জৈনধর্মের প্রচারক বর্দ্ধমান ছিলেন এক ক্ষত্রিয়বংশের কনিষ্ঠপুত্র৷ ৫৯৯ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে বৈশালীতে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন৷ তাঁরও আগে আরো ২৩ জন জৈনধর্মের প্রচারক ছিলেন৷ এই জৈনধর্মের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ঋষভদেব৷ জৈনধর্মের উল্লেখযোগ্য প্রচারক ছিলেন অজিত নাথ, অরিষ্ট নেমী আর পরেশনাথ৷ বর্দ্ধমানেরও দুশো বছর আগের প্রচারক ছিলেন পরেশনাথ৷ পরেশনাথের শিষ্যদের শ্বেতাম্বর আর বর্দ্ধমানের শিষ্যদের দিগম্বর বলা হয়৷ শ্বেতাম্বরা পরিধানের বস্ত্র ছাড়া আর সবকিছুই ত্যাগ করেন আর দিগম্বরা সবকিছুর সাথে পরিধানের বস্ত্রও ত্যাগ করেন৷ বর্দ্ধমান এই দুই সম্প্রদায়কে এক করেছিলেন বটে কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর তাঁরা আবার বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়৷ বর্দ্ধমান ২৮ বছর বয়সে সংসার ত্যাগ করেন৷ ১২ বছর কঠোর তপস্যার পর তিনি কৈবল্য অর্থাৎ মোক্ষলাভ করেন৷ তখন তার নামকরণ হয় মহাবীর৷ আর তখন তিনি ‘জিন’ উপাধিতে ও ভূষিত হন৷
রাঢ় বাংলায় জৈনধর্মের যথেষ্ট প্রভাব ঘটেছিল৷ জৈনবাদ ও শৈবাদর্শ-পরস্পর তত্ত্বগত বিপরীত মুখী হলেও রাঢ়ের বুকে দীর্ঘকাল পাশাপাশি চলেছিল৷ রাঢ়ের একটি শহরের প্রাচীন নাম ছিল ‘আস্তিকনগর’৷ এ প্রসঙ্গে শ্রীপ্রভাতরঞ্জন সরকার বলেছেন---‘বর্দ্ধমানের নাম বার-এ দেওয়ান (লোকে গ্রহণ করেনি)৷ ‘বার -এ-দেওয়ান’ থেকে ইংরেজী ‘বার্ডওয়ান’ শব্দটি এসেছে৷ সুপ্রাচীন নাম বর্দ্ধমান আড়াই হাজার বছর ধরে চলে আসছে৷ নামটি জৈন ধর্মগুরু বর্দ্ধমান মহাবীরের নামে হয়েছে৷ শহরটির আরো প্রাচীন নাম ছিল ‘আস্তিকনগর’.. প্রাকৃতে অত্থিনগর (বর্ণবিজ্ঞান)৷
অহিংসা জৈনদের কাছে সব চেয়ে বড় জিনিস হলেও তা অবাস্তবতায় ভরা৷ যেমন, পাছে পথ চলবার সময় পায়ের চাপে জীবহত্যা হয়, সেজন্য সন্ন্যাসীরা সম্নার্জনী (ঝাঁটা) দিয়ে পথ পরিষ্কার করতে করতে চলেন৷ জল ছেঁকে খান৷ মধুপান করেন না৷ নিঃশ্বাস প্রশ্বাসে জীবাণুর মৃত্যু হয়৷ সেজন্য নাকে কাপড় জড়িয়ে রাখেন৷ সেজন্য নাকে কাপড় জড়িয়ে রাখেন৷ আবার আত্মহত্যা মহাপাপ হলেও জৈনদের মর্ত্যে আত্মহত্যার দ্বারা জীবন বৃদ্ধি লাভ করে৷ যদি সন্ন্যাস জীবন যাপন সম্ভব না হয়, কামনা বাসনার নিবৃত্তি না হয় তাহলে আত্মহত্যা করার বিধান জৈন ধর্মে আছে৷ মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের জীবনে এমনটাই ঘটেছিল৷ শেষ বয়সে তিনি জৈনধর্ম গ্রহণ করেন, কিন্তু বাসনা নিবৃত্তি না হওয়ায় তিনি দাক্ষিণাত্যে আত্মহত্যা করেন৷ তবে বারো বছর সন্ন্যাসী জীবন যাপনের পর এই আত্মহত্যার বিধান আছে৷ নারীর প্রতি জৈনদের দৃষ্টিভঙ্গি এতই নীচ যে, নারী নাকি লোভের বস্তু৷ অতএব নারীসঙ্গ একান্তই বর্জনীয়৷ আবার কৃষিকার্যের ফলে মাটির নীচের পোকামাকড় মারা যায় তাই চাষ বাস ও নিষিদ্ধ৷
এইসব উদ্ভট বিধিনিষেধের জন্যই শ্রীপ্রভাতরঞ্জন সরকার বলেছেন--- ‘যদিও ‘জিন’ শব্দ থেকে জৈন শব্দের উৎপত্তি ও যার অর্থ হচ্ছে জয়ী হওয়া, সব কিছুর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে জয়ী হওয়া কিন্তু এই কূর্মভাবে তা কি করে সম্ভব? এজন্য প্রয়োজন প্রচণ্ড উৎক্ষেপণাত্মক সম্পেষণ৷ তাই জৈন মতবাদ মানুষকে আলো থেকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়, মানুষকে নিষ্কর্মের অন্ধ তমিশ্রার অন্ধকূপে নিক্ষেপ করে৷’ (বাংলা ও বাঙালী)
- Log in to post comments