প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার পর থেকেই গণতন্ত্র, দেশবিরোধী শব্দ দুটোর সংজ্ঞা পাল্টে যাচ্ছে৷ সরকারের বিরুদ্ধে কথা বললেই দেশবিরোধী দেশদ্রোহী আখ্যা দেওয়া হচ্ছে৷ সরকারের কাজের সমালোচনা করা জনগণের মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়ে৷ কিন্তু সরকার যদি বিরুদ্ধে পক্ষের সমালোচনা সহ্য করতে না পারে বুঝতে হবে সে সরকারের মধ্যে স্বৈরাচারী প্রবণতা বাড়ছে৷
গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য শাসক দল নির্বাচিত হয় জনগণের দ্বারা৷ তবে শুধু শাসক পক্ষ নয়, সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী পক্ষ থাকে ও তারাও জনগণের দ্বারা নির্বাচিত৷ ভারতবর্ষের মতো বহুদলীয় গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় একাধিক দল শাসক নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে৷ যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠ হয় তারাই শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় ভারতীয় সংসদীয় গণতন্ত্রে পাঁচ বছরের জন্য৷
ভারতবর্ষ শুধু একটি দেশ নয়,নানা ভাষাভাষী কৃষ্টি- সংস্কৃতি আচার-আচরণ সম্পন্ন বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর যুক্ত প্রদেশ বা ভারত যুক্তরাষ্ট্র৷ নানা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন প্রদেশে অনেক আঞ্চলিক দলও আছে৷ জাতীয় ও আঞ্চলিক দল মিলিয়ে ভারতে প্রায় স্বীকৃত ও নথিভুক্ত ২৬০০০-এর কাছাকাছি রাজনৈতিক দল আছে৷ তাই ভারতবর্ষে কখনোই প্রকৃত সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসক নির্বাচিত হয় না৷ বহুধা বিভক্ত দল ও মতের পার্থক্য অনুযায়ী নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সংখ্যাগরিষ্ঠ যে দলকে চায় সেই দলই বা একাধিক দল শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়৷ অপরদিকে এক বা একাধিক গোষ্ঠী বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকে৷৷
সংসদীয় গণতন্ত্রে শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনে বিরোধীদলের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ৷ কিন্তু ভারতীয় গণতন্ত্রে সাম্প্রতিক দেখা যাচ্ছে শাসক দল সংসদকে বিরোধীশূন্য রাখতে চায় ৷ এর পরিণামে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকার স্বৈরাচারী শাসকের পরিণত হয়৷ সম্প্রতি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ভারতবর্ষকে নির্বাচিতদের স্বৈরাচারী শাসন ও আংশিক স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য করেছে৷
এর প্রধান কারণ নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর কোনরকম বিরোধীতা সহ্য করতে পারছেন না৷ ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার আগে বছরে ২ কোটি চাকরি দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, কালো টাকা উদ্ধারসহ যেসব প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন ১২ বছরে তার কোনটাই রক্ষা করেননি৷ সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা হচ্ছে শাসকদলের ব্যর্থতা ও জনবিরোধী কাজের সমালোচনা করা৷ শাসকদলের যদি মনে হয় বিরোধীদল সত্য বলছে না তাহলে যুক্তি ও তথ্য দিয়ে বিরোধী দলের অভিযোগ খন্ডন করা৷ কিন্তু মোদি সরকার সে পথে না গিয়ে বিরোধীদলকে দেশবিরোধী পাকিস্তানি ইত্যাদি ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে অসচেতন নাগরিকদের বিভ্রান্ত করছে৷ এতে দেশের কল্যাণ তো হয় না, বরং রাষ্ট্রের সংহতি বিঘ্নিত হয়৷ শাসক দলের এই অভিযোগ বহিঃশত্রুকে উৎসাহিত করে দেশকে দুর্বল করে৷
ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনকেও দেশদ্রোহী আখ্যা দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছে বিজেপি৷ এমনকি শিক্ষামন্ত্রীও তার পদত্যাগ পত্রে আন্দোলনকারীদের সম্পর্কে দেশদ্রোহী শব্দটা ব্যবহার করেছেন৷ সাম্প্রতিককালে শাসকবিরোধী গণআন্দোলনকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় তার দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আর জি করের মর্মান্তিক ঘটনার প্রতিবাদে গণআন্দোলনে৷
তবে শাসক বিজেপি যেকোন সরকার বিরোধী আন্দোলনকে দেশবিরোধী আখ্যা দিতে গিয়ে নিজেদের কলঙ্কিত অতীতকে সামনে নিয়ে এসেছে৷ বিজেপির মাতৃ সংগঠন বলে পরিচিত রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ পরাধীন ভারতে বিশেষ করে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে শামিল না হয়ে ব্রিটিশকে সমর্থন করেছিল৷ হিন্দু মহাসভাও ভারতছাড়ো আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিল৷ সরকারের বিভিন্ন কাজের সমালোচনা করা জনস্বার্থ বিরোধী কাজের প্রতিবাদ করে আন্দোলনে নামটাও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়ে৷ শীর্ষ আদালত জানিয়ে দিয়েছেন শাসক দলের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মানে দেশদ্রোহিতা নয়৷ শাসকদলেরও মনে রাখা উচিত শাসন ক্ষমতায় কোন দলই চিরস্থায়ী নয়, হয়তো দীর্ঘস্থায়ীও নয়, তাই একদিন এই দেশদ্রোহী অস্ত্রটাই শাসকদলের কাছে বুমেরাং হয়ে ফিরতে পারে৷ যখন আজকের শাসক দলের দেশদ্রোহিতার একটা অতীত ইতিহাস আছে৷ তাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের অধিকার ও আন্দোলনকে দেশদ্রোহীতার নেতৃত্বে মাপতে গিয়ে নিজেদের কালিমালিপ্ত অতীতকে তুলে না ধরাই ভলো৷
- Log in to post comments