বিশ্বের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তের এই মহাদেশ হল পৃথিবীর বৃহত্তম তুষার মরুভূমি৷ চার দিকে চাঁই চাঁই বরফ৷ সমুদ্রেও ভেসে বেড়াচ্ছে বরফ৷ আন্টার্কটিকায় কোনও স্থায়ী মনুষ্যবসতি নেই৷ গবেষণার জন্য সেখানে সাময়িক আস্তানা তৈরি হয়৷ এখন অবশ্য আন্টার্কটিকায় পর্যটনও শুরু হয়েছে৷ তবে দৃশ্যত জনমানবহীন এই মহাদেশে উঁকি মারতে শুরু করেছে এক লুকানো বিপদ৷
আন্টার্কটিকা মহাদেশের মূল ভূখণ্ড সংলগ্ণ সমুদ্রে ছড়িয়ে রয়েছে ‘আইস শেল্ফ’ (বরফের তাক)৷ এগুলি হল আন্টার্কটিকার মূল ভূভাগে থাকা হিমবাহের অংশ, যা প্রসারিত হয়ে সমুদ্র পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে৷ হিমবাহ রক্ষায় এই বিশালাকার ভাসমান বরফের চাদরগুলির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে৷ এই বরফের তাকগুলি মূল হিমবাহকে সমুদ্রে মিশে যাওয়া আটকায়৷ এগুলিকে মূল হিমবাহ এবং সমুদ্রের মাঝে একটি ‘বাঁধ’ বলা যেতে পারে৷ এই বরফের তাকগুলি না থাকলে আন্টার্কটিকার মূল ভূভাগের হিমবাহ আরও দ্রুত সমুদ্রে মিশে যেত৷
সম্প্রতি এই বরফের তাকগুলিকে নিয়ে একটি গবেষণা করেন নরওয়ের আইসি৩ পোলার রিসার্চ হাবের টোর হ্যাটারম্যান এবং আকভাপ্লান-নিভা সংস্থার কিন ঝোউ৷ তাঁদের ওই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ‘নেচার কমিউনিকেশন্স’-এর জার্নালে৷ নতুন এই গবেষণায় আশঙ্কা করা হচ্ছে, আগে যা ভাবা হয়েছিল, তার চেয়েও দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পেতে পারে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা৷ কারণ, অনুমানের চেয়ে অনেক দ্রুত হারে গলে যাচ্ছে অ্যান্টার্কটিকার বরফের তাকগুলির নীচের (সমুদ্রে নিমজ্জিত) অংশ৷ এই ‘আইস শেল্ফ’গুলির নীচে বিভিন্ন ছোট-বড় প্রণালী বা ‘চ্যানেল’ থাকে৷ সেখান থেকে সমুদ্রের জল প্রবাহিত হয়৷ গবেষণায় দেখা গিয়েছে, দীর্ঘ প্রণালীগুলিতে সমুদ্রের জল অপেক্ষাকৃত উষ্ণ, যা সেখানে বরফ গলার হারকেও বৃদ্ধি করে৷
হ্যাটারম্যান, ঝোউ এবং তাঁদের সহযোগীরা পূর্ব আন্টার্কটিকার ফিম্বুলিসেন আইস শেল্ফে গবেষণটি চালান৷ এখানে বরফের নীচে গভীর প্রণালী রয়েছে৷ গবেষণায় দেখা যায়, সমুদ্রের উষ্ণ জল বরফ-প্রণালীর মধ্যে আটকা পড়ে যায়৷ এর ফলে কোনও কোনও অঞ্চলে বরফ গলার হার প্রায় দশ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে৷ জলবায়ুগত ধাক্কার দিক থেকে পূর্ব আন্টার্কটিকাকে তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ অংশ বলে ধরে নেওয়া হয়৷ কিন্তু সাম্প্রতিক এই গবেষণা বলছে, সেখানেও দ্রুত হারে গলে যেতে পারে বরফ৷ গবেষকদলের প্রধান হ্যাটারম্যানের কথায়, ‘‘আমরা দেখেছি ফিম্বুলিসেন আইস শেল্ফের নীচে সামান্য পরিমাণ উষ্ণ জলও বরফ গলার হারকে উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি করতে পারে৷ এর ফলে প্রণালীগুলি ক্রমশ বড় হওয়ার সম্ভাবনা থাকে৷ ধীরে ধীরে পুরো আইস শেল্ফটিকেই দুর্বল করে দিতে পারে৷’’
এই গবেষণার জন্য হ্যাটারম্যানেরা ফিম্বুলিসেন ‘আইস শেল্ফ’-এর নীচের অংশের ম্যাপিং করেন৷ সমুদ্রে নিমজ্জিত অংশের কোথায় কী গহ্বর রয়েছে, কোথায় কতটা গভীর প্রণালী রয়েছে, সব ধরা পড়ে ওই কম্পিউটার মানচিত্রে৷ গবেষণার জন্য হ্যাটারম্যান নিজে কয়েকশো দিন কাটিয়েছেন আন্টার্কটিকায়৷ যে প্রণালীগুলি অপেক্ষাকৃত ছোট, সেগুলিতে আটকে থাকা জলও পরীক্ষা করে দেখেন তাঁরা৷
গবেষকদের আশঙ্কা, প্রণালীগুলির মধ্যে বরফের গলনের হার বৃদ্ধি পেলে তার প্রভাব বিপজ্জনক হতে পারে৷ প্রণালীগুলি আরও প্রশস্ত হতে থাকলে বরফের স্তর বিভিন্ন অংশে অসম ভাবে পাতলা হয়ে যেতে পারে৷ একটি পর্যায়ে গিয়ে আইস শেল্ফগুলি এতটাই দুর্বল হয়ে পড়বে যে সেগুলির আর পিছনের মূল হিমবাহকে সমুদ্রের দিকে এগিয়ে আসার গতি কমানোর মতো শক্তি থাকবে না৷ এখন আন্টার্কটিকার এই আইস শেল্ফগুলি নিয়ে আরও বিশদ গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন তাঁরা৷ ওই বিশদ গবেষণা থেকেই বোঝা যেতে পারে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা আগের চেয়ে কতটা দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাবে৷