২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে সোস্যাল মিডিয়ায় বিজেপি ঝড় তুলেছিল ৫৬ইঞ্চি ক্ষমতায় আসলে সীমান্তের সন্ত্রাসীরা গর্তে ঢুকে যাবে৷ সে প্রচার যে কতটা অসার ছিল পুলওয়ামা পহেলগাঁও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে৷ কিন্তু কেন্দ্রীয় শাসকদলের নীরব সমর্থন নিয়ে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে যে অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাস সৃষ্টি করা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় তার পরিণতি কি হতে পারে দিল্লির শাসকদলের মগজে এখনও ঢুকেনে৷
এই সন্ত্রাসের লক্ষ্য অবশ্যই বাঙালী জনগোষ্ঠী৷ উত্তর ও পশ্চিম ভারতীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও ধনপতিরা স্বাধীনতার আগে থেকেই বাঙালী বিদ্বেষী৷ ব্রিটিশ শাসকের বাঙালী বিদ্বেষী হওয়ার যথেষ্ট কারণ ছিল৷ কারণ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস থেকে শুরু করে নেতাজী সুভাষচন্দ্র, রাসবিহারী বোস থেকে বাঘা যতীন, মাষ্টারদা সূর্য সেন ভারতে ব্রিটিশ শাসকের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল৷ স্বভাবতই ভারতে বাঙালী জনগোষ্ঠীকে বিনাশ করার পরিকল্পনা ছিল ব্রিটিশের৷ তবু ১৯০৫ সালে ব্রিটিশ পরিকল্পিত বঙ্গভঙ্গ রোধ করা সম্ভব হয়ে ছিল বাঙালীর ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে৷ রোধ হয়েছিল কিন্তু ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি৷ সেই ষড়যন্ত্রেরই পরিনাম ৪৬-এর দাঙ্গা, বাঙলা ভাগ, ক্ষমতা হস্তান্তর৷
বাঙালী যে ধর্মীয় মৌলবাদকে প্রশ্রয় দেয় না তার প্রমাণ দিয়েছিল ধর্মীয় মতবাদে সদ্য বিভক্ত ভারতের পাকিস্তান অন্তর্ভুক্ত বাঙলার অংশে ভাষার দাবীতে আন্দোলন, যে আন্দোলনের শেষ পরিণতি স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গঠন৷ নানা ঘাত সংঘাতের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশ বার বার প্রমাণ করছে তার জাতিসত্তা সাম্প্রদায়িকতার উর্ধে৷ সদ্য বাংলাদেশ নির্বাচনেও আবার প্রমাণ হলো ধর্মীয় মৌলবাদ অপেক্ষা বাঙালীর কাছে মাতৃভাষা তার জাতি সত্তার মর্যাদা অনেক বেশী৷
তবুও বার বার বাঙালী ধর্মীয় মৌলবাদের শিকার হয়েছে৷ আর এই সাম্প্রদায়ীক সংঘাত রাজনৈতিক নেতাদের সংকীর্ণ স্বার্থসিদ্ধির কারণেই হয়েছে৷ দিল্লির বাঙলা দখলের প্রয়াস বার বার ব্যর্থ হওয়ায় রাজনীতির মোড়কে সেই সাম্প্রদায়ীক তাসই খেলছে বাঙলা দখলের নেশায় বুঁদ হয়ে৷ তবে এবার বাঙালীও অন্য খেলার জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছে৷ সাম্প্রদায়ীকতার তিক্ত ইতিহাস এবার বাঙালী ভুলতে চাইছে৷ যারা ৪৬কে সামনে রেখে সাম্প্রদায়িক তাস খেলতে চাইছে তার হয়তো ভুলে গেছে ৪৬-এর আগে আর একটা ইতিহাস আছে ১৯০৫ থেকে ১৯১১ সাল--- সাম্প্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ বাঙলাকে পূর্ব ও পশ্চিমে ভাগ করেছিল৷ প্রতিবাদ শুরু হলে গর্বান্ধ শাসক সদর্পে বলেছিল---বাঙলা ভাগ একটা স্থির সিদ্ধান্ত৷ এর নড়চড় হবে না৷ কিন্তু ঐক্যবদ্ধ বাঙালীর দৃঢ় প্রতিরোধের সামনে নত হতে বাধ্য হয়েছিল সাম্রাজ্যবাদী শাসক৷ ১৯১১ সালে রোধ হয়েছিল বঙ্গভঙ্গের স্থির সিদ্ধান্ত৷
১৯৪৭ সালে বাঙলা ভাগ হলো কারণ সেদিন বাঙলায় কোন ব্যষ্টিত্ব সম্পন্ন নেতা ছিল না৷ আর চক্রান্ত শুধু ব্রিটিশের ছিল না৷ দেশীয় পুঁজিপতি, ধর্মীয় মৌলবাদ ও কংগ্রেস, কম্যুনিষ্ট ও আর.এস.এসের রাজনৈতিক সংঘটন হিন্দু মহাসভা বাঙলাকে দুর্বল করতে ও বাঙালী জাতির অস্তিত্ব বিলুপ্ত করতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছিল৷ তাই ব্রিটিশ চলে গেলেও বাঙালী বিদ্বেষী চক্রান্ত থেমে থাকেনি৷ ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্টের কালরাত্রি থেকেই ভারত থেকে বাঙালীকে বিলুপ্ত করার নতুন চক্রান্ত শুরু হয়৷ সেই চক্রান্তই পূর্ণ পরিণতি পেয়েছে নরেন মোদির হাত ধরে৷ তাই বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে একের পর এক বাঙালী নির্যাতনেও প্রধানমন্ত্রী নীরব থাকছেন৷
যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় এই নীরবতার পরিণতি ভয়ঙ্কর হতে পারে৷ এমনিতেই তুচ্ছ অজুহাতে বাঙলাকে আর্থিক দিক থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে৷ স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও কথায় কথায় বাঙালী মনীষীদের হেয় করছেন৷ বাঙলার ভাষা সংস্কৃতিকে অবজ্ঞা করছেন৷ বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে অকারণে বাঙলাভাষীদের নির্যাতন করা হচ্ছে, ভারতীয় বাঙালীর সবরকম প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও প্রশাসন দিয়ে অপদস্ত করা হচ্ছে, বাংলাদেশ পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে৷ যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় রাজ্যগুলোর গুরুত্ব না বুঝলে, বিশেষ করে বাঙলার মত কৃষিজ খনিজ ও জলজ সম্পদে ভরপুর রাজ্যের গুরুত্ব অনুধাবন করতে না পারলে দিল্লিকে অনেক বড় খেসারত দিতে হতে পারে৷ রাজ্য থেকে রাজস্ব আদায় করে কেন্দ্র চলে৷ কেন্দ্র রাজ্যকে যে অর্থ দেয় রাজ্য থেকে আদায়ীকৃত অর্থের একটা অংশ৷ তাই রাজ্যের টাকায় কেন্দ্র চলে, কেন্দ্রের টাকায় রাজ্য চলে না৷ তাই ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের সংহতি সুদৃঢ় করতে হলে কেন্দ্রের শাসক দলের বিরোধী কোন দল রাজ্যে শাসন ক্ষমতায় থাকলেই তাকে বঞ্চনা করার পরিণতি দিল্লিকে ভুগতে হতে পারে৷ তাই বিরোধী দল শাসিত রাজ্যগুলির ক্ষেত্রে বিশেষ করে বাঙলার মত রাজ্যের ক্ষেত্রে দিল্লির দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন আশু প্রয়োজন৷ এস.আই.আর করে, নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের আইন পরিবর্তন করে দলীয় দাস নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করে আর যাই হোক বাঙলা দখল করা যাবে না৷ বাঙালী শুধু আক্রান্ত হতেই জানে না, পাল্টা মার দিয়ে মারের ওপর মাথা তুলে দাঁড়াতেও জানে৷
- Log in to post comments