১২ বছর আগে ২০১৩ সালের মহিলা বিশ্বকাপের আয়োজক ছিল ভারত৷ সমস্ত ম্যাচের আয়োজন করা হয়েছিল মুম্বই এবং কটকে৷ কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরুর সপ্তাহখানেক আগে মুম্বইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম থেকে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) সব ম্যাচ সরিয়ে দেয়৷ কারণ, মুম্বই রাজ্য দল চেয়েছিল ওয়াংখেড়েতে রঞ্জি ট্রফি ফাইনালটা খেলবে৷ ঘরোয়া প্রতিযোগিতার জন্য সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল বিশ্বকাপের ম্যাচ৷ কারণ, মহিলা ক্রিকেট ‘দুয়োরানি’৷ সেই বিশ্বকাপের ফাইনাল হয়েছিল ওয়াংখেড়ে থেকে সাড়ে ছ’শো মিটার দূরের ব্রেবোর্ন স্টেডিয়ামে৷ পুরো টুর্নামেন্টে গ্যালারিতে সাড়ে ছ’শো লোকও হয়েছিল কি না সন্দেহ! চ্যাম্পিয়ন কারা হয়েছিল, কেউ মনে রাখেননি৷ কারণ, মহিলা ক্রিকেট ‘দুয়োরানি’৷
২০১৭ সালের ২০ জুলাই সম্ভবত ভারতে মহিলা ক্রিকেটের একটা মাইলফলক৷ ইংল্যান্ডে ডার্বির মাঠে হরমনপ্রীতের অপরাজিত ১৭১ রান৷ তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভারতের ফাইনালে পৌঁছোনো৷ ক্রিকেটের বাণিজ্যিক সাফল্যের বাস্তুতন্ত্রে ভারতের সাফল্য অনেকটাই নির্ভরশীল৷ ‘শোলে’ ছবিতে গববর সিংহের সংলাপের মতো, ‘‘জব তক তেরে প্যায়ের চলেঙ্গে...তব তক উসকি সাস চলেগি৷’’ ভারত বনাম ইংল্যান্ডের ফাইনাল হয়েছিল লর্ডসে৷ ‘ক্রিকেটের মক্কা’র ৩১, ১৮০ আসন ভর্তি ছিল৷ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) তথ্য আরও চমকপ্রদ৷ ১৮ কোটি দর্শক টিভিতে সেদিনের ম্যাচ সরাসরি দেখেছিলেন৷ ভারত ৯ রানে হেরেছিল৷ কিন্তু জিতেছিল মহিলাদের ক্রিকেট৷ সেই প্রথম মহিলাদের কোনও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা (টি২০ বিশ্বকাপ-সহ ) থেকে আইসিসি বাণিজ্যিক ভাবে লাভের মুখ দেখেছিল৷
২০১৭-২০২০ তিন বছরের মধ্যে দু’টি সাফল্য সাহায্য করেছিল তার তিন বছরের মধ্যে ২০২৩ সালে মহিলাদের আইপিএল শুরু করার সিদ্ধান্ত নিতে৷ পুরুষদের আইপিএলের মতোই ক্রিকেটারদের নিলাম হয়েছিল৷ ক্রমশ ‘ইভেন্ট’ হিসাবে গুরুত্ব পেতে থাকে মহিলাদের ক্রিকেট৷ আন্তর্জাতিক ম্যাচে পুরুষদের সম পরিমাণ ‘ম্যাচ ফি’ মহিলা ক্রিকেটারদেরও দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বিসিসিআই৷ যেমন দেয় ‘ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া’৷ সেখানে পুরুষ এবং মহিলা ক্রিকেটারদের বাৎসরিক চুক্তির অর্থের পরিমাণ সমান৷
১২ বছর আগের সেই অবহেলার ‘জবাব’ দিল রবিবারের বিশ্বকাপ জয়৷ এখন বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মা বা শুভমন গিলই আর ভারতীয় ক্রিকেটের ‘পোস্টার’ নন৷ স্মৃতি মন্ধানা, হরমনপ্রীত কৌর, জেমাইমা রদ্রিগেসও তাঁদের পাশে জায়গা করে নিয়েছেন বিলবোর্ডে৷ যেমন, স্কাই স্পোর্টসের পডকাস্টে প্রাক্তন ইংরেজ অধিনায়ক নাসের হুসেন বলেছেন, ‘‘বিশ্বকাপ ফাইনালের ধারাভাষ্য দিতে মুম্বই বিমানবন্দরে নেমে একটা ডিজিটাল বিলবোর্ড দেখলাম৷ সেখানে ভারতের মহিলা ক্রিকেটারদের বিজ্ঞাপন চলছিল৷ এত বড় বিলবোর্ড পৃথিবীর কোনও বিমানবন্দরে দেখেছি বলে মনে পড়ে না৷ হোটেল পর্যন্ত গাড়িতে আসার সময় যা বিজ্ঞাপন চোখে পড়ল, তার ৯৯ শতাংশ স্মৃতি, হরমনপ্রীত, জেমাইমার৷’’ যেমন, সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে জেমাইমার ম্যাচ-জেতানো ইনিংসের পর বাংলাদেশের হতদরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা জোরে বোলার মারুফা আখতার সুদূর নীলফামারি থেকে জেমাইমাকে ইনস্টাগ্রামে লিখেছেন, ‘জেমিদিদি, তোমার এই ইনিংস আমার মতো হাজার হাজার মেয়েকে উদ্বুদ্ধ করেছে ক্রিকেট খেলতে এবং জীবনসংগ্রামে না হারতে৷’
১২ বছর আগে যে টুর্নামেন্ট দেখতে সাড়ে ছ’শো লোকও যায়নি, সেখানে নবি মুম্বইয়ের ডিওয়াই পাটিল স্টেডিয়ামে রবিবার নীল ঢেউ৷ বৃষ্টির মধ্যেও ছোট ছোট ছেলেমেয়ে নাচছে দর্শকাসনে৷ পুরুষেরা দিব্যি স্মৃতি, হরমনপ্রীত, জেমাইমার নাম লেখা জার্সি পরে বসে আছেন৷ এ দৃশ্য ১২ বছর আগে অভাবনীয় ছিল৷
১৮ বছর আগে এই স্টেডিয়ামেই ক্রিকেটবিশ্ব জেনেছিল, কারা হল প্রথম আইপিএলজয়ী৷ পাশাপাশিই দেখিয়েছিল, বাণিজ্যিক ভাবে কোন পথে চালিত হবে ক্রিকেট৷ রবিবার হরমনবাহিনীর বিশ্বজয়ও মহিলা ক্রিকেটের জন্য খুলে দেবে বাণিজ্যের দুয়ার৷