যে ক’জন ভারতসাধক হিন্দু এবং মুসলমান ধর্মের মধ্যে সম্প্রীতির বাতাবরণ রক্ষা করতে চেয়েছিলেন, তাঁদের অন্যতম ভক্ত দাদু৷ ভক্ত দাদুকে মরমিয়া সাধক কবীরের উত্তরসুরী বলা হয়৷ কবীর যেমন বিভিন্ন গানের মাধ্যমে ভক্তিপথের সন্ধান করেছেন, দাদুও তাঁকে অনুসরণ করে আধ্যাত্মিক গান লিখে গেছেন৷ দাদু ছিলেন ধর্ম সমন্বয়ের এক মহান প্রতীক৷
আমাদের জানতে ইচ্ছে করে কে এই মহাত্মা দাদু? তাঁর জীবন কেমন ছিল? ১৫৪৪ খ্রিস্টাব্দের ফাল্গুন মাসে শুক্লাষ্টমী তিথিতে সাধক দাদুর আবির্ভাব হয়৷ তিনি জন্মেছিলেন এক দরিদ্র মুসলমান ধনুকরের পুত্র হিসাবে৷ তাঁর বাল্য জীবনের কথা আমরা বিশেষ কিছু জানতে পারি না৷ শুধু জানা যায়, তাঁর পিতার নাম ছিল লোদি আর মা ছিলেন পড়শিবাঈ৷ চামার পল্লীর দরিদ্রতা এবং অশিক্ষার অন্ধকারের মধ্যে দাদুর শৈশবকাল অতিবাহিত হয়৷ পড়াশোনা শেখার সামান্যতম সুযোগ তিনি পাননি৷ বাল্য এবং কৈশোরে তাঁর মধ্যে কোনো অসাধারণত্ব প্রকাশিত হয়নি৷ যৌবনেও তিনি অলৌকিক ঘটনা প্রদর্শন করেননি৷ বরং বলা যায় দুঃখ জর্জরিত দাম্পত্য জীবন কাটিয়ে গেছেন৷ ছিলেন তাঁর প্রেমময়ী পত্নী হওয়া এবং চারজন পুত্র কন্যা৷ তাদের মধ্যে বড়ো ছেলে গৌরদাস পরবর্তীকালে মরমিয়া সাধক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন৷ সব থেকে ছোটো ছেলে মসতিনদাস এবং দুই কন্যা মনুবাঈ ও মাতাবাঈ আধ্যাত্মিক জীবনের পথে অনেক দূর অগ্রসর হন৷ একদিন কোনো অলৌকিক শক্তির প্রভাবে দাদু সংসার ত্যাগ করে পরিব্রাজকের জীবন যাপন করতে শুরু করলেন৷ এক পরিব্রাজক সাধক হিসাবে কাশী, বিহার এবং বাংলার বহু স্থান ভ্রমণ করলেন৷ এই সময় তিনি মন দিয়ে সহজমত, শূন্যবাদ, নিরঞ্জনবাদ এবং নাথতন্ত্রের সাধনতত্ত্ব আয়ত্ত করেছিলেন৷ নাথতন্ত্রের যোগসাধনায় অসামান্য সাফল্য অর্জন করেন৷ এছাড়া বাংলাদেশে বেশ কিছুদিন অতিবাহিত করেন৷ বাংলার নাথগ্রন্থ যোগীদের সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন৷
দাদুর সাধনায় হিন্দু-মুসলমান কোনো প্রভেদ ছিল না৷ তাঁর এই আচরণে সনাতনপন্থী হিন্দু পুরোহিত এবং মুসলমান উলেমারা খুবই বিরক্ত হয়েছিলেন৷ তাঁরা একদিন দাদুকে প্রশ্ণ করলেন ‘‘আচ্ছা দাদু, মানুষ নির্দিষ্ট একটা সম্প্রদায়ের অন্তর্গত হয়ে সেবার কাজ করে, ঈশ্বরের আরাধনা করে৷ তুমি কোন সম্প্রদায়ের?’’
দাদু এই প্রশ্ণের উত্তরে একটু হেসে বলেছিলেন---‘‘ভাই, চন্দ্র-সূর্য-পৃথিবী- আকাশ-বাতাস-জলএরাও তো সেবাকর্মে রত৷ এরা কি কোনো বিশেষ ধর্মের পালক?’’
- Log in to post comments