Skip to header Skip to main navigation Skip to main content Skip to footer
CAPTCHA
This question is for testing whether or not you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

User account menu

  • My Contents
  • Log in
নোতুন পৃথিবী
সর্বাত্মক শোষণমুক্ত সমুন্নত সমাজ রচনার পথপ্রদর্শক

প্রধান মেনু

  • প্রথম পাতা
  • আধ্যাত্মিক প্রসঙ্গ
  • প্রাউট প্রবক্তার ভাষায়
  • সংবাদ দর্পণ
  • দেশে দেশে আনন্দমার্গ
  • সম্পাদকীয়
  • প্রবন্ধ
  • খেলা
  • নারীর মর্যাদা
  • ভাষা
  • স্বাস্থ্য
  • প্রভাতী
  • ইতিকথা

বন্দে মাতরম্‌’ দেশমাতৃকার প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা ও ভক্তির অভাবনীয় দৃষ্টান্ত

মনোতোষ মণ্ডল

সময়টা ছিল ২০০২ সাল৷ বিবিসি’র ৭০তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ গান নির্বাচন কল্পে আন্তর্জাতিক স্তরে একটি সমীক্ষা চালায়৷ ঐ সমীক্ষায় সাত হাজার গানের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ গানের মর্যাদায় মর্যাদিত হয় -- আয়ারল্যান্ডের আইরিশ প্যাট্রিওটিক গান (A Nation once again)৷ কিন্তু অতিশয় হর্র্ষেল্লাসের বিষয়---এই সমীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান লাভ করেছিলো---বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় সুরারোপিত, বিভিন্ন কণ্ঠে গীত ও ভারতবর্ষে জাতীয় স্তোত্র রূপে স্বীকৃত *‘বন্দে মাতরম্‌’* গানটি৷ এটা অবশ্যই প্রতিটি ভারতীয়ের জন্য অতিশয় গর্বের বিষয়৷ ১৯৫০ সালে ছয় স্তবক সমৃদ্ধ এই গানটির মাত্র দুটি স্তবক জাতীয় স্তোত্ররূপে স্বীকৃতি লাভ করে আর জাতীয় সঙ্গীত রূপে স্বীকৃতি লাভ করে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত -- *জন-গণ-মন অধিনায়ক* গানটি৷ বাংলার সাহিত্য সম্রাট রচিত ‘বন্দেমাতরম্‌’ গানটি বাঙলার বুকে অবশ্যই অত্যধিক ঐতিহ্যমন্ডিত ও জনগণের মধ্যে মহিমান্বিত৷ অতএব আজকের আলোচ্য প্রবন্ধে ‘বন্দেমাতরম্‌’ শীর্ষক গানটির ঐতিহাসিক উত্থান ও পতন সম্বন্ধে যৎকিঞ্চিৎ আলোচনা করার চেষ্টা করছি৷ প্রবন্ধটি যদি পাঠকবর্গের হৃদয়ে যৎকিঞ্চিৎও রেখাপাত করতে সক্ষম হয়, তাহলে আমি অবশ্যই নিজেকে ধন্য মনে করবো৷

‘বন্দেমাতরম্‌’ গানটি মোটেই মনোরঞ্জন মূলক গান নয়, বরং এই গানটি হচ্ছে -- সমস্ত বাঙালীর আবেগ সমৃদ্ধ দেশ মাতৃকার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তি নিবেদনের মহামন্ত্র ও বঙ্গমাতার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য উল্লেখের ঐতিহাসিক দলিল৷ কিন্তু দুঃখের বিষয় -- অবিভক্ত বাংলার ঐতিহ্যের মূর্ত প্রতীক স্বরূপ এই গানটির যাত্রাপথ মোটেই মসৃণ ছিল না বরং তরঙ্গায়িত বিধিতেই এগিয়ে এসে আজ সসম্মানে জাতীয় স্তোত্রের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে৷ কিন্তু বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এই গানটি রাজনৈতিক মহলে বিশেষ রূপে বিতর্কিত ও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে৷ কারণ অনেকের মতে গানটির মধ্যে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার ছাপ সুস্পষ্ট৷ সুতরাং নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধানে সুসজ্জিত ভারতবর্ষের মাটিতে এই ধরণের বিতর্ক মোটেই অবাঞ্ছিত নয়৷ বরং এটাই স্বাভাবিক৷ অতএব আজকের আলোচ্য বিষয় -- ‘বন্দেমাতরম্‌’ গানের পথ চলার বিতর্কিত ইতিহাস৷ 

‘বন্দেমাতরম্‌’ গানটিকে গান না বলে যদি ‘বন্দনা গীতি’ বলা হয়, তাহলে অবশ্যই অত্যুক্তি হবে না৷ কারণ সংস্কৃত ও বাংলা ভাষার সম্মিশ্রণে রচিত এই গানটিতে দেশমাতৃকা সহ বিভিন্ন দেবদেবীর বন্দনা করা হয়েছে৷ এই গানের প্রথম দুটি স্তবক পূর্ণতঃ সংস্কৃত ভাষায় রচিত কিন্তু অবশিষ্ট স্তবক সমূহ মিশ্রিত ভাষায় রচিত হয়েছে৷ যেমন চতুর্থ ছত্রের শুরুতেই বলা হয়েছে --

*‘তুমি বিদ্যা, তুমি ধর্ম, তুমি হৃদি, তুমি মর্ম’*৷

আবার পরবর্তী পর্যায়ে বলা হয়েছে --

‘বাহুতে তুমি মা শক্তি, হৃদয়ে তুমি মা ভক্তি,

তোমারই প্রতিমা গড়ি মন্দিরে মন্দিরে৷৷’

আবা এই গানটির বাস্তব সত্য উল্লেখ করতে গিয়ে অবশ্যই বলা যেতে পারে যে, সাহিত্য সম্রাট এই গানটি মোটেই ভারতমাতাকে কেন্দ্র করে রচনা করেন নি৷ অতএব কবির দৃষ্টিতে বঙ্গমাতাই মাতা রূপে বন্দিত৷ কারণ তিনি তৃতীয় স্তবকের শুরুতেই উল্লেখ করেছেন:--

*‘সপ্তকোটিকণ্ঠ কল-কল নিনাদ করালে,*

*দ্বিসপ্তকোটি ভুজৈঃ ধৃত খর-করবালে৷’*

 ১৮৭৫ সালে ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র যখন গানটি রচনা করেন তখন অবিভক্ত বাংলার জনসংখ্যা ছিল প্রায় সাত কোটি৷ আর সম্পূর্ণ ভারতবর্ষের জনসংখ্যা ছিল -- তেত্রিশ কোটি৷ অতএব সমসাময়িক একজন স্বনামধন্য কবি অতুল প্রসাদ সেন তাঁর রচিত ‘হও ধরমেতে বীর’ শীর্ষক কবিতায় স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন:--

*তেত্রিশ কোটি মোরা নহি কভু হীন,*

*হতে পারে দীন, তবু নহি মোরা ক্ষীণ৷’*

 আবার একি সময়ের কবি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তৎকালীন বাঙালীর দুদবৈর কথা উল্লেখ করতে গিয়ে লিখেছেন:--

‘সাতকোটি সন্তানেরে, হে মুগ্দ জননী,

রেখেছ বাঙালী করে --- মানুষ কর নি৷৷’ 

 আবার বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্য থেকেও জ্ঞাত হওয়া যায় যে, ১৯০৫ সালে যখন লর্ড কার্জন বাংলা বিভাগের নির্দেশ জারি করে তখনও দুই বাংলার মোট জনসংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে সাত কোটির সামান্য ঊধের্ব৷ তৎকালীন পূর্ববঙ্গের জনসংখ্যা ছিল -- তিন কোটি দশ লক্ষ৷ আর পশ্চিম বঙ্গের জনসংখ্যা ছিল -- প্রায় সাড়ে চার কোটি৷ অর্থাৎ তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার মোট জনসংখ্যা ছিল -- সাত কোটি ষাট লক্ষের কাছাকাছি৷ অতএব বঙ্কিমচন্দ্র রচিত বন্দেমাতরম গানের কেন্দ্র বিন্দু ছিল -- অবিভক্ত বাংলা৷ যাই বা হোক রচনাকাল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত বন্দেমাতরম গানটির যাত্রাপথ রাজনৈতিক বিতর্কের অমীমাংসিত রহস্য জালে আবদ্ধ৷ 

 *বন্দে মাতরম্‌ গানটির রচনাকাল থেকে অদ্যাবধি ঘটে যাওয়া মার্মিক তথ্য সমূহ*:--

বন্দে মাতরম্‌ নাম দিয়ে এই বন্দনা গীতির প্রথম দুটি স্তবক রচিত হয়েছিল ১৮৭৫ সালে যা বঙ্গদর্শন নামক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল৷ কিন্তু ঐ সময় এই গানটি জনসাধারণের মধ্যে তেমন কোন প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয় নি৷ কিন্তু ১৮৮২ সালে এই গানটি ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র রচিত আনন্দ মঠ উপন্যাসে সংযুক্ত করা হয়৷ কিন্তু আনন্দ মঠ গ্রন্থে আরো চারটি স্তবক যোগ করা হয়৷ আনন্দ মঠ উপন্যাসে গানটি সংযুক্ত হওয়ার পর জন সাধারণের মধ্যে যথেষ্ট প্রাধান্য বিস্তার করে৷ ১৮৭৫ সালে রচিত দুটি স্তবকের কেন্দ্র বিন্দু ছিল -- কেবল বঙ্গভূমির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন৷ কিন্তু ১৮৮২ সালে রচিত অবশিষ্ট চারটির মধ্যে তিনটি স্তবকে হিন্দু ধর্মে মান্যতা প্রাপ্ত দূর্গা, লক্ষী ও সরস্বতীর কথা উল্লিখিত হয়েছে৷ আর ঐ সঙ্গে মন্দিরে মন্দিরে প্রতিমা গড়ার কথাও বলা হয়েছে৷ অতএব এই ছত্রগুলোতে সাম্প্রদায়িকতার স্পষ্ট চিত্র পরিলক্ষিত হয়৷ আনন্দ মঠ উপন্যাসের পরিপ্রেক্ষিতে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর রচিত *’জীবনস্মৃতি* গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন:-- 

 ’১৮৮০ সালের পর থেকে বঙ্কিমচন্দ্রের চিন্তা-ভাবনায় ব্যাপক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়৷ তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, ভারতবর্ষে পরাধীনতার শৃঙ্খল ব্রিটিশরা চাপায় নি, চাপিয়েছিল -- মুসলিম শাসকদল৷ এই ধরণের চিন্তা ভাবনার কারণেই তিনি হিন্দু জাতীয়তাবাদের সমর্থক হয়ে ওঠেন৷

এই বন্দেমাতরম্‌ গানটি পুনরায় ১৮৮৫ সালে *‘বালক’* পত্রিকায় প্রকাশিত হয়৷ আর ১৮৮৬সালে কংগ্রেসের দ্বিতীয় অধিবেশনে একবার পুরো গানটিই গাওয়া হয়৷ আর এই শুভ উপলক্ষটিকে কেন্দ্র করেই বন্দে মাতরম্‌ গানটি ভারতীয় জাতীয়তাবাদের স্বীকৃতি লাভ করে৷ কিন্তু ১৮৯৬ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত জাতীয় কংগ্রেসের দ্বাদশ অধিবেশনে স্বয়ং কবিগুরু এই গানটির মাত্র দুটি স্তবক গান করেন৷ জেনে রাখা ভালো, এই অনুষ্ঠানে কবিগুরু গানটি গাওয়ার আগে স্বয়ং সুরারোপণ করেছিলেন৷ 

 এখানে একটা কথা অবশ্যই স্মরণীয় যে, মানসিকতাকে কেন্দ্র করে লেখক, কবি ও সঙ্গীত স্রষ্টাদের দুটো পর্যায়ে ভাগ করা যায়৷ ১৷ পারম্পারিকতার জালে আবদ্ধ ভাবজড়তা সমৃদ্ধ মানসিকতা ও ২৷ ভাবজড়তামুক্ত স্বতন্ত্র চিন্তাধারা সম্পন্ন উদার মানসিকতা৷ এই উদার মানসিকতা সম্পন্ন ব্যষ্টিরা কোন রকম অযৌক্তিক চিন্তাধারাকে মনের মধ্যে আশ্রয় দেন না৷ অতএব সঠিক পথ নির্দেশনার জন্য মনকে অবশ্যই জড়তার নাগপাশ থেকে মুক্ত করতেই হবে৷ জড়তার মুক্তি প্রসঙ্গে বিংশ শতাব্দীর মহান দার্শনিক ও সত্যদ্রষ্টা ঋষি শ্রী প্রভাত রঞ্জন সরকার তাঁর রচিত ’’অভিমত’’ গ্রন্থের চতুর্থ খণ্ডের শেষ অধ্যায়ে বলেছেন:--

 ’মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ হচ্ছে তার মননশক্তি, তার বুদ্ধি৷ এই বুদ্ধিকে আমি পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারবো না -- এর চেয়ে বেদনাদায়ক আর কী হতে পারে৷ তাই মনের মুক্তি চাই ও তারও আগে ’’বুদ্ধির মুক্তি ’’ চাই৷ ’

 তিনি আরো বলেছেন:-

 ’মানবতার সেবার জন্য এই বুদ্ধিকে সর্ব প্রকার বন্ধন থেকে, ভাবজড়তা থেকে, নানাবিধ অশুভ প্রভাব থেকে মুক্ত করতে হবে৷ যতদিন তা না হচ্ছে মানুষ জাতির ভবিষ্যৎ স্বর্র্ণেজ্জ্বল হতে পারে না৷ যদি আজকের মানুষের সামনে স্বর্ণিম সুপ্রভাত আনতে হয়, তাহলে অসীম সাহস করে এই ভাবজড়তার বিরুদ্ধে, সংগ্রাম করে বুদ্ধির সর্বাত্মক বন্ধন-মুক্তি ঘটাতে হবে৷’

 বাংলার স্বনামধন্য লেখক ও সাহিত্য সম্রাট উপাধিতে বিভূষিত ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অবশ্যই একজন সুদক্ষ রচনাকার ছিলেন কিন্তু ভাবজড়তা বশতঃ তিনি সত্যিকারের সাহিত্যকার হতে পারেন নি৷ আমরা এই আনন্দ মঠ গ্রন্থের বিভিন্ন জায়গায় হিন্দুত্বের শ্রেষ্ঠতার উল্লেখ পাই৷ অতএব এটাই সুস্পষ্ট যে, তিনি যদিও একজন স্বনামধন্য ঔপন্যাসিক তবুও ভাবজড়তার নাগপাশে আবদ্ধ থাকার জন্য উদারবাদী চিন্তক হতে পারেন নি৷ যাই বা হোক, যেহেতু আজকের আলোচ্য বিষয় -- বন্দে মাতরমগানের ঐতিহাসিক উত্থান ও পতন সম্পর্কে, তাই এই সম্বন্ধে আরো কিছু তথ্য প্রকাশ করা উচিত৷ এর আগে বন্দে মাতরমগানের পথ চলা নিয়ে যেটুকু আলোচনা হয়েছে, তা অবশ্যই ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে৷ অতএব বিংশ শতাব্দীর যাত্রাপথ নিয়ে যথাসম্ভব আলোচনা অবশ্যই বাঞ্ছনীয়৷ 

 বিংশ শতাব্দীর পরিপ্রেক্ষিতে বলতে হলে বলতে হয়, বন্দেমাতরম্‌ শীর্ষক গানটি সর্বপ্রথম গীত হয়েছিল-- ১৯০২ সালে জাতীয় কংগ্রেসের অষ্টাদশ অধিবেশনে৷ গানটি গেয়েছিলেন বাংলার নামকরা সঙ্গীত শিল্পী দক্ষিণাচরণ সেন৷ আবার ১৯০৫ সালের একবিংশ অধিবেশনে গেয়েছিলেন -- কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ভাগ্ণী সরলা দেবী৷ এর পর অর্থাৎ বাংলা বিভাগের নির্দেশ জারি হওয়ার পর বন্দে মাতরমধবনিটিই বঙ্গ ভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের মহামন্ত্র রূপে গ্রহীত হয়৷ এক সময় এই ধবনিটিই ব্রিটিশ শাসকদলের রাতের ঘুম কেড়ে নেয়৷ অগ্ণিশিশু ক্ষুদিরাম বসু বন্দে মাতরম ধবনি উচ্চারণ করতে করতেই ফাঁসীর মঞ্চে উপস্থিত হন ও হাসিমুখে দেশমাতৃকার সেবায় প্রাণোৎসর্গ করেন৷ এই বন্দেমাতরম ধবনি একদিকে বিপ্লবীদের মনে অদম্য সাহসের সঞ্চার করে আর অন্যদিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠীর মনে অদম্য ভীতির সঞ্চার করে৷ ১৯০৫ সালের পরবর্তী সময়ে প্রতিটি বিপ্লবীর মুখে একটাই ধবনি সর্বত্রই গুঞ্জিত হয়েছে -- বন্দে মাতরম্‌ সত্যি কথা বলতে কি, বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভিক মূহুর্তে এটাই ছিল -- ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনকে সুদৃঢ় করার অমোঘ বাণী৷ 

 এখানে আরেকটা কথা অবশ্যই স্মরণীয় যে, ১৯০৫ থেকে ১৯২০ পর্যন্ত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মধ্যে কোন রকম সাম্প্রদায়িকতার বীজ উপ্ত হয় নি৷ কিন্তু ১৯২০ সালের পর হিন্দু মুসলিম ভেদাভেদের বেড়াজালে বন্দে মাতরমগানটি তার কৌলিন্য হারাতে শুরু করে আর ক্রমশঃ রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে৷ কারণ যে ধবনিটি এক সময় বিপ্লবীদের চেতনা জাগরণের মহামন্ত্র ছিল, সেই মহামন্ত্রই সাম্প্রদায়িকতার নকারাত্মক প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে হিন্দু জাতীয়তাবাদের এক অভাবনীয় দৃষ্টান্ত রূপে পরিচিতি লাভ করে৷ 

আর এই ভাবেই দিন কেটে যায়৷ ১৯৩৭ সাল৷ অক্টোবর মাসে কলকাতায় অনুষ্ঠিত হতে চলেছে -- কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বিশেষ বৈঠক৷ আর এই বৈঠকেই বন্দে মাতরমগানটিকে জাতীয় গানের স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়৷ কিন্তু এই ব্যাপারে পুনরায় বিতর্ক শুরু হয়৷ অবশেষে এই বিতর্কের ব্যাপারে কবিগুরুর নির্দেশ যাচনা করা হয়৷ তিনি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জবাহর লাল নেহেরু ও আজাদ হিন্দ সরকারের প্রতিষ্ঠাতা সুভাষচন্দ্র বসুকে আলাদা আলাদা চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেন যে, কেবল প্রথম দুটি স্তবক গাওয়া হউক৷ কারণ প্রথম দুটি স্তবকে বিবাদের কোন স্থান নেই৷ অবশেষে কবিগুরুর নির্দেশ মেনেই ওয়ার্কিং কমিটি তাদের কার্য সম্পাদন করেন৷ 

১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট ভারত স্বাধীনতা লাভ করে৷ ১৯৪৮ সালের ২৪শে জানুয়ারি ভারতীয় গণপরিষদ আনুষ্ঠানিক ভাবে রবীন্দ্রনাথ রচিত *জন-গণ-মন অধিনায়ক* গানের প্রথম স্তবকটিকে জাতীয় সঙ্গীতের স্বীকৃতি দেয় আর সেই সঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্র রচিত *‘বন্দে মাতরম্‌’* গানের দুটি স্তবককে জাতীয় স্তোত্রের মর্যাদায় মর্যাদিত করা হয়৷ 

বর্তমান বর্ষে কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক নির্দেশ জারি করা হয়েছে -- যে কোন সরকারী অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রীয় গান গাওয়ার আগে অবশ্যই জাতীয় স্তোত্রের সমস্ত স্তবক গেয়ে শেষ করতে হবে৷ ঐ সময় প্রতিটি দর্শক ও শ্রোতা অবশ্যই সাবধান মুদ্রায় দাঁড়িয়ে থাকবেন৷ নতুবা তিনি শাস্তি যোগ্য অপরাধে অপরাধী বলে গণ্য হবেন৷ এখানে একটা কথা অবশ্যই প্রণিধানযোগ্য যে যদি বন্দে মাতরমগানটি সম্পূর্ণ গাওয়া হয়, তাহলে জন-গণ-মন গানটির একটি স্তবক কেন৷ আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে যে টুকু বুঝতে পারি, তারই পরিপ্রেক্ষিতে বলছি যে, রাষ্ট্রীয় সঙ্গীতেরও প্রতিটি স্তবক অর্থাৎ সম্পূর্ণ গানটি গাওয়া উচিত৷ 

বর্তমান সরকারের এই নির্দেশ অবশ্যই পক্ষপাত দুষ্ট অথবা ও ভারতীয় সমাজের এক পক্ষকে হেয় প্রতিপন্ন করার গুপ্ত ষড়যন্ত্র৷ অবশেষে একটাই কথা বলতে পারি--ভক্তি, শ্রদ্ধা, প্রেম, ভালোবাসা অন্তরের অন্তঃস্থলের পবিত্র আকুতি ও সাত্ত্বিক ভাবাবেগ৷ সুতরাং আইনের ভয় দেখিয়ে বাহ্যিক প্রদর্শন করা যায় কিন্তু আন্তরিক ভাবাবেগকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না৷ সুতরাং সাবধান মুদ্রায় দাঁড়িয়ে থাকাটাই যথেষ্ট নয়৷ প্রতিটি মানুষের মধ্যে সুশিক্ষার মাধ্যমে দেশপ্রেমের ভাবনা জাগ্রত করতে হবে৷ আর দেশবাসীর মনে তখনই এই ধরণের দেশপ্রেমের ভাবনা জাগ্রত হবে যখন প্রতিটি মানুষের জন্য অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার গ্যারান্টি দেওয়া হবে৷

 

 

  • Log in to post comments
Powered by Drupal

নোতুন পৃথিবী সোসাইটির পক্ষ থেকে আচার্য মন্ত্রসিদ্ধানন্দ অবধূত কর্তৃক প্রকাশিত।

সম্পাদকঃ - আচার্য মন্ত্রসিদ্ধানন্দ অবধূত

Copyright © 2026 NATUN PRITHIVII SOCIETY - All rights reserved