সিমু দাস অসমের নগাঁও জেলার কোঠিয়াতলির বাসিন্দা৷ রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর, সঙ্গে বিশ্বকাপজয়ী ভারতীয় মহিলা দলের সদস্য৷ তবে এই বিশ্বকাপ একটু পৃথক৷ সিমু জন্মাবধি দৃষ্টিহীন৷ তাঁর দাদাও তাই৷ সঙ্গে বধিরও৷ দুই সম্তানকে নিয়ে ব্যাংকের রান্নাঘর সামলে সংসার চালিয়েছেন মা৷ মাসিক মাত্র ৩ হাজার টাকায়৷ কারণ, সিমুর জন্মের আগেই বাবা তাঁদের ফেলে চলে যান৷ তাই দৃষ্টিহীনদের ২২ গজে ইতিহাস সৃষ্টি করে সব কৃতিত্ব মাকেই দিচ্ছেন উত্তর-পূর্ব ভারতের অখ্যাত এক গ্রাম থেকে উঠে আসা সিমু৷
সিমু বলেন---স্বপ্ণেও ভাবিনি এটা৷ প্রত্যন্ত গ্রামের দরিদ্র পরিবার থেকে এসে উঠে এসেছি৷ প্রথম যেদিন মাঠে নেমেছিলাম ভয় হচ্ছিল৷ বলটা বেশ ভারী... প্রচুর ব্যথা পেয়েছি৷ কোচ সাহস জুগিয়ে বলেছিলেন, দু’-চারদিন ব্যথা পাবে৷ তারপর অভ্যাস হয়ে যাবে৷ বিশ্বকাপ ছুঁয়ে স্যারের সেই কথাগুলো মনে পড়ছিল৷
২০১৯ সালে দিল্লি গিয়েছিলাম পড়াশোনা করতে৷ লক্ষ্য ছিল ব্যাংকে চাকরি পাওয়া৷ কারণ, সেখানকার হেঁশেল সামলেই মা বড় করেছেন আমাদের৷ সেইমতো সব চলছিল৷ মায়ের উপর বোঝা কমাতে একটা কাজও করতাম পাশাপাশি৷ তিন বছরের মাথায় মিরাকল ঘটল আমার জীবনে৷ ২০২২... এক দিদি এসে বললেন, টুর্নামেন্ট হবে, খেলতে যেতে৷ ভগবান হয়তো এটাই ঠিক করে রেখেছিলেন আমার জন্য৷ সেই শুরু৷
২০২৩ সালে আমরা গোল্ড মেডেল পেয়েছিলাম৷ তখন থেকেই নিজেদের উপর বিশ্বাসটা বেড়ে গিয়েছিল৷ তারপর স্যার বললেন, এবার আমাদের আন্তর্জাতিক স্তরে খেলতে হবে৷
আমার থেকে মায়ের লড়াইটা বেশি ছিল আমাদের দুই ভাইবোনকে নিয়ে৷ অনেক কটূক্তি শুনতে হয়েছে৷ অনুষ্ঠান বাড়িতে গেলেও লোকে হাসিহাট্টা করত৷ কিন্তু মা বিশ্বাস হারাননি কখনও৷ প্রতিনিয়ত সাহস জুগিয়েছেন৷ বিশ্বকাপ জয়ের পর পরিচিতি পেয়েছি, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হাত মিলিয়েছি৷ কিন্তু তৃপ্তিটা অন্য জায়গায়৷ এখন মাকেও লোকে চেনে৷
আগামী দিনে ন্যাশনাল টুর্নামেন্ট রয়েছে৷ খেলব৷ তবে তার পাশাপাশি আমার লক্ষ্য, দৃষ্টিহীনদের পাশে দাঁড়ানো৷ মানুষ যেভাবে আমাকে সাহায্য করেছেন, আমিও সকলের পাশে দাঁড়িয়ে বিশেষভাবে সক্ষমদের সাহায্য করতে চাই৷ নগদ অর্থের প্রয়োজন নেই, আমি সরকারের কাছে একটা চাকরি চেয়েছি৷ সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেটা দেওয়া হবে বলে৷
জীবনে লক্ষ্য থাকতে হবে, আর সেটা পূরণ করার জেদ৷ বাবা মায়ের সাপোর্ট পেলে খুব ভালো, নইলে নিজেকেই এগিয়ে যেতে হবে৷ ডিপ্রেশন আবার কী! আমি পারলে সবাই পারবে৷ এটা আমার বিশ্বাস৷ দাদা আর আমার শিক্ষক ভৃগু বরঠাকুর৷ তিনি না থাকলে অসম কেন, গোটা দেশেই কেউ চিনত না আমাকে৷ খেলার জগতে যতটুকু পরিচয়, সাহায্য পেয়েছি সবই ওঁর জন্য৷