‘‘চৈতন্য রহিতাঃ মন্ত্রাঃ প্রোক্তা বর্ণাস্তু কেবলম্৷ ফলং নৈব প্রযচ্ছন্তি লক্ষ কোটি জপৈরপি৷৷’’
অর্থাৎ মন্ত্রচৈতন্য যদি না হয়, তান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসারে যদি সাধনা করা না হয়, এ অবস্থায় লক্ষ বার বা কোটি বার মন্ত্র জপ করলেও কিছুই হবে না৷ যখন কুলকুণ্ডলিনীর ঘুম ভেঙ্গে যায়, তখন সাধক দীপনী ও মন্ত্রচৈন্যের দ্বারা কুলকুণ্ডলিনীকে ওপরে ওঠানোর প্রয়াস করেন এটাই হচ্ছে সাধনার প্রথম স্তর, যাকে মনোবৈজ্ঞানিক দিক থেকে বলা হয় ‘যতমান’ স্তর৷
তোমরা জান, মানুষের শরীরে তিনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থি আছে একটার নাম ব্রহ্মগ্রন্থি, একটার নাম রুদ্র গ্রন্থি, আর শেষেটির নাম বিষ্ণুগ্রন্থি৷ একটা নাভিতে, একটা হূদয়ে, আর একটা ত্রিকুটিতে৷ কুলকুণ্ডলিনী যখন এই তিন গ্রন্থিকে অতিক্রম করে যায়, তখন মানুষের কাছে পরমার্থের দরজা খুলে যায়৷
সাধনা করতে করতে, কুলকুণ্ডলিনী ওপরে উঠতে উঠতে যখন নাভিস্থ গ্রন্থি অতিক্রম করে যায় তখন মন মজবুত হয়ে যায়৷ সাধনার এই স্তরকে বলা হয় ‘ব্যতিরেক’, অর্থাৎ সাধনাতে সাধক দ্বিতীয় স্তরে পঁৌছে গেল৷ ‘ব্যতিরেক’ স্তরে কী হয় কখনও কখনও ইন্দ্রিয়ের ওপর– কখনও বা বৃত্তির ওপর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ এসে যায়৷ আবার কখনও কখনও একেবারে নিয়ন্ত্রণ থাকে না৷ কখনও কখনও মনে হয়, এবার বৃত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ এসে গেছে৷ আবার কখনও বা দেখে, মন একেবারে নরকে নেমে গেল৷ অর্থাৎ কখনও কখনও বৃত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ এসে যায়, কখনও কখনও নিয়ন্ত্রণ নষ্ট হয়ে যায়৷ সাধক, বৈয়ষ্টিক জীবনে এটা অনুভব করবে৷ এরপর মন আরও ওপরে ওঠে, হূদয় গ্রন্থি অর্থাৎ অনাহত চক্র অতিক্রম করে যায়, এই গ্রন্থি অতিক্রম করলে মনের কী ধরনের পরিবর্তন হয় কোনো বিশেষ গ্রন্থি, বিশেষ বৃত্তি, বিশেষ ইন্দ্রিয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ এসে গেল, কিন্তু অন্য কোনো এক বৃত্তি বা গ্রন্থির ওপর নিয়ন্ত্রণ এল না৷ একে বলা হয় ‘একেন্দ্রিয়’৷ এটা হ’ল তৃতীয় স্তর৷ লোভ একেবারে নেই, এক পয়সাও ঘুস নেয় না৷ কিন্তু খুব ক্রোধী৷ আবার হয়তো ক্রোধ নেই, কিন্তু খুব কামুক৷ অর্থাৎ একটা বৃত্তি নেই, তো আর একটা বৃত্তি খুবই প্রবল৷ এই হচ্ছে ‘একেন্দ্রিয়’৷ ‘ঘুস’ একেবারে নেয় না, হয়তো খুব অহংকারী৷ এ ধরনের লোক তোমরা দেখতে পাবে৷ এ হ’ল ‘একেন্দ্রিয়’ স্তর৷
এরপর সাধনাতে মন্ত্রচৈতন্যের সাহায্যে যখন কুলকুণ্ডলিনী আজ্ঞাচক্র বা ত্রিকুটি অতিক্রম করে যায়, সমস্ত বৃত্তির ওপরই নিয়ন্ত্রণ এসে যায়৷ একে বলে ‘বশীকার’৷ ‘বশীকার’–এর পর মনের ওপর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ এসে যায়৷ মন যখন এইভাবে নিয়ন্ত্রণে এসে গেল, তখন চিত্ত, অহং তত্ত্ব, ও মহৎ তত্ত্ব তিনটেই নিয়ন্ত্রণে এসে গেল, তখন এই মনকে তুমি সহজেই কাউকে দিতে পার৷ যে দৌড়চ্ছে, তাকে নিয়ন্ত্রণ করা মুস্কিল, কিন্তু যে এক জায়গায় বসে গেল, সে আয়ত্তে এসে গেল৷ তাকে সহজেই নিতে পার বা দিতে পার৷ সাধনা মার্গে কী হয় –না, ৰুদ্ধির চর্চা করতে করতে মানুষ যখন নিজের অপূর্ণতা ৰুঝে নেয়, তখন ৰুদ্ধিকে আরও সূক্ষ্মে রূপান্তরিত করার প্রয়াসে রত হয়৷ এইভাবে ৰুদ্ধির অনুশীলন করতে করতে ৰোধির জাগরণ হয়৷ অনেক মানুষকে দেখবে, এই জীবনে লেখাপড়া শেখেনি, অ–আ–ক–খ জানে না, কিন্তু সাধনামার্গে অনেক এগিয়ে গেছে৷ কখনও কখনও পাঁচ বছর বয়সেই সাধনায় খুব এগিয়ে গেছে, ভক্তিমার্গে খুব এগিয়ে গেছে৷ এর কারণ হচ্ছে, পূর্ব জন্মে সে ৰুদ্ধির চর্চা করেছিল, আর ৰৌদ্ধিক চর্চার ফলে, ভাবসংঘাতের ফলে ৰোধি জেগে গেছে৷ সাধনামার্গে নিয়ম হচ্ছে, পূর্বজন্মে মানুষ যে পর্যন্ত এগিয়েছিল, পরবর্ত্তী জীবনে তারপর থেকে যাত্রা শুরু হবে৷ অর্থাৎ সাধনা কখনও নিষ্ফল হয় না৷ এই জীবনে কেউ হয়তো, দেখবে আশি বছর বয়স পর্যন্ত খুব ৰৌদ্ধিক চর্চা করছে, আবার কারুর পাঁচ বছর বয়সেই, দেখবে, খুব ভক্তি জেগে গেছে৷ এর অর্থ এই যে, আজ যে পাঁচ বছরে খুব বড় ভক্ত হয়ে গেছে, আগের জন্মে তার ৰৌদ্ধিক বিকাশ হয়ে গেছে৷ আজ আশি বছর বয়সের যে বৃদ্ধ ৰৌদ্ধিক চর্চায় রত, সে পাঁচ বছর বয়সের ভক্তের থেকে পিছিয়ে আছে৷ এই কারণেই এখনও পর্যন্ত তার ৰৌদ্ধিক চর্চার প্রয়োজন হচ্ছে৷ অর্থাৎ বেশী বয়স পর্যন্ত যে খুব বেশী ৰৌদ্ধিক চর্চা করছে, তার কারণ হচ্ছে সে ৰৌদ্ধিক ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে৷
সাধক এটা জানে যে, মনের যে স্থূল অংশ সাধনার সাহায্যে তাকে সূক্ষ্মে পরিণত করতে হয়৷
‘‘যচ্ছেদ্বাঙ্ মনসি প্রাজ্ঞস্তদ্যচ্ছেজ্জ্ঞান্ আত্মনি৷
জ্ঞানমাত্মনি মহতি নিযচ্ছেদ্ তচ্ছেচ্ছান্ত আত্মনি৷৷’’
সে–ই ৰুদ্ধিমান যে ৰোধির জাগরণের প্রয়াসে রত, যে পরমাত্মাকে লাভ করার জন্যে চেষ্টা করে চলেছে৷ সে ৰুদ্ধির বন্ধ্যাচর্চা করছে না৷ মানুষ জনকল্যাণের জন্যে ৰুদ্ধির চর্চা করুক৷ কিন্তু শুধুমাত্র ৰুদ্ধির জন্যে ৰৌদ্ধিক চর্চা করছে না৷ এ ধরনের ৰৌদ্ধিক চর্চাকে বন্ধ্যা চর্চা– নিষ্ফল চর্চা বলব৷ এ ধরনের ৰৌদ্ধিক চর্চা করে কোনো লাভ নেই৷ ৰুদ্ধিমান ব্যষ্টি অবশ্যই সাধক হবে৷ অসাধক তারাই যারা নির্ৰোধ৷ যে বেশী ৰুদ্ধিমান সে বাল্য অবস্থাতেই সাধনামার্গে এসে যাবে৷ বৃদ্ধাবস্থাতেও যে সাধনামার্গে এল না, ৰুঝতে হবে সে ৰুদ্ধু৷ ৰুদ্ধির অভাবের জন্যেই সে সাধনামার্গে আসতে দেরী করছে৷
‘‘কৃষ্ণনাম হরিনাম বড়ই মধুর
যেইজন কৃষ্ণ ভজে সে বড় চতুর৷’’
অর্থাৎ আধ্যাত্মিক সাধনা কে করে যে খুবই চতুর, যে প্রকৃত ৰুদ্ধিমান, সেই আধ্যাত্মিক সাধনা করে৷ ৰুদ্ধিমান সাধক কী করে নিজের ইন্দ্রিয়বৃত্তিকে চিত্তে সমাহিত করে৷ চিত্তকে রুদ্ধ করবে– suspended করবে, আর সেই আত্মবিভোর চিত্তকে, চৈত্তিক ভাবনাকে, অহংতত্ত্বে সমাহিত করবে৷ অহংতত্ত্বকে কী করবে অহংতত্ত্বকে মহৎ তত্ত্বে– বিশুদ্ধ ‘আমি ৰোধে’, ‘pure I - feeling’–এ সমাহিত করবে৷ ‘তদ্চ্ছেচ্ছান্ত আত্মনি’– আর সেই বিশুদ্ধ ‘আমি ৰোধ’কে পরমাত্মাতে সমর্পণ করবে, আর বলবে, ‘‘হে পরমাত্মা, এই মন তোমার কাছ থেকেই পেয়েছি, তোমাকেই দিলুম৷’’