-এই যে গাইড৷
- কী ব্যাপার সন্ধ্যে রাতে..৷ মনটন খারাপ নাকি?
- আরে শুধু কি মনখারাপ, সঙ্গে বুকের ভিতর টা হু ..... হু৷
- ও’টা বোধ হয় বাংলার বাইরে থাকার এফেক্ট৷
- সে’টা ডিনাই করছি না, তবে এ মনখারাপ সে জন্যে নয় গো৷
- নতুন করে স্মৃতিবেদনায় চক্করে পড়োনি তো? শেস বয়সে এসে অমন একটু আধটু হতেই পারে৷
- তাইই মনে হচ্ছে৷ এ বয়সে নতুন ঐটাই তো অবলম্বন৷ কিছু ওই গৃহপালিত এক্সারসাইজগুলো এন্টারটেনিং হয় বটে৷ এনগেজিং ও বটে৷ এই যেমন ধরো গিন্নী প্রাতরাশ এর ফল ছুলে দিতে বললে৷ তা দিলাম৷ প্রভাতী চা টা তো করেই থাকি৷ মশারির খোলা ও ভাজ করা৷ পার্ফেক্ট রিদমে৷ সব ক’টা কাজ আমার দৃষ্টিতে নিখুঁত, কিন্তু তার দৃষ্টিতে গোলমেলে৷ কাজের কোনও ছিরি ছাদ নেই৷ তবে নতুন প্রেমের ‘ওগো-হ্যাঁগো-তোমায় ছাড়া দুনিয়া অন্ধকার -গো’..ও’সব আর এই বয়সে সইবে কেন বলো৷
- তা’হলে শাগরেদ, কেন তব এ দুর্মতি ?
- জীবনের হাহাকারটা স্পষ্ট হয়ে উঠছে গাইড৷ সে জন্যেই এই কান্দণ৷
- কী’রকম?
- এই যে ধরো পুজো আসছে৷ ছেলেবেলার এক্সাইটমেন্টটা ভাবতে চাইছি কিন্তু কিছুতেই হচ্ছে না৷ ভাবছি এন্তার ঘোরাফেরা, খাওয়া দাওয়া করব৷ লুচি তে সাঁতার কাটব, চপ-ঘুগনিতে বুঁদ হয়ে যাব৷ আর গ্রামে গিয়ে মায়ের হাতের খিচুড়ি লাবড়া ......
ভেবে যেমন আনন্দ হচ্ছে, তেমনি বুক শুকিয়ে যাচ্ছে রিয়েলিটির কথা ভেবে৷ আজকাল সল্টেড বাদাম চিবুলেও বুকজ্বালা৷ কোথায় লুচি ঘুগনি, কীসের চপ ? সেই ট্যালট্যালে ডাল আর মিক্সড ভেজিটেবলেই স্বস্তি৷ বড় জোর শেষ পাতে চাটনি৷ তারপর ধরো কলকাতার প্যান্ডেল প্যান্ডেল ঘুরে রাতকাবার করাটা একসময় মনে হত মার দিয়া কেল্লা৷ এখন ভীড় ভাবলেই বুক কেঁপে উঠছে৷ পুজোসংখ্যা হাতে আর পাইনা তাই স্যোশাল মিডিয়াই ভরসা৷ আচ্ছা গাইড, সবই কি ক্লিশে? ও’সব কি আর কোনওদিনই ফিরে পাবো না? আর, ভয়ের কথা বুড়িয়ে গেলাম নাকি?
- ক্লিশে উড়িয়ে দেবে বিদগ্দ মানুষজন৷ তোমার আমার সে দায় নেই হে৷ চেনা পরিচিত ভালোলাগাগুলোকে জড়িয়ে ধরব, বুক বাজিয়ে ডিফেন্ড করব৷ মনের সুখে সে’ সব ভাবনাগুলোকে আগলে রাখব৷ অত ভেবে অফিসের ডেটাবেস সাজিও, বৃষ্টি নামলে মুড়ি আর ভাজাভুজি খোঁজ করাতেই আমাদের মুক্তি৷
- তবে ‘পুজো আসছে পুজো আসছে’ করে লাফিয়ে উঠতে পারছি না কেন? কেউ কানের কাছে পুজো-পুজো ঘ্যানঘ্যান করলেই রাগ হচ্ছে কেন ? তার ঝুঁটি টা ধরে নাড়িয়ে দিতেই বা ইচ্ছে যাচ্ছে কেন ?
- সে’ টা ক্লিশে নয় হে৷ বড়জোর আক্ষেপ বলতে পারো৷
- ব্যাখ্যা ? কিন্তু বাংলায়৷
- কিশোর বেলায় পুজোটা তুমি গ্রামের বাড়িতে কাটাতে, তাই না?
- প্রতি বছর৷ উইদাউট ফেল৷ যখন থেকে একা যাতায়াত করতে শিখেছি৷ আহা, সে কথা মনে পড়ায় ‘পেটে, বুকে হুহু, চোখে জল’ সিচুয়েশন হয়ে গেল৷ আর বাবা৷ আর মা৷ আর খোলা মাঠ মিষ্টি হাওয়া, কুয়োর জল৷ পাড়ার সে আটপৌরে পুজো৷ আর সেই মানুষগুলো৷ আর সে খিচুড়ি খাওয়া৷ আর বাবা৷ আর মা৷ আর সে দূর থেকে পুজোর অঞ্জলি শুরুর ঘোষণা৷ সন্ধ্যের থিয়েটার এর আওয়াজ৷ আর কচিকাঁচাদের মাইকে গিয়ে নিজের কন্ঠস্বর শোনার ....৷ আর ইয়ে, দশমীর নারকেলের নাড়ু আর ঘুগনি৷ আর বাবা৷ আর মা৷
- ওয়াটার ওয়াটার এভ্রিহোয়্যার নট আ ড্রপ টু ড্রিঙ্ক৷ চারদিকে পুজো পুজো ভাব শাগরেদ, অথচ তুমি তোমার পুজোয় ফিরতে পারছ না৷
- বাবা, মা সে পুজো বগলদাবা করে চলে গেল যে৷
- একটা কথা বলি শাগরেদ?
- নিশ্চয়ই গাইড৷
- তোমার বাবা, মা তোমার ভালোবাসার পুজোর স্মৃতি তৈরি করে গেছেন, যে স্মৃতি নেড়েচেড়ে আজও তুমি চাঙ্গা হয়ে ওঠো৷ তাই না? তেমনই, নিজের বুড়োটেপনায় আটকে না থেকে, অন্য কচি কাঁচাদের হয়ে ভালোবাসার পুজো তৈরির দায়ও তো তোমার ওপর খানিকটা বর্তায়, তাই নয় কি?
- দায়? আছে, তাই না?
- আলবাত৷ আর সে’টা দায়ভার নয়৷ আমার ধারণা সে’টাও বেশ তৃপ্তির৷
- গাইড, পুজো সত্যিই চলে এলো৷ তাই না?
- একদম! একদম!
- Log in to post comments