বিখ্যাত ইংরেজ সাহিত্যিক এ্যাডিসন তাঁর ‘মিসচিভসফপার্টি স্পিরিট’ প্রবন্ধে সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন রাজনৈতিক দলগুলির জঘন্য মানসিকতা৷ তারই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা দেখছি ভারতীয় গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর কুৎসিত চেহারা৷ রাজনৈতিক দলগুলোর না আছে নৈতিকতা, না আছে চরিত্র৷ তারা সর্বদাই নিজ নিজ দলের ও ব্যষ্টিগত স্বার্থের ভাবনায় ভাবিত হয়ে কাজ করে থাকে৷ এর ফলে প্রতি পদে পদে দেশ ও দশের ক্ষতি হয়৷
রাজনৈতিক দলগুলির চিন্তাভাবনা একটাই তা হ’ল কি করে রাজশক্তি কায়েম করা যায়৷ তার জন্যে দলগুলো নির্বাচনে ছল---বল---কৌশল করে পেশীশক্তির জোরে গদী দখল বা রক্ষার চেষ্টা করে৷ জনগণের কাছে যে সব দাবী নিয়ে দলগুলো নির্বাচনে লড়ে, যে সব প্রতিশ্রুতি জনগণের কাছে দিয়ে থাকেন নির্বাচনের পরে সে সব বিসর্জন দিয়ে ফলাফলের নিরিখে উত্তর মেরুর দল দক্ষিণ মেরুর ভাবনা চিন্তায় ভাবিতদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে গদীতে বসে৷ তারপর স্বার্থ নিয়ে কামড়া---কামড়ি করে গণতন্ত্রের পবিত্রতাই ধবংস করে৷ পরাজিতের প্রতি প্রতিহিংসা পরায়ন আচরণ করে৷ উদাহরণস্বরূপ বলা যায় কংগ্রেস দল কমিউনিষ্ট ও সাম্প্রদায়িক দলগুলোর সঙ্গে আঁতাত করে কেন্দ্রে গদী দখল করে৷ গদী দখলের জন্যে সেখানে নীতি বা আদর্শের ধার ধারে না দলগুলো৷
সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে পট পরিবর্তন হয়েছে৷ তৃণমূলের ১৫ বছর শাসনের পর পশ্চিমবঙ্গের দখল নিয়েছে বিজেপি৷ যদিও নির্বাচন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে অনেক প্রশ্ণ রয়েছে৷ বিদায়ী শাসকদল ফলাফল মেনে নিতে পারেনি৷ মুখ্যমন্ত্রী পরাজয়ের পরও গণনায় কারচুপির অভিযোগ তুলে পদত্যাগ করেননি৷ তাঁকে বরখাস্ত করে নূতন সরকার গঠিত হয়৷
অনেকেই দাবী করছেন এই নির্বাচন ঘটনা বিহীন কোন প্রাণহানি ঘটেনি৷ যে দুটো দিন নির্বাচন হয়েছে সেই দুটো দিনে আগের নির্বাচনের সঙ্গে তুলনা করলে হয়তো ঘটনাবিহীন কিন্তু নির্বাচনের আয়োজন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ঘটনাবিহীন বলা যাবে না৷ এই নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া শুরু হয় ২০২৩ সালে৷ যেদিন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের নিয়ম পরিবর্তন করে কমিশনার নিয়োগের অধিকার নিজের হাতে নিয়ে নেন৷ এখান থেকে প্রধানমন্ত্রীর বাঙলা দখলের পরিকল্পনা শুরু হয়৷ তারপর ভোটের ঠিক তিনমাস আগে বোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু হয়৷ পশ্চিমবঙ্গের মতো জনবহুল রাজ্যে যেটা সম্পূর্ণ করতে অন্ততঃ দুটো বছর লাগার কথা৷ কিন্তু দলীয় পছন্দের লোক দিয়ে ২ বছরের কাজ তিন মাসে সারেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার৷ প্রায় অর্ধকোটির বেশী লোকেদের বোটার তালিকার বাইরে রেখে চূড়ান্ত বোটার তালিকা প্রকাশ করেন জ্ঞানেশ কুমার৷ এই প্রক্রিয়া মোটেই ঘটনা বিহীন ছিল না৷ নিত্যনোতুন নিয়ম---লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির নামে লক্ষ লক্ষ বোটারকে ঝুলিয়ে রাখা যা অন্য কোন প্রদেশে হয়নি৷ নির্বাচন কমিশনারের খেয়াল খুশি মতো নিয়ম মানতে গিয়ে দুশোর বেশি বুথস্তরের অফিসার প্রাণ হারিয়েছেন৷ তবু বলবেন ঘটনা বিহীন ছিল!
বিচার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতারও কিছু অভাব ছিল৷ বোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া এক মামলায় বিচারপতি মন্তব্য করেন---এবার বোট না দিলেও বোটার তালিকায় নাম তোলা যাবে৷ নির্বাচন কমিশনারের এই মন্তব্যে অনেকেই বিস্মিত হয়৷ কিন্তু এবারই বা বোট দেব না কেন? এই প্রশ্ণের কোন উত্তর নেই৷ বিচারপতির এই ধরনের মন্তব্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার কাছ থেকে আশা করা যায় না৷ কমিশনার নিয়োগের নিয়ম পরিবর্তন নিয়ে একটি মামলা সুপ্রিম কোর্টে ঝুলে আছে৷ সেই মামলার নিষ্পত্তি হওয়ার আগেই নতুন নিয়মে কমিশনার নিয়োগ করে ২০২৪-এর নির্বাচন একাধিক রাজ্যে রাজ্যস্তরের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়৷ অনেকেই মনে করেন নতুন নিয়মে স্থগিতাদেশ দিয়ে পুরনো নিয়মেই কমিশনার নিয়োগ করে নির্বাচন করা উচিত ছিল৷ তাতে নির্বাচন অস্বচ্ছতার অভিযোগ আনা সহজ হতো না৷
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকদের সবচেয়ে ভরসার জায়গা বিচারব্যবস্থা৷ তার পরেই সংবাদ মাধ্যম৷ সংবাদ মাধ্যম অনেক আগেই গদী মিডিয়া খ্যাতি লাভ করেছে৷ বিচার ব্যবস্থার প্রতিও মানুষ যদি আস্থা হারায় তাহলে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষার আর কোন ও জায়গা থাকে না৷ সম্প্রতি শীর্ষ আদালতের একটি মন্তব্য নিয়ে যুব সমাজ ক্ষুব্ধ৷ কারণ বিচার পতির ওই মন্তব্যে বেকার যুবকদের আরশোলার সঙ্গে তুলনা করেছেন৷ এই নিয়ে বিচার প্রতির মন্তব্যকে ব্যঙ্গ করে ককরোচ্ জনতা পার্টি নামে একটি রাজনৈতিক দলও তৈরী হয়েছে৷ পরে অবশ্য ক্ষোভের মুখে পড়ে বিচারপতি বলেন ---শুধুমাত্র ভুয়ো ডিগ্রিধারীদের এই কথা বলা হয়েছে৷ তবু আজ মানুষের মনে প্রশ্ণ গণতন্ত্রে নিরপেক্ষতার শেষ আশ্রয়স্থলও কি শাসকের অঙ্গুলিহেলনে চলবে৷ তাহলে গণতন্ত্রের সার্থকতা কোথায়!
- Log in to post comments