বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) যে সমস্ত রাসায়নিককে মানুষের স্বাস্থ্যের পক্ষে ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ তকমা দিয়েছে, তার প্রথম দশের তালিকায় রয়েছে পারদ৷ সামান্য মাত্রাতেও এটি বিষাক্ত৷ আন্টার্কটিকার বরফ গলে দিনের পর দিন সেই পারদই মিশে চলেছে সমুদ্রে!
সাধারণ ভাবে আগ্ণেয়গিরি থেকে এবং কিছু ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে পারদ পরিবেশে মেশে৷ তবে সেই পরিমাণ তেমন উদ্বেগের নয়৷ বিজ্ঞানীদের দাবি, শিল্পের প্রয়োজনে আরও বেশি করে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো, মাটিতে খননকার্যের ফলে পরিবেশে পারদের মাত্রা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গিয়েছে৷ তাতেই ঘনিয়েছে বিপদ৷ এখানে অবশ্য আগেই মানব সভ্যতার ত্রাতা হয়ে দাঁড়িয়েছে আন্টার্কটিকা৷ বছরের পর বছর ধরে এই মহাদেশের বরফ ‘পারদ শোষক’ হিসেবে কাজ করে আসছে৷ অর্থাৎ, পরিবেশ থেকে পারদ শুষে নেয় আন্টার্কটিকা৷ তার বরফে আটকে থাকে বিপুল পরিমাণ পারদ-দূষণ! কিন্তু সমস্যা অন্যত্র৷ যে সমস্ত ভারী শিল্পের কারণে পরিবেশে পারদ নির্গত হচ্ছে, সেগুলিই আবার গ্রিনহাউস গ্যাসও উৎপন্ন করছে৷ ফলে বায়ুমণ্ডলে এই ধরনের গ্যাসের পরিমাণ বাড়ছে৷ আর এই সমস্ত বিষাক্ত গ্যাস আন্টার্কটিকার বরফ গলিয়ে দিচ্ছে৷ অর্থাৎ, যে বরফরাশি শিল্পে উৎপন্ন পারদ শোষণ করে দূষণ আটকাচ্ছে, সেই বরফই গলে যাচ্ছে সেই শিল্প ও বায়ুদূষণের কারণে৷ ফলে বরফের পারদ শোষণে হিতে বিপরীত হচ্ছে৷ সম্প্রতি আন্টার্কটিকায় এই সমীকরণই চোখে পড়েছে বিজ্ঞানীদের৷
সারা বিশ্বে যেখানে যত পারদ সঞ্চিত হয়, আন্টার্কটিক উপদ্বীপের বরফে তার দ্বিগুণ পরিমাণ পারদ জমে৷ বিজ্ঞানীদের দাবি, অষ্টাদশ শতকে ইউরোপে শিল্পবিপ্লব হওয়ার পর এই অংশে পারদ সঞ্চয়ের হার ১৬০ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল৷ পারদ দূষণের দু’টি চক্র পরিবেশে সক্রিয়৷ এক, বায়ুমণ্ডল থেকে সমুদ্রের জলে পারদ শোষিত হতে পারে এবং সেখান থেকে আবার তা বাতাসে মিশতে পারে৷ দুই, আন্টার্কটিকার মতো বরফসমৃদ্ধ এলাকায় পারদ বায়ুমণ্ডল থেকে হিমবাহে শোষিত হয়৷ সেখান থেকে স্থলভাগ হয়ে আবার সমুদ্রে মেশে৷ ঝোউ গবেষণাপত্রে লিখেছেন, ‘‘এই দুই চক্রের সংযোগের ফলে বরফ গলে স্থলভাগে পারদের নির্গমন ৫৫০ শতাংশ এবং বায়ুমণ্ডল থেকে সমুদ্রে পারদের বিনিময় ৩৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে৷’’ এ ভাবে আন্টার্কটিকার সুবিশাল পারদের ভান্ডার ধীরে ধীরে দূষণের উৎসে পরিণত হয়েছে৷
বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, দক্ষিণের মহাসাগরে প্রাণীদের দেহে পারদের মাত্রা বাড়তে শুরু করেছে৷ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা আগের রেকর্ডকে ছাপিয়ে যাচ্ছে৷ আন্টার্কটিক উপদ্বীপ থেকে স্রোতের মাধ্যমে খোলা সমুদ্রে পারদ নির্গমনের মাত্রা বেড়েছে ৪০০ শতাংশ৷ এই দূষণ আগামী দিনে আরও দূরের সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়তে পারে, মনে করছেন বিজ্ঞানীরা৷