রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও সংকীর্ণ রাজনীতি

লেখক
আচার্য মন্ত্রসিদ্ধানন্দ অবধূত

আর কয়েকদিন পরে দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে৷ এই নির্বাচনের সঙ্গে সাধারণ মানুষের প্রত্যক্ষ কোন যোগ নেই৷ কারণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সাধারণ মানুষ বোট দেন না৷ সাধারণ মানুষের দ্বারা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি সাংসদ বিধায়কদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন৷ শাসক ও  বিরোধী পক্ষের ঐক্যমতে দেশের সবের্বাচ্চ আসনে উপবিষ্ট প্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার একটা প্রচেষ্টা থাকে৷ তবে এবার সেরকম কোন প্রচেষ্টা শাসক বিরোধী কোন পক্ষ থেকেই দেখা যায়নে৷ তাই দু-পক্ষ থেকেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন পেশ করেছেন৷ তাই  রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অবশ্যম্ভাবী৷ বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এটা এমন কোন শ্লাখাজনক নয়৷

নির্বাচন যেখানে হচ্ছে সেখানে পক্ষে-বিপক্ষে প্রচার থাকবেই৷ রাষ্ট্রপতিপদে যাঁরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা যাঁরা করেছেন দুজনেই এই পদে যথেষ্ট যোগ্য ব্যষ্টি৷ বোট যাঁরা দেবেন তাঁরাও নির্বাচিত প্রতিনিধি কেন্দ্র ও রাজ্যে আইনসভার সদস্য৷ ধরে নেওয়াই যায় তাঁরা প্রত্যেকেই যথেষ্ট বিচক্ষণ ব্যষ্টি৷ দলীয় আদর্শ ও প্রার্থীর যোগ্যতাই প্রচারে প্রাধান্য পাওয়া উচিত৷  বিরোধীদের মূল অভিযোগ এই মুহূর্তে শাসক দলের হাতে দেশের গণতন্ত্র সুরক্ষিত নয়৷ তাই গণতন্ত্র রক্ষাই বিরোধীদের প্রচারে হাতিয়ার৷ কিন্তু শাসকদল কৌশলে প্রার্থী কোন জনগোষ্ঠীর শ্রেণীভুক্ত প্রচারে তা তুলে ধরেছেন৷ যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠাময় প্রাদেশিক বিষয়টা অস্বীকার করা যায় না৷ কিন্তু রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনেও যদি জাত-পাত বা জনগোষ্ঠীর অর্ন্তভুক্ত বিষয়টি সামনে আসে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের পক্ষে তা মোটেও গৌরব জনক নয়৷ বিশেষ করে দেশের বর্তমান শাসকদল যেখানে কথায় কথায় এক দেশ এক রেশন কার্ড, ইত্যাদি শ্লোগান তুলে বিতর্ক বাধায়, সেখানে জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভাজন তৈরী করে ভোট আদায়ের চেষ্টা রাজনৈতিক কপটতার সামিল৷

একথা অস্বীকার করা যায় না---‘‘বৈচিত্র্যং প্রাকৃত ধর্মঃ সমানং ন ভবিষ্যতি৷’’ বৈচিত্রই প্রকৃতির ধর্ম৷ সৃষ্ট জগতের কোনও দুটি বস্তু হুবহু এক নয়৷ দু’টি মন এক নয়, দুটি অণু বা পরমাণুও এক নয়৷ এই বৈচিত্র্যই প্রকৃতির স্বভাব৷ যদি কেউ সবকিছুকে সমান করতে চায় সেক্ষেত্রে প্রাকৃত ধর্মের বিরোধিতা করায় অবশ্যই ব্যর্থ হবে৷ সব কিছু সমান কেবল প্রকৃতির অব্যক্ত অবস্থায়৷ তাই যারা সব কিছুকে সমান করার কথা ভাবে, তারা সব কিছুকেই ধবংস করার কথা ভাবে৷ তাই বিদ্বেষমূলক বিভাজনকে প্রশ্রয় না দিয়ে বৈচিত্র্যের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যকে রক্ষা করতেই হবে৷ .....সবাইকে যেমন এক ছাঁচে ঢালা যাবে না, তেমনি বৈচিত্র্যের ধূয়ো তুলে কেউ যাতে বিভেদ বিদ্বেষের বীজ বপন করতে না পারে সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে৷ বৈচিত্র্য স্বীকৃতি দেয় বহুত্বকে, আর তারই মাঝে বিচ্ছুরিত হয় ঐক্যের দ্যুতি৷

তাই বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য, এটাই বিশ্বপ্রকৃতির মূল সুর৷ ভারতীয় সংবিধানের কথা বলতে গেলেও এটাই আমাদের সংবিধানের মূল কথা৷ গণতন্ত্রেরও মূল কথা এটাই৷ বিশ্বমানবতার আধার শিলাও এটাই---বৈচিত্র্যের মধ্যে একতা৷

যিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন তিনি কোন একটি দল, সম্প্রদায় বা জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি নন৷ তিনি দেশের প্রতিটি মানুষের প্রতিনিধি৷ তাঁর কাছ থেকে দেশবাসী ঐক্য, সংহতি,সম্প্রীতির বার্র্ত শুণবেন৷ তাই নির্বাচনের আগে তাঁকে একটি জনগোষ্ঠী থেকে উঠে আসা ব্যষ্টি হিসাবে তুলে ধরা গণতন্ত্রের পক্ষে গৌরব জনক নয় বরং সংকীর্ণ রাজনীতির পরিচয়৷