গত ১৫ই আগষ্ট স্বাধীনতা দিবস পালনের অনুষ্ঠানে অসমের মুখ্যমন্ত্রী অসমের অন্যভাষা ভাষীর মানুষকেও লোকগণনায় নিজেদের অসমীয়া ভাষী বলে লিপিবদ্ধ করারা আহ্বান জানান৷ অসমের মুখ্যমন্ত্রীর এই বিপদজ্জনক উক্তির তীব্র প্রতিবাদ করেন আমরা বাঙালী দলের অসম রাজ্য সচিব সাধনপুরকায়স্থ৷
রাজ্যে সম্প্রতি লোক গণনার কাজ শুরু হয়েছে৷ লোক গণনার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আইন ও নিয়ম-কানুন রয়েছে৷ আইন অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিককে গণনাকারীদের কাছে পরিবারের সঠিক তথ্য তুলে ধরতে হবে এবং গণনাকারীকেও সেই সঠিক তথ্য খাতায় লিপিবদ্ধ করতে হবে৷ অন্যথায় তা দণ্ডনীয় অপরাধ৷
কিন্তু আমরা লক্ষ্য করেছি, আসামের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী ড.হিমন্তবিশ্ব শর্মা স্বাধীনতা দিবসের দিন তার বক্তব্যে অসমীয়া ভাষাভাষীদের সংখ্যা রাজ্যে দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে বলে উল্লেখ করে, রাজ্যে বসবাসকারী অন্য রাজ্যের ও অন্য ভাষাভাষী মানুষদের অসমীয়া ভাষাকে মাতৃভাষা হিসেবে লিপিবদ্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন৷ এই ক্ষেত্রে বরাক উপত্যকাকে মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী বাদ দিয়েছেন৷
‘আমরা বাঙালী, আসাম রাজ্য কমিটি’-র সচিব সাধন পুরকায়স্থ এক প্রেস বার্তায় বলেন, মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্য সম্পূর্ণ আইন বহির্ভূত ও অসাংবিধানিক৷ যেখানে সঠিক তথ্য লিপিবদ্ধ করার কথা বলা হচ্ছে, সেখানে এই ধরনের আহ্বানের মাধ্যমে জনগণনার তথ্যের বিকৃতি ঘটবে এবং সঠিক প্রতিফলন ঘটবে না৷
সাধন পুরকায়স্থের বক্তব্যে সাংবিধানিক ও আইনি অবস্থান সাধন পুরকায়স্থ বলেন, ১. ভারতের সংবিধানের ২৯ এর ১ নম্বর অনুচ্ছেদে নাগরিকের নিজস্ব ভাষা, লিপি ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে৷ ২. ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতা ও সমান আইনি সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে৷ ৩. ১৯৪৮ সালের জনগণনা আইন অনুযায়ী গণনাকারীর আইনসম্মত প্রশ্ণের সঠিক উত্তর দেওয়া নাগরিকের বাধ্যবাধকতা৷ ৪. ওই একই আইনে গণনাকারীর জেনে-বুঝে মিথ্যা তথ্য লিপিবদ্ধ করা এবং নাগরিকের জেনে-বুঝে মিথ্যা তথ্য দেওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ৷ তাই কার মাতৃভাষা কী হবে তা কোনো সরকার বা কোনো মুখ্যমন্ত্রী নির্ধারণ করে দিতে পারেন না৷ মাতৃভাষার অধিকার ভারতবর্ষের নাগরিকের মৌলিক অধিকার৷ ভাষাগত পরিচয় সংক্রান্ত কোনো তথ্য যাতে অন্যায় চাপ, বৈষম্য বা বেআইনি প্রভাবের মাধ্যমে বিকৃত না হয়, সে বিষয়ে সকলকে সতর্ক থাকতে হবে৷
সাধন পুরকায়স্থের দাবি ও আহ্বান---সাধন পুরকায়স্থ ভারত সরকারের জনগণনা অধিকর্তার কাছে এই ব্যাপারে অবিলম্বে হস্তক্ষেপের দাবি জানান৷ অন্যথায় আসামের চলমান লোক গণনায় সঠিক তথ্যের প্রতিফলন ঘটবে না৷ একই সঙ্গে রাজ্যবাসীর কাছে সাধন পুরকায়স্থ-র আহ্বান, আপনারা গণনাকারীদের কাছে আপনাদের প্রকৃত ও সঠিক তথ্য জানান, যাতে আসামে সঠিক তথ্যসম্বলিত একটি জনগণনা সম্পন্ন হয়৷ তিনি আরও বলেন, আমরা অসমীয়া ভাষা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল৷ আমরা চাই অসমীয়া ভাষা ও সংস্কৃতি আরও সমৃদ্ধ হোক৷ এই ক্ষেত্রে আইন মেনে, সংবিধান মেনে সরকার যা করার তা করুক, তাতে আমাদের আপত্তি নেই৷
আমরা চাই সমস্ত ভাষাভাষী মানুষকে নিয়ে আসাম একটি সমৃদ্ধ রাজ্য হিসেবে গড়ে উঠুক৷ সরকারকে আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, আসাম একটি বহুভাষিক রাজ্য৷ এই সত্যটা মেনে নিয়ে কীভাবে একটি সমৃদ্ধ আসাম গড়ে তোলা যায়, সরকার সেই চিন্তা-চর্চা করুক৷
জনগণনা প্রক্রিয়ার কোনো পর্যায়ে ইচ্ছাকৃত মিথ্যা তথ্য প্রদান, আইনসম্মত দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি, অথবা গণনাকারীর পক্ষ থেকে জেনে-বুঝে মিথ্যা তথ্য লিপিবদ্ধ করার মতো কার্যকলাপ ঘটলে, ১৯৪৮ সালের জনগণনা আইনের প্রযোজ্য ধারা অনুসারে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যবস্থা রয়েছে৷