Skip to header Skip to main navigation Skip to main content Skip to footer
CAPTCHA
This question is for testing whether or not you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

User account menu

  • My Contents
  • Log in
নোতুন পৃথিবী
সর্বাত্মক শোষণমুক্ত সমুন্নত সমাজ রচনার পথপ্রদর্শক

প্রধান মেনু

  • প্রথম পাতা
  • আধ্যাত্মিক প্রসঙ্গ
  • প্রাউট প্রবক্তার ভাষায়
  • সংবাদ দর্পণ
  • দেশে দেশে আনন্দমার্গ
  • সম্পাদকীয়
  • প্রবন্ধ
  • খেলা
  • নারীর মর্যাদা
  • ভাষা
  • স্বাস্থ্য
  • প্রভাতী
  • ইতিকথা

মণ্ডামোহন

শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

যে সকল অন্তর্নিহিত দুর্বলতা মানুষের ক্ষতিসাধন করে সেগুলিকে রিপু বলা হয়৷ আর জীবের এই অন্তর্নিহিত দুর্বলতা বা রিপুর সুযোগ নিয়ে বাইরে থেকে যে বন্ধন এসে জেঁকে বসে’ মানুষকে জড়িয়ে ধরে .....আষ্টেপৃষ্ঠে জাপটে ধরে ...জগদ্দল পাথরের মত বুকে চেপে বসে সেগুলিকে বলা হয় পাশ৷ রিপু ছয়টি – কাম, ক্রোধ, লোভ, মদ, মোহ, মাৎসর্য্য৷ আর এই রিপুগুলি থাকার ফলে যে পাশগুলি (পাশ মানে বন্ধনরজ্জু) মানুষকে বন্ধন করে তারা হ’ল সংখ্যায় আট৷ 

      ‘‘ঘৃণা–শঙ্কা–ভয়ং–লজ্

            জুগুপ্সা চেতি পঞ্চমী

      কুলং–শীলঞ্চ–মানঞ্চ্

            অষ্টপাশাঃ প্রকীর্ত্তিতাঃ’’৷৷

এই ঘৃণা–শঙ্কা–ভয়–লজ্জ্ (গোপন রাখবার ইচ্ছা বা কপটতা – hypocrisy ), কুলাভিমান, মানাভিমান ও গুণাভিমান এই আটটি হচ্ছে পাশ৷ এই ঘৃণা পাশের বীজমন্ত্র হচ্ছে ‘প’৷ একটি পাশ যে কেবল একটি রিপুতেই সন্নিবদ্ধ হয় তা নয়, একটি পাশের পেছনে একাধিক রিপুগত ত্রুটি থাকতে পারে৷ তবে ঘৃণা–ভয় পাশ দু’টি অন্যান্য রিপু–আশ্রিত হলেও এরা মুখ্যতঃ মোহ রিপুর পরিপোষকতা পায়৷ যেমন ধর, কারও মধ্যে পানাসক্তি রয়েছে৷ আকর্ষণ যেখানে জড়াভিমুখী, মনের গতি সেখানে নিম্নঢ়ালুতে৷ গতি যেখানে নিম্নঢ়ালু ক্রিয়া সেখানে ‘পত্ (পততি)৷ আসক্তির ফলে হয় পতন৷ আর গতি যেখানে ঊর্ধ্বঢ়ালুতে তাকে বলে অনুরক্তি ও অনুরক্তির চরম অবস্থার নামই ভক্তি৷ এর জন্যে সংস্কৃতে ধাতু হ’ল ‘উর্ধ্ব গম্’ (ঊর্ধ্ব গচ্ছতি)৷ যার মধ্যে পানাসক্তিরূপী মোহগত দুর্বলতা রয়েছে সে সহজেই ঘৃণা ও ভয়ের দ্বারা বদ্ধ হয়৷ কেবল পানাসক্তিই নয়, যে কোন প্রকারের মোহ রিপু মানুষকে অন্যের কাছে ঘৃণিত ও অন্যকে তার কাছে ভয়ের বস্তু করে তোলে৷ সে যুক্তিতর্ক বর্জিতভাবেই মোহ আলেয়ার পেছনে ছুটে যায়৷ এই মোহ বৃত্তি সম্বন্ধে একটি গল্প মনে পড়ল৷ 

মোমিনপুরে থাকত আমার জানা–চেনা, কী যেন নামটা ... বোধ হয় মণ্ডামোহন মুখুজ্জে৷ মণ্ডামোহনকে কেউ বলত হাড়কেপ্পন, কেউ বলত দৃষ্টিকেপ্পন, কেউ বলত 

আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে জল গলে না, কেউ বলত একটা পয়সা খসালেই ওর একটা পাঁজর খসে যায়, কেউ বলত ওয়ান পাইস ফাদার–মাদার, কেউ বলত এক পয়সা প্যাঁজ–ফুলুরী, কেউ বা রসিকতা করে বলত প্যাঁজ–পয়জার৷ আধুনিক ছেলেরা বলত, উপুড়হস্ত নো–নট–নেবার৷ কথাগুলো শুনে ও বেশ তৃপ্তি অনুভব করত৷

সেবার বেগুনের হয়েছিল অতি–উৎপাদন ৷ বিজ্ঞানসম্মত অর্থনৈতিক কাঠামো যে দেশে নেই সেদেশে অতি উৎপাদনকারীদের মাথায় হাত দিয়ে বসতে হয়৷ বেগুনের অতিরিক্ত ফলনে সেবার বাঙলার চাষীদের মাথায় হাত দিয়ে বসতে হয়েছিল৷ নদীয়া জেলার হরিণঘাটা থানায় বেগো গাঁয়ে গিয়ে দেখি চাষীরা কাটারিতে বেগুন টুকরো টুকরো করে গোরুর জাব খাবার ডাবায় নুন মাখিয়ে ঢ়েলে দিচ্ছে৷ গোরু মুখ দিতে গিয়ে যেই দেখছে বেগুন অমনি নাক সিঁটকে মুখ ঘুরিয়ে বলছে – হুঁ ... বেগুন.... হাম্বা হাম্বা৷ ডাবার আর একটা কোণ ঘেঁসে যেই আবার মুখ রাখতে যাচ্ছে সেখানেও ওই একই কাহিনী৷ আবার সে ভুরু কুঁচকে মুখ বেঁকিয়ে বলছে – উঁ...... আবার বেগুন ...... হাম্বা হাম্বা৷ চাষীরা দেখলে – গোরু জাব খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে, এবার দুধ বন্ধ হয়ে যাবে৷ তাই তারা গোরুকে বেগুন দেওয়া বন্ধ করে দিলে৷ 

বীরভূমের রামনগরের চাষীরা বনেদী বেগুনচাষী৷ ওখানে গিয়ে শুনলুম, ওরা গাছ থেকে বেগুন তোলা ছেড়েই দিয়েছে৷ ওরা আমাকে বললে, ‘‘বাবু, বেগুনগুলো গাছেই পচুক৷ ওতে বরং গাছের সার হবে’’৷ পাঁজিপাড়া যাবার সময় পাইনি৷ তাই ওখানকার ডাকসাইটে বেগুনের কী দশা হয়েছিল বলতে পারছি না৷ আমাদের শহরে সে সময় পসুরী হিসেবে পাইকারী বাজারে কেনাবেচা হত৷ ৫ সেরে হত ১ পসুরী, আর ৮ পসুরীতে হত ১ মণ৷ তবে সেরের হিসেব সব জেলায় এক রকম ছিল না৷ প্রমাণ পরিমাপের সের বলতে বোঝাত ৮০ তোলাকে৷ কিন্তু আমাদের মুঙ্গেরে চলত ৮৪ তোলা৷ আবার পাশের জেলা ভাগলপুরে কোথাও কোথাও ১০০, ১০১, ১০৩ তোলা চলত৷ কোথাও বা ১০৫ তোলায় ১ সের৷ ৬০ তোলার সেরকে কাঁচি হিসেব বলা হত৷ তাই সে যাই হোক, সেবার অতি–উৎপাদনের সময় আমাদের শহরে বেগুনের ফ্যালা–ছড়া৷ মণ্ডামোহনের বাড়ীতে তিন মাস ধরে কেবল ভাত আর বেগুন–পোড়া চলত৷ পাড়ার মেয়েরা মণ্ডামোহনের স্ত্রী শ্রীমতী মিথ্যাময়ী দেবীকে জিজ্ঞেস করত ... ‘‘হ্যাঁ গা মর্কটের মা, (মণ্ডামোহনের ছেলেটির নাম ছিল মর্কট মোহন মুখুজ্জে৷ সে লটারির টিকিট বেচত আর টিউশানি করত৷ জলখাবার ছাত্রের বাড়ীতেই পাওয়া যেত – তবে ছুটির দিনে হরিমটর চিবিয়ে থাকাই পছন্দ করত)৷ আজ কী রাঁধলে গা’ সে বলত, ‘আজ সেই ভোর থেকে দুপুর বারটা অবধি একটানা হেঁসেলে থাকায় ঘাড়–পিঠ টনটন করছে’৷ লোকেরা শুধোলে, ‘তা অতক্ষণ ধরে কী রাঁধলে গা’ সে বললে, প্রথম পাতের জন্যে রাঁধলুম নিম–বেগুন তারপর বেগুন বোঁটার চচ্চরি, ... তারপর বেগুনের কোপ্তা .... তারপরে বেগুনের কোর্মা ... তারপরে আদা বাটা দিয়ে বেগুনের ঝাল....সর্ষে বাটা দিয়ে বেগুনের ঝাল আর শেষ পাতে এখো গুড় দিয়ে বেগুন বীচির পায়েস৷ বেগুন–পোস্ত করব ভেবেছিলুম৷ উনুনে আঁচ না থাকায় আর করা গেল না৷ বেগুনপোড়া–টোড়া হেঁসেলের ত্রিসীমানায় ঘেঁসতে দিই না৷ ওইসব গরীবদের জন্যেই থাকুক৷’

যেমন দ্যাবা তেমনি দেবী৷ 

তা যাই হোক আসল কথায় আসা যাক৷ তখন আমাদের শহরে বেগুনের দর এক পয়সা পসুরী – দু’আনায় মণ অর্থাৎ এক পয়সায় পাঁচ সের৷ মণ্ডামোহন মুখুজ্জে জনৈক কুজরাকে ( বিহারের যারা তরকারী বেচে তাদের বলা হয় কুজরা আর যারা তরকারী উৎপাদন করে তাদের বলা হয় কোইরী৷ কোইরীরা ধর্মে হিন্দু আর কুজরারা মুসলমান৷ আমাদের ওখানকার কুজরাদের মাতৃভাষা অঙ্গিকা৷ তাদের নাম হত মহারাজ কুজরা, শনিচারা কুজরা, এতবারী কুজরা ইত্যাদি) এক পয়সার বেগুন দিতে বলল, কুজরা পাঁচ সের বেগুন দিয়ে আট–দশটা বেগুন ফাউ দিয়ে দিল৷ মণ্ডামোহন বললে, – ‘তোর ফাউয়ের বেগুনেই আমার চলবে৷ বেগুন কিনতে আর হবে না৷ আমার পয়সাটা ফেরৎ দে৷’

বলা বাহুল্য মাত্র, মোহগ্রস্ত লোক অন্যের ঘৃণার পাত্র হয়৷ নিজেও অন্যকে ভয় পায়৷ মণ্ডামোহন তাই হয়ে উঠেছিল সবাইকার ঘৃণার পাত্র৷ 

* * * *

সেবার পাড়ায় জাঁক–জমক করে কালীপূজো হচ্ছিল৷ পাড়ার ছেলেরা থিয়েটারের রিহারর্স্যাল দিচ্ছে৷ কারও কারও পকেট খরচার পয়সায় টান পড়েছে৷ আগে বাড়ীর বাজার খরচার পয়সা থেকেই কমিশন টানত৷ কিন্তু এখন খরচা বেশী হয়ে যাচ্ছে দেখে বাপ নিজেই বাজার করা শুরু করে দিয়েছে৷ তাই কমিশনের পয়সা কম হয়ে যাওয়ায় কয়েকটি অতি–উৎসাহী ছেলে চাঁদার খাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল৷ সবাই যে যেমন পারল চাঁদা দিলে৷ মণ্ডামোহনের কাছে চাঁদা চাওয়া মাত্রই সে চোখ কপালে তুলে বললে – ‘‘ওরে বাবা! কালী! সে তো রণবাই চণ্ডী৷ আমরা পরম বৈষ্ণব৷ কালীপূজো আমাদের করতে নেই, পূর্ব–পুরুষের মানা আছে৷’’

ছেলেরা ভাবলে – সত্যিই বুঝি মানা আছে৷ তাই তারা ফিরে গেল৷ পরের দিন পাড়াশুদ্ধ লোককে বসিয়ে ভাল করে কালীর মহাপ্রসাদ দেবার ব্যবস্থা করা হল৷ দেখা গেল প্রথম পঙ্ক্তিতে প্রথম মানুষ যিনি পাত পেতে বসেছেন তিনি শ্রীযুক্ত বাবু মণ্ডামোহন মুখুজ্জে৷ বন্ধুরা বললে – ‘‘হ্যাঁরে মণ্ডামোহন, তুই যে বললি তোকে কালীপূজো করতে নেই৷’’ 

মণ্ডামোহন বললে – ‘আমি তো বলেছি পূজো করতে নেই কিন্তু পেসাদ খেতে নেই এমন কথা তো বলি নি৷ মায়ের পেসাদ না খেয়ে হাতী–ঘোড়া দূরের কথা, কীট–প্রতঙ্গও কি একদিনও বাঁচতে পারে আমি ও তোমরা সবাই অর্থাৎ আমরা সবাই বেঁচে আছি কি করে! দু’বেলা মায়ের পেসাদ পাচ্ছি বলেই না৷ এখন তোমরাই বল আমি এখানে পাত পেতে কী অন্যায়টা করলুম৷ এ যেন সেই ঃ                  ‘‘আমি বেহায়া পেতেছি পাত৷                কোন্ বেহায়া না দেয় ভাত’’৷৷

 

 

Powered by Drupal

নোতুন পৃথিবী সোসাইটির পক্ষ থেকে আচার্য মন্ত্রসিদ্ধানন্দ অবধূত কর্তৃক প্রকাশিত।

সম্পাদকঃ - আচার্য মন্ত্রসিদ্ধানন্দ অবধূত

Copyright © 2026 NATUN PRITHIVII SOCIETY - All rights reserved