আমরা সাড়ম্বরে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২১শে ফেব্রুয়ারী পালন করে থাকি৷ ২১শে ফেব্রুয়ারী বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ সহ সমস্ত বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে পালিত একটি বিশেষ দিন, যা ১৯৯৯ খ্রীষ্টাব্দের ১৭ই নভেম্বর জাতিসংঘ কর্ত্তৃক গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতিবছর ২১শে ফেব্রুয়ারী বিশ্বব্যাপী পালন করা হয়৷ তবে এটি ২০০২ সালে ৫৬/২৬২ নীতি গ্রহণের মাধ্যমে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়৷ এটি শহীদ দিবস হিসাবে ও পরিচিত৷ ঐ দিনটি বাঙালী জনগণের ভাষা আন্দোলনের মর্মন্তুদ ও গৌরবজ্জ্বল স্মৃতি বিজড়িত একটি দিন হিসাবে চিহ্ণিত হয়ে আছে৷ ১৯৫২ সালে এই দিনে (৮ই ফাল্গুন,১৩৫৮ বৃহস্পতিবার) মাতৃভাষা বাংলাকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ঢাকায় আন্দোলনরত বাঙালী ছাত্রদের ওপর পুলিশের গুলি বর্ষনে অনেক তরুণ ছাত্র শহীদ হন৷ যাদের মধ্যে রফিক, জববার শফিউর, সালাম বরকত উল্লেখযোগ্য৷
জাতিসংঘ নিজের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে লিখেছে, বহুভাষী ও বহু সাংস্কৃতিক সমাজগুলি ভাষার সংরক্ষণের মাধ্যমে উন্নতি লাভ করে, যা ঐতিহ্যগত জ্ঞান এবং সাংস্কৃতির ঐতিহ্যকে বহন করে৷ তবে ভাষাগত বৈচিত্র্য আরও বেশী ভাষা বিলুপ্ত হওয়ার কারণে হুমকির সম্মুখীন হয়৷ বিভিন্ন গবেষনা, শিক্ষারক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষা ব্যবহার করার সুবিধার কথা বলে৷ আত্মসম্মান ও সমালোচনামূলক চিন্তা, দক্ষতা বৃদ্ধি করে মাতৃভাষায় শিক্ষা অথচ বর্তমানে বিশ্ব জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ মানুষই নিজস্ব ভাষায় পড়াশোনা করা সুযোগ পান না৷
আজ আমরা আমাদের এই রাজ্যে কি দেখছি, প্রতি বৎসর এই একুশে ফেব্রুয়ারী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে পালন করার জন্য বাঙালী হিসাবে খুব গর্ববোধ করি৷ কারণ, এই বাংলা ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে জাতিসংঘে এই দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের স্বীকৃতি আদায় করেছে৷ তাই বছরের এই দিনটিতে আমরা বিভিন্ন সংঘটন সরকার বা ব্যক্তি বিশেষে খুব সাড়ম্বরে পালন করে থাকি৷ এমন ভাব দেখাই যে আমরা মাতৃভাষা বাংলাকে কত না ভালবাসি, বিশেষ করে বিভিন্ন মিডিয়া বা বিভিন্ন দূরদর্শন চ্যানেলগুলো এমনভাবে খবর পরিবেশন করে৷ পরক্ষণেই আমরা কি দেখি এই মিডিয়া বা চ্যানেলগুলো তাদের বাংলা সিরিয়ালে, কোন সামাজিক অনুষ্ঠান পালনের জন্য যখন কোন গানের প্রয়োজন হয়, তখন দেখি হিন্দী গান গেয়ে সেই অনুষ্ঠান হচ্ছে৷ (অবশ্য সব সময় নয়)৷ আমার এইসব অনুষ্ঠানের প্রযোজক বা নির্দেশকদের কাছে প্রশ্ণ ? আচ্ছা আমাদের বাংলা ভাষায় কি এইসব অনুষ্ঠানের জন্য গানের খুবই অভাব৷ আমাদের বাংলাভাষাতে কি বিবাহ, অন্নপ্রাশন বা অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্য গান পাওয়া যায় না৷ বা আমাদের বাংলা ভাষাতে ভালবাসা ব্যক্ত করার জন্য গানের খুবই অভাব৷ যদি হ্যাঁ হয়, তাহলে আমি খুবই দুঃখিত এবং মর্মাহত৷ সেক্ষেত্রে আমি গীতিকারদের বলব এই দিকটায় নজর দিয়ে আমাদের বাংলাভাষার গানকে আরও সমৃদ্ধ করতে এবং আরও বেশী করে গান রচনা করতে৷ আর যদি না হয় তাহলে আমার অনুরোধ যেখানে যা প্রয়োজন হিন্দির পরিবর্ত্তে বাংলা গান ব্যবহার করতে৷ তবেই বাঙালী অস্মিতাকে প্রকৃত সম্মান জানানো হবে ও মাতৃভাষাকেও প্রকৃত সম্মান জানানো হবে এবং মাতৃভাষা দিবস পালন সার্থক হবে৷ না হলে শুধু এই একটা দিন লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে বিভিন্ন অনুষ্ঠান করে মাতৃভাষা দিবস পালন করলাম আর দেখে মনে হবে নিজের মাতৃভাষাকে কত না ভালবাসি এবং তখনই ভাষা আন্দোলনের সেই সব শহীদদের প্রকৃত সম্মান জানানো হবে৷ তার পরিবর্ত্তে আমরা করি কি বছরের একটা দিন শহীদদের ফটোতে সামান্য একটু মালা দিয়ে গলা ফাটিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান করি এবং বিভিন্ন মিডিয়াতে বাইট দিয়ে নিজেকে এমন দেখাই যেন মাতৃভাষাকে কতই না ভালবাসি এখানে আমি একটা কথা বলে রাখি, আমি কোন ভাষার বিরোধী নই, সবভাষাকে সম্মান করি৷ কিন্তু যে ভাষাতে প্রথম স্বর মুখ দিয়ে বেরিয়েছিল, সে ভাষার সম্মান আলাদা৷ এবং এটা শুধু আমার ক্ষেত্রে নয়, প্রত্যেকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য৷ প্রত্যেক ভাষাভাষি মানুষের তার নিজস্ব মাতৃভাষাকে সম্মান করা উচিত এবং সে ভাষায় কথা বলতে পারলে নিজেকে গর্বিত মনে করা উচিত৷ এখানে আর একটা কথা বলে রাখি, জোর করে কারও ওপর অন্যভাষাকে চাপিয়ে দেওয়া উচিৎ নয়৷ সেই সঙ্গে কেউ যদি মাতৃভাষা ছাড়াও অন্য ভাষা শিখতে চায় বা জ্ঞানার্জন করতে চায়, তাহলে তাকে উৎসাহ দেওয়া উচিত, কারণ সমাজ তখনই এগিয়ে যাবে যখন আমরা বিভিন্ন ভাষাভাষি বা বিভিন্ন মানুষকে প্রকৃত সম্মান করা৷ কারণ বলা আছে আমাদের দেশে৷ বৈচিত্র্যের মধ্যেই ঐক্য আছে৷ কিন্তু ইদানিং দেখছি, কোথাও যেন এই সুরটা কেটে গেছে৷ আমরা খুব বেশী অস্থির এবং স্বার্থপর হয়ে গেছি আর এটা হচ্ছে আমাদের রাজ্যে বা দেশে প্রকৃত নেতৃত্ব এবং শিক্ষার অভাবে৷ কারণ আমরা নিজেদের স্বার্থ ছাড়া কিছুই বুঝি না৷ এটাই আমাদের কাছে সমূহ বিপদ৷ মনে রাখতে হবে আমরা সবাই ভাই-ভাই৷ একই পরমপুরুষের সন্তান৷ তা আমরা তাকে যে নামেই ডাকি না কেন? তাই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে বিশ্বভাতৃত্ব গড়ে তুলতে এবং এক নূতন মানব সমাজ গড়ে তুলতে৷ যেখানে কোন হিংসা, হানাহানি মারামারি ও বিদ্বেষ থাকবে না৷ সবাই মিলেমিশে এক হয়ে থাকবে ও এক মানব সমাজ গড়ে তুলবে৷
- Log in to post comments