না! আজকের মতো বহুরূপী সরীসৃপের ন্যায় রং পাল্টানো রাজনীতিজ্ঞ তিনি ছিলেন না৷ ভারতের মুক্তি সংগ্রামে ক্ষুদিরামের পরেই যিনি দেশের জন্যে জীবন দিয়েছিলেন দেশদ্রোহী বিশ্বাসঘাতককে শাস্তি দিয়ে৷ কারাগারেই হত্যা করেছিলেন বিশ্বাসঘাতক নরেন গোঁসাইকে৷ ৩১শে আগষ্ট কানাইলাল দত্তের জন্মদিন৷ পশ্চিমবঙ্গের চন্দননগরে মাতুলালয়ে তিনি জন্মগ্রহণ করেন৷ তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল হুগলি জেলার খরসরাই বেগমপুর গ্রামে৷ পিতা চুনিলাল দত্ত ছিলেন বোম্বাইতে ব্রিটিশ সরকারের নৌবিভাগের একজন হিসাবরক্ষক৷
কানাইলাল শৈশবে বোম্বাইয়ের গিরগাঁও এরিয়ান এডুকেশন সোসাইটি স্কুলে এবং পরবর্তী সময়ে চন্দননগর দুপ্লেক্স বিদ্যামন্দিরে (বর্তমান কানাইলাল বিদ্যামন্দির) অধ্যয়ন করেন৷ ১৯০৮ সালে হুগলি মোহসীন কলেজ থেকে বি.এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও বিপ্লব ও রাজদ্রোহিতার অভিযোগে কারারুদ্ধ হওয়ায় ইংরেজ সরকার তাঁকে ডিগ্রি প্রদানে বাধা দেয়, কিন্তু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সে বাধা উপেক্ষা করে তাঁকে ডিগ্রি প্রদান করে৷
কানাইলাল চন্দননগর যুগান্তর পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক চারুচন্দ্র রায়ের সান্নিধ্য লাভ করেন৷ তাঁরই অনুপ্রেরণায় কানাইলাল বিপ্লববাদে দীক্ষা নেন এবং ব্রিটিশ-ভারতে বিপ্লবীদের মুখপত্র যুগান্তর ও অন্যান্য পত্রিকা, বিভিন্ন বৈপ্লবিক আন্দোলনের ইতিহাস এবং দেশপ্রেমিকদের জীবনগাথা পাঠে উদ্বুদ্ধ হন৷ শ্রীশচন্দ্র ঘোষের সক্রিয় নেতৃত্বাধীনে উপেন্দ্রনাথ, নরেন্দ্রনাথ, বসন্তকুমার প্রমুখের গোন্দলপাড়া গোষ্ঠীর সঙ্গে কানাইলালের ঘনিষ্ঠতা হয়৷ শ্রীশচন্দ্রেরই ব্যবস্থাপনায় কানাইলাল আগ্ণেয়াস্ত্রের ব্যবহারও আয়ত্ত করেন৷ ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন চন্দননগর গোষ্ঠীর মধ্যে এক নব উদ্দীপনার সৃষ্টি করে, যার পুরোভাগে ছিলেন কানাইলাল৷ এ সময় চন্দননগরে বিলাতি বস্ত্রবর্জন আন্দোলনসহ ইংরেজবিরোধী অসংখ্য স্থানীয় আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে কানাইলাল খ্যাতি অর্জন করেন৷
বিএ পরীক্ষা শেষে কলকাতায় বারীন্দ্রকুমার ঘোষ পরিচালিত গুপ্ত বিপ্লবী গোষ্ঠীর কার্যকলাপে কানাইলাল সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং ভবানীপুরের এক গৃহে গোপনে কর্মময় জীবন অতিবাহিত করেন৷ পরে তিনি বাগবাজারের ১৫ গোপীমোহন দত্ত লেনে চলে যান, যেখানে ছিল বিপ্লবীদের জন্য অস্ত্র ও বারুদের ভান্ডার৷
১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল প্রফুল্ল চাকী ও ক্ষুদিরাম বসুর কিংসফোর্ড হত্যাচেষ্টার ঘটনায় ২ মে অরবিন্দ ঘোষ, বারীন্দ্রকুমার ও অন্যান্যের সঙ্গে কানাইলালও গ্রেপ্তার হন৷ তাঁদের আলীপুর জেলে (বর্তমান প্রেসিডেন্সি জেল) রাখা হয়৷ এ মামলার অন্যতম আসামি নরেন্দ্রনাথ গোস্বামী প্রাণ বাঁচাতে বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হওয়ায় বিপ্লবীরা ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়৷ ১৯০৮ সালের ৩১ আগস্ট দলপতির নির্দেশে কানাইলাল অপর বন্দি বিপ্লবী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সহযোগিতায় জেল হাসপাতালের ভেতরই নরেন গোস্বামীকে হত্যা করেন৷ বিচারে কানাইলালের ফাঁসির আদেশ হয়৷ এ খবর শুনে তিনি তাঁর জন্য কাউকে আপিল করতে নিষেধ করেন৷ বিনা আপিলে ১৯০৮ সালের ১০ নভেম্বর ফাঁসিকাষ্ঠে আরোহণ করার পূর্ব পর্যন্ত তিনি ছিলেন নির্বিকার, স্বাভাবিক৷ তাঁর এ বীরোচিত আচরণ এবং মাতৃভূমির মুক্তির জন্য এ আত্মত্যাগ কারাকর্মীদের পর্যন্ত অভিভূত করে৷ সমবারু চন্দ্র মহন্ত’৷ (ইনটারনেট থেকে সংগৃহীত)
*****
জীবনে অনেক সাধুসন্ন্যাসী দেখিয়াছি কানাইএর মত আমন প্রশান্ত মুখচ্ছবি আর বড় একটা দেখি নাই৷ সে মুখে চিন্তার রেখা নাই, বিষাদের ছায়া নাই, চাঞ্চল্যের লেশ মাত্র নাই - পফুল্ল কমলের মত তাহা যেন আপনার আনন্দে আপনি ফুটিয়া রহিয়াছে৷ চিতকূটে ঘুরিবার সময় এক সাধুর কাছে শুনিয়াছিলাম যে, জীবন ও মৃত্যু যাহার কাছে তুল্যমূল্য হইয়া গিয়াছে সেই পরমহংস৷ কানাইকে দেখিয়া সেই কথা মনে পড়িয়া গেল৷ জগতে যাহা সনাতন, যাহা সত্য, তাহাই যেন কোন শুভ মুহূর্তে আসিয়া তাহার কাছে ধরা দিয়াছে৷--আর এই জেল, প্রহরী, ফাঁসিকাঠ, সবটাই মিথ্যা, সবটাই স্বপ্ণ ! প্রহরীর নিকট শুনিলাম ফাঁসির আদেশ শুনিবার পর তাহার ওজন ১৬ পাউণ্ড বাড়িয়া গিয়াছে!! ঘুরিয়া ফিরিয়া শুধু এই কথাই মনে হইতে লাগিল যে, চিত্তবৃত্তিনিরোধের এমন পথও আছে যাহা পতঞ্জলিও বাহির করিয়া যান নাই৷ ভগবানও অনন্ত, আর মানুষের মধ্যে তাঁহার লীলাও অনন্ত!
তাহার পর একদিন প্রভাতে কানাইলালের ফাঁসি হইয়া গেল৷ ইংরাজশাসিত ভারতে তাহার স্থান হইল না৷ না হইবারই কথা ! কিন্তু ফাঁসির সময় তাহার নির্ভীক, পশান্ত ও হাস্যময় মুখশ্রী দেখিয়া জেলের কর্তৃপক্ষরা বেশ একটু ভ্যাবাচাকা হইয়া গেলেন৷ একজন ইউরোপীয় প্রহরী আসিয়া চুপি চুপি বারীনকে জিজ্ঞাসা করিল ‘‘তোমাদের হাতে এ রকম ছেলে আর কতগুলি আছে?’’ যে উন্মত্ত জনসঙ্ঘ কালীঘাটের শ্মশানে কানাইলালের চিতার উপর পুষ্প, বর্ষণ করিতে ছুটিয়া আসিল, তাহারাই প্রমাণ করিয়া দিল যে, কানাইলাল মরিয়াও মরে নাই৷’’
(নির্বাসিতের আত্মকথা গ্রন্থ থেকে উপেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী)
- Log in to post comments