রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের পর পরাজিত দলের নেতা-নেত্রীদের উপর যে ধরনের আক্রমণ ধেয়ে আসছে কিছু মস্তিষ্ক বিকৃত রাজনৈতিক পোষ্যদের মাধ্যমে তাকে জনরোষ আখ্যা দিচ্ছে একদল শাসক পোষ্য সংবাদ মাধ্যম৷ এতে তৃণমূল বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশেষ ক্ষতি নেই৷ বরং এই ধরণের ঘটনা মমতাকে রাজনৈতিক শক্তি যোগাবে৷ কিন্তু বঙ্গ রাজনীতিতে এই কুৎসিত কদর্যকে সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ সামগ্রিকভাবে বাঙলার সর্বনাশ করবে৷
ভারতীয় রাজনীতিতে ব্যষ্টি আক্রমণের কদর্যরূপ দেখা গিয়েছিল ১৯৩৯ সালে গান্ধীর অমতে জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচনে গান্ধী মনোনীত প্রার্থী সীতা রামাইয়া কে পরাজিত করে সুভাষচন্দ্র জয়ী হওয়ার পর৷ ভক্তরা শুধু সুভাষচন্দ্রকে ব্যষ্টিগতভাবে আক্রমণ করে থেমে থাকেনি, গান্ধীকে সুভাষচন্দ্রের চেয়ে বড় করে দেখাতে হিটলার, মুসোলিনি ও স্ট্যালিন-এর সঙ্গে তুলনা করেছিলেন৷ তাতে গান্ধী কিন্তু অসম্মান বোধ করেননি৷ তাই ভক্তদের কুৎসিত উল্লাসের কোন প্রতিবাদ করেননি৷ প্রতিবাদ করেছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর৷
গণতান্ত্রিক সৌজন্যতা ভুলে, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি সামান্যতম সম্মান না দেখিয়ে যে প্রতিহিংসার রাজনীতি সেদিন শুরু করেছিল জাতীয় কংগ্রেসের পশ্চিম ভারতীয় গান্ধী লবি তারই অনুপ্রবেশ ঘটছে বাঙলায় সেই পশ্চিম ভারতীয় রাজনীতির অনুসরণ করে৷ বাঙলায় এই জিনিস আগে ঘটেনি৷ শাসক বিরোধীসব পক্ষই প্রচারে প্রতিবাদে শালীনতা সৌজন্যতা বজায় রেখে চলত৷ জরুরি অবস্থার পরেও জরুরি অবস্থা জারির অন্যতম কান্ডারী সিদ্ধার্থ রায়কে পরাজিত করে সিপিএম তথা বামফ্রন্ট ক্ষমতায় এসে সিদ্ধার্থ রায় ও তার দলের নেতাদের এই কদর্য আক্রমণ করেনি৷ দীর্ঘ ৩৪বছর ক্ষমতায় ছিল বামফ্রন্ট৷ সেদিন এতো সোশ্যাল মিডিয়া না থাকায় দুর্নীতি ও খুন সন্ত্রাসের প্রচার না হলেও বহু নিদর্শন আছে ৩৪ বছরের৷ তবু কেউ বামফ্রন্ট পরাজিত হওয়ার পর বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ও বামফ্রন্ট নেতাদের এমন কদর্যভাবে আক্রমণ করেনি৷
২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সাধারণ নির্বাচনে প্রকৃত জনমতের প্রতিফলন হয়নি৷ প্রথমত তড়িঘড়িভাবে এস আই আর করতে গিয়ে লক্ষ লক্ষ বৈধ বোটারকে বোটদানে বঞ্চিত করেছেন নির্বাচন কমিশনার৷ নির্বাচনেও ইভিএমে কারচুপির অভিযোগ উঠেছে৷ চার হাজার ইভিএম মেশিন পুড়িয়ে দেওয়ায় সেই অভিযোগ জনমানসে প্রভাব ফেলেছে৷ এসব থেকে মানুষের দৃষ্টি ফেরাতে শাসকদলের নেতারা এই কদর্য কৌশল অবলম্বন করেছে এমনটা ভাবা অযৌক্তিক নয়৷ ডিম কাদা পাথর নিয়ে আক্রমণের ঘটনা ঘটার পর লোক দেখানো প্রতিবাদ করলেও একের পর এক কুৎসিত কদর্য ঘটনায় একজনও গ্রেপ্তার হয়নি৷ বরং মন্ত্রীরা বিরোধী দলের মতো কথাবার্র্ত বলছেন৷ হয়তো নির্বাচন কমিশনারের কৃপায় পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনা ক্ষমতা পেয়ে এখনও নিজেদের শাসক বলে মনে করতে পারছেন না৷ মুখ্যমন্ত্রী, পঞ্চায়েত মন্ত্রীর কথায় সেইরকমই মনে হয়৷ দেশের একজন সম্মানীয় নেত্রীর প্রতি এই কুৎসিত কদর্য আক্রমণ বন্ধ করার দায় যে শাসকদলের সেকথা হয়তো ভুলেই গেছে, নতুবা এখনো নিজেদের শাসক বলে ভাবতে পারছেন না৷
তবে এসবের ঊর্ধে গণতান্ত্রিক সৌজন্য বলে একটা কথা আছে৷ সেই গণতান্ত্রিক সৌজন্যতার শিক্ষা পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান শাসকদলের নেই৷ সাম্প্রদায়িক মৌলবাদ কখনো ভিন্নমতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও সহনশীলতা দেখায় না৷ ভিন্ন আদর্শ ও চিন্তার মানুষকে সহ্য করার শিক্ষাও ধর্মীয় মৌলবাদীদের থাকেনা৷ ব্যষ্টি আক্রমণে না গিয়ে যুক্তি ও তথ্যের ভান্ডার নিয়ে জনসমক্ষে দাঁড়াবার মতো মগজাস্ত্রও নেই৷ তাই রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও গণতান্ত্রিক সৌজন্যে ভুলে এই কুৎসিত কদর্য ব্যষ্টি আক্রমণ৷ কিন্তু একদিন বুমেরাং হয়ে ফিরবে এই কুৎসিত কদর্যতা৷ শাসকের মনে রাখা উচিত---‘‘একের স্পর্ধারে কভু নাহি দেয় স্থান দীর্ঘকাল নিখিলের বিরাট বিধান৷’’
- Log in to post comments