গুরু বাড়িতে এসেছে শিষ্য৷ হাতে এক খানা ছবি৷ সাগ্রহে গুরু হাত বাড়িয়ে বললেন, দেখি কেমন এঁকেছো?
শিষ্যগুরুর হাতে অসঙ্কোচে ছবিখানা তুলে দিল৷ গুরু ছবিখানা কিছুক্ষণ দেখেই নাক কুঁচকিয়ে বললেন, ব্যাক গ্রাউণ্ডের রঙ তো ঠিক হয়নি৷
কেমন হবে? সবিনয়ে জিজ্ঞেস করলো শিষ্য৷ ছবির ওপর দৃষ্টি রেখেই গুরু বললেন, একটু লালচে হলেই ভাল হতো৷
বেশ, তাই দেব৷ বলে বিদায় নিল শিষ্য৷ রাত হয়েছে অনেক৷ গুরু শুয়ে পড়লেন৷ কিন্তু চোখে ঘুম নেই৷ শিষ্যের আঁকা ছবিটা বার বার ভেসে ওঠে ন্যায্য বিচারের দাবি নিয়ে৷ ভাবতে থাকেন ছবিটা সম্পর্কে৷ ভাবতে ভাবতে বুঝতে পারলেন হঠাৎ শিষ্যের রঙটাই ঠিক হয়েছে৷ তিনি নিজেই ভুল নির্দেশ দিয়েছেন৷ তাহলে এখন উপায়? শিষ্য যদি তাঁর কথা মতো ছবির রঙ পাল্টে ফেলে, ছবিটা নষ্ট হয়ে যাবে৷ দুর্ভাবনায় ঘুম আসে না গুরুর৷
তখন অন্ধকার৷ সূর্য ওঠেনি৷ ভোর হয় হয়৷ গুরু হন হন করে ছুটলেন শিষ্যের বাড়ি৷ বাড়ি ঠিক নয়---মেসে৷ চার মাইল হেঁটে শিষ্যের মেসের দরজায় টোকা মারলেন৷
আচমকা ঘুম ভেঙে গেলো শিষ্যের৷ চেঁচিয়ে উঠলো কে? আমি৷
গুরুর উত্তেজিত কন্ঠস্বর শুণে তাড়াতাড়ি দরজা খুললো শিষ্য৷
হাঁপাতে হাঁপাতে গুরু জিজ্ঞেস করলেন, তোমার সেই ছবির ব্যাক গ্রাউণ্ডের রঙটা পাল্টে ফেলেছো?
না, কাল রাতে সময় পাইনি৷ আজ পাল্টে দেব৷ বলে ঘাড় নুইয়ে গুরুকে ভেতরে আহ্বান করলো শিষ্য৷
যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন গুরু৷ বললেন, যাক, আর পাল্টাতে হবে না৷ তোমার রঙটাই ঠিক হয়েছে৷ রঙটা ওরকমই হওয়া উচিত৷
শিস্যতো বিস্ময়ে হতবাক৷ এই না হলে গুরু৷ শিষ্যের মাথা লুটিয়ে পড়তে চাইল গুরুর পায়ে৷ শ্রদ্ধায় গদগদ স্বরে বললেন, এই বলার জন্যেই রাত না পোহাতে পাক্কা চার মাইল হেঁটে এসেছেন?
বলতো কে এই গুরুই হলেন ভারতের একনিষ্ঠ শিল্প-সাধক অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর৷ শিষ্যকেও তোমরা সবাই চেনো৷ শিষ্য হচ্ছেন নন্দলাল বসু৷
এবার এঁদের সম্পর্কে শ্রীপ্রভাতরঞ্জন সরকার কি বলেছেন শোণা যাক৷ তিনি বলেছেন---...রাঢ়ের পটুয়ারা পটশিল্পে তো প্রসিদ্ধিত অর্জন করেই ছিলেন তাঁদের অনেকে এই শিল্পটিকে লোকায়তের পরিভূ থেকে লোকোত্তরে ও উন্নীত করেছিলেন৷ তাঁদের ভাবনায় ও তাঁদের অঙ্গুলির সংযুক্ত মুন্সিয়ানায় গড়ে উঠেছিল রাঢ়ের ধ্রপদী চিত্রশিল্প৷ গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (অবণ ঠাকুর ছবি লেখেন), নন্দলাল বসু, সুরেন্দ্রনাথ কর--- এঁরা সবাই জন্মসূত্রে বা বংশধারা সূত্রে রাঢ়ী৷’’ (বাংলা ও বাঙালী)৷
- Log in to post comments