চ ঃ (১) ‘চি’ ধাতু + ‘ড’ প্রত্যয় করে ‘চ’ শব্দ নিষ্পন্ন হচ্ছে যার মানে হ’ল চয়ন করা হিন্দীতে ‘চুনন্া’৷ এই চয়ন করা থেকেই বাংলায় ‘চয়ন’, ‘সঞ্চয়ন’, ‘সঞ্চয়িতা’, ‘সঞ্চিতা’, ‘অপচয়’, ‘অপচিত’, ‘উপচয়’ (উপচে পড়া), ‘উপচিত’ প্রভৃতি শব্দগুলি এসেছে৷ আমরা ভাল করে একটি মালা গাঁথবার জন্যে ৰাগান থেকে ভাল ভাল ফুল ৰাছাই করে নিই ও তা তুলি৷ এই ফুল তোলা হ’’ল পুষ্প চয়ন করা৷ যিনি বিশ্বের সকল জায়গা থেকে সৎ নীতিনিষ্ঠ ভাল মানুষগুলিকে ৰাছাই করে নিয়ে নিজের ‘গণ’ বা অনুচর বা সহকারী করে নেন, তাঁদের সাহায্যে বিশ্বে সৎ ভাবনার প্রচার-প্রসারের চেষ্টা করেন তিনিও নিশ্চয়ই ‘চ’৷ তাই শিবের একটি নাম চ’৷
(২) লোকের ধারণা, চাঁদ শুক্ল পক্ষে পৃথিবীর বিভিন্ন বস্তু থেকে তাদের মাধুর্য চয়ন করে আর এই মাধুর্য পূর্ণত্বে পৌছোয় পূর্ণিমা তিথিতে৷ চাঁদ সে সময় জ্যোৎস্নায় উপচে পড়ে৷ তারপর আবার কৃষ্ণপক্ষে বিভিন্ন সত্তা চাঁদের কাছ থেকে তাদের মাধুর্য কেড়ে নেয়৷ চাঁদ ধীরে ধীরে তার মাধুর্য হারাতে থাকে ও অমাবস্যায় সে মাধুর্যহীন কৃষ্ণপক্ষে পরিণত হয়৷ চাঁদ মাধুরী চয়ন করে থাকে৷ তাই চাঁদেরও একটি নাম ‘চ’৷
(৩) লোকের ধারণা সর্প প্রতিটি তিথিতে ধীরে ধীরে বিষ আহরণ করে ও তারপর আবার ধীরে ধীরে সেই বিষ কমে যেতে থাকে৷ বিষ চয়ন করে বলে সর্পের একটি নাম ‘চ’৷
(৪) যে লোকটি এর বাড়ী থেকে হাতা-খুন্তি, ওর বাড়ী থেকে থালা-গেলাস, তার হেঁসেল থেকে পান্তাভাত, এর পকেট থেকে মানিব্যাগ, তার দোকান থেকে ৰাজি-পটকা, একদমা-দোদমা, কারও ৰাগান থেকে ঁৰ-পেয়ারা চয়ন করে করে নিজের ভাণ্ডার পূর্ণ করে, চয়ন করা স্বভাব থাকায় সেও ‘চ’৷ তাই চোরের একটি প্রতিশব্দ হল ‘চ’৷
(৫) যে জীব সোজাসুজি খায় না, কোন জিনিস খাবার আগে প্রথমে তার সব চেয়ে নরম অংশটুকু খাৰলে খায়, তারপর আর একটু নরম অংশ খাৰলে খায়, এইভাবে শেষ পর্যন্ত গোটা বস্তুটি খায়, এই চয়ন করে করে খাওয়া বা খাৰলে খাবলে খাওয়া যার স্বভাব সেও নিশ্চয়ই ‘চ’৷ এইভাবে মৎস্য জাতীয় অনেক জীবই খেয়ে থাকে৷ তবে মাছেদের চেয়ে এইভাবে খেতে ৰেশী অভ্যস্ত ‘কচ্ছপ’৷ তাই কচ্ছপের আর একটি নাম ‘চ’৷
(৬) চ ধাতুর অর্থ খেতে খেতে চলা৷ গোরু খেতে খেতে চলে৷ তাই আমরা ৰলি, ‘গোরু চরছে’ কিন্ত ‘মানুষ চলছে’৷ তোমরা যদি কখনও প্রকাশ্যে বা লুকিয়ে চানাচুর-বাদাম খেতে খেতে চল সেই অবস্থায় তোমরাও কিন্তু চরছ, লোকে জানুক বা না জানুক৷
সভ্যতার আদিযুগে মানুষের আজকালকার মত সকালের জলখাবার, দুপুরের খাবার, বিকেলের জলখাবার ও রাত্রির খাবার কোন নির্দিষ্ট সময় ছিল না৷ ভোজ্য খাবারের কোন নিশ্চিততাও ছিল না৷ তাই অনেক সময় তারা রাস্তায় খাদ্য সংগ্রহ করতে পারলে চলতে চলতেও খেত৷ তাই আজকের মানুষের তুলনায় কালের মানুষ বেশী চরত৷ সম্ভবতঃ সেই জন্যেই বেদে ‘চরৈবেতি, চরৈবেতিশব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ (শ্রীপ্রভাতরঞ্জন সরকারের লঘুনিরক্ত থেকে সংগৃহীত)