত,

ভাব-ভাষা-সুর-ছন্দ ও তালে

অজস্র তারা খচিত৷

কোন তারকা বেশি উজ্জ্বল

প্রথমে খুঁজিয়া হয়েছি পাগল

অযথা সময় বৃথা ব্যায়

কেন মোর তরে সব রচিত

সর্বস্তরের মানবসমাজে,

গুনীজনে বহু চর্চিত৷

বিশ্ব যখন নিদ্রা মগন

প্রভাত সঙ্গীতে হয় জাগরণ,

এত সম্ভার দিলে উপহার

তাহাতে ভ্রমিনু আমরন,

ছন্দ ও সুর বোঝেন বিজ্ঞ

প্রাজ্ঞ সমাজ, সঙ্গীতজ্ঞ,

আমারতো শুধু গান-সমুদ্রে

নিত্য অবগাহন,

তোমার গানের ডালি নিয়ে

আমি তোমায় করেছি স্মরণ৷

অব্যক্ত মোর মনের কথাটি

লিখিত রয়েছে গানের ভাষায়,

নিরাশ মনের  অন্তরালে

প্রদীপ্ত হই সুপ্ত আশায়৷

নীলসায়রের কনক কমল

ভরিয়ে দিয়েছে শিশু মহল,

বৈচিত্র্যের সমাহারে,

সমৃদ্ধ হয় ঋতু পর্যায়,

অনুভবে পাই ষড় ঋতু

উষ্ণ-শীতল, উদাসী হাওয়ায়৷

মুখ-নিঃসৃত যে অমৃতবাণী

সুর-মিশ্রণে আনে মূর্চ্ছনা,

সে বাণী তোমায় নিবেদন করে

তারপর শুরু পূজা-অর্চনা৷

ভক্ত-ভগবানের প্রেম-বন্ধন

নিবিড় করেছে প্রাণ-স্পন্দন

কেন আগমন কোথায় গমন

তুমি দাও তার দিক-নিদর্শন,

তোমার ভাষায় সুরের মায়ায়

পেয়েছি আলোর বিবরণ৷

শোষণ-বঞ্চনা-হাহাকার নয়

সোনালী ভোরের আশ্বাস,

মেঘ-উদ্বেগ দুই কেটে যায়

মনে প্রাণে করি বিশ্বাস৷

একতার বাণী গানে গানে আনি

প্রীতি ভরা থাক নিখিল সমাজ,

পৃথক কোথায় বল

সুখ-সন্ধানে তৃপ্তি বিরাজ?

গানের ভাষায় বর্ণিত হলো

ভাগবত দর্শন,

গানের ভাষায় করুণাময়ের

আশীর্বাদ বর্ষন৷

তোমার প্রীতিতে ভরা আছে ধরা

ভরা আছে যত চন্দ্র, সূর্য্য, তারা,

তব সঙ্গীত তোমায় শুনাই,

তুমি শ্রোতা, রচয়িতা, তুমি সুমহান,

সঙ্গীতে আছো, অন্তরে আছো৷

আছো বিশ্ব ব্যাপীয়া, তোমায় প্রণাম৷

কালো বাড়ি

লেখক
কৃষ্ণা হোমরায়

একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই শঙ্খর ফোন৷

–মিস্, তুমি কি করছো?

–আমি এই তো সবে ঘুম থেকে উঠলাম৷

–এত দেরীতে তুমি ঘুম থেকে ওঠো?

–না, বাবা, আজতো স্কুল ছুটি৷ তোমাদের পড়াতে যাব না৷ তাই একটু দেরী করে উঠলাম৷ এবার বলো তো–তুমি কেন এতো সকালে ফোন করলে? কোন দরকার আছে?

–হ্যাঁ, আমি একটা ছবি এঁকেছি৷ তোমায় দেবো৷

–বেশ তো৷ কাল স্কুকলে দিয়ে দিও৷

–না না, কাল তো আমি স্কুলে যাবো না৷ তুমি একটু কষ্ট করে আমাদের বাড়িতে আসবে৷ তাহলে তোমার হাতেই ছবিটা দিয়ে দেবো৷ এসো না মিস৷ প্লি–জ একটুখানির জন্যে এসো আমাদের বাড়ি৷

–ঠিক আছে দেখছি৷

ফোনটা রাখার পর আমার মনে হলো, শঙ্খ বেশ কিছুদিন ধরে স্কুলে আসছে না৷ বাড়ি থেকে জানিয়েছে শরীর ভালো নেই৷ আণ্ডার মেডিকেল ট্রিটমেণ্ট৷

ব্যাপারটা ওই পর্যন্ত মাথায় রেখেই আমি ক্লাসের অন্যান্য বাচ্চাদের দিকে নজর দিচ্ছিলাম৷ শঙ্খর ব্যাপারটা নিয়ে আলাদা করে ভাবিনি কিছু৷ আজ শঙ্খর ফোন পেয়ে মনে হলো খুব বড়ো অন্যায় করে ফেলেছি আমি৷ শঙ্খ হাজার হলেও আমার ক্লাসের ছাত্র৷ হোক নার্সারির ছাত্র তবু তো আমার খোঁজ নেওয়া উচিত ছিল–কেন শঙ্খ এতদিন স্কুলে আসেনি৷ কি অসুখ হয়েছে৷ আঃ হাঃ এতো বড়ো ভুল আমি করলাম কি করে৷

না, আজ একবার শঙ্খর বাড়িতে যেতেই হবে৷

দুপুরের দিকে খাওয়া দাওয়া সেরে ঠিক তিনটে নাগাদ রওনা হলাম যাদবপুরের দিকে৷ গল্ফ গ্রীণে শঙ্খদের বাড়ি৷ বাবা–মা’র একমাত্র ছেলে শঙ্খ৷ ভারি মিষ্টি দেখতে৷ একেবারে ধপধপে গাবলু গাবলু চেহারা নয়৷ শ্যামলা, দোহারা, একটু লম্বাটে গোছের গড়ন৷ চোখ দুটো ভারি সুন্দর৷ এককথায় শঙ্খ আর পাঁচটা সাধারণের থেকে আলাদা৷ দশজনের মধ্যে মিশে থাকলেও আগে নজরে পড়ে যায়৷

বিকেলের রোদ তখন তেরছাভাবে গল্ফগ্রীণের রাস্তায় পড়েছে৷ শঙ্খদের বাড়িটা যেদিকে সেদিকে রোদের তাপ কমে এসেছে৷ হালকা হাওয়া বইছে৷ সন্ধ্যের সাঁঝবাতি তখন আকাশের গায়ে জ্বলে উঠেছে৷

শঙ্খদের ঘরটা দোতলায়৷ সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতেই শঙ্খর মায়ের সঙ্গে দেখা হলো৷ উষ্ণতায় ভরা অভিনন্দনে বলে উঠলেন–শঙ্খ, দেখো মিস্ এসেছেন৷ শঙ্খ ঘরের ভেতর থেকে উত্তর দিলো মিস্ তুমি লাল পরদাটা সরিয়ে আমার ঘরে এসো৷ আমি এইঘরে আছি৷

লাল পরদা সরিয়ে শঙ্খর বিছানায় বসলাম৷ শঙ্খ তখনো মাথা নীচু করে রঙ লাগিয়ে চলেছে৷ মুখ না তুলেই বললো মিস্ তুমি একটু বসো, আমি বাড়িটা কমপ্লিট করে নি৷

শঙ্খর খাতার দিকে তাকিয়ে দেখলাম–ও একটা বাড়ি এঁকে কালো রঙ করছে৷ বাড়িটার সামনে ছোট্ট গুড়ি–পথ৷ বাদামী রঙের বেড়া দিয়ে পুরো বাড়িটায় বাউণ্ডারি ওয়াল করেছে৷ বাড়ির পিছনে সবুজ রঙের গাছ৷ সম্ভবত তাল গাছ এঁকেছে৷ বাড়িটায় জানলা দরজায় সাদা রঙ৷

আমি অবাক হয়ে শঙ্খকে জিজ্ঞেস করলাম৷ তুমি কালো রঙের বাড়ি এঁকেছো কেন?

শঙ্খ জবাব দিল–মিস্ জানো, এই কালো বাড়িটায় আমি থাাকবো৷

আমি বুঝলাম ওর শিশুমনে যে রঙ লেগেছে ও তাই দিয়ে বাড়িটা রঙ করেছে৷ মুখে

যা ভাবছ তা নয়

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

‘মৃগী’ শব্দের একটি অর্থ হচ্ছে একটি স্নায়ু–সংক্রান্ত মানসিক ব্যাধি, ইংরেজীতে ন্দ্বহ্মন্প্তন্দ্বহ্মব্দ্৷ যদি কোনো কম বয়সের ছেলে বা মেয়ে হঠাৎ কোনো অভাবনীয় কিছু দেখে বা শোনে তাহলে অনেক সময় তার স্নায়ুর ওপর বা মনের ওপর হঠাৎ একটা ৰড় রকমের চাপ এসে পড়ে৷ সেই চাপ সে যদি সহ্য করতে না পারে তখন তার এই  মৃগী রোগ দেখা দেয়৷ যেমন ধরো, একটি ১২/১৪ বছরের ছেলের ধারণা ছিল, অমুক লোকটি কোনো নেশার ধারেকাছে যান না৷ হঠাৎ সে দেখলে সেই সংশ্লিষ্ট লোকটি বোতলের পর বোতল মদ খাচ্ছে৷ ফলে তার আগেকার ধারণার ওপর বিরাট একটা হাতুড়ির আঘাত লাগল৷ এর ফলে তার মৃগী রোগ দেখা দিতে পারে৷ কোনো একটি ছেলের ধারণা ছিল যে সে সদ্বংশজাত কিন্তু হঠাৎ সে শুনতে পেলে তার বংশ পরিচয় নেই৷ এই অবস্থায় তার মৃগী রোগ দেখা দিতে পারে৷ মৃগী রোগীর জীবনে স্নায়ুতন্তুর ওপর হঠাৎ কোনো আরামদায়ক পরিস্থিতি এলেই রোগ ফুটে ওঠে৷ কোনো মৃগী রোগীর অনেকক্ষণ ধরে মূত্র ত্যাগের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে৷ কিন্তু উপযুক্ত স্থান না পাওয়ায় মূত্র ত্যাগের সুযোগ পায়নি৷ এখন সে যখন মূত্র ত্যাগের সুযোগ পায় তখন তার স্নায়ুতে একটা আরামের অবস্থা আসে৷ এমন সময় মৃগী রোগী মূত্র ত্যাগ করতে করতে রোগগ্রস্ত হয়ে পড়ে যায়৷ কোনো মৃগী রোগী হয়তো দারুণ গরমে কষ্ট পাচ্ছে, এমন সময়ে সেই কষ্ট থেকে বাঁচার জন্যে সে পুকুরে বা নদীতে স্নান করতে গেল৷ জলের সংস্পর্শে এসে তার আরাম ৰোধ হল৷ এমন অবস্থায় রোগগ্রস্ত হয়ে সে জলে পড়ে মৃত্যুমুখে পতিত হতে পারে৷ এই কারণে কোনো মৃগী রোগীকে একলা কখনই কোনো জলাশয়ে স্নান করতে যেতে দিতে নেই৷

‘মৃগী’ প্রসঙ্গে একটা গল্প মনে পড়ল৷ একবার কৃষ্ণনগরের এক পাঁড় মাতাল ৰেশী মদ খেয়ে বেসামাল হয়ে রাত্তিরটা নালীতে শুয়ে কাটালে৷ শেষ রাতের মিষ্টি মিষ্টি ফুরফুরে হাওয়া ও ঠান্ডা নালীর জলের মধুর স্পর্শে তার নেশার ঘোর যখন কিছুটা কেটে গেল সে চোখ মেলে চেয়ে দেখলে তাকে ঘিরে লোকের ভীড় জমেছে৷ তার তখন একটু একটু লজ্জা করতে লাগল৷ সে আবার চোখ বুজে ফেললে৷ খানিক বাদে আবার সে চোখ খুলে চাইল৷ চেয়ে দেখলে ভীড়ের লোকেদের ভেতর তার বেয়াই মশায়ও (বৈবাহিক) রয়েছেন৷

এবার তার লজ্জার মাত্রা গেল আরও ৰেড়ে৷ বেয়াই তাহলে আসল ব্যাপারটা জেনেই ফেলেছে৷ এবার কী হবে সে তখন বেয়াইয়ের দিকে চেয়ে বললে–বেয়াই, ও বেয়াই, বেয়াই গো, শুনছ, তুমি যা ভাবছ এটি তা নয়–এ আমার মৃগী রোগ৷

(শ্রীপ্রভাতরঞ্জন সরকারের ‘গল্প সঞ্চয়ন’ থেকে)

সুন্দরবন কেন সুন্দরবন

লেখক
প্রণবকান্তি দাশগুপ্ত

বাঙলায় দক্ষিণে অবস্থিত সমুদ্র উপকূলবর্তী জঙ্গলময় ভূখণ্ডকে বলে সুন্দরবন৷ এ বনের নাম যে সুন্দরবন হল তার কোন মানে খুঁজে পাওয়া যায় না৷  এখানে না আছে ফলবান বৃক্ষ, না আছে পুষ্পতরু৷ যে সব ফল এখানকার গাছে হয় তার বেশির ভাগই মানুষের খাওয়ার অযোগ্য৷ এ বনে অশ্বত্থ বট ইত্যাদি স্নিগ্দ সুনিবিড় ছায়া সৃষ্টিকারী বৃক্ষের সমাবেশ দেখা যায় না৷ নিবিড় কন্টকাকীর্ণ কর্দমাক্ত, হিংস্র জন্তু জানোয়ারে পরিপূর্ণ দুর্গম এই বনের নাম তবু সুন্দরবন৷  কিন্তু কেন? সুন্দরবনে প্রচুর সুন্দরী বৃক্ষ জন্মায়৷ এই সুন্দরী বৃক্ষের কাঠের রঙ লাল৷ তাই দেখতেও সুন্দর৷ এই সুন্দরী বৃক্ষের আধিক্য হেতুই বনের নাম হয়েছে সুন্দরবন৷  অনেকে আবার এ ব্যাখ্যা মানেন না৷ তাঁদের মতে সুন্দরবনের সর্বত্র এই সুন্দরী বৃক্ষের অস্তিত্ব নেই৷ তাই সুন্দরী বৃক্ষের মধ্যে সুন্দরবনের নামের উৎস খুজতে যাওয়া নিরর্থক৷ তাঁরা বলেন, সমুদ্রবন থেকে ‘সুন্দরবন’ নামের উৎপত্তি৷ সাধারণ লোক সমুদ্রকে সমুন্দর বলে৷ ‘সুন্দরবন’ এই সমুদ্রবনেরই অপভ্রংশ৷ আবার এরকম মতও শোনা যায় যে, পূর্বে বাখরগঞ্জ জেলা ছিল চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের অন্তর্গত৷ চন্দ্রদ্বীপের বনভূমিকে বলা হত চন্দ্রদ্বীপ বন৷ এই ‘চন্দ্রদ্বীপ বন’ থেকে হয়েছে ‘চন্দ্র বন’ ‘চন্দ্রবন’ থেকে ‘সুন্দরবন’৷

বিভারিজ সাহেব বলেন অন্য কথা৷ বাখরগঞ্জ জেলায় ‘সুগন্ধা’ নামে একটি নদী আছে৷ এই সুগন্ধাই লোক মুখে হয়েছে ‘সুন্ধা’ এই সুন্ধার তীরের বনভাগই ‘সুন্ধার বন’ ধীরে ধীরে উচ্চারণ বৈষ্যম্যের ফলে ‘সুন্দরবন’৷ কিন্তু সুন্দরবনের সম্পূর্ণ অঞ্চলটাই তো আর সুগন্ধা নদীর তীরে নয়৷ এই সুন্দরবন পশ্চিমে ভাগীরথীর মোহানা থেকে পূর্বে মেঘনার মোহানা পর্যন্ত বিস্তৃত৷ প্রকৃতপক্ষে গঙ্গা ও মেঘনার অন্তর্বর্তী ভূভাগই ‘সুন্দরবন’ নামে পরিচিত৷ পূর্ব-পশ্চিমে সুন্দরবনের দৈর্ঘ্য ১৬০ মাইল৷ উত্তর-দক্ষিণে প্রস্থ পশ্চিম দিকে ৭০ মাইল থেকে পূর্ব দিকে অনধিক ৩০ মাইল৷ গড় বিস্তৃতি ৫০ মাইল৷ অতএব, সুন্দরবন অঞ্চলটা হল ৮০০০ (আট হাজার) বর্গ মাইল৷ এই আট হাজার বর্গ মাইল বন নিশ্চই সুগন্ধা নদীর তীরে অবস্থিত নয়৷ তাই সুগন্ধা নদীর সঙ্গে সুন্দরবনের নাম জড়ানো সমীচীন হবে না৷

বরং সুন্দরী বৃক্ষ সুন্দরবনের সর্বত্র প্রচুর সংখ্যায় না পাওয়া গেলেও অল্প-বিস্তর সবখানেই এই বৃক্ষ জন্মায়৷ তদুপরি এই বৃক্ষের কাঠ অত্যন্ত শক্ত ও ভারী৷ ফলে মূল্যবান৷ এই বৃক্ষ খুব লম্বা---বেশি ডালপালা হয় না৷ সুন্দরী কাঠে গৃহের  আসবাবপত্র ও  নৌকা তৈরী হয়৷ এই কাঠ সুন্দরবনের একটি প্রধান অর্থকরী সম্পদ৷ অতএব,এই সুন্দরী বৃক্ষের জন্যই এই বন-ভাগের নাম  সুন্দরবন হয়েছে---একথা আমরা সহজেই বিশ্বাস করতে পারি৷