দেশের প্রধানমন্ত্রী যে গণতন্ত্রের ভাষা বোঝেন না বা বুঝতে চাননা সেটা স্পষ্ট হয়ে গেছে৷ সংখ্যা গরিষ্ঠের মস্তানি দেখিয়ে সংকীর্ণ দলীয় ও ব্যষ্টি স্বার্থপুরণের জন্য একের পর এক আইন পরিবর্তন বা নতুন আইন সংযোজন করেছেন গণতন্ত্রের মর্যাদাকে ধূলিসাৎ করে৷ দেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের নতুন নিয়মও প্রধানমন্ত্রীর একটি স্বৈরাচারী পদক্ষেপ৷ তবে প্রধানমন্ত্রী সম্ভবত বুমেরাং অস্ত্রটির সঙ্গে পরিচিত নন৷ গণতন্ত্রে ঘাতকের অস্ত্রেই ঘাতক ঘায়েল হতে পারে, এ বোধ সম্ভবতপ্রধানমন্ত্ নেই৷ নরেন্দ্র মোদি আজ যে কুর্সিতে বসে আছে গতকাল সেটায় অন্য একজন ছিলেন, আগামীকাল অন্য একজন বসবেন৷ তখন আজকের প্রধানমন্ত্রীর তৈরী অস্ত্রই ব্যবহার করবে আজকের শাসক দলের বিরুদ্ধে৷ মানব সভ্যতার ইতিহাসে কোন শাসকই চিরস্থায়ী নয়৷ তবে সবার বিদায় গৌরবোজ্জ্বল হয় না৷
আচ্ছা দিনের ফেরিওয়ালা ইতিহাসের এই সব তথ্য পরিসংখ্যান নিয়ে মাথা ঘামায় না৷ এসব শিক্ষাই ওনার নেই৷ সে নিজেকে খলনায়ক পরিচয়েই ইতিহাসের পাতায় রেখে যেতে চায়৷ আচ্ছা দিনের আস্বাদন চিরস্থায়ী করতে প্রধানমন্ত্রী উন্মত্ত হয়ে যেভাবে সংখ্যাধিক্যের জোরে সংসদ কক্ষে মস্তানি দেখিয়ে নিজের পক্ষে আইন প্রণয়ন করছে তা যে একদিন তার বুকেই আঘাত করবে সেই বোধ লুপ্ত হয়ে গেছে৷ ‘‘একের স্পর্ধারো কভু নাহি দেয় স্থান দীর্ঘ কাল নিখিলের বিরাট বিধান৷’’ মোদিকে যেতেই হবে৷ জরুরী অবস্থার কালাকানুন ইন্দিরা গান্ধীকে রক্ষা করতে পারেনি৷ তবে ইন্দিরা গান্ধীর স্বৈরাচারিতা সাময়িক মতিভ্রম ছিল৷ তাই স্বগর্বে ফিরে আসতে পেরেছিলেন৷ বর্তমান প্রধামন্ত্রীর সে সম্ভবনা নেই৷ তিনি নিজেতো ডুববেনই দলকেও ডোবাবে৷ সাম্প্রদায়িক স্বৈরাচারিতা ওনার দলীয় আদর্শ৷
এত ধানাই পানাই করার উদ্দেশ্য এস.আই.আরের অপপ্রয়োগ, বিশেষ করে বাঙলার ওপর৷ এস.আই.আর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোয় ভোটার তালিকা সংশোধনের একটি সাধারণ প্রক্রিয়া৷ যার মাধ্যমে নতুন ভোটার তালিকায় সংযুক্ত হবে, আবার মৃত্যু, ঠিকানা পরিবর্তন ইত্যাদি কারণে কিছু নাম বাদ যাবে, কিছু নাম অন্য কেন্দ্রের তালিকায় যাবে৷ অগণতান্ত্রিক পথে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার বাসনায় গণতন্ত্রের এই সরল প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে প্রধানমন্ত্রী ও তার বশংবদ নির্বাচন কমিশনার৷
ভারতবাসী নির্বাচন কমিশনের শীর্ষে দেখেছিলেন টি.এন শেষনকে৷ শাসকের দাস না হয়ে সংবিধানের প্রতি আনুগত্য রেখে কিভাবে শিরদাঁড়া সোজা রেখে নির্ভীকভাবে কাজ করে যেতে হয় তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন টি.এন শেষন৷ সেদিন পশ্চিমবঙ্গের স্বৈরাচারী মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতিবসুও সহ্য করতে পারেননি টি.এন শেষনকে৷ সেই জ্যোতি বসুর দল আজ কোথায়? দোর্দন্ড প্রতাপ সিপিএম আজ কালের গর্ভে৷ বাঙলা দখলে উন্মত্ত প্রধানমন্ত্রী মোদি ও তার দল আজ একই পথের পথিক৷ ২০২১-এর পরাজয়ের বদলা নিতে রাজ্যের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ শুরু করেছে৷ বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পের নায্য পাওনা থেকে বাঙলাকে বঞ্চিত করে চলেছে৷ ভেবে ছিল হয়তো অর্থের অভাবে মুখ থুবড়ে পড়বে রাজ্য সরকার৷ জনগণ ক্ষুব্ধ হবে রাজ্য সরকারের ওপর সেই সুযোগে বাঙলা দখল করবে বিজেপি৷ কিন্তু মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী নিজ মস্তিষ্ক প্রসুত নানা সামাজিক প্রকল্পের মাধ্যমে নিজের ও দলের জন সমর্থনের ভিত আরও মজবুত করেছেন৷
নিরুপায় প্রধানমন্ত্রী বাঙলা দখল করতে এখন এস আই আর কে হাতিয়ার করেছে দলীয় নির্বাচন কমিশনারকে দিয়ে৷ কিন্তু মমতা বন্দোপাধ্যায় মিডিয়ার তৈরী নেত্রী নন৷ সিপিএমের মতো সুশৃঙ্খল সংঘটন ও দাম্ভিক ক্ষমতাশালী দুই মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তার সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস আছে৷ আজ মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে তিনি যতটা সফল বিরোধী নেত্রী হিসেবেও তাঁর সফলতা অনেক বেশী৷ মমতার প্রতাপেই ২৩৫-এর দোর্দণ্ড প্রতাপ সিপি,এম আজ বিধান সভায় শূন্য৷
কেন্দ্রের শাসনে থাকা মোদির সাংবিধানিক ক্ষমতা অনেক বেশী৷ কিন্তু এই সংবিধান যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর৷ যেখানে রাজ্যগুলোকে নিয়ে দেশ৷ রাজ্যের সম্পদে কেন্দ্র চলে কেন্দ্রের সম্পদে রাজ্য চলে না৷ বহু দলীয় গণতন্ত্রে রাজ্যে কেন্দ্রে ভিন্ন দল শাসন ক্ষমতায় থাকলেও রাজ্যের উন্নয়নে দলবাজি চলে না৷ রাজ্যে উন্নয়নই দেশের উন্নয়ন৷ কেন্দ্রীয় সরকারের মোট রাজস্বের একটা বড় অংশ পশ্চিমবঙ্গ থেকে যায়৷ সেই রাজ্যের প্রতি কেন্দ্রের স্বৈরাচারী আচরণ রাজ্যের যত না ক্ষতি করবে তারচেয়েও বেশী যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে দুর্বল করে দেবে৷ যার শেষ পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা ভবিষ্যতই বলবে৷
- Log in to post comments