‘‘গণতান্ত্রিক দেশে ছাত্রসমাজের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ জানানোর অধিকারকে কোনওভাবেই পুলিশি দমন-পীড়নের মাধ্যমে স্তব্ধ করা যায় না৷ নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ণ তুলে যখন দেশের তরুণ প্রজন্ম রাস্তায় নেমেছে, তখন তাঁদের কণ্ঠরোধ করতে প্রশাসনিক শক্তির প্রয়োগ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী৷ দিল্লির রাজপথে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশের যে আচরণের অভিযোগ সামনে এসেছে, তার নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে৷ একই সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সাংবিধানিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে৷ দিল্লির রাজপথে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর প্রশাসনের বর্বর আচরণ শুধু কয়েকজন তরুণের ওপর রাষ্ট্রের ক্ষমতা প্রদর্শনের ঘটনা নয় এটি আমাদের গণতন্ত্রের কাছে এক গভীর প্রশ্ণচিহ্ণ৷ মনে রাখা দরকার রাষ্ট্রের শক্তি মানুষের কণ্ঠকে স্তব্ধ করার জন্য নয়, মানুষের অধিকারকে সুরক্ষিত করার জন্য৷
ইতিহাস বড় নির্মম শিক্ষক- যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য একদিন বুক ফুলিয়ে বলেছিল---‘‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যায় না’’, সেই সাম্রাজ্যের পতন হয়েছে৷
ভারতের মাটিতে জরুরি অবস্থার অন্ধকারও চিরস্থায়ী হয়নি৷ কংগ্রেসের আজকের করুণ অবস্থা কারুরই অজানা নয়৷ পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসনের অটল দুর্গও একদিন ভেঙে পড়েছে৷ সিপিএমের গগনচুম্বী অহংকার ধবংস হয়েছে৷ দুর্নীতিতে আকন্ঠ ডুবে গিয়ে তৃণমূল দলটা এখন অবক্ষয়ের শেষ ষ্টেশনে৷ অর্থাৎ ইতিহাসের পাতায় একটি সত্যই বারবার ফিরে আসে৷ ক্ষমতা যত বড়ই হোক, মানুষের ঊর্ধে নয়৷ অহংকার যত প্রবলই হোক, চিরস্থায়ী নয়৷ শাসন যত দীর্ঘই হোক, তারও একদিন হিসাব দিতে হয়৷
আজকের ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের কাছেও তাই ইতিহাসের এই শিক্ষা স্মরণ রাখা জরুরি৷ ধর্মীয় আবেগ, পরিচয়ের রাজনীতি কিংবা বিভাজনের উত্তাপ দিয়ে কিছু সময়ের জন্য মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরানো সম্ভব হতে পারে কিন্তু চাকরি, বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, আয় ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বাস্তব প্রশ্ণকে চিরকাল আড়াল করে রাখা যায় না৷ মানুষকে ভয় দেখিয়ে কিছুদিন শাসন করা যায়, কিন্তু মানুষের প্রশ্ণকে চিরদিন বন্দী করে রাখা যায় না৷ গণতন্ত্রে মানুষ প্রজা নয় নাগরিক৷ সরকার মানুষের প্রভু নয় জনগণের কাছে জবাবদিহি করা প্রতিষ্ঠান৷ ক্ষমতার অলিন্দে বসে ইতিহাসকে ভুলে যাবেন না৷
আমরা দিল্লির শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের অধিকারের পাশে আছি৷ প্রশাসনিক দমন-পীড়নের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা হোক৷ জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ ও সুপ্রীমকোর্টের নজরদারীতে সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনী ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করা, যাতে সম্পূর্ণ অনায্যভাবে বাদ পড়া ভোটাররা পুনরায় স্বাধীনভাবে নিজেদের ভোট দেওয়ার অধিকার ফিরে পায়৷