যেখানে ক্রিয়া রয়েছে সেখানে ক্রিয়াত্মক স্পন্দন রয়েছে তথা স্পান্দনিক ধবনিতরঙ্গ রয়েছে৷ তরঙ্গোত্থিত এই ধবনিকেই বীজমন্ত্র বলা হয়৷ ওঁম্-কার ধবনি হ’ল সমগ্র সৃষ্টিক্রিয়ার বীজমন্ত্র৷ সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ড এই ধবনি থেকেই উৎসারিত৷ সৃষ্টি-স্থিতি-লয় এতেই বিধৃত৷ এই ধবনিই পর ও অপর ব্রহ্মের দ্যোতক৷ ওম-কারের প্রতীকীকরণ নানান জন নানান ভাবে ব্যাখ্যা করে থাকলেও এর দর্শনসমর্থিত তথা মননগ্রাহ্য রূপটি এইরকম-
‘অ-উ-ম’-য়ের সংযুক্তি + নাদবিন্দু= ওঁম্৷ এই ওঁম-কার চারপদ যুক্ত মন্ত্র৷ স্বরবর্ণ ‘অ’ আর ‘উ’, ব্যঞ্জনবর্ণ ‘ম্’ ও নাদবিন্দু () ‘অ’ সত্ত্বগুণ প্রধান ও জাগ্রদবস্থার সূচক, ‘উ’ রজোগুণ প্রধান ও স্বপ্ণাবস্থার সূচক, ‘ম্’ তমোগুণ প্রধান ও সুষুপ্তাবস্থার সূচক৷
‘অ-উ-ম্’-কে যথাক্রমে সৃষ্টি-স্থিতি-লয় বা ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের দ্যোতক হিসেবেও ব্যবহার করা হয়৷ ‘ওঁম্’-এর ওপরের অংশটি সত্ত্ব, নীচের অংশটি রজ, ও ম্-টি তমোগুণের দ্যোতক৷
(.) বিন্দু-টি ত্রিগুণাতীত নির্গুণাবস্থার দ্যোতক৷ এই তিন গুণ এখানে কৈবল্যাবস্থায় বা তুরীয়াবস্থায় সমাহিত৷ অনন্ত ব্রহ্মকে কোনো রূপ-রঙেই ৰাঁধা যায় না৷ তিনি ধরা-ছোঁয়ার বাইরে৷ তাঁর অনন্তত্ব বোঝাবার জন্যে তাই (-) বিন্দুর আশ্রয় নেওয়া হয়েছে৷ বিন্দুর কোনো সীমা পরিসীমা নেই, A point has got position but no magnitude, অব্যক্ত পরমব্রহ্মকে তাই নেহাৎ বোঝাবার খাতিরেই (.) বিন্দুটি ব্যবহার করা হয়েছে৷
কলা () চিহ্ণটি নির্গুণ-সগুণ বা ব্যক্ত-অব্যক্তের বিভাজক রেখা৷ এই বিন্দু ও কলা ব্যক্ত ব্রহ্মের পূর্বে ব্যবহৃত হয়ে ওঁম্ রূপ পরিগ্রহ করেছে৷
ব্রাহ্মীচিত্তের এই স্পান্দনিক অভিব্যক্তি ওঁম্-কার ধবনিকে প্রণবধবনিও বলা হয়৷ এই মহাজাগতিক ধবনি অনন্তকাল ধরে অহরহ হয়ে চলেছে৷ একে শোণার জন্যে যে আধার দরকার তা মানুষের মস্তিষ্কে নেই৷ একমাত্র কুশাগ্র মানসাবস্থার ব্রাহ্মীলোকেই মানুষ এই ধবনি শুনতে পায়৷ এই ধবনিতে সমস্ত ধবনির বীজমন্ত্র নিহিত৷ এই ওঁমকার বা প্রণব ধবনিই সমস্ত জীবের পরাগতি৷ এর পথ ধরেই সকলকে নিষ্ঠাসহ চলতে হবে৷ তাই পরমশ্রদ্ধেয় দার্শনিক শ্রীশ্রীআনন্দমূর্ত্তিজী বলেছেন---
‘‘মানুষ! তুমি ওঙ্কারের পথ ধরে সূক্ষ্মত্বের দিকে এগিয়ে চলো, ছুটো না তুমি আপাতমধুর তমোগুণী মরীচিকার দিকে৷ সত্ত্বগুণে প্রতিষ্ঠিত হয়ে তারপর ব্রহ্মত্বে লীন হও৷ ওঙ্কার যেখান থেকে এসেছে, সেখানে গিয়ে পৌঁছাও৷ সাধনায়, নিষ্ঠায় জাগিয়ে তোলো নিজের সুপ্ত মনুষ্যত্বকে, উদ্বোধন করো দেবত্বের মনীষাকে, আর সেই সাধনালব্ধ শুচিশুভ্র দেবত্বকে বিলিয়ে দাও ব্রাহ্মী মহিমার অখণ্ড স্রোতে৷ অর্জন করো সেই পরমাস্থিতি, যার জন্যে অনাদিকাল থেকে তুমি অনেক কষ্টে এগিয়ে এসে আজ নিজেকে মানুষ বলে পরিচয় দেবার সুযোগ পেয়েছ৷’’ (সুভাষিত সংগ্রহ, ১/১৯)
(স্তোত্রমঞ্জুষা থেকে থেকে সংগৃহীত)