‘যে সত্য ও আদর্শকে অভ্রান্ত জানিয়াও কেঊ যখন ব্যক্তিজীবনে আর অনুসরণ করিতে পারে না, ধীরে ধীরে সেই ব্যক্তি ওই সত্য ও আদর্শের বিরোধী হইয়া পড়ে৷‘(মহামতি বিপিনচন্দ্র পাল৷) তারপর একদিন জনমানস থেকে, আদর্শ থেকে, এমনকি জীবন থেকেও তারা হারিয়া যায়৷ জীবন প্রতিস্রোতে ডুবে যেতেও অনেক সময় পিছু পা হয়না৷ জীবনের উদেশ্য কী--- সেটাই হয়ত এদের কাছে চিরকাল অজানাই থেকে যায়৷
দুর্ভাগ্যের বিষয় কিছু পুণ্যাত্মা এক শক্তিশালী ও সুস্থ সমাজ তৈরীতে ব্রতী হয়েছিলেন৷ কিন্তু চলার পথে সুচিন্তিত কার্যও অন্যকে এইরকম সমাজের প্রয়োজনীয়তা বোঝাবার পরিবর্তে যুক্তি আর বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন, পরিণামে শেস পর্যন্ত তাঁরা ভাবাদর্শের পরিবর্তে নিজেদেরই তুলে ধরেছিলেন৷ ফলে ভাবাদর্শ হয়ে গেল গৌণও পরিশেষে ধুয়ে মুছে পরিস্কার হয়ে গেল৷ কারণ জনগণেরা তাঁদেরই মহাত্মা বা মহাপুরুষ বলে পূজা করতে শুরু করে দিয়েছিল৷ ভাবাদর্শের অভাবে একটা শক্তিশালী সমাজ গড়ে উঠল না, আর নানাপ্রকার ত্রুটি মানুষের জীবনে অলক্ষিতভাবে প্রবেশ করল৷ কাজেই আধ্যাত্মিকতাকে বাদ দিয়ে সুস্থ সবল সমাজগঠনের প্রয়াস, আর শিরঃপীড়া সারাতে শিরোচ্ছেদ করা একই ব্যাপার৷ (দার্শনিকশ্রেষ্ঠ শ্রীপ্রভাতরঞ্জন সরকার)৷ কিছুকাল, কিছু অঞ্চলে,কিছু মানুষের জীবন ওলোটপালট করে দিয়ে এঁরা হারিয়ে যানকালের গহন আঁধারে৷ সমাজের লাভের কিছু হ’লনা, উল্টে সমাজের বুকে এঁদের অনুগামীতে অনুগামীতে ভিন্ন ভিন্ন মতভেদে বিভেদ-বৈষম্য বেড়ে গেল৷ ওঁরাও গেলেন, রেখে গেলেন বিভেদ-বৈষম্য- অসুয়া - অসহিষ্ণুতা,সমাজ থেকে হারিয়ে গেল অন্যোন্যজীবিতা, অনন্যময়তা৷
দিকে দিকে ‘নীরব-কলরব ‘খেপি-পুটি - দুলারী -মিস্রা হঠাৎ হঠাৎ হারিয়ে যায়৷ পুলিশ-প্রশাসন জানতেও পারল-না৷ হারিয়ে যাওয়ার গল্পগুলো অজানাই থেকে যায়৷ জানলেও লোকলাজে বা আরো সর্বনাশের ভয়ে প্রকাশ্যে আনতে ভয় পায়৷ ঘর (হোম) হারিয়ে হয়তো এদের চিরদিনের আশ্রয় জোটেচিরদিনের অন্ধকারের রাজ্যে৷ সমাজ যেন অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র, চোখ বুঁজে থাকাই ভালো, নইলে ঝক্কি অনেক৷ দারিদ্র্য, বেকারিত্ব, প্রবৃত্তির বিকৃত তাড়না হয়তো হ্যাম্লিন বাঁশী ৷
‘আমরা কাজহারা পরিযায়ী, অভিবাসী, কর্ষক-খনি- কারখানা-তথ্যপ্রযুক্তি-করপোরেট্-মেগাশপ শ্রমিক৷ আমরা খাব কী? আমাদের ছেলেমেয়েদের পরিবারের হবে কী? এরাও যে জীবনের মূলস্রোত থেকে হারিয়ে যাচ্ছে৷ ঘুরে দাঁড়াতে সমাজের বিজ্ঞানসম্মত, সুচিন্তিত পরিকল্পনা ও কার্য কোথায়? ডুমুস্ডে কী এদের জন্য আসন্ন !
সামাজিক-অর্থনৈতিক পিছিয়ে পড়া দেগে দেয়া তালিকাভুক্ত জাতি-উপজাতি সংরক্ষণের গেঁরোয় আজোও সামাজিক মূলস্রোতে ব্রাত্য৷ হারানোর সুর তাদের টানছেই৷ পিছিয়ে পড়া বিভেদ-বৈষম্যের জালে আজোতারা আটকে ৷ শুধুমাত্র প্রকৃতি দত্ত জাতিকসত্তাগত ভৌমপরিচয়ই নয়, হারিয়েগেছে মানুষ হিসেবে মানব-জীবপ্রজাতিগত পরিচয়ও৷
তোর/তোমার/তোমাদের মন বলে কী কিছু নেই?--- কথাটা আমরা প্রায়ই শুণে থাকি৷ তথাকথিত সভ্য মানুষের সমাজে মানুষের মনটাই হারিয়ে গেছে৷ মনটাই যদি হারিয়ে গেল তো মানুষের থাকল কী৷ কোটি কোটি বছরের পশুজীবন ফেলে এসে লাভ হলটা কী? এই মনটাই যে মানুষকে জন্তু-জানোয়ার থেকে আলাদা করেছে ৷ এই মন বলতে মনের ‘মহৎ-সত্তা (অপারেট প্রিন্সিপ্ল্), অর্থাৎ যৌক্তিকতা-ভিত্তিক বিচারশীলতা৷ তাত্ত্বিক পরিভাষায় এর নাম বিবেক, ইংরেজিতে কন্সায়েন্স্৷ এই মনটাই হারিয়ে গেছে, খোঁজ নেই, খোঁজার তাগিদও নেই৷
একটা মহামূল্যবান সম্পদ হারিয়েছে গো! কী হারালো? কী হারালো? চরিত্র! সে আবার কী? বিকশিত মনুষ্যত্বের পূর্ণত্বই চরিত্র৷ এই বিকাশের বিকচোন্মুখ কোরকগুলির মধ্যে প্রধান হচ্ছে প্রাকৃতধর্ম অধ্যুসিত সদাচার বা চর্যাচর্য, অন্যোন্যময়তা-অনন্যময়তা, আধ্যাত্মিক অভীপ্সা ও সেবাধর্ম৷ এই গূণগুলির সামবায়িক সহবস্থান যার মধ্যে বর্তমান তিনিই চরিত্রবান৷ বলাবাহুল্য, বর্তমান ব্যষ্টি তথা সমাজজীবনে অণুবীক্ষণযন্ত্রেও একে মেলান ভার৷ কার্যত চরিত্র হারিয়েই গেছে৷
ভুক্তভোগীরা বলছেন---এ দুনিয়ায় কাঊকে বিশ্বাস নেই৷ বিশ্বাস জন্ম নেয় বৈয়ষ্টিক সম্পর্কের আপনত্ব বোধে --- একাত্মতায়৷ এই বোধবোধি সিঞ্চিত হয় আত্মাভিমুখী ও কল্যাণ ঈপ্সিত ভাবনায়৷ কিন্তু সে কোথায়? সাধারণের ধারণা মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাসই আজ হারিয়ে গেছে৷ মানুষের বিকৃত জীবনবোধ অসদাচরণই বোধহয় এর জন্যে দায়ী৷
তোমাদের কি হারালো গো? গৌরবোজ্জ্বল অতীতটাই সভ্যতাটাই হারিয়ে গেছে, কোনো ইতিহাস নেই৷ হিসেব তো মিলছে না ৷ জ্যোতির্বিজ্ঞান বলে---মহাবিশ্ব কোনো কিছুই হারিয়ে যায় না৷ কোনো না কোনো জ্যোতির্র্লেকে তা রক্ষিত-সঞ্চিত রয়েছে৷ গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যকে সম্যক কমর্ৈষণা দ্বারা উদ্বর্তিত করে যুগ থেকে যুগে বয়ে নিয়ে যেতে হয়৷ আসলে সেই উদ্বর্তন-গুণান্বিত কমর্ৈষণাই হারিয়ে গেছে৷
ব্যাকুল -বিহ্বল-উদাস বাঊল করুণ- মরমীসুরে হাপুস নয়নে গাইছে---এমন মানুষ পেলাম নারে যে আমারে ভালবাসে (ব্যথা দিল না)৷ সেটাই যে হারিয়েগেছে! সব সমস্যার সমাধানের পন্থা কেবলমাত্র একটাইআর সেটা হচ্ছে জীবে প্রেম, মানুষের প্রতি ভালবাসা৷ এই প্রেম-ভালবাসাই মানুষকে পথ-নির্দেশনা দেবে, বুঝিয়ে দেবে কোথায় কী করণীয় ও অকরণীয়৷ দরকার কেবল ওই একটা জিনিসের---সত্যিকারের দরদ দিয়ে মানুষের পানে চেয়ে দেখা---কিন্তু সেটাই যে হারিয়ে গেছে! ‘মহাভারতে শ্রীকৃষ্ণ বুঝিয়েছিলেন প্রেমহীন পৃথিবীটা মরুভুমির সমান, যেখানে প্রেম সেখানেই প্রাণের হিল্লোল সবুজের লালিমা, মুক্তির খোলা জানালা৷ প্রেমের অভাবেই খৃষ্টপূর্ব পঞ্চদশ শতকের বিশ্বের বৃহত্তম রণভূমির নাম কুরুক্ষেত্র, আধুনিক বিশ্বের দু-দুটি বিশ্বযুদ্ধ, নাগাসাকি হিরোসিমা ৷ বর্তমান চিত্র যুযুদ্ধান প্রায় গোটা বিশ্বই৷ হায় প্রেম! তুমি কোথায়?
হারিয়ে গেছে --- বাঁচ ও অপরকে বাঁচাও নীতি ৷ সার হয়েছে - আপনি বাঁচলে বাপের নাম৷ আমিই একমাত্র বাঁচব অন্যেরা মরুক! অথচ ভুললে চলবে কী করে? অন্যেরা না বাঁচলে আপনি যে বাঁচে না---এই বিশ্বজগৎ আমাদের সকলের পৈত্রিক সম্পত্তি৷ আমরা সকলে এক বিশ্বভিত্তিক যৌথ পরিবারের সদস্য৷ পরমপুরুষ আমাদের পিতা৷ যৌথ পরিবারের সদস্যদের মতই আমাদের উচিত সবাইকে নিয়ে নিজে বাঁচ ও অপরকে বাঁচাও নীতি নিয়ে চলা৷ বস্তুতঃ বিশ্বের ব্যবহৃত সমস্ত সম্পদ কোনো বিশেষ ব্যষ্টি, রাষ্ট্র বা জাতির সম্পত্তি নয়৷ সকলের কেবল এই সম্পদ ভোগ করবার অধিকার আছে মাত্র৷ এই ভূমা-উত্তরাধিকার মেনে নিয়ে যাবতীয় লোকায়ত ও লোকোত্তর সম্পদের সদ্ব্যবহারই মানুষের যথার্থ সামাজিক ধর্ম৷ এটা কেবল সামাজিক বিবেচনার দিক দিয়েই নয়, যুক্তি ও ন্যায় বিচারেবদিক থেকেও একমাত্র পথ৷ বলতে গেলে এটাই যথার্থ সমাজ দর্শন৷ সেটাই যে হারিয়ে গেছে৷
হারালো হারাল ‘ভাল’(ভদ্র> ভদ্দ> ভল্ল> ভালা / ভাইলো> ভাল) যে হারালো! সেই ভাল যে সুষ্ঠুভাবে ত্রি-ভূতেই --- শারীরিক,মানসিক ওআধ্যাত্মিকে এগিয়ে চলে ৷ কিন্তু যে বসে বসে মার খায়,অপমান সহ্য করে, শোষণের পর শোষণকে মুখ বুঁজে সহ্য করে ও বিধিলিপি বলে মেনে নেয়, সে ভাল নয় ৷ সেই ভালমানুষ যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে, ন্যায়কে দৃঢ হাতে ধরে রাখে, দুর্বলকে রক্ষা করে,পাপীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে৷ তবে অত্যন্ত নিরীহ, শান্ত-শিষ্ট গুডি-গুডি বয়েজ’রা ভাল নয়, এরা ব্যষ্টি ও সমষ্টি জীবনের কোনো হোম-যজ্ঞেই কাজে লাগে না৷ ভাল যথার্থই একটি প্রতিবাদীও প্রতিস্পর্ধী ভাবাত্মক চরিত্র বৈশিষ্ট্য৷ সমাজ থেকে এই ভালরাই হারিয়ে গেছে৷
মানব সমাজের প্রয়োজনেই ওই হারাণদের যে খুঁজে আনতে হবেই হবে৷ নইলে না বাঁচবে মানুষ, না বাঁচবে সমাজ৷ কে আছো জওয়ান, হও আগুয়ান ‘‘৷ ‘‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ নাই আসে, তবে একলা চলোরে ৷ আমরা যে সামাজিক, সবাইকে নিয়ে একসঙ্গেই চলোরে ৷ এগিয়ে চলাই যখন জীবনধর্ম তখন চলতে তো হবেই৷ কিন্তু চলার রসদ কোথায়? সংবেদ বা আকর্ষণ কোথায় ? এটাও তো একটা জীবন সংগ্রাম, এ লড়ায়ের হাতিয়ার কোথায় ? আছে তো সবই, আছে তা চেতনা -চৈতন্যের গভীরে, খুঁজে নিতে হয় ৷ রসদ আছে সুষ্ঠ-সুন্দর- আদর্শ মানবসমাজের বিভোল-ব্যাকুল রঙিন স্বপ্ণে ও গ্রথক তার ভাবাদর্শ, সংবেদ বা আকর্ষণ জগৎ ও জীবনের সামূহিক কল্যাণের পথে অমৃতলোক, দিব্যাস্ত্র ‘প্রকৃত দর্শন ও প্রকৃত সাধন পদ্ধতি---যা সবরকম ভৌতিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক রোগের নিদান ৷ সোজা কথায় এই সব রোগের একমাত্র নিদানই হ’ল বিশ্বৈকতাবাদ, যা প্রকৃতপক্ষে মনের ৩৬০ কৌণিক প্রক্ষেপ৷ (সমাপ্ত)
- Log in to post comments