যাদবপুর ইউনিভার্সিটির সাম্প্রতিক ঘটনা আর এক বার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে বৈশ্যের স্বার্থরক্ষা ও দলীয় মতাদর্শ প্রচারের মাধ্যম হয়ে গেছে ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা৷ তাই গেরুয়া, লাল, নীলে যে যখন ক্ষমতায় আসে তার মত করে, তার রঙে গড়ে তোলে শিক্ষাব্যবস্থা৷ এ ব্যাপারে ডান বাম রাম কোন পক্ষই পিছিয়ে নেই৷ যাদবপুর দীর্ঘদিন ধরেই বাম রাজনীতির দুর্গ৷ তৃণমূল ১৫ বছরে সে দুর্গ ভাঙতে পারেনি৷ সদ্য ক্ষমতায় এসে বিজেপি সেই কাজে হাত দিয়েছে৷ দলীয় রাজনীতির প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা ও বামেদের প্রভাব ধরে রাখার প্রয়াস যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক সংঘর্ষের কারণ৷ আরো লজ্জার বিষয় ছাত্রদের এই রাজনৈতিক সংঘাতকে শুধু রাজনৈতিক নেতারা নয়, শিক্ষক সমাজের একটি অংশ মদত দিচ্ছে৷ শিক্ষা ব্যবস্থার সবথেকে বড় ত্রুটি এখানেই৷ মানুষ তৈরির কারিগরই সমাজে অমানুষ ভরে দিচ্ছে৷
শিক্ষা ব্যবস্থায় এই নৈরাজ্য শুধু যাদবপুরেই নয়, দেশজুড়েই শিক্ষা ব্যবস্থায় চলছে নিদারুণ অব্যবস্থা৷ একদিকে শিক্ষার পবিত্র অঙ্গনে রাজনৈতিক তঞ্চকতা শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনায় ক্ষমতাশীল রাজনৈতিক নেতাদের অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ, অপরদিকে বৈশ্য শাসকদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে গোলাম তৈরির কারখানায় পরিণত করার চেষ্টা ছাত্রদের মনুষ্যত্ব বিকাশের পথে সব থেকে বড় বাধা৷ বরং বলা ভাল দুই এর যাঁতাকলে পড়ে ছাত্র সমাজ অমানুষ হয়ে উঠছে৷
শুভবোধসম্পন্ন শিক্ষক, শিক্ষাব্রতী, শিক্ষা হিতৈষী অবশ্যই আছে৷ কিন্তু তাদের সংখ্যা ও সামর্থ্য ধুরন্ধর রাজনৈতিক নেতা ও বৈশ্য শোষকের শক্তির কাছে একেবারেই নিস্তেজ৷ ফল যা হবার তাই হচ্ছে৷ শিক্ষা ক্ষেত্রে নৈরাজ্য অরাজকতা ছাত্রদের উশৃংখল আচরণ শুধু শিক্ষার পরিধির মধ্যে আর সীমাবদ্ধ নেই৷ সমগ্র সমাজকে গ্রাস করেছে৷ কারণ শিক্ষার সঙ্গে সমাজের সম্পর্ক গভীর৷ শিক্ষাই মানব সমাজের মেরুদন্ড৷ মনুষ্যত্বের বিকাশ, সমাজ চেতনা, সামাজিক মূল্য, মানবীয় মৌলনীতি, সামাজিক সুবিচার এই সমস্ত গুণগুলির সঙ্গে শিক্ষার সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত৷
পশু তার পাশবিক গুণ নিয়েই জন্মগ্রহণ করে৷ কিন্তু একটি মানব শিশু জন্মালেই মানবিক গুণের অধিকারী হয় না৷ তা যদি হতো তবে মানুষ এত হীন কাজ করত না, এত নির্মম নৃশংস হতো না৷ মানব সমাজ এত অন্যায় অবিচার ব্যভিচারের ভরে যেত না৷ তাই মানুষ জন্মালেই মানুষ হয় না৷ মানুষকে পরিপূর্ণ মানুষ হতে চাই উপযুক্ত শিক্ষা৷ যে শিক্ষার মাধ্যমে শিশু অবস্থা থেকেই মানুষ অর্জন করবে মানবিক গুণাবলি৷ তাই মনুষ্যত্বের বিকাশের জন্য সমাজ চেতনার বিকাশের জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষা নীতি৷ কিন্তু বর্তমান শিক্ষা জগতে এই দুইয়েরই অভাব৷
আজ শিক্ষার মূল লক্ষ্য হয়ে গেছে বড় বড় ডিগ্রি অর্জন ও সচ্ছল জীবন যাপনের সুব্যবস্থা৷ এই স্থূলজাগতিক চাহিদাকে মূল লক্ষ্য করে শিক্ষা জগতে শুরু হয়েছে ছাত্রদের মধ্যে এক অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা৷ এরই সুযোগ নিয়েছে বৈশ্য শোষক ও রাজনৈতিক দলগুলি৷ সুযোগ নিয়েছে না বলে বলা ভালো শিক্ষার পরিবেশকে এইভাবেই তৈরি করেছে বর্তমান সমাজের এই দুই কীট৷
মহান দার্শনিক শ্রীপ্রভাতরঞ্জন সরকার তার নব্যমানবতা-ভিত্তিক শিক্ষা গ্রন্থে বলেছেন, ভৌতিক অস্তিত্ব রক্ষা তথা মানসিক বিকাশের জন্য যে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ তাকেই বলবো শিক্ষা৷ কিন্তু বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার একমাত্র লক্ষ্য হয়ে গেছে শুধু ভৌতিক অস্তিত্ব রক্ষা৷ মানসিক বিকাশের দিকটা সম্পূর্ণ উপেক্ষিত থেকে গেছে৷ শিক্ষা ব্যবস্থার এই ত্রুটির কারণেই শিক্ষাক্ষেত্রে এত নৈরাজ্য ব্যভিচার উচ্ছৃঙ্খলতা৷ মানুষের অন্তর জীবনের সঙ্গে বহির জীবনের সুষ্ঠু সমন্বয় সাধন করে বলিষ্ঠ পরিপূর্ণ জীবন বোধসম্পন্ন যুগের প্রয়োজন পরিপূর্তি, জ্ঞান-বিজ্ঞান জগতের অসীম সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়া, নিজের পরিবার ও দেশের আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সমগ্র মানব সমাজের প্রগতির মেলবন্ধন ঘটিয়ে দেওয়াই হবে শিক্ষার সার্থকতা৷ যথার্থ শিক্ষা ব্যবস্থা৷ দলীয় রাজনীতির অনুপ্রবেশ ও প্রভাব বিস্তারের অপচেষ্টা যাদবপুরে শিক্ষার অঙ্গনকে যেভাবে কলুষিত করেছে তার থেকে শিক্ষা নিয়ে সব পক্ষের শুভ বুদ্ধির উদয় হোক, শিক্ষার পবিত্র অঙ্গন রাজনৈতিক দূষণ থেকে মুক্ত হোক৷
- Log in to post comments