মানুষের তিনটি দুঃখ– জাগতিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক অথবা আধিভৌতিক, আধিদৈবিক ও আধ্যাত্মিক৷
ভৌতিক* জগতের যা কিছু দুঃখ–অন্নের অভাব, বস্ত্রের অভাব, এগুলি হ’ল আধিভৌতিক দুঃখ৷ যার সাহায্যে (এই) দুঃখের নিবৃত্তি ঘটে তাকে বলি ‘অর্থ’৷ বস্ত্র নেই, শীত করছে, পয়সা থাকলে বস্ত্র কেনা যাবে অন্ন নেই, ক্ষুধা পাচ্ছে, পয়সার সাহায্যে অন্ন ক্রয় করে’ ক্ষুণ্ণিবৃত্তি করা যাবে দুঃখটা দূর হবে৷ তাই যার দ্বারা (এই) দুঃখ দূর হয় তাকে বলি ‘অর্থ’৷ মূল কথা হ’ল ক্রয় ক্ষমতা চাই৷ ক্রয় ক্ষমতাটা যদি মানুষের এসে যায়, তাহলে আর আধিভৌতিক দুঃখটা থাকছে না৷
আধিদৈবিক দুঃখ হ’ল সেইগুলি যার উৎস হ’ল অমূর্ত্ত জগৎ, অর্থাৎ মানুষের মনোরাজ্য৷ এমন দেশও আছে যেখানে লোকেরা ভাল খায়–দায়, পরে৷ কিন্তু তারা কি সুখী তারা সুখী নয়৷ দুঃখ, কষ্ট, যন্ত্রণা, রোগ–সবই তাদের আছে৷ প্রিয়জনকে হারিয়ে তারা চোখের জলে বুক ভাসায়৷ সুতরাং দুঃখ তাদেরও আছে৷ এই সব দুঃখ হ’ল আধিদৈবিক৷
আধিদৈবিক দুঃখ থেকে বাঁচবার জন্যে দরকার উপযুক্ত শিক্ষার, যথোপযুক্ত মানসাধ্যাত্মিক শিক্ষার–যাতে সে তার মনকে ভালভাবে তৈরী করতে পারে, বিরূপ পরিবেশের বিরুদ্ধে যুঝতে পারে৷
উপায় হ’ল স্থূল স্পন্দনগুলোকে সূক্ষ্ম স্পন্দনে রূপান্তরিত করা৷ বৌদ্ধিক স্পন্দন–সমূহকে মানসাধ্যাত্মিক স্পন্দনে রূপান্তরিত করতে হবে৷ এতে মানসিক স্তরের প্রতিক্রিয়া থেকে মানুষ কিছুটা রক্ষা পাবে৷ যার ফলে সুখ–দুঃখের কোনটাই মনকে অভিভূত করতে পারবে না৷ এই অবস্থাটাকে গীতায় বলা হয়েছে–‘দুঃখেষু অনুদ্বিগ্ণ মনঃ সুখেষু বিগত স্পৃহঃ৷’
মানুষ যেমন কর্ম করে, তেমন কর্মের ফল ভোগটা, মুখ্যতঃ মানসিক ভূমিতেই হয়৷ মানসিক দুখঃ–কষ্ট সেই অনুযায়ী আসবেই৷ কিন্তু সেই ক্লেশটা তখন আর ক্লেশ বলে’ মনে হবে না৷ অর্থাৎ সেই মানসিক ক্লেশটাও তার দূর হয়ে যাবে৷ কারণ কষ্ট হচ্ছে কিন্তু কষ্টকে কষ্ট বলে’ মনে হচ্ছে না, তাহলে সেটা কি আর কষ্ট হ’ল তেমন কষ্ট যদি হয় হোক না, কী আসে যায়! মানসিক ভূমিতে সে আনন্দেই থেকে যাবে৷
তৃতীয় দুখঃটা হ’ল আধ্যাত্মিক দুঃখ৷ প্রতিটি মানুষ মুখে যত বড় বড় কথাই বলুক না কেন, সবাই জানে যে, সে ঈশ্বরের সন্তান৷ সব মানুষই জানে যে, ঈশ্বর তার, আর সে ঈশ্বরের৷ কিন্তু এটা জানা সত্ত্বেও ঈশ্বরকে সে সহজভাবে ধরতে পারছে না৷ এই না–পারার যে দুঃখ, এটাকেই বলা হয় আধ্যাত্মিক দুঃখ৷
মানুষের মনের পরিধি খুবই ছোট৷ তাও আবার সীমিত বিষয় নিয়ে ব্যাপৃত থাকে৷ এই সীমিত আভোগগুলি* থেকে মনকে ঊর্ধ্বে উঠতে হবে, সীমিত সুখ থেকে মনকে অসীম আনন্দময় সত্তায় রূপান্তরিত করতে হবে৷ সীমিত মানসিক সম্পদই হ’ল আধ্যাত্মিক ক্লেশের কারণ৷২ এই আধ্যাত্মিক দুঃখ থেকে মানুষ বাঁচতে পারে আধ্যাত্মিক সাধনায়৷
মানুষের সত্তাটা অবশ্যই দেশ–কাল–পাত্রের মধ্যে, ও এই দেশ–কাল–পাত্রের মধ্যে থেকেই তাকে দেশাতীত, কালাতীত, পাত্রাতীত হবার প্রয়াসে রত হতে হবে, আর তা হতে গেলে সীমার গণ্ডি ছেড়ে অসীমের দিকে যেতেই হবে৷ এক অসীম কোনও সত্তা, এক সংশ্লেষণনাত্মক সত্তার পথে যাওয়া ছাড়া দ্বিতীয় কোনও পথ নেই৷
মানুষের সবচেয়ে বড় আকাঙক্ষা হ’ল দুঃখের হাত থেকে অব্যাহতি লাভ৷ দুঃখের হাত থেকে এই অব্যাহতিই নিবৃত্তি৷ নিবৃত্তি দু’ধরণের–একটিকে বলে নিবৃত্তি, অপরটিকে আত্যন্তিকী নিবৃত্তি৷ যে বস্তু নিবৃত্তি লাভে সাহায্য করে তাই হ’ল অর্থ৷ এই অর্থ থেকে কেবল সাময়িক তৃপ্তিই হতে পারে৷ দুঃখের হাত থেকে চিরন্তন অব্যাহতি পাবার জন্যে পরমার্থই একমাত্র উপায়৷ পরমার্থ দুঃখ থেকে কেবল সাময়িক অব্যাহতি দেয় না, স্থায়ী অব্যাহতি দেয়৷ আধিভৌতিক, আধিদৈবিক ও আধ্যাত্মিক সমস্ত প্রকার দুঃখ থেকেই আত্যন্তিকী নিবৃত্তি এনে দেয় পরমার্থ৷ এই পরমার্থ প্রাপ্তি কেবল আধ্যাত্মিক সাধনার দ্বারাই সম্ভব৷ এই কথাটা মনে রাখতে হবে যে, আধিভৌতিক, আধিদৈবিক আর আধ্যাত্মিক–এই তিন রকমের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার জন্যে যে পরমার্থ, সেটা সকলকেই অর্জন করতে হবে৷
টাকার সাহায্যে যে মুক্তি তা কখনোই স্থায়ী হতে পারে না৷ তবু এই ক্ষণস্থায়ী জগতে ক্ষণস্থায়ী বস্তুরই আমাদের প্রয়োজন হয়৷ এই আপেক্ষিক জগতে আপেক্ষিক বস্তু ও সত্তার পরিবেশেই আমাদের বাস করতে হয়, আর সেই কারণেই আমাদের জীবনের দৃষ্টিভঙ্গী হওয়া উচিত–‘আপেক্ষিক জগতের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরমসত্তার দিকে অগ্রসর হওয়া’৷ লোকায়ত সংরচনার সব কিছুকে সঙ্গে নিয়ে এমনভাবে লোকোত্তরের দিকে মানুষকে এগোতে হবে, যাতে লোকায়তের সমস্ত ব্যঞ্জনা লোকোত্তরের মধ্যেই রসঘন সত্তা হিসেবে মিলেমিশে এক হয়ে যায়৷ যথার্থ হ’ল সেটাই যা মানুষের লোকায়ত ও লোকোত্তর জীবনের উভয় ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা এনে দেয়৷
বহির্বিশ্বকে আমরা অস্বীকার করতে পারি না৷ অর্থ বা টাকাকেও অস্বীকার করতে পারি না৷ সাময়িক দুঃখ–যন্ত্রণার হাত থেকে মুক্তি পাবার জন্যে অর্থের প্রয়োজন আছে ঠিকই, কিন্তু দুঃখ–যন্ত্রণার হাত থেকে স্থায়ী মুক্তি যার সাহায্যে সম্ভব হয় তাই হ’ল ‘পরমার্থ’৷২ পরমার্থের সাহায্যে মানুষ এমনভাবে সামাজিক ব্যবস্থা তৈরী করবে, যাতে কোনদিনই মানুষের অন্নাভাব, বস্ত্রাভাব না হয়৷
মানুষের ক্লেশকে দূর করার উপায় খুঁজে বের করতে আমাকে এক নোতুন সামাজিক–র্থনৈতিক তত্ত্ব আবিষ্কার করতে হয়েছে৷ সেই সামাজিক–র্থনৈতিক তত্ত্ব হ’ল ‘প্রাউট’ (PROUT ––Progressive Utilisation Theory – প্রগতিশীল উপযোগ তত্ত্ব)৷ প্রাউট থিয়োরীটা তৈরী করা হয়েছে এজন্যেই–যাতে করে’ জাগতিক দুঃখগুলো দূর হয়, যাতে মানুষের পরমার্থ লাভ হয়৷
জাগতিক ক্ষেত্রে দুঃখ ভোগটা দূর করতে গেলে এর পেছনে একটা common sense একটা সাধারণ বুদ্ধি কাজ করে’ থাকে যে, জগতের যা কিছু সম্পদ–এতো সবাইকার জন্যে যাতে সবাই খেয়ে পরে থাকতে পারে, তার জন্যে৷ একটা মানুষ অন্যের মুখের গ্রাস কেড়ে নেবে–এটা তো উচিত নয়৷ সুতরাং মানুষ যাতে একটা বিধিসম্মতভাবে তার সমস্ত সম্পদ নিজেদের মধ্যে মিলে মিশে ভাগ করে’ কাজে লাগাতে পারে তার একটা ব্যবস্থার দরকার ছিল–যা না করার জন্যে সমাজ জীবনে যে অনুপপত্তি থেকে গিয়েছিল, সেই অনুপপত্তির জন্যেই মানুষের যত দুঃখ–কষ্ট ভোগ চলছিল৷ এটাও তো বন্ধ করতে হবে৷ মানুষ যখন বুদ্ধিপ্রধান জীব তখন তার মধ্যে এই ধরণের একটা বড় ত্রুটি দিনের পর দিন, বছরের পর বছর, শতাব্দীর পর শতাব্দী কেন চলতে থাকবে জাগতিক ক্ষেত্রে এই অনুপপত্তি, ও তার ফলে সৃষ্ট ভিন্নতাবোধ (disparity) গুলোই যত অনর্থের মূল৷ এই অনর্থের ফলেই মানসিক শান্তিও বারবার বিঘ্ণিত হয়ে যাচ্ছে৷ যাতে এটা না হয়–যাতে মানুষ তার মহত্তর লক্ষ্যকে চোখের সামনে রেখে জাগতিক দুঃখ–ক্লেশগুলোকেও দূর করবার চেষ্টা করে, সেই জন্যেই ‘প্রাউট’ দর্শনের সৃষ্টি হয়েছে৷ প্রাউট দর্শনকে সৃষ্টি করা ছাড়া অন্য কোন পথ ছিল না৷ তা যদি না করা হতো আরও হয়তো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে’ মানুষের দুঃখ–ক্লেশ চলতেই থাকত৷
প্রাউট ছাড়া এই ক্লেশ দূর করে’ মানবতাকে রক্ষা করার অন্য কোন উপায় নেই৷ অন্নহীনকে পরমার্থের কথা শুনিয়ে লাভ নেই৷ বাস্তব জগতে বাঁচতে হলে অর্থের দরকার৷ অস্তিত্ব রক্ষার মাধ্যম হ’ল ‘অর্থ’, সেই সঙ্গে দরকার ‘পরমার্থ’৷
অন্ন চাই, বস্ত্র চাই, বাঁচার মত বাঁচতে চাই, চিকিৎসা চাই, নিবাস চাই৷ আর এই প্রয়োজন মেটাবার জন্যেই একদিন আমি অবস্থার চাপে পড়ে’ ‘প্রাউট’ দর্শন তৈরী করতে বাধ্য হয়েছি৷ কারণ, যে মানুষটা খেতে পাচ্ছেনা, আগে তাকে অন্ন দোব, তরপর তাকে শেখাবো অধ্যাত্ম দর্শন৷ তারপর তাকে সাধনায় বসাবো৷ তাকে সাধনাতেই বসাবো, কিন্তু আগে তার পেট ভরাবার ব্যবস্থা করতে হবে তো৷ শীতের সময় তার বস্ত্রের ব্যবস্থা করতে হবে৷ অসুখ হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে৷ এগুলো প্রাথমিক প্রয়োজন৷ এই প্রয়োজন পূর্ত্তি না হলে কখনো সামগ্রিক ভাবে মানুষ জাতির উন্নতি সম্ভব নয়৷
অর্থাৎ প্রাউটের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে জাগতিক স্তরে (physical sphere) আর আধ্যাত্মিক স্তরে (spiritual sphere) সমস্যার সমাধান হয়ে যাচ্ছে৷ আর মানসিক স্তরে ক্লেশ ভোগটা হবে বটে, কিন্তু সেটার সঙ্গে যুঝবার সামর্থ্য মানুষের এসে যাবে৷ এ কথাটা মনে রেখে তোমরা দ্রুত নোতুন একটা মানব সমাজ গড়ে’ তোল৷