প্রভাতী

কাঁচা বেঁশো হ্যাংলামি

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

‘ক্রুড্’ ধাতুর একটি অর্থ ‘হ্যাংলামি করা’ বা ‘ন্যালা খ্যাপামি করা’ –কাঁচা বাঁশের মত হ্যাংলামি বা ন্যালা খ্যাপামি যা শুণলেই বোঝা যায়, দেখলেই ধরা যায় অথবা এমনও কেউ কেউ থাকে যারা ধরা পড়বার জন্যেই এই রকম হ্যাংলামি বা ন্যালাখ্যাপামি করে থাকে৷ যেমন নেম্তন্ন বাড়ীতে তোমার আরও কয়েকটা রসগোল্লা খাবার ইচ্ছে হল৷ তুমি পাশের ভদ্রলোকটির পাত দেখিয়ে বললে......ও দাদা, এদিকে, এদিকে, এঁর পাতে কয়েকটা রসগোল্লা দিন৷

রসগোল্লা পরিবেশনকারী কাছে এলে তাকে বললে–আমায় আর দেওয়া কেন আমার পাতে পরে দেবেন (আসলে পরিবেশনকারী তাকে দিতে আসেন নি, এসেছিলেন পাশের লোকটিকে দিতে)৷ পরিবেশনকারী দিতে গেলে বললে–না, আমার আর চাই না, পেট ভরে গেছে৷ আবার হ্যাংলামি করে বললে–তা দেবেন যখন অন্ততঃ চারটে দিন৷ একগণ্ডার কমে কি ভাল দেখায় এতে পরিবেশনকারী বুঝে নিলেন, যিনি পরিবেশনকারীকে ডেকেছিলেন তাঁরই রসগোল্লা দরকার......আর চারটে দরকার৷ এই ধরণের হ্যাংলামির জন্যে ক্রুড/ক্রুড়, শব্দটি চলবে৷ চলবে ক্রুূযৎ ঞ্চ ক্রড্য শব্দটিও (ক্রুড়া হয় না)৷ একবার দেখেছিলুম জনৈকা মহিলা–তিনি ছিলেন একজন মস্তবড় অফিসারের মাতাঠাকুরাণী–একজন মধ্যবিত্তের বাড়ীতে গিয়ে তার লক্লকে লাউগাছটি দেখে বলেছিলেন–লাউ–এর ডগাগুলো ভারী সুন্দর দেখাচ্ছে তো৷ পোস্ত–বাটার সঙ্গে লাউডগা সেদ্ধ খেতে খুব ভাল লাগে৷ চাকরটাকে রোজই বাজারে পাঠাই৷ এসে বলে বাজারে আজকাল লাউডগা পাওয়া যাচ্ছে না৷ লাউডগা–পোস্ত সেই যে কোন মান্ধাতার আমলে খেয়েছিলুম, আজও যেন জিবে লেগে আছে৷ লাউ–ডগার মালিক কি আর করেন মহিলার সঙ্গে কিছু লাউডগা পাঠিয়ে দিলেন৷ যাই হোক, এই কাঁচাবেঁশো হ্যাংলামি ভালভাবেই বুঝলে৷ সুতরাং ওই হ্যাংলা মহিলা হচ্ছেন ‘ক্রুড্যা’৷

আমার পরিচিত ভোলা মোড়লের ভাল রকমের বেগুনের চাষ ছিল৷ বর্ষার শেষে একদিন সে তার বেগুনবাড়ী থেকে বছরের প্রথম ফসলটি তুলে নিয়ে বাড়ীর দিকে যাচ্ছিল৷ আশা করেছিল, বর্ধমানের বাজারে নতুন মুক্তকেশী বেগুনের ভালই দর পাবে........তার একটু টেনেটুনে সংসার চলত৷ রাস্তায় সে পড়ে গেল হরু ভটচাজের খপ্পরে৷ হরু ভট্চাজ্ বললে–কি রে ভোলা, আজকাল তোর দেমাগে যে মাটিতে পা–ই পড়ে না৷ বামুন–বোষ্টমের প্রতি শ্রদ্ধাভক্তি হারালে ফল কি ভাল হয়? জানিস তো মাথার ওপর নারায়ণ রয়েছেন৷ তিনি আমাকেও দেখছেন, তোকেও দেখছেন, বেগুনগুলোকেও দেখছেন৷ যাই হোক, বেগুনগুলো বেশ তেল কুচকুচে৷  কম আঁাঁচে পোড়াতে গেলে গায়ে তেলও মাখাতে হবে না৷ তা তু’ এক কাজ কর গা৷ আমাকে বেগুনগুলো দিতে হবে না৷ তু’ ওগুলো পুড়িয়ে যেন আমার প্রসাদ খাচ্ছিস ভেবে নিজেই খা গা যা৷ ভোলা মোড়ল আর কি করে তার বুকের পাঁজর–ভাঙ্গা আট–দশটা বেগুন হরু ভটচাজকে দিয়ে দিলে৷ এই হরু ভটচাজ ছিল একটি নির্ভেজাল ‘ক্রুডা’৷

কোন একটা বিয়ে বাড়ীতে ভিয়েন বসেছে৷ অনিমন্ত্রিত পুণ্ডরীকাক্ষ ভট্টাচার্য্য হঠাৎ সেখানে পৌঁছে গেলেন৷ পুণ্ডু ভট্চাজ্ ছিলেন আমাদেরই বর্ধমান জেলার পুতুণ্ডু গ্রামের বাসিন্দে৷ মস্ত বড় ভিয়েন, কলকাতা থেকে বাছাইকরা হালুইকারেরা এসেছে৷

পুণ্ডু ভটচাজ্ বললেন–খাওয়াদাওয়ায় আমার তেমন আগ্রহ নেই৷ কিন্তু রান্নাবান্না দেখতে বড্ড ভালবাসি.....সেই ছোটবেলাকার স্বভাব৷

সবাই বললে–এসো,এসো, বসো, বসো৷ দেখো, কেমন খাবার তৈরী হচ্ছে৷

দেখে বোঝা গেল হালুইকারেরা খুব উন্নত মানের চমচম*(*সংস্কৃতে ‘চম্’ ধাতু হল গোগ্রাসে গিলে খাওয়া৷ একপক্ষের সৈন্য অন্য পক্ষের দেশে গিয়ে সব কিছুকে গোগ্রাসে গিলে খায়৷ এই অর্থে চম্ ধাতুূউস্ প্রত্যয় করে ‘চম্’ শব্দটি পাচ্ছি৷ ‘চমু’ মানে সৈন্যবাহিনী৷ ‘চমূড্ণ্’ করে ‘চম্’ শব্দটি পাচ্ছি, অর্থাৎ যা দেখে গোগ্রাসে গিলে খেতে লোকের ইচ্ছে হয়৷) তৈরী করছে৷ পুণ্ডু ভট্চাজ্ আর নোলা সামলাতে পারছে না৷ প্রাণে আকুতি জেগেছে, চমচম একেবারে খোলা থেকে নোলায় চলে আসুক৷ সে তখন স্বগতভাবে বললে, (বললে এমন ভাবে যাতে আর পাঁচটা লোকের বধির কর্ণেও তা প্রবেশ করে)–এককালে চমচম খেতে খুবই ভালবাসতুম৷ কবে সেই খেয়েছিলুম.......বাহাৰপুরের ঘোষেদের বাড়ীতে৷ এখনও যেন ভুলতে চাইলেও ভুলতে পারছি না৷ মন বারে বারে সেই চমচমে ফিরে যেতে চায়৷ এখন দু’চারটে চাখতে পারতুম কিন্তু সন্ধ্যে হয় হয়৷ সন্ধ্যে আহ্ণিক না করে খাই বা কি করে– তিন কাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে–সে কথাও ভুলি কি করে৷

হালুইকারেরা বললে–সন্ধ্যে হতে এখনও একটু দেরী আছে৷

পুণ্ডু ভটচায্ আকাশের দিকে তাকিয়ে বললে–হ্যাঁ মনে হয় আধঘন্টাটাক সময় আছে৷

হালুইকারেরা বললে–তৰে দুটো সন্দেশ চেখেই দেখুন৷ আমার মনে হয় গণ্ডাখানেক চেখে নিয়ে হাত মুখ ধুয়ে ফেলাও সম্ভব৷

হালুইকারেরা কি আর করে পুণ্ডু ভট্চাজ্কে একটা শাল পাতায় মুড়ে চারটে চমচম দিলে৷ এও সেই কাঁচা বেঁশো হ্যাংলামি৷ পুণ্ডুরীকাক্ষ ভট্টাচার্য হলেন একটি ডাকসাইটে ‘ক্রুড্ড’৷ যাই হোক, তোমরা ‘ক্রুড্’ ধাতুর রকমারি ব্যবহার দেখলে তো৷      (শব্দ চয়নিকা)

কান্ত কবি রজনীকান্ত

লেখক
প্রণবকান্তি  দাশগুপ্ত

১৯০৫ সাল৷ ভারতের বড় লাট তখন লর্ড কার্জন৷ তিনি বাঙলাকে দুইভাগে ভাগ করলেন৷ ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও আসামকে একটি নতুন প্রদেশে পরিণত করলেন৷ উক্ত প্রদেশের নাম হ’ল পূর্ববঙ্গ ও আসাম৷ তারজন্য আলাদা শাসনকর্তা নিযুক্ত হ’ল৷ সেই সময় বিহার ও উড়িষ্যা বাঙলার শাসনকর্তার দ্বারা শাসিত হতো৷ সেই অজুহাতে শাসন কার্যে নাকি নানারকম অসুবিধা হতো৷ তাতে শাসন কার্যের সুবিধার্থে বাঙলাকে ভাগ করা হ’ল৷ তখন বাঙলার জাতীয়তাবাদী নেতারা এই বিচ্ছেদের বিরুদ্ধে আপত্তি তোলেন৷ সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় শুরু করলেন প্রবল আন্দোলন৷ বড়লাট যখন বললেন'Partition of Bengal is a settled fact'.’ উত্তরে সুরেন্দ্রনাথ বললেন, 'I will unsettled the settled fact.’ সারাদেশ জুড়ে দেখা দিল প্রবল উত্তেজনা৷ শুরু হ’ল অত্যাচার নির্যাতন আর নির্বিচার ধরপাকড়৷ তথাপি জাতীয় চেতনায় সমগ্র দেশ উত্তাল৷

প্রত্যেক দেশবাসী বিদেশী পণ্য বর্জন করতে লাগলো৷ কোলকাতার স্কুলের ছেলে মেয়েরা মিছিল বের করে গান গাই্‌তে গাইতে চললো৷

‘‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড়

মাথায় তুলে নেরে ভাই

দীন-দুঃখিনী মা-যে তোদের

তার বেশি আর সাধ্য নাই৷

কচি কচি ছেলে মেয়েদের মিষ্টি গলার করুণ সুরে আকাশ বাতাস মুহ্যমান৷ মিছিলের পুরোভাগে চলেছেন এক খ্যাতনামা কবি৷ তাঁরই লেখা  এই গান ৷ সেদিন স্বরচিত স্বদেশী গান শুনে তিনি আবেগে কেঁদে ফেলেছিলেন৷

এই কবিই হলেন কান্তকবি রজনীকান্ত সেন৷ পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জ মহকুমার ভাঙাবাড়ি নামক গ্রামে ১৮৬৫ খৃষ্টাব্দের ২৪ জুলাই সম্ভ্রান্ত বৈদ্যবংশে তাঁর জন্ম হয়৷ পিতার নাম গুরুপ্রসাদ সেন, মাতা মনোমোহিনী দেবী৷ ১৮৯১ সালে বি.এল পাশ করে রাজশাহী কোর্টে ওকালতি শুরু করেন৷ বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় তাঁর রচিত গান দেশবাসীর মনে প্রচুর উদ্দীপনা সঞ্চার করেছিল৷ তাঁর মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নেরে ভাই’ অতুলনীয় জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল৷ ‘বাণী’, ‘কল্যাণী’ ইত্যাদি তাঁর কাব্য ও সঙ্গীত গ্রন্থ৷ তিনি ‘কান্তকবি’ নামেই লোক সমাজে সমধিক প্রসিদ্ধ ছিলেন৷

প্রাউট সঙ্গীত

লেখক
সাক্ষীগোপাল দেব

ঘরেতে তোমার লেগেছে আগুন

ঘুমায়ে রবে কি আজও

জাগো বাঙালী থেকোনা ঘুমায়ে

যুদ্ধের সাজে সাজো৷৷

 

শত্রুরা আজ ঘিরেছে তোমায়

সংগ্রাম ছাড়া আর পথ নাই

দুনিয়া জুড়ে দাঁড়াও ঘুরে

বজ্র আওয়াজে বাজো৷৷

 

তোমার তুলনা তুমি হে বীর

হিমালয়সম উন্নত শির

গৌরবময় ইতিহাস তব

নিজ গৌরবে বিরাজো৷৷

ঝর ঝরিয়ে বৃষ্টি এলো

লেখক
কৌশিক খাটুয়া

ঝর ঝরিয়ে বৃষ্টি এলো

শয্যা নেওয়ার সময়৷

আবহাওয়া শীতল হলো

সুনিদ্রা নিশ্চয়৷

সারাদিনের গুমোট আর

গোমড়ামুখো মেঘ,

স্বপ্ণ-রঙ্গীন নিদ্রা আশ্বাসে

কাটলো উদ্বেগ৷

 

(২)

জীবনটা নয় সংকীর্ণ

এক উদার মহাকাশ,

সেই মহাকাশ

কখনো শুভ্র কখনো কৃষ্ণ

অথবা নির্মল নীলাকাশ৷

                        অনন্ত নীলাকাশে

                        রবি-শশী-তারা হাসে,

                        উদার হৃদাকাশে

                        তাঁর ছবি সদাভাসে৷

নিষ্কাম প্রার্থনা

লেখক
সমরেন্দ্রনাথ ভৌমিক

‘‘প্রার্থনা অর্চনা মাত্রৈব ভ্রম্‌মূলম্‌৷

একথা শিখায়েছে তব আনন্দসূত্রম্‌৷৷

জেনেও ভ্রম্‌ তোমা কাছে ক’রি তবু প্রার্থনা৷

দিওগো মোরে শুধু অনুপম তব কৃপাকণা৷৷

অন্তর মাঝে স্মরি যেন শুধু তোমারেই দিবারাত্রি৷

রেখো গো  সদা আমারে ক’রে তোমার রথের যাত্রী৷

তোমারই দেওয়া কন্ঠে সুরে  ডাকি সদা তোমারে৷

প্রার্থনা শুধু প্রভু, তোমার ক’রে নাওগো আমারে৷৷

তোমা হ’তে লভিয়াছি এই মানব জীবন৷

শুভ কাজে সদা লিপ্ত রেখো অনুক্ষণ৷৷

চাহিনা অন্যকিছু, চাই শুধু পরা ভক্তি৷

আকুল হ’য়ে ডাকি তোমায় দাও তব কাজে শক্তি৷৷

নাছোড়বান্দা চাটুকার

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

পৃথিবীর সব দেশেই, এমনকি সব শহরেই কিছু সংখ্যক খুশামুদে ও উন্নত মানের অনারারী

মুসাহিৰ আছে ৷ মাইনে পাওয়া মুসাহিৰদের চেয়েও অনারারী মুসাহিৰেরা আরও ৰেশী মুসাহিৰী করে থাকে৷ একটা গল্প বলি শোনো –

সে আজ প্রায় ৪০–৪৫ বছর আগেকার কথা৷ আমাদের শহরে একজন নামজাদা ডাক্তার ছিলেন৷ ধরো, তাঁর নাম অরুণ বাঁড়ুজ্জে৷ ডাঃ বাঁড়ুজ্জের যেমন ছিল হাত–যশ, তেমনি ছিল পসার৷ রোজগার করতেন দু’হাতে, দান–ধ্যানও করতেন দু’হাতে৷ এই অমায়িক পরোপকারী মানুষটির দরজা থেকে কোনো অভাবী মানুষকেই কখনও নিরাশ হয়ে ফিরতে হত না৷ স্বাভাবিক নিয়মেই তাঁকে ঘিরে তৈরী হয়েছিল একটি খুশামুদে–চক্র৷ তিনি পসন্দ না করলেও এই খুশামুদেদের মধ্যেও কয়েকজন ৰেশ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ও দক্ষ মুসাহিৰ ছিলেন৷

ডাঃ বাঁড়ুজ্জে ছিলেন খুবই মাতৃভক্ত৷ শিশুপুত্রকে নিয়ে বিধবা হয়ে তাঁর মা কায়ক্লেশে পুত্রকে মানুষ করে তুলেছিলেন৷ একথা ডাঃ বাঁড়ুজ্জে সবাইকে বলতেন৷

ডাঃ বাঁড়ুজ্জের মায়ের বাড়াবাড়ি অসুখ৷ ডাক্তারেরা জৰাব দিয়ে গেছেন৷ তাঁরা বলেছেন–রোগিণী ৰড় জোর আর দিন দু’য়েক বাঁচতে পারেন৷ ডাঃ বাঁড়ুজ্জে সেবা–যত্নের কোনো ত্রুটি করছেন না৷

কাগে–কোকিলে মুসাহিৰদের কানে খবরটা তুলে দিলে৷ তারা কাঁদতে কাঁদতে দৌড়তে দৌড়তে ডাঃ বাঁড়ুজ্জের বাড়ী ঘিরে ভীড় জমাতে লাগল৷ কেউ বললে–মাসীমা এমন ভাবে আমাদের ফেলে চলে যাবেন এ আমরা স্বপ্ণেও ভাবিনি৷ কেউ বললে–মাসীমা আমাদের মায়া কাটিয়ে চলে যাচ্ছেন এ যে দুর্বিষহ৷ ডাঃ বাঁড়ুজ্জে আস্তে আস্তে বললেন–আমার মা’কে আগে মরতে দিন৷ কেউ বা কোমরে গামছা ৰেঁধে, হাতে বাঁশ–কাটারি–দড়ি নিয়ে উপস্থিত হয়ে বললে–মাসীমা ছিলেন সত্যিই পুণ্যশ্লোকা৷ এরকম মহীয়সী মহিলার কথা আমরা কোনো বইয়েই পড়িনি, আর কখনও কারো মুখেও শুনিনি৷ ডাঃ বাঁড়ুজ্জে আবার আস্তে আস্তে বললেন–আমার মা’কে আগে মরতে দিন৷ যেসব মুসাহিৰ একটু পেছিয়ে পড়েছিল অর্থাৎ একটু বিলম্বে খবর পেয়েছিল তারা তাদের আফশোষ  পুরো করে নিতে কসুর করলে না৷ কেউ বললে– মাসীমা যেমন ছিলেন তাতে তাঁর গতি শিবলোকেই হবে৷ কেউ কেউ উৎসাহের আধিক্যে বলে ফেললে–গত মাসের ৪০টা দিনই আমি তাঁকে একাদশী করতে দেখেছি৷ কেউ বা বললে–তাঁর গতি অবশ্যই বৈকুণ্ঠে৷ শিবলোকে গিয়ে তিনি হৰিষ্যি খেতে যাবেন কোন্ দুঃখে বৈকুণ্ঠে গিয়ে পোলাও–কালিয়া খাবেন৷ কেউ বা বললে–একজন জ্যোতিষী আমাকে বলেছিলেন, মাসীমার জন্যে গোলোকধামে একটা স্থান নির্দিষ্ট করে রাখা আছে৷

ডাঃ বাঁড়ুজ্জে আর সহ্য করতে পারছিলেন না৷ তিনি বললেন–আপনারা কথাবার্ত্তা বলুন, আমি এক্ষুনি আসছি৷ মুসাহিৰদের দল হাঁ হাঁ করে উঠে বললে–সে কী কথা সে কী কথা আপনি কোথায় যাবেন যাবার জন্যে তো আমরা তৈরী হয়েই এসেছি৷ ডাক্তারবাবু ওদের কবল থেকে উদ্ধার পাবার জন্যে বললেন–আপনারা কথাবার্ত্তা বলুন, আমি একটু বাথরুম থেকে আসছি৷ মুসাহিৰের দল সমস্বরে বলে উঠল–সে কী কথা সে কী কথা আপনার এখন মাতৃদায়– মাতৃশোক৷ আপনি কোথায় যাবেন বাথরুমে যেতে হয় আমরা যাব, আমরা যাচ্ছি৷

ডাঃ বাঁড়ুজ্জে হতাশ হয়ে ধপাস করে বসে পড়লেন৷ তখন তাঁর আর করবার কিছুই  রইল না৷

ইতিহাসে উপেক্ষিতা তোসিকো

 

স্বাধীনতা সংগ্রামে বাঙলার মেয়েদের অবদান আমরা কম বেশি ইতিহাসে পড়ি৷ কিন্তু ভারতবর্ষ থেকে বহু দূরে জাপানের একটি মেয়ের অবদান ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে কম নয়৷

বিপ্লবী মহানায়ক  রাসবিহারী বসু৷  ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের অনন্য যোদ্ধা৷ সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ তার মাথার দাম ধার্য করেছে তৎকালীন সময় এক লক্ষ টাকা৷ তাই দেশে থাকা তাঁর পক্ষে আর নিরাপদ নয়৷

১২ই মে ১৯১৫ সাল৷ খিদিরপুর ডকে ১২ নং জেটি থেকে জাপানী জাহাজ ‘সানু কী মারু’-তে করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মীয় ও একান্ত সচিব পি.এন.ঠাকুর পরিচয় দিয়ে  জন্মভূমিকে বিদায় জানিয়ে সিঙ্গাপুর, হংকং হয়ে ৫ই জুন,১৯১৫ জাপানে পৌঁছোলেন ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের অনন্য যোদ্ধা রাসবিহারী বসু৷ ব্রিটিশ পুলিশের জানতে দেরী হলো না৷ অতএব জাপান সরকারকে চাপ দেওয়া হল রাসবিহারীকে বহিষ্কার করতে৷ জাপান সরকারও জাপান ত্যাগ করার নোটিশ জারী করলেন৷ পাশে দাঁড়ালেন জাপানের বিরোধী দলনেতা তোয়ামা৷ তাঁর প্রচেষ্টায় রাসবিহারী আশ্রয় পেলেন এক রুটি কারখানার মালিক মিঃ সোমার বাড়িতে৷ কিন্তু জাপান পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে ক’দিন থাকবে৷ এগিয়ে এলেন মিঃ সোমা ও শ্রীমতি সোমা৷ তাঁদের বড়ো মেয়ে তোসিকোর সঙ্গে রাসবিহারীর বিবাহ দেবে৷ মায়ের কথায় জীবনের ঝঁুকি নিয়েও এক অজ্ঞাত, অপরিচিত, পলাতক বিপ্লবীকে বিয়ে করতে রাজি হলেন তোসিকো৷ শুরু হলো নতুন জীবন, জাপানী পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে বার বার বাসা বদল, জীবনের ঝুঁকি৷ রাসবিহারীর

 সঙ্গে সবকিছু হাসিমুখে মেনে নিলেন তোসিকো৷ অবশেষে ১৯২৩ সালে জাপানী নাগরিকের স্বীকৃতি পেলেন রাসবিহারী৷ এবার হয়তো শান্তি ভাবলেন রাসবিহারী৷ কিন্তু ঘরের মঙ্গল শঙ্খ বিপ্লবীর জন্যে নয়৷ ১৯২৫ সালের ৪ঠা মার্চ এক পুত্র ও এক কন্যা রেখে ইহলোক ত্যাগ করলেন তোসিকো৷ ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক বিপ্লবীকে রক্ষা করতে যে ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন একটি বিদেশিনী ইতিহাসে তাঁর তুলনা কোথায়! কিন্তু তাঁর কথা স্বাধীন দেশের ক’জনই বা জানে!

মানব ধর্ম

লেখক
দাদাঠাকুর

ছোট ভাইবোনেরা, বৈচিত্র্যময় এই জগতে আমরা নানান ধরণের বস্তু দেখতে পাই৷ তাদের প্রত্যেকেরই কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য বা গুণ আছে যা দেখে আমরা সেই বস্তুটিকে চিনতে পারি৷ যেমন আগুনের বৈশিষ্ট্য হ’ল তাপ ও আলো দেওয়া, জলের বৈশিষ্ট্য হ’ল ভেজানো বা নীচের দিকে গড়িয়ে যাওয়া৷ বস্তুর এই বিশেষগুণ বা বৈশিষ্ট্যকেই তার ধর্ম বলে৷

জড় বস্তুর মত প্রতিটি জীবেরও কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে যা দেখে আমরা তাদের জড়বস্তু থেকে আলাদা করতে পারি৷ যেমন জীব  মাত্রেই ক্ষুধা পেলে খেতে চায় ক্লান্ত হলে বিশ্রাম চায়, ঘুমায়, প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে দূরে থাকতে চায় আর নিজের বংশ বিস্তার করে যেতে চায়৷ এই বিশেষ বৈশিষ্ট্য বা গুণগুলিকেই বলা হয় জৈব  ধর্ম৷ এই জৈব ধর্মে উদ্ভিদ, পশু–পাখী তথা মানুষে কোন প্রভেদ নেই৷ জীব মাত্রেরই এগুলি স্বাভাবিক ধর্ম৷

এই জৈব ধর্ম ছাড়াও বত তযটফ জীবের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে যা দেখে তাদের অন্যান্য জীব থেকে আলাদা করা যায়৷ তেমনি মানুষেরও কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে যা দেখে তাকে পশু থেকে আলাদা করা যায়৷ পশু দেহপ্রধান জীব, তার আছে শুধু দেহের ক্ষুধা৷ কিন্তু মানুষ মন প্রধান জীব, তার দেহের ক্ষুধার সঙ্গে আছে মনের ক্ষুধাও৷ এর ফলেই পশু ও মানুষের মধ্যে পার্থক্য৷ দেহের ক্ষুধা সীমিত কিন্তু মনের ক্ষুধা অনন্ত৷ সীমিত জড়বস্তুতে দেহের ক্ষুধা মিটলেও মনের অনন্ত ক্ষুধা মেটে না৷ ক্ষুধা পেলে আমরা খাদ্য গ্রহণ করি, খেয়ে সুখ পাই৷ কিন্তু খাদ্য এক সময় শেষ হয়ে যায় বা আমাদের পেট ভরে গেলে আমরা আর খেতে পারি না৷ আর খাওয়া শেষ হবার সাথে সাথে খাওয়ার সুখও শেষ হয়ে যায়৷ মন তখন অন্য কিছু পেতে চায়৷ আমরা যা কিছুই পাই না কেন তার দ্বারা আমরা ক্ষণিকের সুখ পাই৷ মন তাতে কখনও তৃপ্ত হয় না৷ মন এমন কিছু পেতে চায় যা কখনও শেষ হবে না, যা থেকে আমরা সব সময় সুখ পেতেই থাকব৷ যে সুখের কখনও শেষ হবে না৷ এই অনন্ত সুখকেই প্রকৃত আনন্দ বলা হয়৷ ঈশ্বরই একমাত্র অনাদি অনন্ত সত্তা৷ তাই একমাত্র ঈশ্বরকে উপলব্ধির দ্বারাই আনন্দ পাওয়া সম্ভব৷ প্রতিটি মানুষ জ্ঞাতসারে হোক বা অজ্ঞাতসারে হোক আনন্দ পেতে চায়, ঈশ্বরকে পেতে চায়৷ এটাই মানুষের বিশেষ বৈশিষ্ট্য বা গুণ৷ এই বিশেষ বৈশিষ্ট্য মানুষকে পশু থেকে আলাদা করেছে, মানুষকে জীব জগতের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব এনে দিয়েছে৷ এই আনন্দ পাবার এষণা অর্থাৎ একান্ত ইচ্ছা বা ঈশ্বরকে উপলব্ধি করার একান্ত ইচ্ছাই মানুষের যথার্থ পরিচিতি বহন করে৷ এটাই মানুষের বিশেষ বৈশিষ্ট্য, এটাই মানুষের ধর্ম৷ আর মানুষ যখন জেনে, বুঝে এই আনন্দ পাবার জন্যে, ঈশ্বরকে উপলব্ধি করার জন্যে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করে তাকে বলে সাধনা৷ তাই প্রতিটি মানুষেরই সাধনা করা উচিত৷

ছোট্ট বন্ধুরা, এখন তোমরা বুঝতে পেরেছ, আমাদের জীবনের লক্ষ্য হ’ল অনন্ত সুখ বা আনন্দ লাভ করা৷ আর নিয়মিত সাধনার দ্বারা ঈশ্বর উপলব্ধির মাধ্যমেই অনন্ত সুখ  বা আনন্দ পাওয়া যায়৷ তাই আমাদের দু’বেলা নিয়মিত ভাবে সাধনা করতেই হবে৷ এটা আমাদের বিশেষ কর্তব্য৷

বারিধারা

লেখক
কৌশিক খাটুয়া

আকাশ ভরা মেঘের আনাগোনা,

জমিতে দেখি কৃষকের ধান বোনা৷

আষাঢ়-শ্রাবণ ডাকে গগন,

বৃষ্টি ধারায় আনে প্লাবন৷

খাল-বিল-হ্রদ জলে একাকার,

এক সুরে  বারি, যেন বাজিছে সেতার৷

শস্যশ্যামল গাছ পায় প্রাণ৷

চাতকের আর নাই অভিমান৷

এসবের মাঝে নীরবে-নিভৃতে

রয়েছে কাহার দান?

সকল ঋতু তাঁহারই প্রকাশ

তিনি চির মহিয়ান৷

নিরুপায় ডাকি তোমায়

লেখক
শিবরাম চক্রবর্তী

কামনা ঝাঁকুনী

বাসনার কাঁপুনী

মাঝে মাঝে এসে

মনের স্থিরতারে

অস্থীরে কোরিবারে

ধরে মোরে ঠেসে৷

 

হয়ে খুব অসহায়

বাঁচিবার চেষ্টায়

ভাবি মনে মনে

এ যেন তোমার

পরীক্ষায় আমারে

ফেলেছো এইক্ষণে৷

 

সাথে সাথে একবার

ডাকিলে তোমারে

দেখি তব কৃপায়

কামনা-বাসনার

সবটুকু ধার

ভোঁতা হয়ে যায়৷

 

সদা স্বার্থে বিকি-কিনি

ভালমন্দের পরশ মাখি

ভালতে পাই সুখ সে সময়

মন্দে দুঃখের ঝরে আঁাখি৷

 

সুখ, দুঃখ চলতেই থাকে

জীবনের হয় সেতো সাথী

মন অলক্ষে শান্তি চায়

ধ্যান চলে তার দিবা রাত্রি৷

 

ধ্যানের ধনে উদার মনে

অসীমের ডাক যখন শুণি,

স্বার্থ আর ভালমন্দের

ভোলে না কোন ধবনী!